বজরঙ্গি ভাইজান-এর আদুরে মুন্নি হর্ষালি মালহোত্রা প্রায় এক দশক পর বড়পর্দায় ফিরছেন নন্দমুরি বালকৃষ্ণর ‘অখণ্ড ২ এ।ছোট্ট মুন্নি থেকে পরিণত অভিনেত্রী, হর্ষালি এবার জনানি চরিত্রে দর্শকদের মুগ্ধ করতে চলেছেন।প্যান-ইন্ডিয়া মুক্তির মাধ্যমে হর্ষালির এই কামব্যাক নতুন অধ্যায় খুলতে চলেছে অভিনয়জীবনে।সাত বছরের মুন্নি এখন আত্মবিশ্বাসী ও নতুন লুকে বড়পর্দায় প্রত্যাবর্তন করছেন।দশ বছর পর হর্ষালি মালহোত্রা আবারও দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে দেখাতে চলেছেন।
২০১৫—ভারতীয় বক্স অফিস যেন সেদিন থমকে গিয়েছিল একটি ছোট্ট, নির্বাক মেয়ের হাসিতে। ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ তখন শুধু আরেকটি সালমান খান সিনেমা ছিল না; সেই ছবিতে জন্ম নিয়েছিল এক বিশেষ আবেগ, এক অনন্য স্নেহ, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মাত্র সাত বছরের একটি শিশু—হর্ষালি মালহোত্রা, ওরফে মুন্নি। পাকিস্তান থেকে হারিয়ে এসে ভারতে আটকে পড়া সেই নির্বাক মেয়েটিকে তার মায়ের কাছে ফেরানোর জন্য বাজরঙ্গি অর্থাৎ পবন চতুর্বেদীর সংগ্রাম যেন প্রতিটি দর্শকের মন জয় করেছিল তার নির্দোষ সরলতার মাধ্যমে। সিনেমা শেষ হওয়ার পর যখন দর্শকদের চোখে জল দেখা গেছে, তার অর্ধেক কৃতিত্ব কিন্তু নিঃসন্দেহে ছিল সেই ছোট্ট মেয়েটির নিটোল অভিনয়ের।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, বিপুল সাফল্য, জনপ্রিয়তা এবং অগণিত ভক্ত থাকা সত্ত্বেও হর্ষালি মালহোত্রা যেন হঠাৎই আড়ালে চলে গেলেন। বলিউডে এমন অনেক প্রতিভা আছে যারা শৈশবেই আলোড়ন তুলেছেন, কিন্তু বড় হয়ে সেভাবে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি তাদের। এই অদৃশ্য হওয়ার পেছনে কারণ অনেক হতে পারে—পড়াশোনা, পরিবার, নিজের উন্নতির জন্য সময় নেওয়া কিংবা সংগঠিত প্রস্তুতির অভাব। কিন্তু হর্ষালির ক্ষেত্রে সময়টা যেন আরও নীরব ছিল। তিনি জনসমক্ষে খুব বেশি দেখা দিতেন না, মিডিয়া ইভেন্টে তাঁর উপস্থিতিও ছিল সীমিত। ফলে দর্শকরা ধীরে ধীরে ভাবতে শুরু করেছিলেন—‘মুন্নি কি আর ফিরে আসবে?’
এতদিন পর সেই প্রশ্নের উত্তর মিলেছে। প্রায় এক দশক পরে, হর্ষালি আবার ফিরে আসছেন বড় পর্দায়—তাও দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রির এক বড় মাপের ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে। খবর পাওয়া গেছে যে তিনি নন্দমুরি বালকৃষ্ণ অভিনীত বহুল প্রতীক্ষিত ছবি ‘অখণ্ড ২’–এ একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছেন। এই ঘোষণা সামনে আসতেই ভারতের বিনোদন অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। কারণ দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রি এখন শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং প্যান-ইন্ডিয়া প্রভাব বিস্তারকারী এক শক্তিশালী মাধ্যম। দক্ষিণের ছবিতে সুযোগ পাওয়া মানে আজকের দিনে জাতীয় স্তরে নিজের পরিচিতি আরও দৃঢ় করা।
ছোট্ট মুন্নি থেকে পরিণত অভিনেত্রী—দশ বছরে হর্ষালির বদলে যাওয়া যাত্রা
‘বজরঙ্গি ভাইজান’-এর ছোটখাটো, নিস্পাপ মেয়েটিকে দর্শকরা যখন আবার পর্দায় দেখলেন ‘অখণ্ড ২’-এর প্রথম সিঙ্গল মুক্তির অনুষ্ঠানে, তখন অনেকেই তাকিয়ে রইলেন বিস্ময়ে। সবারই চোখে যেন একই প্রশ্ন—‘এ কি সেই মুন্নি?’ কিউট মুখ, অভিব্যক্তির খেলায় ভরপুর শিশু থেকে পরিণত হয়েছে আত্মবিশ্বাসী কিশোরীতে। বছরের পর বছর নীরব থাকার মধ্যেও যে তিনি নিজেকে তৈরি করেছেন, তা তাঁর আচরণ, পোশাক, শরীরী ভাষা সবকিছুতেই স্পষ্ট ছিল। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে স্বচ্ছন্দে হাসছেন, মানুষের সঙ্গে মিশছেন, আবার সৌজন্য বজায় রেখে নিজের অবস্থান ধরে রাখছেন—সব মিলিয়ে সম্পূর্ণ একটি নতুন রূপ।
অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন হয়তো তিনি আর অভিনয়ে ফিরবেন না। কিন্তু হর্ষালি নিজে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি আবেগঘন পোস্টে লিখেছিলেন—
“মুন্নি শুধু একটি চরিত্র ছিল না, এটি আমার জীবনের এক অনুভূতি। সেই চরিত্র আমাকে আজও মনে করিয়ে দেয় আমি কী হতে চাই। তাই এতদিন আমি নিজের উন্নতির জন্য নীরবে কাজ করেছি—যেন পরের বার যখন পর্দায় ফিরি, তখন মানুষ আবার আমাকে দেখে অনুভব করে—আমি সেই ছোট্ট মেয়েটিই, যার চোখে ছিল সত্যতা।”
এই প্রতিটি শব্দে বোঝা যায় এই ফিরে আসার পিছনে ছিল গভীর প্রস্তুতি, আত্মসমালোচনা এবং প্রচুর অনুশীলন। চলচ্চিত্র জগতে কামব্যাক বলা হয় সহজ, কিন্তু বাস্তবে তা দারুণ কঠিন। অনেক শিল্পীই ফিরে আসতে পারেন না, কারণ তারা সময়ের সঙ্গে নিজেদের বদলাতে পারেন না। কিন্তু হর্ষালি এই অপেক্ষার সময়টাকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়েছেন—নাচ, অভিনয়, ভয়েস মডুলেশন, ভাষার উপর দখল, শারীরিক ফিটনেস—সবকিছুই তিনি শিখেছেন নতুন করে।
‘অখণ্ড ২’—দক্ষিণী সিনেমার জায়ান্ট স্কেলে হর্ষালির প্রবেশ
নন্দমুরি বালকৃষ্ণ দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম অন্যতম শক্তিশালী তারকা। তাঁর ‘অখণ্ড’ সিরিজের জনপ্রিয়তা তেলুগু দর্শকদের বাইরে গিয়েও ছড়িয়ে পড়েছে। তাই ‘অখণ্ড ২’–এ হর্ষালির কাস্টিং নিছক কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয়। ছবির পরিচালক ও প্রযোজনা সংস্থা জানিয়েছেন—হর্ষালির জন্য এমন একটি চরিত্র তৈরি করা হয়েছে যা পুরো গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তাঁর চরিত্রের নাম ‘জনানি’। এই নাম থেকেই বোঝা যায় চরিত্রের মধ্যে রয়েছে ভরপুর আবেগ, গভীরতা এবং হয়তো ট্র্যাজেডি কিংবা শক্তির কোনো প্রতীকী উপস্থিতি।
শোনা যাচ্ছে ছবির গল্পে জনানি হবে এমন একজন চরিত্র, যাকে ঘিরেই বালকৃষ্ণর চরিত্রের আবেগ এবং সিদ্ধান্তগুলোর বড় অংশ তৈরি হবে। যদিও নির্মাতারা এখনো অফিসিয়ালি চরিত্রের সব তথ্য প্রকাশ করেননি, তবে টলিপাড়ার সূত্র বলছে—হর্ষালি এই চরিত্রে অভিনয় করতে প্রচুর ওয়ার্কশপ করেছেন। দক্ষিণী ভাষার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য তাঁকে করতে হয়েছে ভাষা প্রশিক্ষণও। ফলে তাঁর অভিনয়ের পরিসর আগের চেয়ে আরও বড় ও পরিণত হবে বলেই প্রত্যাশা।
প্যান-ইন্ডিয়া মুক্তি—হর্ষালির জন্য নতুন দিগন্ত
আজকের দিনে দক্ষিণী সিনেমা ভারতের মূলধারার চলচ্চিত্রকে নতুন পথ দেখাচ্ছে। ‘বাহুবলি’, ‘কেজিএফ’, ‘পুষ্পা’, ‘জেলার’, ‘আরআরআর’–এর সাফল্যের পর প্যান-ইন্ডিয়া রিলিজ এখন আঞ্চলিকতার বেড়া ভেঙে একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। এই অবস্থায় হর্ষালির কামব্যাক সিনেমাটি শুধু তেলুগু নয়, বরং হিন্দি, তামিল, কন্নড় এবং মালয়ালম—পাঁচটি ভাষায় মুক্তি পাবে। এর ফলে দর্শকসংখ্যা বাড়বে বহুগুণ, আর হর্ষালি নতুন করে পরিচিত হবেন দক্ষিণ ভারতের পাশাপাশি উত্তর, পূর্ব এবং পশ্চিম ভারতের দর্শকদের কাছেও।
একদিকে যেমন এই সুযোগ তাঁর জন্য শুভ, তেমনই এটি তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জও। কারণ প্যান-ইন্ডিয়া চলচ্চিত্রে কাজ করলে প্রত্যাশা থাকে অনেক বেশি। দর্শকরা শুধু অভিনয় নয়, চরিত্রের গভীরে তাঁর উপস্থিতি, সংলাপ, আবেগ—সব কিছুই খুঁটিয়ে দেখবেন। কিন্তু হর্ষালিকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি সেই দায়ভার গ্রহণ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তাঁর চোখে এখন এক ধরনের দৃঢ়তা দেখা যায়, যা কেবলমাত্র আত্মবিশ্বাসী অভিনেত্রীদের চোখে থাকে।
সোশ্যাল মিডিয়ার তুমুল প্রতিক্রিয়া—‘মুন্নি ফিরে এসেছে!’
‘অখণ্ড ২’-এর ইভেন্টে হর্ষালিকে দেখা যাওয়ার পর সোশ্যাল মিডিয়া ভরে গিয়েছে তাঁর ছবি ও ভিডিওতে। কেউ লিখেছেন—
“বিশ্বাসই হচ্ছে না—এটাই সেই ছোট্ট মুন্নি!”
আবার কেউ লিখেছেন—
“দশ বছর পরেও চোখের চাহনিটা একদম একই রকম।”
ইনস্টাগ্রাম, টুইটার, ফেসবুক—সব প্ল্যাটফর্মেই তাঁর লুক ও কামব্যাক নিয়ে উচ্ছ্বাস ছড়িয়েছে। এমনকি অনেক দক্ষিণী দর্শকও লিখছেন যে তাঁরা ‘বজরঙ্গি ভাইজান’-এর পর থেকেই তাঁকে পছন্দ করেন, এবং তাঁকে আবার পর্দায় দেখে আনন্দিত। এটি স্পষ্ট যে হর্ষালির জনপ্রিয়তা জাতীয় স্তরে একবার তৈরি হয়েছিল, এবং সেটি এত বছর পরেও মিলিয়ে যায়নি।
শিশুশিল্পী থেকে কিশোরী—অভিনয়ে রূপান্তরের কঠিন বাস্তবতা
শিশুশিল্পীদের অনেক সময় একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়—তাদের পরিচিতি থাকে একটি নির্দিষ্ট চরিত্র বা চেহারার সঙ্গে। বড় হওয়ার পর দর্শকরা তাদের সেই আগের রূপেই দেখতে অভ্যস্ত থাকেন। ফলে শিশুশিল্পী থেকে পূর্ণাঙ্গ অভিনেত্রী হওয়ার রূপান্তর কঠিন। অনেকক্ষেত্রে দর্শক তাদের নতুন অবয়বে গ্রহণ করতে পারেন না। কিন্তু হর্ষালি এই রূপান্তরের সময়টা সঠিকভাবে নিয়েছেন। তিনি নিজেকে পরিণত করেছেন এমনভাবে, যাতে তিনি আগের জনপ্রিয়তাকে ধরে রেখে নতুন স্বত্ত্বাকেও সামনে আনতে পারেন।
তিনি আগে যেভাবে মিষ্টি ও নির্দোষ অভিব্যক্তি দিয়ে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন, এখন সেই অভিব্যক্তির সঙ্গে যোগ হয়েছে এক ধরনের পরিণত ভাব। তাঁর চোখের ভাষায় যেমন সরলতা আছে, তেমনই আছে গভীরতা। এই দুইয়ের মিশ্রণ তাঁকে করে তুলেছে আরও আকর্ষণীয় অভিনেত্রী।
হর্ষালির ভবিষ্যৎ—এই কামব্যাক কি নতুন অধ্যায়ের সূচনা?
দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রির শক্তিশালী প্রযোজনা, ব্যাপক বাজেট, প্যান-ইন্ডিয়া মুক্তির পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে ‘অখণ্ড ২’ যে তাঁর জন্য বিশাল লঞ্চিং প্যাড হিসেবে কাজ করবে, তা বলাই বাহুল্য। যদি ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মন ছুঁতে পারে, তবে দক্ষিণ থেকে শুরু করে বলিউড—সব জায়গা থেকেই তাঁর প্রতি আগ্রহ বাড়বে। আজকের দিনে তরুণ ও প্রতিভাবান অভিনেত্রীদের চাহিদা হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে, আর তাতে নিজেকে প্রমাণ করতে পারলে হর্ষালি অল্প সময়েই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসতে পারেন।
তবে এর সঙ্গে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, ধারাবাহিকতা এবং চরিত্র নির্বাচন করার বুদ্ধিমত্তা। কারণ কামব্যাক একটি সুযোগ, কিন্তু তা ধরে রাখার জন্য প্রয়োজন অভিনয় দক্ষতা এবং নিয়মিত পরিশ্রম। কিন্তু হর্ষালির আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি দেখে মনে হয়—তিনি খুব ভালভাবেই প্রস্তুত।
শেষ কথা—মুন্নির প্রত্যাবর্তন, দর্শকদের নতুন আশা
২০১৫ সালের ছোট্ট মুন্নি আজ পরিণত অভিনেত্রী। এমন রূপান্তর সময়ের সঙ্গে স্বাভাবিক হলেও, তার সঙ্গে আবেগের যোগ থাকে খুবই গভীর। দর্শকরা তাঁকে ভালোবেসেছিলেন নিঃস্বার্থভাবে, আর আজ তাঁকে বড় পর্দায় ফিরে দেখে যেন মনে হচ্ছে—একটি পরিচিত মুখ আবার নিজের জায়গায় ফিরে এসেছে।
‘অখণ্ড ২’-এ তিনি কতটা দাগ কাটতে পারেন, তা এখনো অজানা। কিন্তু যে উত্তেজনা এবং প্রত্যাশা ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে, তা বলছে—দশ বছর পরেও দর্শকরা তাঁকে ভুলে যাননি। বরং তাঁকে আবার নতুনভাবে দেখার অপেক্ষায় হৃদয় উন্মুখ হয়ে আছে।
এখন শুধু প্রশ্ন—এই কামব্যাক কি তাঁর অভিনয় জীবনে নতুন দিগন্ত খুলে দেবে?
সম্ভাবনা কিন্তু প্রবল।
মুন্নি আবার ফিরছে—এবার বড়, আরও শক্তিশালী চরিত্রে।