Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

দক্ষিণ কলকাতায় পোষ্যদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে দেবশ্রী রায়ের সঙ্গে অশোভন আচরণ

দেবশ্রী রায়, যিনি দীর্ঘদিন ধরে পশু কল্যাণের জন্য কাজ করছেন, দক্ষিণ কলকাতার এক আবাসনে পোষ্য কুকুরদের নিরাপত্তা ও পরিচর্যা নিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা সম্মুখীন হন। পুলিশ এসে পরিস্থিতি সামাল দেন।

দীর্ঘদিন ধরেই পশুপ্রেমী দেবশ্রী রায় পোষ্যদের কল্যাণ ও নিরাপত্তার জন্য কাজ করে আসছেন। তার স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘দেবশ্রী রায় ফাউন্ডেশন’ পথকুকুরদের আশ্রয়, চিকিৎসা ও সার্বিক যত্নের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। সংস্থার লক্ষ্য শুধুমাত্র পশুদের সুরক্ষা নয়, বরং শহরে মানুষের মধ্যে পশুপ্রেম ও সচেতনতা বৃদ্ধিও। এই কাজের মাধ্যমে দেবশ্রী নিজের শিল্পী পরিচয়কে পেছনে রেখে সমাজে একটি মানবিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন।

কিন্তু সম্প্রতি দক্ষিণ কলকাতার একটি আবাসনে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা দেখিয়েছে, যে পশুদের প্রতি সহানুভূতি এবং তাদের নিরাপত্তার জন্য দাঁড়ানো কতটা কঠিন ও বিপজ্জনক হতে পারে। সম্প্রতি জানা গেছে, আবাসনের কিছু বাসিন্দা পোষ্য কুকুরদের বাইরে ঘোরানোর সময় প্রতিবেশীদের বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। অভিযোগ ছিল, আদৃজা নামের এক বাসিন্দা ও তার স্বামী তাদের কুকুরকে নিয়ে বের হলে, কিছু প্রতিবেশী তাদের ওপর চড়াও হন। এই ঘটনার খবর পেয়ে দেবশ্রী রায়, যিনি আদৃজার সংস্থার সদস্য, ঘটনাস্থলে পৌঁছান সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে।

যদিও উদ্দেশ্য ছিল সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান করা, দেবশ্রী রায়কে তাত্ক্ষণিকভাবে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। উপস্থিত কয়েকজন বাসিন্দা তাকে প্রশ্ন করেন, “আপনি কে? আমাদের সোসাইটিতে এসে প্রশ্ন করছেন কেন?” এমনকি কেউ কেউ তার দিকে হেয়প্রকাশ করে বলেন, “You are just an actress।” এই ধরনের মন্তব্য স্পষ্টভাবে দেখায় যে, অনেকের কাছে মানুষের সামাজিক পরিচয় বা খ্যাতি কখনও কখনও কাজের গুরুত্বের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।

পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠলে স্থানীয় পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশের উপস্থিতিতে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। দেবশ্রী রায়ের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, তিনি শুধুমাত্র একজন অভিনেত্রী নন; বরং তিনি প্রায় ১৫–২০ বছর ধরে অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ারের সঙ্গে যুক্ত এবং পোষ্যদের প্রতি তার দায়িত্ব গুরুতর। তিনি আরও বলেন, “আমি শুনেছি তাদের পোষ্যদের মলত্যাগের পর পরিষ্কার করলেও হেনস্থা করা হচ্ছে। তাই মনে হয়েছে পাশে দাঁড়ানো উচিত।”

এই ঘটনাটি সমাজে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে—পশুদের অধিকার এবং মানুষের অসহিষ্ণুতার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে স্থাপন করা যায়। কলকাতার মতো শহরে যেখানে আবাসন ও জনসংখ্যার চাপ বেশি, সেখানে পথকুকুর ও পোষ্যদের নিয়ে সমস্যাগুলি প্রায়ই তীব্র রূপ নেয়। অনেক বাসিন্দা মনে করেন, কুকুরের মালিকেরা পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ ও পরিচর্যা নিশ্চিত না করলে তাদের উপস্থিতি বিরক্তির কারণ হতে পারে। অন্যদিকে, পশুপ্রেমীরা মনে করেন, পোষ্যদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

দেবশ্রী রায়ের মতো ব্যক্তি এই সমস্যার সমাধানে একটি মধ্যস্থকারী ভূমিকা নিতে পারেন। তিনি কেবল ব্যক্তিগতভাবে পশুদের যত্ন নেন না, বরং সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন ওয়ার্কশপ, ক্যাম্পেইন ও সামাজিক প্রচারণার মাধ্যমে সমাজে পশুপ্রেম ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তার সংস্থা পথকুকুরদের চিকিৎসা, খাবার, আশ্রয় এবং পুনর্বাসনের মতো সেবা প্রদান করে থাকে।

এ ধরনের ঘটনা শুধু দক্ষিণ কলকাতায় নয়, বরং সমগ্র শহরে পশু ও মানুষের সহাবস্থানের জটিলতা তুলে ধরে। পোষ্য কুকুর বা অন্যান্য প্রাণীর উপস্থিতি নিয়ে সমাজে যে ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়, তা প্রায়ই জানার বাইরে থাকে। অনেক মানুষ মনে করেন, কুকুর বা অন্যান্য পোষ্য বাড়ির বাইরে ঘোরানো সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু পশুপ্রেমীরা বলেন, প্রাণীদের যথাযথ পরিচর্যা ও নিয়ম মেনে চললে এই সমস্যাগুলি সহজেই এড়ানো সম্ভব।

দেবশ্রী রায়ের এই উদ্যোগ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও তুলে ধরে—সমাজে পশু অধিকার নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। বহু মানুষের কাছে, বিশেষ করে যারা বড় শহরে বাস করেন, পোষ্যদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা আইন ও নিয়ম মানা প্রায়শই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে অভিনেত্রী হিসেবে দেবশ্রী রায়ের সামাজিক প্রভাব অনেক বড়। তিনি এই প্রভাব ব্যবহার করে মানুষের মনে পশুদের প্রতি দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতা জাগানোর চেষ্টা করছেন।

news image
আরও খবর

এই ধরনের পরিস্থিতিতে যে প্রধান চ্যালেঞ্জটি উঠে আসে, তা হলো—কীভাবে ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে ভারসাম্য রাখা যায়। অনেক সময় কুকুরের মালিকরা মনে করেন, তাদের পোষ্যদের জন্য তারা যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছেন, কিন্তু অন্য বাসিন্দারা হয়তো এরকম মনে করেন না। এমন জটিলতা মোকাবিলা করতে প্রয়োজন একটি সংলাপমূলক এবং সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি। দেবশ্রী রায়ের ঘটনাটি দেখিয়েছে, এই সংলাপ এবং সংবেদনশীলতা কখনও কখনও সঠিকভাবে কাজ না করলেও, প্রতিবাদ এবং সচেতনতা উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ।

পুলিশের হস্তক্ষেপে যদিও পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়, তবু এটি শুধু একটি সংকেত দেয় যে, শহরে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করার জন্য আরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। স্থানীয় প্রশাসন, আবাসন কমিটি এবং পশু কল্যাণ সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করা জরুরি, যাতে পোষ্য কুকুর এবং মানুষ উভয়ের অধিকার রক্ষা করা যায়।

দেবশ্রী রায়ের মন্তব্যের মাধ্যমে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রকাশ পায়—সচেতনতা বাড়লেও সামাজিক অসহিষ্ণুতা কমেনি। অনেক মানুষ এখনও সামাজিক পদ, পরিচয় বা খ্যাতি দিয়ে অন্যকে হেয়প্রকাশ করার প্রবণতা দেখান। এমন পরিস্থিতিতে একজন সাধারণ ব্যক্তি বা একজন সমাজসেবক হিসেবে দাঁড়ানো মানে শুধু সাহসিকতা নয়, বরং একটি সামাজিক বার্তা প্রদান করা। দেবশ্রী রায় এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারেন, এবং এই ধরনের সাহসিকতা অন্যান্য মানুষকেও অনুপ্রাণিত করতে পারে।

পশুদের অধিকার রক্ষা ও মানুষের অসহিষ্ণুতা মোকাবিলায়, দেবশ্রী রায়ের ঘটনা আমাদের শেখায়—প্রতিটি ব্যক্তি যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন এবং সংবেদনশীল হয়, তাহলে সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব। বিশেষ করে বড় শহরগুলিতে যেখানে স্থান, জনসংখ্যা এবং সামাজিক চাপ বেশি, সেখানে এই সংবেদনশীলতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

এই ঘটনাটি শুধু একটি স্থানীয় সংবাদ নয়; এটি একটি সামাজিক শিক্ষাও। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পশুদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কখনও ছোট বা তুচ্ছ নয়। পোষ্যদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং সামাজিক সংবেদনশীলতা প্রকাশ করা—এই তিনটি দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

দেবশ্রী রায়ের মতো ব্যক্তিত্ব শুধুমাত্র খ্যাতির কারণে নয়, বরং সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমাজে পরিবর্তন আনতে সক্ষম। তার এই উদ্যোগ অন্যান্য নাগরিকদেরও অনুপ্রাণিত করতে পারে, যাতে শহরে পশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও সহমর্মী পরিবেশ তৈরি করা যায়।

শেষমেষ, দক্ষিণ কলকাতার এই ঘটনা একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করে—যখন ব্যক্তি সাহসিকতার সঙ্গে পশু অধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের জন্য দাঁড়ায়, তখন অসহিষ্ণুতা ও প্রতিবাদ মেনে নেওয়া যায় না। তবে পুলিশের হস্তক্ষেপ এবং সমাজের সংবেদনশীলতার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। এই ঘটনার মাধ্যমে নাগরিকরা আরও সচেতন হতে পারেন, যাতে ভবিষ্যতে এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি এড়ানো যায় এবং শহরে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান প্রতিষ্ঠিত হয়।

দেবশ্রী রায়ের উদ্যোগ আমাদের শেখায়, পশুদের প্রতি সহানুভূতি এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ কখনও আলাদা নয়। তারা একসঙ্গে কাজ করলে একটি মানবিক ও ন্যায়সঙ্গত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। দক্ষিণ কলকাতার এই ঘটনা তার নিজের কাজের প্রতি দৃঢ়তা, সাহসিকতা এবং দায়িত্ববোধের নিদর্শন, যা সমাজকে অনুপ্রাণিত করতে পারে এবং ভবিষ্যতে আরও সচেতন নাগরিক তৈরি করতে সাহায্য করবে।

Preview image