আফ্রিকার ১২টি দেশ ও সুইজারল্যান্ডে চলছে নতুন ম্যালেরিয়া ওষুধের পরীক্ষা। প্রথম ফলেই দেখা গেছে এই ওষুধ খেলে মৃত্যুর ঝুঁকি কমে এবং রোগ খুব দ্রুত সেরে যায়।
নতুন ম্যালেরিয়া প্রতিরোধী ওষুধকে কেন্দ্র করে যে আশার সঞ্চার হয়েছে তা আজ বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। বহু দশক ধরে মশাবাহিত এই রোগ এশিয়া এবং আফ্রিকার বিশাল অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। ম্যালেরিয়া প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে নানা ওষুধ এসেছে এবং টিকা তৈরির দিকেও প্রচেষ্টা চলছে তবু বড় কোনও সাফল্য ধরা দেয়নি। এই প্রেক্ষাপটে সুইজারল্যান্ডের ওষুধ নির্মাতা সংস্থা নোভার্টিস যে নতুন ওষুধ তৈরি করেছে তা বিশ্ব স্বাস্থ্য গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। ওষুধটির নাম গ্যানলাম। এই ওষুধ সম্পর্কে প্রথম যে তথ্য সামনে এসেছে তাতে বলা হয়েছে যে এটি একবার খেলেই শরীরের ভিতরে থাকা জীবাণুকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে পারে।
এতদিন ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় রোগীকে টানা চৌদ্দ দিন ধরে ওষুধ খেতে হত। প্রথমে জ্বর কমানোর জন্য একটি ওষুধ দেওয়া হত। এরপর আরেকটি ওষুধ দেওয়া হত যা কয়েক সপ্তাহ ধরে চালিয়ে যেতে হত যাতে শরীরে লুকিয়ে থাকা জীবাণু সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ রোগীই এত দীর্ঘ সময় ওষুধ সেবন করেন না। ফলে শরীরে জীবাণু রয়ে যায় এবং কয়েক মাস পরেও রোগ পুনরায় ফিরে আসে। বিশেষ করে ম্যালেরিয়ার ভাইভ্যাক্স প্রজাতির জীবাণু যাদের শরীরে ঢোকে তারা খুব সহজে এই বিপদের বাইরে আসতে পারেন না। তাদের ক্ষেত্রে প্রথমে জ্বর কমলেও পরে আবার নতুন করে সংক্রমণ দেখা দিতে পারে কারণ জীবাণু লিভারের ভিতরে সুপ্ত অবস্থায় থেকে যায়। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার নিয়ম ঠিক মতো পালন না করার ফলে ম্যালেরিয়া অনেক মানুষের জীবনে বারবার ফিরে আসে।
এই পরিস্থিতিতে গ্যানলাম নামের এই নতুন ওষুধটি এক বিপ্লব ঘটাতে পারে। নোভার্টিস জানিয়েছে যে গ্যানলাম পাউডার আকারে পাওয়া যাবে এবং এটি খেলেই শরীরে থাকা ম্যালেরিয়ার জীবাণুর বংশধ্বংস হয়ে যাবে। শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতারও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটবে। অর্থাৎ একদিকে জীবাণুকে ধ্বংস করা হবে অন্যদিকে রোগীর প্রতিরোধক্ষমতাকে শক্তিশালী করা হবে যাতে ভবিষ্যতে সংক্রমণের ঝুঁকি কম থাকে। ঠিক এই জায়গাতেই ওষুধটি অন্য সব ম্যালেরিয়া চিকিৎসার পদ্ধতির থেকে আলাদা হয়ে উঠেছে।
আফ্রিকার বারোটি দেশ এবং সুইজারল্যান্ডে ইতিমধ্যেই গ্যানলামের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হয়েছে এবং এই পরীক্ষার প্রাথমিক ফলাফল গবেষক সমাজকে নতুন করে আশ্বস্ত করেছে। বহু দিন ধরে বিজ্ঞানীরা এমন একটি ওষুধের সন্ধান করছিলেন যা ম্যালেরিয়ার জীবাণুকে খুব দ্রুত ধ্বংস করতে পারে এবং রোগীর শারীরিক অবস্থাকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে। গ্যানলাম সেই প্রত্যাশার দিকেই দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। পরীক্ষার পর দেখা গেছে যে রোগীরা এই ওষুধ গ্রহণ করার পর খুব দ্রুতই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসে এবং রক্তের মধ্যে থাকা বিপজ্জনক জীবাণুগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়। শুধু তাই নয় রোগীর জ্বর এবং ক্লান্তির মতো উপসর্গও দ্রুত কমে আসতে দেখা গেছে। ফলে রোগীকে দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসার চাপে থাকতে হচ্ছে না।
গবেষকদের দাবি এতদিন ধরে যে সব ওষুধ ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে তার মধ্যে অনেকগুলোর কার্যকারিতা কমে এসেছে। এর কারণ হলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবাণুর মধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। ঠিক যেমনভাবে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে বিভিন্ন সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে ঠিক তেমনভাবেই ম্যালেরিয়ার জীবাণুও প্রচলিত ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ফলে বহু দেশে ম্যালেরিয়া এখনও ভয়াবহ আকারে রয়ে গেছে। এই প্রতিরোধ ক্ষমতার ফলে জীবাণুকে মারতে দীর্ঘ সময় ধরে ওষুধ খেতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তাও সম্পূর্ণভাবে জীবাণু নষ্ট করা সম্ভব হয় না। এর ফলেই রোগ বারবার ফিরে আসে এবং রোগীর জীবনকে আরও বিপন্ন করে তোলে।
ঠিক এই জায়গাতেই গ্যানলামকে নতুন সম্ভাবনার ওষুধ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গবেষকদের দাবি গ্যানলামের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল এটি ম্যালেরিয়ার জীবাণুকে শুধু দুর্বলই করে না বরং জীবাণুর সম্পূর্ণ বংশ ধ্বংস করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। ফলে শরীরের ভিতরে কোনও সুপ্ত জীবাণু লুকিয়ে থাকে না এবং রোগ পুনরায় হওয়ার সম্ভাবনাও খুব কমে আসে। এর পাশাপাশি গবেষকরা মনে করছেন যে এই ওষুধ সহজে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠতে দেবে না তাই ভবিষ্যতে এটি দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর থাকা সম্ভব হবে। ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সাফল্য হয়ে উঠতে পারে।
আফ্রিকার দেশগুলোর বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করলে এই ওষুধটি সত্যিই এক নতুন আশা। সেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হন এবং অনেকেই সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে প্রাণ হারান। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। গ্যানলামের মতো একটি ওষুধ যদি একবার খেলেই শরীরের জীবাণুকে মেরে ফেলতে পারে তাহলে চিকিৎসার চাপ কমবে এবং রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারবেন। এতে স্বাস্থ্যসেবার উপর চাপ কমবে এবং মৃত্যুহারও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
সুইজারল্যান্ডে এই ওষুধের গবেষণা চলছে আরও আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি ব্যবহার করে। গবেষক দল জানিয়েছে যে গ্যানলাম শরীরে প্রবেশ করে খুব দ্রুত জীবাণুর বৃদ্ধিকে থামিয়ে দেয় এবং জীবাণুর বংশবৃদ্ধির কোনও সুযোগ রাখে না। এর ফলে সংক্রমণের প্রভাব কমে আসে এবং রোগীর শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে শুরু করে।
এই ওষুধটি সফলভাবে বাজারে আসতে পারলে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। বহু দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমে আসবে এবং ম্যালেরিয়ার মতো জাঁদরেল রোগের ভয় আর আগের মতো থাকবে না। গবেষক মহলও মনে করছে স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এটি হবে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। গ্যানলামের পরীক্ষামূলক সাফল্য এখন সারা বিশ্বের নজর কাড়ছে এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আজকের দিনে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ করা অনেক দেশের জন্য বড়সড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বর্ষার সময়ে এই রোগ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ে। গ্রামাঞ্চলে যেখানে স্বাস্থ্য পরিষেবা তত উন্নত নয় সেখানে ম্যালেরিয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক মানুষ চিকিৎসা না পেয়ে মারা যান। শিশু এবং বৃদ্ধদের মধ্যে মৃত্যুহার বেশি কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। এই অবস্থায় যদি একটি ওষুধ একবারেই রোগের শিকড় উপড়ে ফেলতে পারে তাহলে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে বিশ্বজুড়ে এক ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে।
গবেষক ডেভিড সুলিভান জানিয়েছেন যে বর্তমানে যে কয়েকটি ম্যালেরিয়ার ওষুধ রয়েছে সেগুলোর প্রায় সবকটিই প্রতিরোধের মুখে। অত্যধিক সেবনের ফলে অনেক ওষুধই আর কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে নতুন একটি শক্তিশালী ওষুধের প্রয়োজন ছিল। গ্যানলামের গবেষণা সেই প্রয়োজন পূরণ করতে পারে।
গবেষণার ফলাফল এখনও পর্যবেক্ষণে রয়েছে। ওষুধটি পরীক্ষার সমস্ত ধাপ পেরিয়ে সফল হলে বিশ্বের আরও অনেক দেশে এটি পৌঁছে দেওয়া হবে। কিন্তু এখনও তা বাজারে আসতে কিছুটা সময় লাগবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে পরীক্ষা সফল হলে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে এটি হবে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আগের ঘোষণাগুলোতে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল তা পূরণ হয়নি। কিন্তু গ্যানলামকে ঘিরে যে আশা তৈরি হয়েছে তা বিজ্ঞানী মহলের মতামত অনুযায়ী অনেকখানি বাস্তবসম্মত।
এমন একটি ওষুধ যদি সত্যিই একবার সেবনেই ম্যালেরিয়ার জীবাণু সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে পারে তাহলে বহু মানুষের জীবন বাঁচবে। স্বাস্থ্য পরিষেবার উপর চাপ কমবে এবং চিকিৎসার খরচও কমে আসবে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য এটি আশীর্বাদ হয়ে উঠবে কারণ দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার খরচ অনেকের পক্ষেই বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়াও রোগীর শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ার ফলে ভবিষ্যতে ম্যালেরিয়া পুনরায় ফিরে আসার সম্ভাবনাও থাকবে না।
ভারতে এই ওষুধটি কবে আসবে তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে গবেষণায় সাফল্য পাওয়া গেলে নোভার্টিস খুব দ্রুত এই ওষুধকে আরও বেশি সংখ্যক দেশে পৌঁছে দেবে। বিশ্বজুড়ে ম্যালেরিয়ার ভয়াবহতা যেভাবে আজও আতঙ্ক সৃষ্টি করে রেখেছে সেখানে গ্যানলামের আবিষ্কার এক নতুন আশার আলো হয়ে উঠেছে। রোগ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানুষের জীবনমান উন্নত করতেও এই ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।