ছোটবেলা থেকেই অভিনয় জগতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এনা সাহা। দীর্ঘদিন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করলেও নানা সময়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। তবে কোনও প্রতিকূলতাই তাঁর আত্মবিশ্বাস নষ্ট করতে পারেনি। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এনা জানান, জীবনে উত্থান-পতন থাকলেও তিনি সবসময় নিজের কাজের উপর ভরসা রেখেছেন। অভিনয়ে ফেরার ইচ্ছার কথাও স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন অভিনেত্রী। তাঁর মতে, কঠিন পরিস্থিতি মানুষকে আরও শক্তিশালী করে তোলে এবং নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়।
বাংলা চলচ্চিত্র জগতের পরিচিত মুখ এনা সাহা। শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় জীবনে পা রাখার পর ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন অভিনেত্রী হিসেবে। পরবর্তীকালে অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনার দায়িত্বও কাঁধে তুলে নেন তিনি। তবে গত কয়েক বছরে তাঁকে বড়পর্দায় তুলনামূলক কম দেখা গিয়েছে। একই সঙ্গে প্রযোজক হিসেবেও তিনি কিছুটা আড়ালে ছিলেন। এই পরিস্থিতিতে ইন্ডাস্ট্রির নানা পরিবর্তন, বিতর্ক এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের আবহে এনার অবস্থান নিয়ে কৌতূহল তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।
সম্প্রতি টলিপাড়ায় একাধিক ঘটনা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ইমপা (ইন্ডিয়ান মোশন পিকচার্স অ্যাসোসিয়েশন)-কে কেন্দ্র করে নানা বিতর্ক প্রকাশ্যে এসেছে। পিয়া সেনগুপ্তকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে শিল্পী মহল থেকে সাধারণ দর্শক— সকলের মধ্যেই আলোচনা চলছে। এই আবহেই ইমপার দফতরে দেখা যায় এনা সাহাকে। তাঁর উপস্থিতি ঘিরে নানা জল্পনাও শুরু হয়েছিল। অনেকে মনে করেছিলেন, হয়তো ইন্ডাস্ট্রির চলমান কোনও সমস্যার সঙ্গে তাঁরও যোগ রয়েছে অথবা তিনি কোনও বিশেষ পক্ষের সমর্থনে সেখানে গিয়েছেন।
কিন্তু সমস্ত জল্পনায় জল ঢেলে অভিনেত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁর ইমপা অফিসে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল শুধুমাত্র সংহতির বার্তা দেওয়া। তিনি সেখানে গিয়েছিলেন এই বার্তা পৌঁছে দিতে যে শিল্পীদের পাশে তিনি রয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে ব্যক্তিগত জীবনে কিংবা পেশাগত ক্ষেত্রে তাঁকে কখনও এমন কোনও প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি, যা তাঁকে সমস্যায় ফেলেছে।
এনা বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি অভিনয় জগতের সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ সময় ধরে এই ইন্ডাস্ট্রির অংশ হয়ে থেকেও তিনি কখনও নিজেকে একা মনে করেননি। বরং বরাবরই ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক এবং কলাকুশলীদের কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছেন। তাঁর কথায়, তাঁকে সবাই আগলে রেখেছেন। কাজের ক্ষেত্রে কোনও বাধা বা অযথা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়নি। বর্তমান সময়ে যখন টলিউডের নানা সমস্যা ও দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন এনার এই মন্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে, যদি কোনও সমস্যা না থাকে, তা হলে এত দিন বড়পর্দা থেকে দূরে কেন? এই প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর দিয়েছেন অভিনেত্রী। তাঁর মতে, পর্দা থেকে দূরে থাকার কারণ কোনও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বা ইন্ডাস্ট্রির অভ্যন্তরীণ সংঘাত নয়। বরং তিনি এই সময়টাকে কাজে লাগিয়েছেন নিজেকে আরও প্রস্তুত করার জন্য। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা সংস্থার নানা দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে তাঁকে নতুন নতুন বিষয় শিখতে হয়েছে। একটি ছবি নির্মাণের পেছনে কত ধরনের প্রশাসনিক, আইনি এবং সাংগঠনিক কাজ থাকে, তা তিনি প্রযোজক হওয়ার পর আরও কাছ থেকে উপলব্ধি করেছেন।
এনা জানান, প্রযোজনা করতে গিয়ে তিনি অনেক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ছবির সেন্সর সার্টিফিকেট আগে থেকে সংগ্রহ করার মতো বিষয় সম্পর্কে তিনি প্রথমে অবগত ছিলেন না। কিন্তু সেই সময়েও ইন্ডাস্ট্রির প্রবীণরা তাঁকে সাহায্য করেছেন। তাঁদের পরামর্শ এবং সহযোগিতার কারণেই তিনি দ্রুত বিষয়গুলি শিখে নিতে পেরেছেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও আত্মবিশ্বাসী করেছে এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান দিয়েছে।
বর্তমানে এনা সাহার অন্যতম লক্ষ্য অভিনয়ে আরও সক্রিয়ভাবে ফিরে আসা। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ কখনও কমেনি। বরং প্রযোজনার কাজ সামলানোর পাশাপাশি অভিনয়কেও সমান গুরুত্ব দিতে চান। সেই কারণেই তিনি বিভিন্ন পরিচালক, প্রযোজক এবং পরিচিত মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এমনকি নিজে ফোন করে কাজের ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন।
অভিনেত্রী জানান, দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। অতীতে তিনি দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রিতে একাধিক কাজ করেছেন। সম্প্রতি সেখানেও গিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে এসেছেন। ফলে বাংলা এবং দক্ষিণী— দুই ক্ষেত্র থেকেই নতুন কাজের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। তাঁর কাছে ইতিমধ্যেই একাধিক চিত্রনাট্য পৌঁছেছে। এখন তিনি সেগুলি বিচার করে নিজের পছন্দমতো কাজ বেছে নিতে চান।
এনার বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি শুধুমাত্র প্রযোজক হিসেবেই নয়, অভিনেত্রী হিসেবেও নতুন অধ্যায় শুরু করতে প্রস্তুত। দীর্ঘ বিরতির পর দর্শক তাঁকে নতুন চরিত্রে দেখতে পাবেন কি না, সেই প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে। কারণ তিনি নিজেই জানিয়েছেন, এখন অভিনয়ের দিকে মনোনিবেশ করার সময় এসেছে।
রাজনীতি প্রসঙ্গেও এনা অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। অতীতে কোনও রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠ ছিলেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরে তিনি সরাসরি জানান, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। অনেক সময় সেই অনুষ্ঠানগুলির আয়োজন কোন রাজনৈতিক দলের উদ্যোগে হচ্ছে, তা শিল্পীরা জানেন না। ফলে কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, রাজনৈতিক বিতর্ক বা মতাদর্শগত সংঘাতে নিজেকে জড়াতে তিনি অনিচ্ছুক।
বর্তমান সময়ে যখন বিনোদন জগতের বহু ব্যক্তিত্বকে রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে, তখন এনার এই নিরপেক্ষ অবস্থান বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি স্পষ্ট করেছেন, তাঁর প্রধান লক্ষ্য কাজ। অভিনয় এবং প্রযোজনা— এই দুই ক্ষেত্রেই নিজেকে আরও উন্নত করা এবং ভালো কনটেন্ট দর্শকদের সামনে তুলে ধরা তাঁর অগ্রাধিকার।
সব মিলিয়ে, এনা সাহার সাম্প্রতিক বক্তব্যে উঠে এসেছে এক আত্মবিশ্বাসী এবং পরিণত শিল্পীর ছবি। যিনি বিতর্ক নয়, কাজের মাধ্যমে নিজের পরিচয় তৈরি করতে চান। দীর্ঘদিন বড়পর্দা থেকে দূরে থাকলেও তাঁর উৎসাহ বা উদ্যমে ভাটা পড়েনি। বরং নতুন পরিকল্পনা, নতুন চিত্রনাট্য এবং নতুন দায়িত্ব নিয়ে তিনি ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছেন।
অভিনেত্রী হিসেবে প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছা, প্রযোজক হিসেবে অভিজ্ঞতার বিস্তার এবং রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে দূরে থাকার মনোভাব— এই তিনটি বিষয়ই বর্তমানে এনা সাহার অবস্থানকে স্পষ্ট করে। এখন দেখার, আগামী দিনে কোন নতুন প্রজেক্টের মাধ্যমে তিনি আবার দর্শকদের সামনে হাজির হন এবং তাঁর এই নতুন যাত্রা কতটা সফল হয়।
এনা সাহার কেরিয়ারের দিকে তাকালে দেখা যায়, খুব অল্প বয়স থেকেই তিনি ক্যামেরার সামনে কাজ শুরু করেছিলেন। শিশুশিল্পী হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর ধীরে ধীরে নিজেকে নায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি অন্যান্য ভাষার প্রজেক্টেও কাজ করেছেন তিনি। ফলে অভিনয়ের জগতের নানা উত্থান-পতন খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে তাঁর। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় ইন্ডাস্ট্রিতে কাটানোর পরও তাঁর বক্তব্য, ব্যক্তিগতভাবে কখনও এমন কোনও পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি যেখানে নিজেকে অসহায় মনে হয়েছে।
বর্তমান সময়ে বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের প্রসার, দর্শকদের রুচির পরিবর্তন, বড় বাজেটের ছবির প্রতিযোগিতা এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের আগমন— সব মিলিয়ে ইন্ডাস্ট্রির চেহারা অনেকটাই বদলেছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে শিল্পীদেরও নিজেদের নতুনভাবে তৈরি করতে হয়। এনা সাহার ক্ষেত্রেও বিষয়টি আলাদা নয়। তিনি মনে করেন, শুধু অভিনয় জানলেই চলবে না, চলচ্চিত্র নির্মাণের সামগ্রিক প্রক্রিয়া সম্পর্কেও জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। সেই কারণেই প্রযোজনার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি কাজের প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেছেন।
একজন প্রযোজক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে আর্থিক পরিকল্পনা, শুটিং পরিচালনা, শিল্পী নির্বাচন, বিপণন কৌশল এবং মুক্তির প্রস্তুতি— সবকিছু নিয়েই তাঁকে ভাবতে হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে শিল্পের অন্য একটি দিক সম্পর্কে সচেতন করেছে। ফলে ভবিষ্যতে অভিনয়ে ফিরলেও একজন শিল্পী হিসেবে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আরও পরিণত হবে বলেই মনে করছেন অনেকে।
এদিকে, দর্শকরাও এনার প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন। দীর্ঘদিন তাঁকে বড়পর্দায় না দেখায় তাঁর অনুরাগীদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। নতুন কোনও ছবিতে তাঁকে দেখা যাবে, কেমন চরিত্রে দেখা যাবে, কিংবা তিনি নিজেই প্রযোজিত কোনও ছবিতে অভিনয় করবেন কি না— এই সমস্ত প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে টলিপাড়ার অন্দরে। যদিও এ বিষয়ে এখনও কোনও নির্দিষ্ট ঘোষণা করেননি অভিনেত্রী, তবে তিনি যে অভিনয়ে ফেরার ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক, তা তাঁর বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট।
তাঁর কথায় বারবার উঠে এসেছে কৃতজ্ঞতার সুর। ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়রদের কাছ থেকে পাওয়া সহযোগিতা ও পরামর্শকে তিনি নিজের পথচলার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বলে মনে করেন। আজকের দিনে যখন নানা বিতর্ক, বিভাজন এবং মতপার্থক্যের খবর সামনে আসে, তখন এনার অভিজ্ঞতা কিছুটা ভিন্ন ছবি তুলে ধরে। তিনি বিশ্বাস করেন, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং পেশাদারিত্বই একটি সুস্থ চলচ্চিত্র জগত গড়ে তুলতে পারে।
অভিনয় এবং প্রযোজনা— দুই ক্ষেত্রেই নিজের স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান এনা সাহা। তাই আপাতত কোনও বিতর্কে না জড়িয়ে, নিজের কাজ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। নতুন চিত্রনাট্য, নতুন চরিত্র এবং নতুন সম্ভাবনার অপেক্ষায় রয়েছেন অভিনেত্রী। আর সেই কারণেই তাঁর অনুরাগীদের আশা, খুব শিগগিরই নতুন উদ্যমে বড়পর্দায় ফিরবেন এনা সাহা এবং আবারও নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে দর্শকদের মন জয় করবেন।