Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

একই বলে দু’বার জীবন পেয়েও পরের বলেই আউট বৈভব! ছোটদের বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৩০ রানে শেষ ইনিংস

বৈভব যে বলে আউট হয়েছে, তার আগের বলেও আউট হতে পারত। এক বার নয়, দু’বার। কিন্তু দু’টি সুযোগই পাকিস্তান নষ্ট করে।পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রান পেল না বৈভব সূর্যবংশী। ছোটদের বিশ্বকাপে রবিবার ২২ বলে ৩০ রান করে আউট হল ভারতের ১৪ বছরের ব্যাটার।

অষ্টম ওভারের শেষ বলে পাকিস্তানের বাঁহাতি পেসার মহম্মদ সায়ামের বলে কটবিহাইন্ড হয় বৈভব। স্কোয়্যার দিয়ে পুল করতে গিয়ে বলের লাইন মিস্‌ করে সে। ব্যাটের নীচের দিকে বল লাগে। পাক উইকেটরক্ষক হামজা জাহুর ক্যাচ ধরেন।

বৈভব যে বলে আউট হয়েছে, তার আগের বলেও আউট হতে পারত। এক বার নয়, দু’বার। কিন্তু দু’টি সুযোগই পাকিস্তান নষ্ট করে। সায়ামের শট বল অফস্টাম্পের বাইরে থেকে হুক করতে যায় বৈভব। টাইমিং একেবারেই ঠিকঠাক হয়নি। এ ক্ষেত্রে বল বৈভবের ব্যাটের উপরের দিকে লাগে। স্কোয়্যার লেগে ক্যাচ ওঠে। কিন্তু হুজাইফা আহসান ক্যাচ ধরতে পারেননি।

এর পরেও সেই বলেই রান আউট হতে পারত বৈভব। হুজাইফা ক্যাচ ফস্কে বল ছোড়েন। তিনি ঠিকঠাকই বল ছুড়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানের ফিল্ডার বল ধরতে পারেননি। বৈভব তখন মাঝ উইকেটে।

একই বলে ক্যাচ আউট এবং রান আউট হওয়ার হাত থেকে বেঁচেও শেষরক্ষা হয়নি বৈভবের। দু’বার জীবন পেয়েও পরের বলেই আউট হয়ে যায় সে। তার ইনিংসে পাঁচটি চার এবং একটি ছক্কা রয়েছে।

অনূর্ধ্ব১৯ বিশ্বকাপে সুপার সিক্সের এই ম্যাচে ভারত জিতলে সেমিফাইনালে চলে যাবে। হারলেও বৈভবদের সামনে সুযোগ থাকছে। কারণ, নেট রানরেটে পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে ভারত।

অনূর্ধ্ব১৯ বিশ্বকাপের সুপার সিক্স পর্বে ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ মানেই আলাদা উত্তেজনা, আলাদা চাপ। বয়সে ছোট হলেও মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গেই এই দুই দলের ক্রিকেটাররা বুঝে যায়—এটা শুধু আর পাঁচটা ম্যাচ নয়। সেই চাপ, সেই উত্তেজনার মধ্যেই বৈভবের ইনিংস যেন হয়ে উঠল ম্যাচের এক গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট। মাত্র কয়েকটি বলের মধ্যে জীবন, ভাগ্য আর ভুল—সব কিছু মিলিয়ে তৈরি হল এক নাটকীয় অধ্যায়।

অষ্টম ওভারের শেষ বল। পাকিস্তানের বাঁহাতি পেসার মহম্মদ সায়াম বল হাতে। তার আগের কয়েকটি ডেলিভারিতেই গতি আর বাউন্সে অস্বস্তিতে ফেলেছিলেন ভারতীয় ব্যাটারদের। বৈভব তখন কিছুটা আক্রমণাত্মক মেজাজে। আগের ওভারগুলোতে কয়েকটি সুন্দর চার মেরে আত্মবিশ্বাস পেয়েছিল সে। কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাসই যে মুহূর্তের মধ্যে বিপদের কারণ হয়ে উঠবে, তা হয়তো সে নিজেও বুঝতে পারেনি।

সায়ামের বলটি ছিল শর্ট অব লেংথ। বৈভব স্কোয়্যার দিয়ে পুল করতে গেল। কিন্তু বলের লাইন পুরোপুরি বুঝতে পারেনি সে। ব্যাট নামাতে একটু দেরি হয়ে যায়। ফলাফল—বল লাগে ব্যাটের নীচের দিকে। সরাসরি চলে যায় পাকিস্তানের উইকেটরক্ষক হামজা জাহুর গ্লাভসে। কোনও ভুল করেননি হামজা। পরিষ্কার ক্যাচ। বৈভব আউট। ভারতীয় শিবিরে নেমে আসে চাপা হতাশা। কারণ, কয়েক মুহূর্ত আগেও যে বৈভবকে দেখে মনে হচ্ছিল বড় ইনিংস খেলতে পারে, সেই সে-ই প্যাভিলিয়নের পথে।

কিন্তু এই আউটের নাটকীয়তা বোঝার জন্য ফিরে তাকাতে হবে ঠিক তার আগের বলটির দিকে। কারণ, ওই এক বলেই বৈভব দু’বার আউট হতে পারত। একবার নয়, দু’বার জীবন পেয়েছিল সে। অথচ সেই জীবন কাজে লাগাতে পারল না।

সায়ামের আগের ডেলিভারিটিও ছিল শর্ট বল। অফস্টাম্পের বাইরের লাইন থেকে ওঠা সেই বল হুক করতে গিয়েছিল বৈভব। কিন্তু টাইমিং ছিল একেবারেই এলোমেলো। ব্যাটের উপরের দিকে লেগে বল উড়ে যায় স্কোয়্যার লেগের দিকে। সেখানে ফিল্ডিং করছিল হুজাইফা আহসান। বল তার কাছেই আসে। মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, এবার আর বাঁচার কোনও রাস্তা নেই। কিন্তু হুজাইফা ক্যাচ ধরতে পারেননি। বল হাত ছুঁয়ে মাটিতে পড়ে যায়। পাকিস্তান শিবিরে হতাশার হাঁসফাঁস। ভারতীয় ডাগআউটে তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস।

এতেই শেষ নয়। একই বলে রান আউট হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। ক্যাচ ফস্কে যাওয়ার পর হুজাইফা দ্রুত বল তুলে থ্রো করেন। থ্রোটা খারাপ ছিল না। বরং বেশ সঠিক জায়গাতেই এসেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য পাকিস্তানের—অন্য ফিল্ডার বল ধরতে পারেননি। বৈভব তখন মাঝ উইকেটে। সামান্য দেরি হলে বা থ্রোটা একটু নিখুঁত হলে সহজেই রান আউট হয়ে যেতে পারত সে। দু’বার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এল বৈভব।

news image
আরও খবর

ক্রিকেটে বলা হয়, জীবন পেলে সেটা কাজে লাগাতে হয়। বড় ইনিংসে পরিণত করতে হয়। কিন্তু বৈভবের ক্ষেত্রে হল ঠিক উল্টোটা। ওই দু’বার বেঁচে যাওয়ার পরেও সে নিজের খেলায় কোনও পরিবর্তন আনতে পারল না। পরের বলেই আবার শর্ট বল, আবার পুল করার চেষ্টা, আবার ভুল বিচার। এবার আর কোনও ছাড় দেয়নি পাকিস্তান। হামজা জাহুর নিরাপদ ক্যাচে বৈভবের ইনিংস শেষ।

এই কয়েকটি বলই যেন ম্যাচের মাইক্রোকসম। পাকিস্তান এক বলে দু’টি সুযোগ নষ্ট করল, কিন্তু পরের বলেই ঘুরে দাঁড়িয়ে উইকেট তুলে নিল। অন্য দিকে, বৈভব দু’বার জীবন পেয়েও সেই শিক্ষা নিতে পারল না যে, হয়তো একটু সংযত হওয়া দরকার ছিল। অনূর্ধ্ব১৯ স্তরে এই ধরনের মুহূর্তই ভবিষ্যতের ক্রিকেটার গড়ে দেয়—ভুল থেকে শেখা অথবা একই ভুল বারবার করা।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বৈভবের ইনিংস খারাপ নয়। পাঁচটি চার এবং একটি ছক্কা রয়েছে তার ব্যাটে। স্ট্রাইক রেটও মন্দ ছিল না। কিন্তু ভারতীয় দলের প্রেক্ষাপটে এই ইনিংসটা আরও বড় হতে পারত। কারণ, শুরুর ওভারগুলোতে পাকিস্তানের বোলাররা ধারাবাহিক চাপ তৈরি করছিল। সেই সময় বৈভব যদি উইকেটে টিকে থাকত, তাহলে ভারত একটা শক্ত ভিত পেতে পারত।

এই ম্যাচের গুরুত্বও কম নয়। অনূর্ধ্ব১৯ বিশ্বকাপে সুপার সিক্স মানেই কার্যত নকআউটের মতো পরিস্থিতি। এই ম্যাচে ভারত জিতলে সরাসরি সেমিফাইনালের টিকিট পাবে। হারলেও সুযোগ পুরোপুরি শেষ হয়ে যাচ্ছে না, কারণ নেট রানরেটে পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে ভারত। তবু ভারতীয় শিবির জানে, হিসেব–নিকেশের অঙ্কে না গিয়ে জিতে যাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

এই পরিস্থিতিতে বৈভবের উইকেট পাকিস্তানের কাছে ছিল বড় সাফল্য। কারণ, বৈভবের মতো একজন সেট ব্যাটারকে তুলে নিতে পারলে ভারতের রানগতি কিছুটা হলেও কমানো যায়। পাকিস্তানি বোলাররা সেটাই চাইছিল। সায়াম সেই পরিকল্পনাই সফল করলেন। বাঁহাতি পেসার হিসেবে শর্ট বল আর অফস্টাম্পের বাইরের লাইন ব্যবহার করে বৈভবকে ফাঁদে ফেললেন তিনি।

পাকিস্তানের ফিল্ডিং অবশ্য পুরোপুরি নিখুঁত বলা যায় না। একটি বলেই ক্যাচ আর রান আউট—দু’টি সুযোগ নষ্ট করা বড় ম্যাচে প্রায় অপরাধের মতো। কিন্তু তরুণ ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে এই ধরনের ভুল নতুন নয়। চাপ, উত্তেজনা আর ভারত–পাকিস্তান ম্যাচের মানসিক বোঝা—সব মিলিয়ে ভুল হওয়াই স্বাভাবিক। তবু পাকিস্তানের কৃতিত্ব এখানেই যে, ওই ভুলের পরেও তারা নিজেদের মনোবল হারায়নি। পরের বলেই উইকেট তুলে নিয়ে তারা প্রমাণ করেছে, ম্যাচে এখনও তারা লড়াইয়ে আছে।

ভারতীয় শিবিরের দিক থেকে দেখলে, এই আউট একটা সতর্কবার্তা। শুধু বৈভবের জন্য নয়, বাকি ব্যাটারদের জন্যও। শর্ট বলের বিরুদ্ধে কীভাবে খেলতে হবে, কখন আক্রমণ আর কখন রক্ষণ—এই সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ। অনূর্ধ্ব১৯ স্তরে অনেক প্রতিভাবান ব্যাটারই শর্ট বল খেলতে গিয়ে আউট হয়। কিন্তু যারা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক স্তরে যেতে চায়, তাদের এই জায়গাতেই উন্নতি করতে হয়।

বৈভবের ইনিংস শেষ হওয়ার পর ভারতের ইনিংসের দায়িত্ব পড়ে অন্য ব্যাটারদের উপর। তারা যদি পরিস্থিতি বুঝে খেলতে পারে, তাহলে বৈভবের এই আউট খুব বেশি ক্ষতি করবে না। কিন্তু যদি দ্রুত উইকেট পড়তে থাকে, তাহলে এই আউটকেই ম্যাচের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে দেখা হবে।

পাকিস্তানের দিক থেকেও এই উইকেট গুরুত্বপূর্ণ আত্মবিশ্বাস এনে দেয়। ফিল্ডিংয়ে ভুল হলেও বোলিংয়ে পরিকল্পনা কাজে লাগছে—এই বার্তাটা দলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সায়ামের মতো তরুণ বোলারের জন্যও এটা বড় প্রাপ্তি। ভারত–পাকিস্তান ম্যাচে উইকেট পাওয়া মানে আলাদা মর্যাদা। ভবিষ্যতে এই অভিজ্ঞতা তাকে আরও পরিণত বোলার করে তুলবে।

সব মিলিয়ে, বৈভবের আউট শুধু একটি উইকেট পড়া নয়। এটি ছিল কয়েকটি মুহূর্তের সমষ্টি—ভুল শট নির্বাচন, প্রতিপক্ষের ফিল্ডিং ভুল, আবার সেই ভুল শুধরে নেওয়া বোলারের দৃঢ়তা। অনূর্ধ্ব১৯ বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে এই ধরনের মুহূর্তই ম্যাচের গল্প তৈরি করে।

ম্যাচের ফল যাই হোক না কেন, বৈভবের জন্য এই ইনিংস এক বড় শিক্ষা হয়ে থাকবে। দু’বার জীবন পাওয়া মানে ঈশ্বরের দ্বিতীয় সুযোগ পাওয়া। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারার আফসোসই হয়তো তাকে ভবিষ্যতে আরও সতর্ক, আরও পরিণত ব্যাটার করে তুলবে। আর ভারতীয় দলের জন্য এই ম্যাচ স্মরণ করিয়ে দেবে—বড় মঞ্চে ছোট ভুলেরও বড় মূল্য দিতে হয়।

Preview image