Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ভবিষ্যতের বিষয়ে সাবধানী সম্পত্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাবা নাকি স্ত্রী কার কথা শোনেন অভিষেক

বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হলেও নিজের স্থাবর অস্থাবর বৃদ্ধি নিয়ে সচেতন অভিষেক বচ্চন। তিনি নীরবে ব্যবসায়ী হয়ে উঠেছেন। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কার কথা শুনে সিদ্ধান্ত নেন?

বলিউডের আলোঝলমলে দুনিয়ায় জন্ম নেওয়া মানেই যে জীবন সহজ, তা নয়। বিশেষ করে যখন আপনার পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে থাকে এক কিংবদন্তির নাম। অভিষেক বচ্চন—এই নামের আগে-পরে আজও উচ্চারিত হয় তাঁর পিতা অমিতাভ বচ্চন-এর মহিমা। আবার ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্বামী ঐশ্বর্যা রাই বচ্চন-এর। এমন দুই উজ্জ্বল নক্ষত্রের মাঝে দাঁড়িয়ে অভিষেক নিজের আলাদা পরিচয় গড়ে তুলতে চেয়েছেন ধীরে, নীরবে এবং কৌশলীভাবে—বিশেষত ব্যবসা ও বিনিয়োগের জগতে।

উত্তরাধিকার বনাম আত্মনির্ভরতা

বচ্চন পরিবারের বিপুল সম্পত্তি ও ঐতিহ্য নিয়ে অভিষেকের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও অনিশ্চয়তা ছিল না। তবু তিনি বারবার জানিয়েছেন, কেবল পারিবারিক সম্পদের উপর নির্ভর করে থাকতে চান না। বরং নিজের উপার্জন, নিজস্ব সিদ্ধান্ত এবং নিজস্ব ঝুঁকি নিয়েই তিনি অর্থনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলতে আগ্রহী।

অমিতাভ বচ্চন বরাবরই জমি ও স্থাবর সম্পত্তিতে বিনিয়োগের পক্ষে। তাঁর মতে, জমি মানে নিরাপত্তা—এক ধরনের স্থায়িত্ব ও নিশ্চিন্তি। বাজারের ওঠানামা, অর্থনৈতিক মন্দা—সবকিছুর মধ্যেও জমির মূল্য দীর্ঘমেয়াদে স্থির থাকে বা বৃদ্ধি পায়। তাই ছেলেকে তিনি প্রায়ই উপদেশ দেন রিয়্যাল এস্টেটে বিনিয়োগ করতে।

অভিষেক নিজেও জানিয়েছেন, বাবার এই দৃষ্টিভঙ্গি খানিকটা ‘পুরনোপন্থী’, তবে অমূলক নয়। বাস্তবিক অর্থেই রিয়্যাল এস্টেট দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে সুরক্ষিত ক্ষেত্র। আর সেই পরামর্শ অগ্রাহ্যও করেননি তিনি। মুম্বই জুড়ে তাঁর রিয়্যাল এস্টেটে বিনিয়োগের পরিমাণ আনুমানিক ২১৯ কোটি টাকা—যা প্রমাণ করে যে বাবার উপদেশ তাঁর ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছে।

ঐশ্বর্যার পছন্দ: রূপো, আর অভিষেকের ঝোঁক সোনায়

পরিবারের আর এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হলেন ঐশ্বর্যা রাই বচ্চন। তিনি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রূপোকে প্রাধান্য দেন। রূপো ঐতিহ্যগতভাবে তুলনামূলক কম মূল্যের হলেও শিল্পক্ষেত্রে, প্রযুক্তিতে এবং গয়নার বাজারে তার ব্যবহার বাড়ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এর সম্ভাবনা উজ্জ্বল।

অভিষেকের নিজের ঝোঁক সোনায়। ভারতীয় সংস্কৃতিতে সোনা শুধু অলঙ্কার নয়, নিরাপদ বিনিয়োগের প্রতীক। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে সোনার দাম সাধারণত বৃদ্ধি পায়। তাই সোনায় বিনিয়োগকে তিনি স্থিতিশীল ও নিরাপদ মনে করেন।

তবে কেবল ধাতু বা সম্পত্তিতেই সীমাবদ্ধ নন অভিষেক। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন—যে পণ্য বা পরিষেবা নিজে ব্যবহার করতে পারেন, সেগুলিতেই বেশি আগ্রহী হন। অর্থাৎ তাঁর বিনিয়োগ কৌশল কেবল আর্থিক লাভের হিসাব নয়; বরং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল।

‘গ্লোবাল বিজ়নেস সামিট ২০২৬’-এ অভিষেকের বক্তব্য

২০২৬ সালের ‘গ্লোবাল বিজ়নেস সামিট’-এ অভিষেক তাঁর বিনিয়োগ দর্শন নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। সেখানে তিনি জানান, ঝাল খাবারের প্রতি ভালবাসা থেকেই একটি ফুড ডেলিভারি সংস্থায় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর মতে, যদি কোনও পরিষেবা নিজে উপভোগ করেন এবং মনে করেন তার মান ভাল, তবে সেটি ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকেও সম্ভাবনাময় হতে পারে।

এই মনোভাব একদিকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও অন্যদিকে তা ভোক্তা-অভিজ্ঞতাভিত্তিক বিনিয়োগের আধুনিক ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আজকের স্টার্ট-আপ সংস্কৃতিতে বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই নিজেদের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেন।

স্টার্ট-আপ ও খেলাধুলায় আগ্রহ

অভিষেক কেবল খাদ্য পরিষেবা নয়, বিভিন্ন স্টার্ট-আপ সংস্থায়ও বিনিয়োগ করেছেন। প্রযুক্তি, বিনোদন, ক্রীড়া—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর উপস্থিতি রয়েছে। খেলাধুলার প্রতি তাঁর ঝোঁক পুরনো। কাবাডি ও ফুটবল দলের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা বহুদিনের। ক্রীড়া-দলে বিনিয়োগ কেবল আর্থিক নয়; এটি ব্র্যান্ড ভ্যালু ও আবেগেরও বিষয়।

ক্রীড়া শিল্প ভারতে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রচার অধিকার, স্পনসরশিপ, মার্চেন্ডাইজিং—সব মিলিয়ে এটি লাভজনক ক্ষেত্র। অভিষেকের মতো তারকারা সেখানে বিনিয়োগ করলে ব্র্যান্ড দৃশ্যমানতাও বৃদ্ধি পায়।

রিয়্যাল এস্টেটে বিস্তার

মুম্বই ভারতের আর্থিক রাজধানী। এখানে রিয়্যাল এস্টেটের দাম সর্বোচ্চ স্তরে। তবু অভিষেক এই ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিনিয়োগ করেছেন। ২১৯ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রমাণ করে যে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ সৃষ্টিতে তিনি বাবার উপদেশকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

রিয়্যাল এস্টেট কেবল সম্পদ নয়, এটি সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক স্থায়িত্বেরও প্রতীক। মুম্বইয়ের অভিজাত এলাকায় সম্পত্তি থাকা মানে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।

ব্যবসায়ী হিসেবে অভিষেক: নীরব কিন্তু সচেতন

বলিউডে তাঁর অভিনয় নিয়ে আলোচনা চললেও ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি বরাবরই নীরব। প্রচারের আলোয় নয়, বরং বোর্ডরুমের সিদ্ধান্তেই তিনি বেশি মনোযোগী। এই নীরবতা তাঁকে আরও কৌশলী করে তুলেছে।

news image
আরও খবর

তিনি ঝুঁকি নেন, তবে হিসাব করে। ব্যক্তিগত ব্যবহার, বাজার বিশ্লেষণ এবং পারিবারিক পরামর্শ—এই তিনের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে তাঁর বিনিয়োগ কৌশল।

কার কথা শুনে চলেন অভিষেক?

প্রশ্ন উঠতেই পারে—তিনি তবে কার কথা শুনে চলেন? বাবার জমির পরামর্শ, স্ত্রীর রূপো বিনিয়োগ, নিজের সোনার প্রতি ঝোঁক—সব মিলিয়ে উত্তরটি সরল নয়।

বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তিনি একপাক্ষিক নন। অমিতাভ বচ্চনের উপদেশ মেনে রিয়্যাল এস্টেটে বিনিয়োগ করছেন। আবার ঐশ্বর্যার মতকেও অস্বীকার করছেন না। নিজের ঝোঁক ও অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। অর্থাৎ সিদ্ধান্তে রয়েছে ভারসাম্য।

উত্তরাধিকারকে ছাপিয়ে নিজস্ব পরিচয়

বচ্চন পরিবারের সন্তান হিসেবে অভিষেকের পরিচয় শুরু হলেও ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি আলাদা পরিচয় গড়ে তুলছেন। উত্তরাধিকার তাঁর ভিত্তি, কিন্তু ভবিষ্যৎ গড়ছেন নিজস্ব পরিকল্পনায়।

বলিউডের তারকারা এখন আর কেবল অভিনয়েই সীমাবদ্ধ নন। তাঁরা উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং ব্র্যান্ড নির্মাতা। অভিষেক সেই প্রবণতারই এক উদাহরণ।
 

উপসংহার (বিস্তৃত)

অভিষেক বচ্চনের আর্থিক ও বিনিয়োগ-দর্শনের গল্প আসলে এক বহুমাত্রিক পরিচয়ের গল্প। তিনি কেবল একজন তারকা-সন্তান নন, কেবল একজন অভিনেতাও নন—তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি উত্তরাধিকার, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, বাজার-বুদ্ধি এবং পারিবারিক পরামর্শ—সব মিলিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে চাইছেন। এই পথচলা নিঃশব্দ, কিন্তু সুসংগঠিত।

বচ্চন পরিবারের ঐতিহ্য নিঃসন্দেহে তাঁকে এক শক্ত ভিত দিয়েছে। বিপুল সম্পত্তি, সামাজিক মর্যাদা, আর্থিক নিরাপত্তা—সবই তাঁর নাগালের মধ্যে ছিল। কিন্তু সেই সুরক্ষার আবরণেই নিজেকে আটকে না রেখে তিনি নিজের পরিচয় তৈরি করতে চেয়েছেন। এটাই তাঁর বিনিয়োগ-দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। উত্তরাধিকারকে ভরসা হিসেবে রেখে, নির্ভরতা হিসেবে নয়—এই সূক্ষ্ম পার্থক্যই তাঁকে আলাদা করে।

অমিতাভ বচ্চনের জমি ও রিয়্যাল এস্টেট-কেন্দ্রিক ভাবনা এক প্রজন্মের অভিজ্ঞতার ফল। স্থাবর সম্পত্তি মানেই দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা—এই বিশ্বাস ভারতীয় মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত সকলের মধ্যেই প্রবল। অভিষেক সেই ভাবনাকে অস্বীকার করেননি। বরং মুম্বই জুড়ে উল্লেখযোগ্য রিয়্যাল এস্টেট বিনিয়োগ করে প্রমাণ করেছেন, তিনি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেন। অর্থাৎ, তিনি শিকড় মজবুত রাখতে জানেন।

অন্যদিকে ঐশ্বর্যা রাইয়ের রূপোয় বিনিয়োগের পছন্দ আধুনিক বাজার-বোধের ইঙ্গিত দেয়। শিল্প, প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে রূপোর চাহিদা বাড়ছে—এমন বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না। পরিবারে যখন এমন ভিন্নমত থাকে, তখন সাধারণত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। কিন্তু অভিষেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়—তিনি মতের ভিন্নতাকে সংঘাত হিসেবে নয়, বিকল্প হিসেবে দেখেন। এটিই একজন পরিণত বিনিয়োগকারীর লক্ষণ।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, তিনি নিজের অভিজ্ঞতাকে বিনিয়োগের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করেন। যে পরিষেবা তিনি নিজে ব্যবহার করেন, যে পণ্যে বিশ্বাস রাখেন—সেই ক্ষেত্রেই অর্থ লগ্নি করতে স্বচ্ছন্দ। এই দর্শন আধুনিক উদ্যোক্তা-সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। কারণ, ব্যবহারকারীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যবসাকে দেখা গেলে তার সাফল্যের সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।

খেলাধুলা ও স্টার্ট-আপে তাঁর আগ্রহও ভবিষ্যৎমুখী চিন্তার পরিচয়। ভারতীয় ক্রীড়া শিল্প দ্রুত বিকাশমান; প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্ট-আপ বিশ্ববাজারে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে। এই পরিবর্তনশীল সময়কে তিনি ধরতে পেরেছেন। ফলে তাঁর বিনিয়োগ কৌশল একদিকে ঐতিহ্যনির্ভর, অন্যদিকে সমকালীন।

সব মিলিয়ে প্রশ্নের উত্তর—তিনি কার কথা শুনে চলেন?—হয়তো একক কোনও নাম নয়। তিনি বাবার অভিজ্ঞতাকে সম্মান করেন, স্ত্রীর মতামতকে গুরুত্ব দেন, আবার নিজের যুক্তি ও পছন্দকেও অগ্রাধিকার দেন। অর্থাৎ সিদ্ধান্তে রয়েছে ভারসাম্য, সংযম এবং স্বাধীনতা। এটাই তাঁকে কেবল ‘অমিতাভের পুত্র’ বা ‘ঐশ্বর্যার স্বামী’ পরিচয়ের বাইরে এনে একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

একজন সফল বিনিয়োগকারীর সবচেয়ে বড় গুণ হল দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি ও ঝুঁকি-বণ্টনের ক্ষমতা। অভিষেকের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে—তিনি সম্পদের ধরন বৈচিত্র্যময় রেখেছেন। জমি, সোনা, রূপো, স্টার্ট-আপ, ক্রীড়া—সব মিলিয়ে একটি সুসমন্বিত পোর্টফোলিও। এতে যেমন নিরাপত্তা রয়েছে, তেমনই রয়েছে সম্ভাবনার বিস্তার।

পরিশেষে বলা যায়, অভিষেক বচ্চনের আর্থিক যাত্রা আমাদের শেখায়—উত্তরাধিকার আশীর্বাদ হতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যৎ গড়তে হলে প্রয়োজন ব্যক্তিগত দূরদৃষ্টি। পারিবারিক পরামর্শ মূল্যবান, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয় নিজের বিচারে। সেই বিচক্ষণতা ও ভারসাম্যের পথেই তিনি হাঁটছেন। আলোঝলমলে পর্দার বাইরে, নিঃশব্দে তিনি গড়ে তুলছেন এক দৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি—যা হয়তো আগামী দিনে তাঁকে বলিউডের পাশাপাশি ব্যবসায়িক জগতেও এক প্রতিষ্ঠিত নাম হিসেবে চিহ্নিত করবে।

Preview image