এবি ডিভিলিয়ার্স সম্প্রতি গৌতম গম্ভীরকে নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন। তাঁর দাবি, গম্ভীরকে তিনি সবসময়ই একজন আবেগপ্রবণ ক্রিকেটার হিসেবে দেখেছেন, আর অতিরিক্ত আবেগ নিয়ে কোচিং করা যে কোনও দলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আইপিএল ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘদিন গম্ভীরের সঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা থেকেই এই বিশ্লেষণ এসেছে বলে জানিয়েছেন ডিভিলিয়ার্স। তিনি এমনও বলেছেন, একজন কোচের শান্ত, স্থির ও পরিকল্পনামাফিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকা উচিত শুধু আবেগ দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না। গম্ভীরের এই আবেগী স্বভাব দলের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, সেটি নিয়ে নেটদুনিয়ায় তীব্র আলোচনা চলছে। এই রিপোর্টে থাকছে ডিভিলিয়ার্সের বক্তব্য, গম্ভীরের প্রতিক্রিয়া এবং ক্রিকেটবিশ্বের বিশ্লেষণ।
ভারতীয় ক্রিকেটে গৌতম গম্ভীর এক জনপ্রিয় ও বিতর্কিত নাম। অন্যদিকে এবি ডিভিলিয়ার্স—বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম ভদ্র, শান্ত প্রকৃতির মহাতারকা। মাঠে দু’জনের ব্যক্তিত্ব একেবারেই ভিন্ন। কিন্তু তাদের পার্থক্য নিয়েই এবার উঠেছে নতুন আলোচনার ঝড়। ডিভিলিয়ার্স সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন যে, তিনি গম্ভীরকে বরাবরই একজন ‘অত্যন্ত আবেগপ্রবণ’ মানুষ হিসেবে দেখেছেন, এবং এমন আবেগ নিয়ে কোচিং করা দলের জন্য সবসময় ইতিবাচক নাও হতে পারে।
এই মন্তব্যই এখন ক্রিকেটবিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। গম্ভীরের নেতৃত্ব, তাঁর আগ্রাসী মনোভাব এবং কোচিং স্টাইল নিয়ে বহুদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু এবিডির মতো একজন বিশ্ববিখ্যাত ক্রিকেটারের মন্তব্য বিষয়টিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
এক সাক্ষাৎকারে এবি ডিভিলিয়ার্স বলেন—
“আমি গম্ভীরকে সবসময়ই একজন আবেগী খেলোয়াড় হিসেবে দেখেছি। একজন কোচকে স্থির থাকতে হয়। সাধারণত আবেগী কোচ দলকে সমস্যায় ফেলতে পারে।”
তিনি আরও জানান, গম্ভীর একজন অসাধারণ প্রতিযোগী হলেও তাঁর আবেগ অনেক সময় সিদ্ধান্তকে ছাপিয়ে যায়। ডিভিলিয়ার্সের মন্তব্যের অর্থ খুব স্পষ্ট—একজন কোচ হিসেবে গম্ভীরের আবেগী আচরণ দলকে হয়তো সাফল্য এনে দিতে পারে, কিন্তু বিপদও বাড়াতে পারে।
এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই ঝড় উঠেছে ক্রিকেটমহলে। বিশেষত আইপিএলের সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলি মাথায় রেখে অনেকেই বলছেন—ডিভিলিয়ার্সের কথাগুলো বাস্তবসম্মত।
ডিভিলিয়ার্স প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গম্ভীরের মুখোমুখি হয়েছেন। পাশাপাশি আইপিএলেও বহুবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন দু’জন। মাঠে কখনো হালকা বাক্যবিনিময়, কখনও আবার তীব্র প্রতিযোগিতা—সবই হয়েছে।
ডিভিলিয়ার্স বলেন—
“গম্ভীর জেতাতে বদ্ধপরিকর। তাঁর আগ্রাসন কখনও কখনও অতিরিক্ত মনে হয়। কিন্তু সেটা তাঁর স্বভাব।”
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দু’জনের ব্যক্তিত্ব আলাদা। গম্ভীর মাঠে আগুনের মতো, আর ডিভিলিয়ার্স শান্ত নদীর মতো। তাই ডিভিলিয়ার্সের মন্তব্যে অনেকটাই বাস্তব অভিজ্ঞতার ছাপ রয়েছে।
ক্রিকেট এখন শুধু talento নয়—এটি সম্পূর্ণরূপে মানসিক খেলা। ম্যাচের চাপ, মিডিয়ার নজর, দর্শকদের প্রত্যাশা—সব কিছু মিলিয়ে ক্রিকেটার ও কোচদের মানসিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঠাণ্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা হতে পারে
ম্যাচের টানটান মুহূর্তে আবেগ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
খেলোয়াড়দের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে
কোচ যদি সবসময় উচ্চস্বরে কথা বলেন, আগ্রাসী হন, খেলোয়াড়রা মানসিকভাবে চাপ অনুভব করতে পারে।
ড্রেসিং রুমে উত্তেজনা তৈরি হয়
দলের পরিবেশ নষ্ট হলে পারফর্ম্যান্সে প্রভাব পড়ে।
ম্যাচ প্ল্যানিংয়ের চেয়ে আবেগ বেশি গুরুত্ব পায়
যা খেলার মান নষ্ট করতে পারে।
মিডিয়ার সামনে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়
গম্ভীর বহুবার সাংবাদিকদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যযুদ্ধে জড়িয়েছেন।
ডিভিলিয়ার্সের মতে, কোচিং হল শান্ত মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার শিল্প। হঠাৎ আবেগের বিস্ফোরণ দলের ক্ষতি করতে পারে।
এবিডির মন্তব্য নিয়ে গম্ভীর এখনো সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে অতীতে তিনি স্পষ্ট বলেছেন—
“আমি জেতার জন্য খেলি। আবেগ আমার শক্তি।”
গম্ভীর বহুবারই বলেছেন, তাঁর আগ্রাসন তাঁকে আলাদা করে। তিনি আবেগে চলেন, কিন্তু সেটা দলের উপকারেই লাগে বলে তাঁর দাবি।
তবুও প্রশ্ন উঠছে—
কোচ হিসেবে একই আগ্রাসন কি কাজ দেবে?
নাকি তা বড় ম্যাচে বিপদ ডেকে আনবে?
গম্ভীরের নীরবতা আরও বিতর্ক বাড়িয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে।
“গম্ভীরের আগ্রাসনই তাকে সফল করেছে। বিজয়ের জন্য এমন আগুনের মতো নেতৃত্ব দরকার।”
“ডিভিলিয়ার্স ঠিক বলেছেন। গম্ভীরের আচরণ অনেক সময় বেশি হয়ে যায়। কোচিংয়ের জন্য শান্ত মাথা দরকার।”
X (Twitter) থেকে Facebook—সব জায়গাতেই বিতর্ক চলছে। কেউ কেউ পুরনো ভিডিও তুলে দিচ্ছেন যেখানে গম্ভীর মাঠে উত্তেজিত হয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়িয়েছেন।
অন্যদিকে, কেউ আবার তাঁর নেতৃত্বে KKR-এর দুটি আইপিএল জয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন।
গম্ভীর একজন তীক্ষ্ণ কৌশলী
চাপের মধ্যে তিনি অসাধারণভাবে দল পরিচালনা করেন
তাঁর আগ্রাসন অনেক সময় দলের morale বাড়ায়
গম্ভীরের আত্মনিয়ন্ত্রণ কম
মাঠে অতিরিক্ত উত্তেজনা দলকে অস্থির করতে পারে
ড্রেসিংরুমের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে
উদাহরণ হিসেবে তারা IPL 2023-এ বিরাট কোহলির সঙ্গে গম্ভীরের উত্তপ্ত ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন।
গম্ভীর যখন কোচিং বা পরামর্শদাতা হিসেবে দলের দায়িত্ব নেন, তখন দেখা যায়—
তিনি প্রতিটি খেলোয়াড়ের ওপর তীব্র শৃঙ্খলা চাপিয়ে দেন
পরিশ্রম বাড়ান
আগ্রাসী ক্রিকেট খেলার পরামর্শ দেন
কিন্তু একই সঙ্গে কখনও তিনি
সাইডলাইনে উত্তেজিতভাবে প্রতিক্রিয়া জানান
খেলোয়াড়দের চাপে ফেলেন
ম্যাচের পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত আবেগ দেখান
এবিডির বক্তব্যে তাই নতুন কিছু নেই—এমন মত অনেকের।
২০০৭ টি২০ বিশ্বকাপে ভারতের হিরো
২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনালে ভারতের সবচেয়ে বড় ইনিংস
KKR-কে দুটি IPL ট্রফি
LSG-কে পরপর দুইবার প্লে-অফে নিয়ে গেছেন
KKR-কে আবারও শক্তিশালী দলে রূপান্তরিত করেছেন
তাই অনেকে বলছেন—
গম্ভীরের আবেগ তাঁকে যতটা বিতর্কিত করেছে, ঠিক ততটাই সফলও করেছে।
খেলাধুলার মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন—
আবেগ নেতৃত্বকে শক্তিশালী করে
কিন্তু আবেগ যদি অনিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে তা বিপর্যয় ডেকে আনে
একজন কোচকে эмоশনের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তি ও calmness বজায় রাখতে হয়
গম্ভীরের ক্ষেত্রে আবেগ তাঁর শক্তি হলেও, বড় ম্যাচে সেই আবেগই বিপদের কারণ হতে পারে—এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ক্রিকেট মহল বলছে—
এবিডি স্বভাবতই সরল ও সত্যবাদী
তিনি কাউকেই খুশি করার জন্য মন্তব্য করেন না
গম্ভীর সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে
তাই তাঁর মন্তব্যকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না, বলছেন প্রাক্তন ক্রিকেটাররা।
এবি ডিভিলিয়ার্সের মন্তব্য ক্রিকেটমহলে বড়সড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গম্ভীরের আবেগ একজন খেলোয়াড় হিসেবে তাঁকে শক্তিশালী করেছে—এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু কোচ হিসেবে সেই আগ্রাসী, উত্তেজনাপূর্ণ আচরণ কতটা দলের কাজে লাগবে—তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।
আসন্ন আইপিএল মরসুমে গম্ভীরের নেতৃত্ব পরীক্ষা দেবে—
তাঁর আবেগ দলকে এগিয়ে নিয়ে যাবে
নাকি
সেই আবেগই দলের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে
সময়ই বলে দেবে।
খেলাধুলার মনোবিজ্ঞানীরা (Sports Psychologists) বহুদিন ধরেই বিশ্লেষণ করছেন যে, কোচের মানসিক স্থিতিশীলতা এবং আবেগী প্রতিক্রিয়া দলের পারফরম্যান্সে কী ধরনের প্রভাব ফেলে। গৌতম গম্ভীরকে নিয়ে এবি ডিভিলিয়ার্সের মন্তব্য সেই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, একজন সফল কোচের জন্য ক্রিকেটীয় জ্ঞানের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স (Emotional Intelligence বা EI)।
সংজ্ঞা: EI হলো নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং অন্যদের আবেগকে বোঝা ও প্রভাবিত করার ক্ষমতা।
গম্ভীরের ক্ষেত্রে: গম্ভীরের আবেগ তাঁর 'স্ব-প্রণোদনা' (Self-Motivation) হিসেবে দুর্দান্ত কাজ করেছে। তিনি নিজে জেতার জন্য যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা দেখান, তা তাঁর ব্যক্তিগত শক্তি। তবে কোচিংয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজন 'অন্যকে প্রভাবিত' (Influencing Others) করার ক্ষমতা। অনিয়ন্ত্রিত আবেগ ড্রেসিংরুমে দ্রুত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
খেলোয়াড়রা কোচের আবেগী আচরণের প্রতি সাধারণত দু'ভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়—যা গম্ভীর বা ডিভিলিয়ার্সের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু:
অনুপ্রাণিত গ্রুপ (Driven by Aggression): একদল খেলোয়াড় কোচের উচ্চস্বর বা আগ্রাসী আচরণে অনুপ্রাণিত হয়। তারা মনে করে কোচ তাদের ওপর আস্থা রাখছেন এবং জেতার জন্য মরিয়া।
চাপগ্রস্ত গ্রুপ (Pressured by Intensity): অন্যদল, বিশেষ করে তরুণ বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কম অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা, কোচের তীব্র আবেগে মানসিকভাবে চাপ অনুভব করে। তারা ভুলের ভয়ে স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারে না। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই চাপ তাঁদের পারফরম্যান্সের মান কমিয়ে দেয়।
ক্রিকেট ইতিহাসের সফলতম কোচদের দিকে তাকালে দেখা যায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্থিরতা আগ্রাসনের চেয়ে বেশি টেকসই সাফল্য এনে দিয়েছে।
| কোচিং স্টাইল | উদাহরন | সাফল্যের কারণ |
| শান্ত ও স্থির (Calm & Composed) | গ্যারি কার্স্টেন (ভারত), স্টিফেন ফ্লেমিং (CSK) | খেলোয়াড়দের স্বস্তি ও স্বাধীনতা দিয়েছেন; চাপের মুহূর্তে সহজ ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছেন। |
| উচ্চ আবেগী ও আগ্রাসী (High-Intensity & Aggressive) | গ্রেগ চ্যাপেল (ভারত), বব উলমার (পাকিস্তান) | স্বল্পমেয়াদে ভালো ফল এনে দিলেও, ড্রেসিংরুমে অস্থিরতা সৃষ্টি করে খেলোয়াড়দের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করেছে। |
ডিভিলিয়ার্স সম্ভবত এই ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছেন। গম্ভীরের আবেগ তাঁর চরিত্র, কিন্তু কোচ হিসেবে তিনি যদি চাপের মুহূর্তে নিজের স্নায়ু ধরে রাখতে না পারেন, তবে তা দলের ভুল সিদ্ধান্তের কারণ হতে পারে। মনোবিজ্ঞানীরা তাই মনে করেন, গম্ভীরকে তাঁর আবেগকে 'নিয়ন্ত্রণ' না করে, বরং তাকে 'চ্যানেলাইজ' (Channelize) করতে শিখতে হবে—যা দল গঠনে শৃঙ্খলা আনবে, কিন্তু খেলোয়াড়দের মনে ভয় জন্মাবে না।