Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ডলারের দামে ৯৬.৩১ টাকা কেন বারবার দুর্বল হচ্ছে ভারতীয় মুদ্রা, নেপথ্যে কোন কোন কারণ?

ডলারের বিপরীতে ফের দুর্বল হয়েছে ভারতীয় টাকা। ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর একদিনেই প্রায় ০.৫ শতাংশ পড়ে গিয়ে ডলারের দাম পৌঁছেছে ৯৬ টাকা ৩১ পয়সার কাছাকাছি। দুই মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি ছিল টাকার সবচেয়ে বড় দৈনিক পতন। কিন্তু কেন বারবার চাপের মুখে পড়ছে ভারতীয় মুদ্রা? এর পিছনে রয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক ও দেশীয় কারণ। মার্কিন সরকারি বন্ডের ফলন বৃদ্ধি, শক্তিশালী ডলার সূচক এবং ১০০ ডলারের উপরে ওঠা অপরিশোধিত তেলের দাম টাকার ওপর চাপ বাড়িয়েছে। একইসঙ্গে বিদেশি লগ্নিকারীদের ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে বিপুল অর্থ তুলে নেওয়ায় ডলারের চাহিদা বেড়েছে। তেলের দাম বাড়ায় ভারতের মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিতে আরও বেশি ডলার খরচ করতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারেও সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গিয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ৯৬.৩১ টাকার এই বিনিময় হার কি সাময়িক আন্তর্জাতিক চাপের ফল, নাকি ভারতীয় অর্থনীতির সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত? আন্তর্জাতিক বাজার, বিদেশি বিনিয়োগ, তেলের দাম এবং রিজার্ভ পরিস্থিতি—সব মিলিয়েই টাকার ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারিত হতে পারে।

ডলারের বিপরীতে ভারতীয় টাকার দর নিয়ে ফের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের ১ অক্টোবরের বাজারে এক ডলারের দাম প্রায় ৯৬ টাকা ৩১ পয়সায় পৌঁছে যায়। ওই দিন ভারতীয় মুদ্রা প্রায় ০.৫ শতাংশ দুর্বল হয়ে ৯৬.৩১৫০ স্তরে বন্ধ হয়। আগের দিনের দর ছিল প্রায় ৯৫.৮৩ টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক দিনের ব্যবধানেই টাকার ওপর বেশ বড় চাপ তৈরি হয়েছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, কয়েক দিনের মধ্যেই দু’বার ডলারের দর ৯৬ টাকার গণ্ডি পার করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, কেন বারবার দুর্বল হচ্ছে ভারতীয় মুদ্রা? এই পতন কি শুধুই সাময়িক আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ, নাকি এর পিছনে ভারতের অর্থনীতির কিছু দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জও রয়েছে?

বিনিময় হারকে অনেক সময় শুধু একটি সংখ্যা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে এক ডলারের বিনিময়ে কত টাকা দিতে হচ্ছে, সেই সংখ্যা একটি দেশের অর্থনীতির বহু গুরুত্বপূর্ণ দিকের সঙ্গে যুক্ত। আমদানি খরচ, রপ্তানি আয়, বিদেশি বিনিয়োগ, জ্বালানির দাম, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বিনিয়োগকারীদের মনোভাব সবকিছুর প্রভাব পড়ে মুদ্রার দরের ওপর। তাই টাকার ৯৬.৩১ স্তরে পৌঁছনোকে বুঝতে হলে শুধু ভারতীয় বাজারের দিকে তাকালে হবে না। একই সঙ্গে দেখতে হবে আমেরিকার অর্থনীতি, মার্কিন ট্রেজারি বন্ড, ডলারের শক্তি, অপরিশোধিত তেলের দাম এবং বিশ্ববাজারে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতাকেও।

টাকার এই সাম্প্রতিক দুর্বলতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মার্কিন বন্ডের ফলন বৃদ্ধি। আমেরিকার ১০ বছরের সরকারি ট্রেজারি বন্ডের ফলন ৫.৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে বলে বাজার তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এই স্তর আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমেরিকার সরকারি বন্ডকে সাধারণত তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদ হিসেবে দেখা হয়। যখন সেই বন্ড থেকে পাওয়া সম্ভাব্য রিটার্ন বাড়ে, তখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিনিয়োগকারীদের কাছে ডলার নির্ভর সম্পদ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে উদীয়মান অর্থনীতির বাজার থেকে কিছু অর্থ আমেরিকার দিকে সরে যেতে পারে।

এই প্রক্রিয়াটি সরাসরি ভারতীয় টাকার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। কোনও বিদেশি বিনিয়োগকারী যদি ভারতীয় শেয়ার বা বন্ড বিক্রি করে সেই অর্থ আমেরিকায় নিয়ে যেতে চান, তাহলে সাধারণত তাঁকে ভারতীয় টাকা ডলারে রূপান্তর করতে হয়। ফলে বাজারে ডলারের চাহিদা বাড়ে। অন্যদিকে টাকার চাহিদা কমে। চাহিদা ও জোগানের এই পরিবর্তন বিনিময় হারে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই মার্কিন বন্ডের ফলন বৃদ্ধির প্রভাব শুধু আমেরিকার বাজারে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর ঢেউ ভারত-সহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল অর্থনীতির মুদ্রাবাজারেও পৌঁছতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলার সূচকের শক্তিশালী অবস্থান। ডলার সূচক প্রায় ১০১.৯-এর কাছাকাছি উঠে যাওয়ায় বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলারের চাহিদা ও শক্তি বেড়েছে। ডলার যখন অন্যান্য প্রধান মুদ্রার তুলনায় শক্তিশালী হয়, তখন উদীয়মান বাজারের মুদ্রাগুলির ওপর স্বাভাবিকভাবেই চাপ তৈরি হতে পারে। ভারতের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ টাকার দুর্বলতাকে শুধু ভারতের নিজস্ব সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি ধরা পড়বে না। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের শক্তিশালী অবস্থানও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে ভারতীয় টাকার ওপর চাপ তৈরির ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আচরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রত্যাহারের কথা বাজার-তথ্যে উঠে এসেছে। প্রায় তিন লক্ষ কোটি টাকার মতো অর্থ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তুলে নিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ যখন কমে যায় বা বিপুল বিক্রি শুরু হয়, তখন শেয়ারবাজারের ওপর চাপ পড়ার পাশাপাশি মুদ্রাবাজারেও তার প্রভাব দেখা দিতে পারে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভারতীয় সম্পদ বিক্রির পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক সুদের হার, মার্কিন বন্ডের ফলন, বিশ্ব অর্থনীতির সম্ভাবনা, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, অপরিশোধিত তেলের দাম এবং বিভিন্ন দেশের বাজারে সম্ভাব্য রিটার্ন এসব বিষয় বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। কোনও সময় যদি আমেরিকার সম্পদ তুলনামূলক আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ বা উদীয়মান বাজার থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। ভারতের মতো বড় বাজারেও সেই প্রভাব পড়া অস্বাভাবিক নয়।

ভারতের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বিষয় হল অপরিশোধিত তেলের দাম। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেলে ভারতীয় অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়তে পারে। কারণ ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় তেল আমদানিকারক দেশ। দেশের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি চাহিদা মেটাতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করতে হয়। তেলের দাম বাড়লে একই পরিমাণ তেল কেনার জন্য আগের তুলনায় বেশি ডলার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ তেলের দাম বাড়া মানে শুধু পেট্রল বা ডিজেলের বাজারে সম্ভাব্য চাপ নয়, একই সঙ্গে ডলারের চাহিদাও বাড়তে পারে।

এই জায়গাতেই টাকার সঙ্গে তেলের দামের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ধরুন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হঠাৎ অনেক বেড়ে গেল। ভারতীয় তেল আমদানিকারকদের তখন বেশি ডলার দিয়ে একই পরিমাণ তেল কিনতে হতে পারে। বাজারে ডলারের চাহিদা বাড়লে টাকার ওপর চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ অবস্থানে থাকলে ভারতের আমদানি ব্যয়ও বাড়তে পারে। এর ফলে বাণিজ্য ঘাটতি এবং চলতি হিসাবের ভারসাম্যের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন খরচের মাধ্যমেও অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ পৌঁছতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। সেখানে উত্তেজনা বা সংঘাতের আশঙ্কা বাড়লে বাজারে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিনিয়োগকারীরা তখন ভবিষ্যৎ তেলের দাম নিয়ে বেশি সতর্ক হয়ে ওঠেন। তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হলে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলির মুদ্রার ওপরও চাপ পড়তে পারে। ভারতের ক্ষেত্রে তেলের আমদানির ওপর নির্ভরতা থাকার কারণে এই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

টাকার দুর্বলতার সঙ্গে ভারতের শেয়ারবাজারের সাম্প্রতিক গতিবিধিরও সম্পর্ক রয়েছে। বাজার তথ্য অনুযায়ী, নিফটি ও সেনসেক্স টানা কয়েক সপ্তাহ সাপ্তাহিক পতনের মুখে পড়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে পতন থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রির চাপ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শেয়ারবাজার থেকে অর্থ বেরিয়ে যাওয়া এবং মুদ্রার দুর্বলতা অনেক সময় একে অপরকে প্রভাবিত করতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করলে ডলারের চাহিদা বাড়ে, আবার দুর্বল টাকা বিদেশি বিনিয়োগের রিটার্নকেও প্রভাবিত করতে পারে। ফলে বাজারের দুই দিকের মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।

অবশ্য টাকার দুর্বলতা মানেই ভারতের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। মুদ্রার বিনিময় হার আন্তর্জাতিক অর্থনীতির নানা পরিবর্তনের প্রতিফলন। কখনও কোনও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ভালো থাকলেও আন্তর্জাতিকভাবে ডলার শক্তিশালী হয়ে উঠলে সেই দেশের মুদ্রা দুর্বল হতে পারে। একইভাবে বিদেশি পুঁজি অন্য বাজারে চলে যাওয়ার কারণে সাময়িক চাপ তৈরি হতে পারে। তাই একটি নির্দিষ্ট দিনের বিনিময় হার দিয়ে পুরো অর্থনীতির স্বাস্থ্য বিচার করা যায় না।

তারপরও ৯৬.৩১ টাকার স্তর গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিতে বিভিন্ন খাতে প্রভাব ফেলতে পারে। সবচেয়ে আগে প্রভাব পড়তে পারে এমন একটি জায়গা হল আমদানি। বিদেশ থেকে পণ্য কিনতে হলে ভারতীয় আমদানিকারকদের ডলারে অর্থ পরিশোধ করতে হয়। ডলারের দাম বেড়ে গেলে একই ডলারের জন্য বেশি টাকা দিতে হয়। ফলে আমদানির খরচ বাড়তে পারে। যেসব সংস্থা বিদেশ থেকে কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক পণ্য বা অন্যান্য পণ্য আমদানি করে, তাদের ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

তেলের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। ডলারের দাম বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও ভারতীয় মুদ্রায় তেলের আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। আবার একই সময়ে তেলের আন্তর্জাতিক দামও যদি বেড়ে যায়, তাহলে দ্বিগুণ চাপ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ একদিকে ডলার শক্তিশালী, অন্যদিকে তেল মহার্ঘ এই দুই পরিস্থিতি একসঙ্গে ঘটলে ভারতের আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

এখানে মূল্যস্ফীতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়লে সেই বাড়তি খরচ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলি শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যুক্ত করতে পারে। অবশ্য কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করে বাজারের প্রতিযোগিতা, সরকারি নীতি, পণ্যের চাহিদা এবং ব্যবসায়ীদের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতার ওপর। তাই টাকার দুর্বলতা সবসময় সরাসরি একই মাত্রায় খুচরো মূল্যস্ফীতি বাড়ায় না। তবে দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রা দুর্বলতা আমদানি-নির্ভর খাতে মূল্যচাপ তৈরির সম্ভাবনা বাড়ায়।

অন্যদিকে টাকার দুর্বলতার কিছু সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। ভারতের রপ্তানিকারীরা বিদেশি বাজারে পণ্য বিক্রি করে ডলারে আয় করলে সেই ডলার দেশে এনে বেশি টাকা পেতে পারেন। ফলে কিছু রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা, কিছু উৎপাদনশিল্প এবং অন্যান্য রপ্তানিমুখী ব্যবসা দুর্বল টাকা থেকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সুবিধা পেতে পারে। তবে এই সুবিধা কতটা হবে, তা নির্ভর করে তাদের আমদানি করা কাঁচামাল ও অন্যান্য খরচ কতটা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কেমন রয়েছে তার ওপর।

news image
আরও খবর

ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। ২৫ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার প্রায় ১৮.৩৪ বিলিয়ন ডলার কমে ৭৪৭.৫৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে বলে বাজার-তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ৪ সেপ্টেম্বর ভাণ্ডার প্রায় ৭৮৫.৭১ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড উচ্চতায় ছিল। অর্থাৎ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভাণ্ডারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার কমার বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে এবং প্রতিটি পরিবর্তনকে সরাসরি টাকা বাঁচাতে রিজার্ভ ব্যবহার হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। তবে বাজারে টাকার ওপর চাপ থাকলে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করে অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে পারে।

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত মুদ্রাবাজারে অতিরিক্ত অস্থিরতা তৈরি হলে পরিস্থিতি সামলানোর জন্য বিভিন্ন উপায় ব্যবহার করতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার থেকে ডলার বিক্রি করে বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ানো তার একটি উপায় হতে পারে। এর ফলে অতিরিক্ত ডলার চাহিদার চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য সাধারণত কোনও নির্দিষ্ট বিনিময় হারকে চিরস্থায়ীভাবে ধরে রাখা নয়; বরং বাজারে অতিরিক্ত অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের সরকারি বন্ডের ফলন বৃদ্ধিও বর্তমান পরিস্থিতির আরেকটি দিক। ১০ বছরের ভারতীয় সরকারি বন্ডের ফলন ৭.২১ শতাংশে পৌঁছেছে বলে বাজার-তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। বন্ডের ফলন বৃদ্ধি হলে সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের সম্পদ বণ্টনের ওপর বিভিন্ন প্রভাব পড়তে পারে। একই সময়ে যদি মার্কিন বন্ডের ফলনও দ্রুত বাড়ে, তাহলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা দুই দেশের সম্পদের ঝুঁকি ও সম্ভাব্য রিটার্ন নতুন করে হিসাব করতে পারেন।

মুদ্রার দরের ক্ষেত্রে সুদের হারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনও দেশের সুদের হার এবং অন্য দেশের সুদের হারের পার্থক্য বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যদি মার্কিন সম্পদের সম্ভাব্য রিটার্ন উল্লেখযোগ্যভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, তাহলে ডলারের চাহিদা বাড়তে পারে। ভারতের ক্ষেত্রে সেই পরিস্থিতি তৈরি হলে বিদেশি পুঁজি প্রবাহে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। অবশ্য শুধু সুদের হার নয়, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্পোরেট আয়ের সম্ভাবনা, রাজনৈতিক ও ভূ রাজনৈতিক ঝুঁকি এবং বাজারের মূল্যায়নও বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।

এখন প্রশ্ন হল, ৯৬.৩১ টাকার এই স্তর কি সাময়িক চাপ, নাকি আরও বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত? এর উত্তর এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয়। মুদ্রাবাজার অত্যন্ত গতিশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের শক্তি কমলে, তেলের দাম নেমে এলে, বিদেশি বিনিয়োগ আবার বাড়লে কিংবা বৈশ্বিক ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা ফিরলে টাকার ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। আবার বিপরীতভাবে মার্কিন বন্ডের ফলন আরও বাড়লে, তেলের দাম দীর্ঘ সময় ১০০ ডলারের ওপরে থাকলে এবং বিদেশি বিনিয়োগের বহিঃপ্রবাহ অব্যাহত থাকলে টাকার ওপর চাপ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

ভারতের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে এই চাপ কতদিন থাকে এবং কীভাবে বিভিন্ন সূচক একসঙ্গে পরিবর্তিত হয়। একদিনের পতন বা একটি নির্দিষ্ট বিনিময় হার দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না। বরং দেখতে হবে ডলারের সূচক, অপরিশোধিত তেলের দাম, বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ, বাণিজ্য ঘাটতি, চলতি হিসাব, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার এবং বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারের গতিপথ কোন দিকে যাচ্ছে।

বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও ভারতের টাকার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক পুঁজির গতিপথের ওপর। আমেরিকার অর্থনীতি শক্তিশালী থাকলে এবং মার্কিন সম্পদের রিটার্ন আকর্ষণীয় থাকলে বিশ্বজুড়ে ডলারের চাহিদা শক্তিশালী থাকতে পারে। অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ঝুঁকি কমলে এবং বিনিয়োগকারীরা উদীয়মান বাজারের দিকে ফিরলে ভারতের মতো বাজারে বিদেশি পুঁজির প্রবাহ বাড়তে পারে। সেই পরিস্থিতিতে টাকার ওপর চাপ কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের রপ্তানি যদি বাড়ে, পরিষেবা খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় শক্তিশালী থাকে, পর্যাপ্ত বিদেশি বিনিয়োগ আসে এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ নিয়ন্ত্রিত থাকে, তাহলে মুদ্রাবাজারে ভারসাম্য বজায় রাখা তুলনামূলক সহজ হতে পারে। বিপরীতে তেলসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের আমদানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে গেলে এবং একই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ কমে গেলে ডলারের চাহিদা ও জোগানের ব্যবধান বাড়তে পারে।

সাধারণ মানুষের কাছে টাকার দুর্বলতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হতে পারে আমদানি করা পণ্য ও বিদেশে খরচের ক্ষেত্রে। বিদেশে পড়াশোনা, ভ্রমণ, চিকিৎসা বা ব্যবসার জন্য ডলার কিনতে হলে বেশি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। বিদেশি পরিষেবা বা আমদানি করা পণ্যের খরচও বাড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে যেসব পরিবার বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স পায়, তারা ডলারের বিপরীতে বেশি টাকা পেতে পারে। ফলে মুদ্রার দুর্বলতার প্রভাব সবার ক্ষেত্রে একই রকম হয় না।

ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খাতভেদে আলাদা। যেসব সংস্থা ডলার-নির্ভর কাঁচামাল আমদানি করে, তাদের ব্যয় বাড়তে পারে। আবার যেসব সংস্থা বিদেশে পণ্য বা পরিষেবা রপ্তানি করে, তারা বেশি টাকা আয় করতে পারে। তাই টাকার পতনকে সব ব্যবসার জন্য একই ধরনের সমস্যা হিসেবে দেখা যায় না। কোন সংস্থা কতটা আমদানি-নির্ভর এবং কতটা রপ্তানিমুখী, তার ওপর প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হল, টাকার বিনিময় হার ভারতের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও এটি একা পুরো অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরে না। ৯৬.৩১ টাকা প্রতি ডলারের দর নিঃসন্দেহে বাজারে আলোচনার কারণ তৈরি করেছে। কিন্তু এর সঙ্গে ভারতের উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, পরিষেবা খাত, সরকারি আর্থিক অবস্থা, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তথ্যও বিবেচনা করতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই নজর থাকবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের শক্তি কমছে না বাড়ছে, মার্কিন ১০ বছরের ট্রেজারি বন্ডের ফলন কোন দিকে যাচ্ছে, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের ওপরে স্থায়ী হচ্ছে কি না, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় বাজারে ফিরছেন কি না, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক মুদ্রাবাজারে কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারের গতিপথ কেমন থাকছে এই সূচকগুলিই আগামী দিনে টাকার অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সব মিলিয়ে, ডলারের বিপরীতে ৯৬ টাকা ৩১ পয়সার স্তর শুধুমাত্র একটি বিনিময় হার নয়। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের শক্তি, মার্কিন বন্ডের উচ্চ ফলন, অপরিশোধিত তেলের চড়া দাম, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রি এবং ভারতের আমদানি নির্ভরতার মতো একাধিক বিষয় একসঙ্গে প্রতিফলিত হচ্ছে। একই সময়ে এশিয়ার অন্যান্য মুদ্রাও যদি ডলারের চাপে দুর্বল হয়, তাহলে বোঝা যায় যে সমস্যার একটি বড় অংশ বৈশ্বিক। তবে ভারতের ক্ষেত্রে তেল আমদানির উচ্চ নির্ভরতা এবং বিদেশি পুঁজির প্রবাহের পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

তাই ৯৬.৩১ টাকার স্তরকে শুধুমাত্র আতঙ্কের কারণ হিসেবে দেখার বদলে এর পিছনের অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াগুলি বোঝা বেশি জরুরি। টাকা আরও দুর্বল হবে কি না, নাকি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে আবার কিছুটা শক্তি ফিরে পাবে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনে ডলারের অবস্থান, তেলের বাজার, বিদেশি বিনিয়োগ এবং ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যের ওপর। একটি দিনের পতন দীর্ঘমেয়াদি সংকটের নিশ্চিত প্রমাণ নয়। কিন্তু যদি একই সঙ্গে তেলের দাম, ডলারের শক্তি এবং বিদেশি অর্থের বহিঃপ্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ভারতের নীতিনির্ধারকদের জন্য পরিস্থিতি সামলানো অবশ্যই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

অর্থাৎ ভারতীয় টাকার ৯৬.৩১ টাকার স্তরকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন ভারতের মতো বড় আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিতে কত দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে, তার একটি উদাহরণ হিসেবে। আগামী দিনের মুদ্রাবাজারের গতিপথ নির্ধারণ করবে শুধু ভারত নয়, আমেরিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের আচরণ পর্যন্ত বিস্তৃত একাধিক কারণ। সেই কারণেই টাকার ওঠানামা বোঝার জন্য শুধু ডলারের দাম নয়, পুরো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ছবির দিকে নজর রাখা প্রয়োজন।

Preview image