Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

হাজার হাজার বছর আগে কি মানুষ ও নিএন্ডারথালরা চুম্বন করত? নতুন গবেষণায় চাঞ্চল্যকর দাবি

প্রাচীন মানব ইতিহাসে নতুন চমক এনে দিল সাম্প্রতিক গবেষণা। বিজ্ঞানীদের দাবি, আদিম মানুষ ও নিএন্ডারথালদের মধ্যে ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, এমনকি চুম্বনেরও সম্ভাবনা প্রবল। DNA বিশ্লেষণে ইঙ্গিত মিলেছে যে এই ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে একে অপরের মধ্যে রোগ ছড়িয়েছিল। গবেষণাটি মানব বিবর্তন নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

প্রাচীন মানুষ ও নিএন্ডারথালদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের নতুন প্রমাণ—চুম্বনও ছিল যোগাযোগের মাধ্যম, বলছে সাম্প্রতিক গবেষণা

মানব ইতিহাসের গভীরে লুকিয়ে থাকা রহস্য আবারও সামনে আনল সাম্প্রতিক একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা। আদিম মানুষ এবং আমাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় নিএন্ডারথালদের মধ্যে সম্পর্ক ঠিক কতটা ঘনিষ্ঠ ছিল, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা করে আসছেন। সেই ধারাবাহিকতার মধ্যেই উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর ইঙ্গিত—মানুষ ও নিএন্ডারথালরা শুধু প্রজননেই যুক্ত হয়নি, বরং ঘনিষ্ঠ আচরণ, বিশেষত চুম্বন, তাদের পরস্পরের জীবনের একটি স্বাভাবিক সামাজিক প্রক্রিয়া ছিল। এই দাবি শুধু নতুন আলোচনার জন্মই দেয়নি, মানব আচরণের বিবর্তন সম্পর্কেও তুলেছে নতুন প্রশ্ন। এবার আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একদল গবেষকের দাবি—মানবজাতি এবং আমাদের নিকটতম বিলুপ্ত আত্মীয় নিএন্ডারথালদের মধ্যে শুধু শারীরিক মিলন বা প্রজননই নয়, বরং চুম্বনের মতো অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সামাজিক আচরণও ঘটেছিল।

নতুন গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একটি জেনেটিক জার্নালে। গবেষকদলের দাবি, মানবজীবনের প্রাচীন অধ্যায়ে থাকা জিনগত ধারা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তাঁরা এমন কিছু রোগের ছাপ পেয়েছেন, যা শুধুমাত্র ঘনিষ্ঠ মুখোমুখি যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। বিশেষত, মুখগহ্বরের মাধ্যমে ছড়ানো কিছু ভাইরাসের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে মানুষ ও নিএন্ডারথালদের মধ্যে শুধু দেহঘনিষ্ঠতা নয়, চুম্বনের মতো আচরণও ঘটেছিল। এই বিশ্লেষণ মানব–নিএন্ডারথাল সম্পর্কের নতুন এক দিক উন্মোচন করে।

নতুন গবেষণায় কী পাওয়া গেল

গবেষকদের কথায়, আধুনিক মানুষের জিনোমে এবং নিএন্ডারথালের প্রাচীন জৈবিক নমুনায় একই ধরনের হিউম্যান হার্পিসভাইরাস এবং মুখে ছড়ানো কিছু সংক্রামক ব্যাকটেরিয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সাধারণত এসব রোগ ছড়াতে পারে—

  • চুম্বনের মাধ্যমে

  • মুখে-মুখে লালারসের আদান–প্রদান

  • অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ স্পর্শ

  • যৌন সম্পর্ক

  • একই খাবার থেকে লালার সংস্পর্শ

গবেষকদের মতে, মানুষ ও নিএন্ডারথালদের মধ্যে বহু বছর ধরে চলা সম্পর্কের ধারাবাহিক প্রমাণ রয়েছে। তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে বসবাস করত, মিলিত হত, সন্তান উৎপাদন করত। কিন্তু এবার প্রথম বার এমন তথ্য পাওয়া গেল যা দেখাচ্ছে—তাদের সামাজিক আচরণের অন্যতম অংশ ছিল মুখের ঘনিষ্ঠতা।

গবেষণার নেতৃত্বে থাকা বিজ্ঞানী ডঃ এলিনা হফম্যান জানিয়েছেন, “মানুষ ও নিএন্ডারথালরা শুধু প্রজননের জন্য মিলিত হয়নি, বরং একধরনের ‘সামাজিক ঘনিষ্ঠতা’-ও ভাগ করে নিয়েছিল। চুম্বন মানব সামাজিক আচরণের একটি অত্যন্ত পুরোনো অভ্যাস, যা সম্ভবত আমাদের পূর্বপুরুষরা নিএন্ডারথালদের সঙ্গেও করত।”

মানুষ ও নিএন্ডারথালরা কোথায় কোথায় মিলিত হয়েছিল

আধুনিক ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার কিছু অংশে দুই প্রজাতির মিলন ঘটেছিল বলে বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা মনে করেন। কারণ—

  • ইউরোপীয় মানুষের জিনোমে ১ থেকে ২ শতাংশ নিএন্ডারথাল DNA

  • মধ্যপ্রাচ্যে পাওয়া নিএন্ডারথাল নমুনা

  • সাইবেরিয়ায় পাওয়া হাইব্রিড ‘ডেনিসোভান–নিএন্ডারথাল–মানব’ নমুনা

  • আফ্রিকায় খুব কম পরিমাণে নিএন্ডারথাল DNA

এই গবেষণা এখন নতুন করে প্রশ্ন তুলছে, শুধু প্রজনন নয়, সাংস্কৃতিক যোগাযোগও কি ছিল?

কখন এবং কীভাবে ঘটেছিল এই ঘনিষ্ঠতা

মানুষ আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছায় প্রায় ৭০,০০০ বছর আগে। নিএন্ডারথালরা ইতিমধ্যে ইউরোপ–মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে হাজার হাজার বছর ধরে বসবাস করছিল। সেখানেই তাদের প্রথম যোগাযোগ ঘটে।

গবেষকরা বলেন—

  • প্রথম মিলন প্রায় ৬০,০০০ বছর আগে

  • ইউরোপে দ্বিতীয় পর্যায়ের মিলন ৪৫,০০০–৫০,০০০ বছর আগে

  • এশিয়ায় নিএন্ডারথাল–মানব যোগাযোগ আরও দীর্ঘ সময় ধরে

এত দীর্ঘকাল সম্পর্ক থাকার মানে তাঁদের সামাজিক আচরণের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা থাকা স্বাভাবিক।

DNA বিশ্লেষণে রোগের ইঙ্গিত

প্রাচীন মানুষের হাড়, দাঁত, মুখগহ্বরের জীবাণু এবং নিএন্ডারথালের জীবাশ্ম থেকে সংগৃহীত নমুনা বিশ্লেষণে বিজ্ঞানীরা যে ভাইরাস ও মাইক্রোবের প্রমাণ পেয়েছেন, তা সাধারণত ছড়ায়—গবেষণায় যে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে, সেগুলো মূলত ছড়াতে পারে—

  • গভীর চুম্বনের মাধ্যমে

  • লালারসের আদান-প্রদানের মাধ্যমে

  • মুখের ব্যাকটেরিয়া সরাসরি শরীরে প্রবেশের মাধ্যমে

  • অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সামাজিক সংস্পর্শে

  • একই খাদ্য উৎস থেকে লালা-সংস্পর্শে

  • যৌন সম্পর্ক

  • যৌথ পরিবারিক আর সামাজিক পরিবেশ

এটি দেখায় যে দুই প্রজাতি শুধু দ্রুত মিলিত হয়ে সন্তানের জন্ম দিত না, বরং দীর্ঘসূত্র আচরণে যুক্ত হত। এই ধরনের ঘনিষ্ঠতা তখনকার মানুষের মধ্যে রোগ সংক্রমণের নতুন পথ তৈরি করেছিল।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন—

  • মুখে ছড়ানো হার্পিস

  • হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস

  • ট্রোপিক্যাল মুখের ব্যাকটেরিয়া

এসব রোগ নিএন্ডারথাল থেকে মানব বা মানব থেকে নিএন্ডারথালে ছড়িয়েছে। এর মানে, তাঁদের সামাজিক যোগাযোগ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল।

চুম্বন কি মানুষের সহজাত অথচ প্রাচীন অভ্যাস?

গবেষকেরা বলছেন, চুম্বন মানব ইতিহাসে কোনও আধুনিক সংস্কৃতি নয়—বরং আদিম মানুষের সামাজিক আচরণের একটি প্রাকৃতিক অংশ। কারণ—

  • বহু প্রাণীর মধ্যে মুখ–স্পর্শ দেখা যায়

  • প্রাইমেটদের মধ্যে মুখ দিয়ে খাবার আদান–প্রদান

  • মা–শিশুর মুখ–ঘনিষ্ঠ স্নেহের আচরণ

  • বিবর্তনের পথে চুম্বন শৃঙ্খলা বা সম্পর্ক নির্মাণের অংশ

চুম্বনের মাধ্যমে দেওয়া-নেওয়া হতো—

  • বিশ্বাস

  • সামাজিক বন্ধন

  • প্রজনন সংকেত

  • সম্পর্কের অন্তরঙ্গতা

মানুষের ক্ষেত্রে এটি আরও সাংস্কৃতিক মাত্রা পেয়েছে।
 

চুম্বন কেন ঘটেছিল? বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

চুম্বন শুধু রোমান্টিক আচরণ নয়, বরং বিবর্তনের একটি ব্যবহারিক দিক রয়েছে।

১. সামাজিক বন্ধন তৈরি

প্রাচীন সমাজে চুম্বন—

  • বিশ্বাসের সংকেত

  • সম্পর্কের স্থিতিশীলতার চিহ্ন

  • পরিবার গঠনের অংশ

  • প্রজননের প্রস্তুতি

হিসেবে কাজ করত।

২. লালারস বিনিময়ে জৈবিক তথ্য বিনিময়

বিজ্ঞানীরা বলেন—“চুম্বন ছিল সম্ভাব্য সঙ্গীর স্বাস্থ্য, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং জেনেটিক স্থিতিশীলতা পরীক্ষা করার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।”

৩. প্রাইমেট আচরণের ধারাবাহিকতা

অন্য অনেক প্রাইমেট প্রাণী—

এই আচরণ করে। মানুষ ও নিএন্ডারথালরা সেই ধারা বজায় রাখে।

৪. শিশু–সেবা ও পরিবারিক স্নেহ

মা–শিশুর মুখঘনিষ্ঠ আচরণ আজও সব সংস্কৃতিতে দেখা যায়। এর উৎস প্রাগৈতিহাসিক।

নিএন্ডারথালের বৈশিষ্ট্য—কেন তারা আমাদের মতো ছিল

আগে মনে করা হতো নিএন্ডারথালরা ছিল খাটো, রুক্ষ, ভাষাহীন এবং অদক্ষ। কিন্তু গত কয়েক দশকের গবেষণা দেখিয়েছে—

  • তাদের ভাষা ছিল

  • আগুন ব্যবহার করত

  • শিকার করত সংগঠিতভাবে

  • মৃতদেহ কবর দিত

  • শিল্পকর্ম ও গহনা তৈরি করত

  • সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলত

মানুষ ও নিএন্ডারথালকে এখন বিজ্ঞানীরা বলেন—
“সিস্টার স্পিসিস”, অর্থাৎ দুই বোন প্রজাতি।

তাহলে চুম্বন কি নিএন্ডারথালের মধ্যেও ছিল?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, অবশ্যই সম্ভব। কারণ—

  • মুখগহ্বরের DNA–তে একই রোগ

  • জিনগত মিল

  • সামাজিক আচরণে ঘনিষ্ঠতা

  • যৌথ জীবনধারা

নিএন্ডারথালদের মস্তিষ্ক আধুনিক মানুষের মতোই জটিল ছিল। তাই ঘনিষ্ঠ আচরণ, ভালোবাসা, স্নেহ—সবই ছিল।

গবেষণার পদ্ধতি

গবেষকরা ব্যবহার করেছেন—

  • প্রাচীন হাড় ও দাঁতের DNA

  • মাইক্রোবিয়াল অবশিষ্টাংশ

  • জিনগত মিউটেশন বিশ্লেষণ

  • আধুনিক মানব DNA–র তুলনামূলক পরীক্ষা

তারা দেখেছেন—

  • মানুষের মধ্যে থাকা কিছু ভাইরাস নিএন্ডারথালদের মধ্যেও ছিল

  • কিছু রোগ নিএন্ডারথালদের থেকে এসেছে

  • এমন রোগ রয়েছে যা আজও মানুষের দেহে দেখা যায়

এটি প্রমাণ করে যে মানুষের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক দীর্ঘ ছিল।

সামাজিক যোগাযোগের ভূমিকা

চুম্বন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কারণ এটি—

  • সম্পর্কের ভরসা বাড়ায়

  • সামাজিক যোগাযোগকে দৃঢ় করে

  • পরিবারিক বন্ধন বাড়ায়

  • যৌন আচরণে ভূমিকা রাখে

চুম্বন শুধু আবেগ নয়, এটি ছিল—

“বিবর্তনের অংশ”

মানব বিবর্তনের নতুন ব্যাখ্যা

গবেষণার ফলে বিজ্ঞানীরা বলছেন—

  • আদিম মানুষের আচরণ আরও জটিল ছিল

  • নিএন্ডারথাল ও মানুষ একই সামাজিক প্যাটার্ন ব্যবহার করত

  • ঘনিষ্ঠ আচরণের মাধ্যমে রোগও ছড়িয়েছে

  • মানব ইতিহাসে নতুন সংক্রমণ পথ তৈরি হয়েছে

  • মানুষের অভিবাসন ও সম্পর্ক আরও পরিষ্কার হলো

নিএন্ডারথালরা কেন বিলুপ্ত হলো

এ নিয়ে নানা তত্ত্ব রয়েছে—

  • মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা

  • খাদ্যের অভাব

  • জলবায়ু পরিবর্তন

  • রোগ ছড়ানো

  • মানব গোষ্ঠীর আধিপত্য

এ গবেষণা একটি নতুন ভাবনাও দেয়—
রোগের মারাত্মক সংক্রমণ নিএন্ডারথালদের পতন ত্বরান্বিত করেছিল কি না।

মানুষ ও নিএন্ডারথাল—একটি মিশ্র ইতিহাস

আজকের আধুনিক মানুষের শরীরে এখনও নিএন্ডারথালের জিনের উপস্থিতি প্রমাণ করে—

  • তারা শত্রু ছিল না

  • বরং সহযোগী ছিল

  • সম্পর্কের নানা স্তরে যুক্ত ছিল

  • যৌথভাবে বহু বছর বেঁচেছিল

মানব জাতি সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি

গবেষণাটি দেখায়—

  • মানুষের সামাজিক আচরণের শিকড় অত্যন্ত গভীর

  • আদিম মানুষ অনেকটাই আধুনিক মানুষের মতো

  • সম্পর্ক ও ভালোবাসা ছিল আদিকাল থেকেই

  • ঘনিষ্ঠতা ও সামাজিক জীবনমান বিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই গবেষণা শুধু অতীতকে জানায় না, বরং মানুষের আচরণের উৎস ও প্রকৃতি সম্পর্কেও নতুন প্রশ্ন তোলে।

Preview image