Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

অবশেষে! রিঙ্কুর ব্যাটে সপ্তম ম্যাচে জয় কেকেআরের, তবু ১৫৫ তুলতেই কালঘাম ছুটল রাহানেদের, ক্যাচ ফেলে ডুবল রাজস্থান

একটি-দু’টি নয়, প্রথম জয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হল দীর্ঘ সাতটি ম্যাচ। এ বারের আইপিএলে অবশেষে জিতল কেকেআর। হারের মুখ থেকে রিঙ্কু সিংহ এবং অনুকূল রায়ের জুটিতে রাজস্থান রয়্যালসকে ৪ উইকেটে হারাল তারা।একটি-দু’টি নয়, প্রথম জয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হল দীর্ঘ সাতটি ম্যাচ। এ বারের আইপিএলে অবশেষে জিতল কেকেআর। হারের মুখ থেকে রিঙ্কু সিংহ এবং অনুকূল রায়ের জুটিতে ইডেন গার্ডেন্সে রাজস্থান রয়্যালসকে ৪ উইকেটে হারাল তারা। প্রথমে ব্যাট করে রাজস্থান তুলেছিল ১৫৫/৯। জবাবে দু’বল বাকি থাকতেই ম্যাচ জেতে কেকেআর। অর্ধশতরান করে দলকে জেতালেন রিঙ্কু। তবে এ দিন কেকেআর যা খেলেছে, তাতে ইতিবাচক কথা বলার জায়গা বিশেষ নেই। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং— তিনটি বিভাগ এ দিনও হতাশ করেছে। রিঙ্কু শেষ বেলায় উদ্ধার না করলে এই ম্যাচেও নিশ্চিত হার অপেক্ষা করছিল।

শুরু থেকেই বেশ ধরে খেলছিলেন রিঙ্কু। খুচরো রানের বেশি নিতে পারছিলেন না। মাঝে এক বার মরিয়া হয়ে চালাতে গেলেন রবীন্দ্র জাডেজার বলে। শর্ট থার্ডম্যানে থাকা নান্দ্রে বার্গার সহজতম ক্যাচটি ফস্কালেন। এই ধৈর্যই শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখল রিঙ্কুকে। এ বারের আইপিএলে একটি ম্যাচেও বলার মতো খেলতে পারেননি তিনি। এ দিনও দলের বিপদের সময় তাঁকে নামানো হয়েছে সাতে। সেখান থেকেও দলকে জিতিয়ে দিলেন তিনি। অর্ধশতরান করলেন। ৩৪ বলে ৫৩ রানের ইনিংসে রয়েছে ৫টি চার এবং ২টি ছয়। কেকেআরের জয় অপূর্ণ থেকে যাবে অনুকূলের অবদানের কথা না বললে। রিঙ্কুর পাশে দাঁড়িয়ে তিনি ১৬ বলে ২৯ রানের ইনিংস না খেললে কেকেআরের পক্ষে ম্যাচ জেতা কার্যত অসম্ভব ছিল।হায়দরাবাদ, পঞ্জাব, লখনউ। ইডেনে আগে যে তিনটি ম্যাচ খেলেছিল কেকেআর, কোনও বারই ৬৭ হাজারের স্টেডিয়ামে ৩০-৩৫ হাজারের বেশি দর্শক হয়নি। কিন্তু রবিবার প্রথম টিকিট নিয়ে আকুতি দেখা গিয়েছিল সমর্থকদের। তার একটাই কারণ, ১৫ বছরের বৈভব সূর্যবংশী। আগের ম্যাচে শূন্য করলেও ইডেনকে যে বৈভব হতাশ করবে না, এমনটাই আশা ছিল অনেকের। তাঁদের হতাশ করেনি বৈভব। গত বছর ইডেনে সে রান করতে পারেননি। এ বার অল্পের জন্য অর্ধশতরান হাতছাড়া করলেও যে টুকু আনন্দ দেওয়ার তা দিয়েছে বৈভব। ২৮ বলে ৪৬ রানের ইনিংসে রয়েছে ৬টি চার এবং ২টি ছয়। নিজের দ্বিতীয় বলেই কার্তিক ত্যাগীকে চার মেরে শুরু করেছিল সে। এর পর বৈভব অরোরাকে তিনটি চার মেরে। সুনীল নারাইনকে পর্যন্ত পাঠিয়েছে গ্যালারিতে। ক্যামেরন গ্রিনকেও রেয়াত করেনি। শেষ পর্যন্ত হার মেনেছে বরুণ চক্রবর্তীর কাছে।রবিবার ইডেনের পিচ দেখে পরিষ্কার বোঝাই যাচ্ছিল স্পিনারেরা সাহায্য পেতে চলেছেন। কেকেআরের হাতে বিকল্প কম ছিল না। রাচিন রবীন্দ্রকে এই ম্যাচেও খেলানো হয়নি। কিন্তু হাতে তো স্পিনার হিসাবে অনুকূল ছিলেন। কেকেআরের অধিনায়ক অজিঙ্ক রাহানে বলই করালেন না অনুকূলকে দিয়ে। যে পিচে বরুণ চার ওভারে মাত্র ১৪ রান দিলেন, নারাইন ৪ ওভারে ২৬ দিলেন, সেই পিচে অনুকূল আসবেন না? অগ্রাধিকার পাবেন রমনদীপ সিংহ, গ্রিনেরা? ক্রিকেট বিশেষজ্ঞেরা বলছিলেন, অনুকূল তো বটেই, এমনকি রিঙ্কুর স্পিন বোলিংও এই পিচে কাজে আসত। রাহানের সিদ্ধান্ত কতটা ভুল ছিল তা প্রমাণ করে দেয় রাজস্থান। সাত ওভারের মধ্যেই তারা তিন স্পিনারকে নিয়ে এসেছে। যশরাজ পুঞ্জার মতো অনভিজ্ঞ স্পিনারকেও নামিয়ে দিয়েছে ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার হিসাবে। স্পিনারেরা সাহায্য পাচ্ছেন দেখে রিয়ান পর্যন্ত বল করতে এলেন। প্রথম ক্রিকেট খেলতে নামা কেউও অনায়াসে এই পিচে স্পিনারদের গুরুত্ব বুঝতে পারবে। পারেন না শুধু রাহানে।অধিনায়ক হিসাবে রাহানে এমন সব সিদ্ধান্ত নেন যার ব্যাখ্যা খুঁজতে বসলে সারা দিন মাথা চুলকোতে হবে। তাতেও উত্তর পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। এ দিন যেমন স্পিনারেরা ধারাবাহিক সাফল্য পাচ্ছেন দেখেও অনুকূলকে দিয়ে বল করালেন না। ঘরোয়া ক্রিকেটে অনুকূলের দল ঝাড়খন্ড সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফি জিতেছে। তিনি নিজে ১৮টি উইকেট পেয়েছেন। তাঁকে আস্তিনের তলায় লুকিয়ে রাখা হল। বল করানো হল রমনদীপকে দিয়ে, যিনি একের পর এক ওয়াইড দিয়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুললেন। তিনি তো ঘরোয়া ক্রিকেটেও বল করেন না। দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাক, তবু বৈভব অরোরাকে দিয়ে চার ওভার করাবেনই রাহানে। বৈভব ১০০ রান হজম করলেও তিনি নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরবেন না। এ দিন তবু টসে হারার কারণে ভুলভাল সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক হয়নি।পাওয়ার প্লে শেষ হবে, অথচ কেকেআরের তিনটি উইকেট পড়বে না এমনটা হতে পারে না। আগের ম্যাচগুলিতে যা দেখা গিয়েছে তা দেখা গেল এ দিনও। প্রথম বলেই আউট টিম সেইফার্ট। দু’ম্যাচে তিনি যা দেখালেন তাতে বোঝা গিয়েছে তিনি ফিন অ্যালেনের চেয়েও খারাপ। ফলে কেকেআর এ বার কাকে দিয়ে ওপেন করাবে তা নিয়ে ভাবতে হতে পারে। এক দিকে রয়েছেন রাহানে, যিনি আগের দিন প্রথম বলে আউট হওয়ার পর এ দিন দ্বিতীয় বলে আউট হলেন। যে ভাবে নান্দ্রে বার্গারের বল চালালেন তা শিক্ষানবিশও কেউ খেললে তাঁকে দু’ম্যাচ বসিয়ে দেওয়া হত। তবু কেকেআর নারাইনকে দিয়ে ওপেন করাবেন না। আগের ম্যাচে তবু ২৪ রান করেছিলেন চালিয়ে খেলে। যে দিন নারাইন খেলবেন সে দিন তাঁকে আটকানো যাবে না। রাহানের চেয়ে অন্তত ভাল।১৫৬ রান যেখানে দরকার, সেখানে তাড়াহুড়ো করার কোনও মানেই হয় না। প্রথম বলে সেইফার্ট না হয় বলের লেংথ বুঝতে না পেরে আউট হয়েছেন। কিন্তু রাহানে? অফস্টাম্পের এত বাইরের বলে কে ও ভাবে চালাতে যায়! গ্রিন ক্রিজ় ছেড়ে এতটাই বেরিয়ে খেলছিলেন যে, রবি বিশ্নোইয়ের লেগ স্টাম্পের বাইরে করা বলের নাগালই পেলেন না। সেই বল ধরতে ধ্রুব জুরেলকে ঝাঁপাতে হলেও দূর থেকে ছুড়ে উইকেট ভেঙে দিলেন। রবীন্দ্র জাডেজার বল এমনিতেই সোজা ব্যাটে খেলতে পারছিলেন না। অঙ্গকৃশ রঘুবংশী ‘রিভার্স সুইপ’-এর মতো সাহসী শট খেলতে গেলেন! একটিও ম্যাচ না জেতা দলের ব্যাটারেরা যে এ ভাবে শট খেলতে পারেন তা কেকেআরের ব্যাটিং না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। রিঙ্কুর ব্যাটিং ছাড়া এই ম্যাচ থেকে ব্যাটিং নিয়ে বলার মতো কোনও প্রাপ্তি নেই।

এই ম্যাচটি মূলত ব্যাটিং ব্যর্থতার এক স্পষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে, বিশেষ করে Kolkata Knight Riders-এর দৃষ্টিকোণ থেকে। ১৫৬ রানের লক্ষ্য—টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে একেবারেই অজেয় নয়। বরং সঠিক পরিকল্পনা ও ধৈর্যের সঙ্গে খেললে এই রান সহজেই তাড়া করা সম্ভব। কিন্তু কেকেআরের ব্যাটিংয়ে সেই ধৈর্য, ম্যাচ সেন্স কিংবা পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতার মারাত্মক অভাব চোখে পড়েছে।

ইনিংসের শুরুতেই সঠিক ভিত্তি গড়ে তোলার বদলে ব্যাটাররা অপ্রয়োজনীয় তাড়াহুড়ো করতে শুরু করেন। প্রথম বলে সেইফার্টের আউট হওয়া কিছুটা দুর্ভাগ্যজনক বলা যেতে পারে—বলটির লেংথ বুঝতে না পেরে ভুল করেছিলেন। কিন্তু এরপর যা ঘটেছে, তা আর শুধুই ভুল নয়, বরং তা দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিংয়ের উদাহরণ। অধিনায়ক অজিঙ্কা রাহানে, যাঁর থেকে দলের সবচেয়ে বেশি সংযম ও স্থিরতা আশা করা হয়, তিনিই অফস্টাম্পের অনেক বাইরের একটি বলে অপ্রয়োজনীয় শট খেলতে গিয়ে উইকেট ছুঁড়ে দেন। এমন একটি বলকে ছেড়ে দেওয়াই ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে যখন দলকে একটি স্থির শুরু দরকার।

এরপর ক্যামেরন গ্রিনের আউটটি আরও হতাশাজনক। তিনি ক্রিজ ছেড়ে এতটাই এগিয়ে খেলছিলেন যে, রবি বিশ্নোইয়ের একটি লেগ স্টাম্পের বাইরের বলেই পুরোপুরি বিট হয়ে যান। সেই বলটি ধরতে ধ্রুব জুরেলকে ঝাঁপ দিতে হলেও দূর থেকে নিখুঁত থ্রো করে উইকেট ভেঙে দেন। এই ধরনের আউট প্রমাণ করে, ব্যাটাররা নিজেদের পরিকল্পনায় কতটা অস্থির এবং পরিস্থিতি বিচার করতে কতটা ব্যর্থ।

news image
আরও খবর

রবীন্দ্র জাডেজার বিপক্ষে ব্যাটারদের অসহায়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাডেজার বল এমনিতেই স্কিড করে এবং সোজা ব্যাটে খেলতে না পারলে বিপদ বাড়ে। কিন্তু কেকেআরের ব্যাটাররা সেই মৌলিক বিষয়টিও মানতে পারেননি। অঙ্গকৃশ রঘুবংশীর মতো তরুণ ব্যাটারও ‘রিভার্স সুইপ’-এর মতো ঝুঁকিপূর্ণ শট খেলতে গিয়ে উইকেট হারান। এই ধরনের শট সাধারণত তখনই খেলা হয়, যখন ব্যাটার সেট হয়ে যান বা ম্যাচের বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হয়। কিন্তু এখানে সেই পরিস্থিতি একেবারেই ছিল না।

পুরো ইনিংস জুড়ে দেখা গেছে, ব্যাটাররা নিজেদের মধ্যে কোনও যোগাযোগ বা পরিকল্পনা ছাড়াই খেলছেন। একটিও ম্যাচ না জেতা একটি দলের ব্যাটারদের মধ্যে সাধারণত যে চাপ থাকে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন সংযম এবং সহজ ক্রিকেট খেলা। কিন্তু কেকেআরের ব্যাটিংয়ে সেই সহজত্বের সম্পূর্ণ অভাব ছিল। বরং প্রত্যেকেই যেন দ্রুত ম্যাচ শেষ করে দেওয়ার তাড়নায় ভুলের পর ভুল করে গেছেন।

এই ব্যর্থতার মধ্যে একমাত্র উজ্জ্বল দিক ছিলেন রিঙ্কু সিং। তিনি নিজের স্বাভাবিক খেলা খেলেছেন এবং চেষ্টা করেছেন দলকে ম্যাচে ফেরাতে। তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল পরিপক্বতা, ধৈর্য এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী শট নির্বাচন। কিন্তু একার পক্ষে ম্যাচ জেতা সম্ভব নয়, যখন অন্য প্রান্ত থেকে কোনও সমর্থন পাওয়া যায় না।

সব মিলিয়ে, এই ম্যাচটি কেকেআরের জন্য একটি বড় শিক্ষা হয়ে থাকা উচিত। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে শুধু আক্রমণাত্মক হওয়াই যথেষ্ট নয়; সঠিক সময় বুঝে আক্রমণ এবং প্রতিরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। ব্যাটারদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে খেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। না হলে এই ধরনের ব্যাটিং ব্যর্থতা ভবিষ্যতেও দলের জন্য বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

Preview image