গানের প্রতি নিজের ভালবাসাকে ছবিতে তুলে ধরার ইচ্ছা দীর্ঘদিনের জানালেন পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় তাঁর এই বক্তব্যে উঠে এসেছে সঙ্গীতের প্রতি ব্যক্তিগত টান এবং চলচ্চিত্রে সেই অনুভূতিকে ব্যবহার করার ভাবনা গল্প ও সুরের মেলবন্ধনে নিজের ভালবাসাকে কীভাবে পর্দায় প্রকাশ করতে চান পরিচালক তা নিয়েই তৈরি হয়েছে আগ্রহ
গানের প্রতি ব্যক্তিগত ভালবাসাকে নিজের ছবিতে ব্যবহার করার ইচ্ছা দীর্ঘদিনের সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের এই বক্তব্য তাঁর সৃষ্টিশীল ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। গল্প, চরিত্র ও দৃশ্যের সঙ্গে সঙ্গীতের সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হয়, সেই প্রসঙ্গেও বক্তব্যটি ভাবনার সুযোগ করে দেয়। একজন পরিচালকের কাছে গান কখনও কোনও দৃশ্যের আবেগ প্রকাশের মাধ্যম, কখনও চরিত্রের না-বলা কথার ভাষা। সৃজিতের দেওয়া বক্তব্যের আলোকে বলা যায়, তাঁর কাছে ব্যক্তিগত সঙ্গীতপ্রীতি এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের মধ্যে একটি যোগসূত্র রয়েছে। সৃজিতের সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহের পেছনে পারিবারিক পরিবেশের কথাও উঠে এসেছে তাঁর অন্য একটি সাক্ষাৎকারে। ২০২৬ সালের মে মাসে TV9 বাংলাকে তিনি জানিয়েছিলেন, ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে সঙ্গীতচর্চার পরিবেশ ছিল। নিজেও গান এবং বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র শেখার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রের কাজে সঙ্গীত পরিচালকদের সঙ্গে আলোচনা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়েও তাঁর শেখার পরিধি বেড়েছে। এই অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, সঙ্গীতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধু ছবির জন্য গান বেছে নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চলচ্চিত্রে গান ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির একটি হল গল্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক। কোনও গান আলাদা করে শুনতে ভাল লাগলেও ছবিতে সেটি কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার উপর দর্শকের অভিজ্ঞতা নির্ভর করে। একটি দৃশ্যের সঙ্গে মানানসই সুর চরিত্রের অনুভূতিকে আরও স্পষ্ট করতে পারে। আবার গানের কথা কখনও এমন অভিজ্ঞতার ইঙ্গিত দিতে পারে, যা সংলাপে সরাসরি বলা হয়নি। এই জায়গাতেই পরিচালকের ব্যক্তিগত পছন্দকে গল্পের প্রয়োজনের সঙ্গে মেলানোর প্রশ্ন আসে। গানের প্রতি ভালবাসা সৃষ্টির প্রেরণা হতে পারে, কিন্তু পর্দায় তার ব্যবহারকে অর্থবহ করে তোলে দৃশ্য, চরিত্র এবং পরিস্থিতি। সৃজিতের বক্তব্যকে সেই দৃষ্টিতে দেখলে তাঁর দীর্ঘদিনের ইচ্ছার মধ্যে সুরের সাহায্যে গল্প বলার আকাঙ্ক্ষাও খুঁজে পাওয়া যায়। এটি তাঁর বক্তব্যের একটি ব্যাখ্যা নির্দিষ্ট কোনও ছবির দৃশ্য বা গানের পরিকল্পনা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য নয়। সঙ্গীতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গান তৈরির কাজেও প্রকাশ পেয়েছে। ‘অভিমান’ ছবির জন্য ‘আদর’ নামে একটি গান তৈরি করার কথা সৃজিত জানিয়েছিলেন। একই সাক্ষাৎকারে সৃষ্টিশীল কাজে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভূমিকার কথাও বলেন তিনি। তাঁর ব্যাখ্যায়, জীবন থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা এবং কল্পনা মিলিয়েই সৃষ্টির রসদ তৈরি হয়। এই ভাবনা চলচ্চিত্রের গানের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। প্রেম, বিচ্ছেদ, অপেক্ষা কিংবা স্মৃতির অনুভূতি গানের মাধ্যমে প্রকাশ পেলে তা দর্শকের নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল খুঁজে পেতে পারে। কোনও চরিত্রের জন্য লেখা গান তখন সেই চরিত্রের সীমা ছাড়িয়ে শ্রোতার ব্যক্তিগত অনুভূতির অংশ হয়ে ওঠে। তবে এমন সংযোগ তৈরির জন্য শুধু আবেগঘন কথা যথেষ্ট নয়; সুর, কণ্ঠ এবং দৃশ্যায়নের মধ্যেও সামঞ্জস্য প্রয়োজন।
পর্দায় গানের উপস্থাপনাও তাই গুরুত্বপূর্ণ। অভিনেতার অভিব্যক্তি, দৃশ্যের পরিবেশ, সম্পাদনার ছন্দ এবং নীরবতার ব্যবহার সব মিলিয়ে একটি গানের অর্থ তৈরি হয়। একই সুর ভিন্ন দৃশ্যে ভিন্ন অনুভূতি জাগাতে পারে। কোথাও গান স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনে, কোথাও সম্পর্কের পরিবর্তন বোঝায়, আবার কোথাও গল্পের সময় এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। সৃজিতের গান তৈরির কাজ নিয়ে সঙ্গীতমহলেও আলোচনা হয়েছে। আনন্দবাজারের একটি প্রতিবেদনে এম্পেরর ভার্সাস শরৎচন্দ্র ছবির জন্য তাঁর তৈরি গান এবং তা নিয়ে বিভিন্ন সঙ্গীতশিল্পীর প্রতিক্রিয়া উঠে এসেছে। সেই আলোচনা পরিচালনার পাশাপাশি সঙ্গীত সৃষ্টিতে তাঁর আগ্রহের আরও একটি উদাহরণ। গানের প্রতি ভালবাসাকে ছবিতে ব্যবহার করার ইচ্ছার মধ্যে তাই ব্যক্তিগত অনুভূতি ও পেশাগত সৃষ্টির মিলন দেখা যায়। একজন শিল্পী যা শুনেছেন, শিখেছেন এবং অনুভব করেছেন, তার কিছু অংশ তাঁর কাজে ফিরে আসতে পারে। সৃজিতের বক্তব্য সেই সম্পর্কটিকেই সামনে আনে। তাঁর দেওয়া বক্তব্যে নির্দিষ্ট ছবির নাম গানের ধরন বা দৃশ্যায়নের বিস্তারিত নেই। ফলে সেই বিষয়ে অনুমান করার সুযোগ সীমিত। তবে বক্তব্যের কেন্দ্রটি স্পষ্ট সঙ্গীতের প্রতি নিজের টানকে চলচ্চিত্রের ভাষায় প্রকাশ করতে চেয়েছেন তিনি। সেই ইচ্ছা পর্দায় কতটা অর্থবহ হয়ে ওঠে, তা বিচার করার জায়গা থাকবে গল্প ও সুরের মেলবন্ধনেই।
চলচ্চিত্রে একটি গান শুধু শোনার অভিজ্ঞতা তৈরি করে না, দেখার অভিজ্ঞতাকেও প্রভাবিত করে। গানের কথা ও সুরের সঙ্গে যখন অভিনেতার অভিব্যক্তি, দৃশ্যের পরিবেশ এবং সম্পাদনার ছন্দ মিলিত হয়, তখন তার অর্থ আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে। কোনও গান আলাদা করে শুনে যে অনুভূতি তৈরি হয়, ছবির একটি বিশেষ মুহূর্তে সেই গানই অন্য মাত্রা পেতে পারে। গানের প্রতি নিজের ভালবাসাকে চলচ্চিত্রে ব্যবহার করার বিষয়ে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য এই সম্পর্কটি নিয়ে ভাবনার সুযোগ তৈরি করে। গল্পের মধ্যে গান কোথায় আসছে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনও চরিত্রের জীবনে আনন্দের মুহূর্তে ব্যবহৃত সুর পরে বিচ্ছেদের দৃশ্যে ফিরে এলে তার অর্থ বদলে যেতে পারে। প্রথমবার যে সুর সম্পর্কের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিল, পরেরবার সেটিই হারানোর অনুভূতি বহন করতে পারে। ফলে গানের অর্থ শুধু তার কথায় বা সুরে থাকে না; গল্পের সঙ্গে তার সম্পর্কও সেই অর্থ তৈরি করে।
অভিনেতার অভিব্যক্তি এই উপস্থাপনায় বড় ভূমিকা নেয়। গানের দৃশ্যে সব অনুভূতি সংলাপে প্রকাশ করার প্রয়োজন হয় না। একটি স্থির দৃষ্টি, মুখের সামান্য পরিবর্তন কিংবা কোনও পরিচিত জায়গায় ফিরে আসার মুহূর্ত চরিত্রের মনের অবস্থা বোঝাতে পারে। সেই দৃশ্যের সঙ্গে মানানসই গান থাকলে দর্শক চরিত্রের অনুভূতির আরও কাছে পৌঁছতে পারেন। একই ভাবে দৃশ্যের পরিবেশও গানের প্রভাব বদলে দেয়। জনবহুল জায়গায় একটি চরিত্রের একাকিত্ব এবং নির্জন ঘরে তার অপেক্ষা দুই পরিস্থিতিতে একই গান ভিন্ন অনুভূতি তৈরি করতে পারে। আলো, রং, স্থান এবং ক্যামেরার অবস্থান সেই অনুভূতিকে গড়ে তোলে। তাই গানের দৃশ্যায়নকে শুধু সুন্দর দৃশ্যের সমাহার হিসেবে দেখলে তার গল্প বলার ক্ষমতার একটি অংশ আড়ালে থেকে যায়। সম্পাদনার ছন্দও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত বদলাতে থাকা দৃশ্য কোনও সম্পর্কের বহু মুহূর্তকে অল্প সময়ে তুলে ধরতে পারে। আবার দীর্ঘ সময় ধরে একটি মুখ বা একটি স্থান দেখালে দর্শক সেই মুহূর্তের অনুভূতির মধ্যে থাকার সুযোগ পান। গানের গতির সঙ্গে দৃশ্যের গতি কীভাবে মিলছে, তা নির্ধারণ করে উপস্থাপনার আবেগ। নীরবতার ব্যবহারও সুরের মতোই অর্থবহ হতে পারে। গান শুরু হওয়ার আগে একটি বিরতি বা গানের শেষে কিছুক্ষণ শব্দহীনতা কোনও দৃশ্যের প্রভাব বাড়াতে পারে। সব অনুভূতিকে একটানা সঙ্গীত দিয়ে ব্যাখ্যা না করে কিছু জায়গায় দর্শককে নিজের মতো অনুভব করার সুযোগ দেওয়া যায়। সুর ও নীরবতার এই সম্পর্ক চলচ্চিত্রের আবেগ প্রকাশের একটি কার্যকর উপায়। গান কখনও স্মৃতির সূত্র হিসেবেও কাজ করে। কোনও পরিচিত সুর শুনে চরিত্রের মনে অতীতের একটি ঘটনা ফিরে আসতে পারে। সেই স্মৃতি বর্তমান সম্পর্ককে নতুন ভাবে বুঝতে সাহায্য করতে পারে। দর্শকও আগের কোনও দৃশ্যের সঙ্গে পরের দৃশ্যের যোগ খুঁজে পান। এভাবে গান গল্পের বিভিন্ন মুহূর্তকে সংযুক্ত করে। আবার গান সময়ের পরিবর্তন বোঝানোর মাধ্যম হতে পারে। একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠা, দূরত্ব তৈরি হওয়া অথবা দীর্ঘ অপেক্ষার অভিজ্ঞতা গানের দৃশ্যগুলির মাধ্যমে দেখানো সম্ভব। তবে এমন ব্যবহার অর্থবহ হতে হলে দৃশ্যগুলি থেকে গল্প বা চরিত্র সম্পর্কে কিছু জানা প্রয়োজন। তখন গান কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে অংশ নেয়।
এই প্রেক্ষাপটে সৃজিতের সঙ্গীত সৃষ্টির প্রতি আগ্রহ একটি প্রাসঙ্গিক বিষয়। আনন্দবাজারের আলোচনায় এম্পেরর ভার্সাস শরৎচন্দ্র ছবির জন্য তাঁর তৈরি গান এবং তা নিয়ে সঙ্গীতশিল্পীদের প্রতিক্রিয়া উঠে এসেছে। পরিচালনার পাশাপাশি গান তৈরির কাজে তাঁর অংশগ্রহণ সঙ্গীতের সঙ্গে সম্পর্কের আর একটি দিক সামনে আনে। একজন পরিচালক যখন গান তৈরির কাজেও যুক্ত হন, তখন গল্পের ভাবনা এবং সুরের ভাবনার মধ্যে সরাসরি আদানপ্রদান সম্ভব হয়। চরিত্র কী অনুভব করছে, দৃশ্যটি কোথায় ঘটছে এবং গল্পের কোন পর্যায়ে গানটি আসবে এই প্রশ্নগুলি গানের নির্মাণেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ব্যক্তিগত পছন্দের পাশাপাশি ছবির প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়াও জরুরি। প্রিয় একটি সুর ব্যবহার করার ইচ্ছা তখনই পূর্ণতা পায় যখন তা দৃশ্য ও চরিত্রের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে। শিল্পীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এই প্রক্রিয়ার রসদ হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে শোনা গান, শেখার অভিজ্ঞতা, কোনও বিশেষ সুরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি কিংবা জীবনের নানা অনুভূতি সৃষ্টিতে ফিরে আসতে পারে। সেই অভিজ্ঞতা পর্দায় প্রকাশ পেলে দর্শকের নিজস্ব স্মৃতির সঙ্গেও তার মিল তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সৃজিতের বক্তব্যের কেন্দ্রেও রয়েছে নিজের সঙ্গীতপ্রীতিকে চলচ্চিত্রের ভাষায় প্রকাশ করার ইচ্ছা। এখানে আলোচিত সংক্ষিপ্ত বক্তব্য থেকে নির্দিষ্ট কোনও দৃশ্যের পরিকল্পনা বা গানের ধরন সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। তবে গল্প বলার সঙ্গে ব্যক্তিগত ভালবাসাকে যুক্ত করার আকাঙ্ক্ষাটি বোঝা যায়। পর্দায় সেই ভাবনার সাফল্য নির্ভর করবে গানটি গল্পকে কতটা সমৃদ্ধ করছে তার উপর। সুর চরিত্রের না-বলা কথা প্রকাশ করছে কি না, দৃশ্যের অনুভূতিকে গভীর করছে কি না এবং দর্শকের কাছে নতুন কোনও অর্থ পৌঁছে দিচ্ছে কি না এই বিষয়গুলিই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। গল্প, অভিনয়, দৃশ্য ও সুরের মধ্যে এই সংযোগ তৈরি হলে গান চলচ্চিত্রের অভিজ্ঞতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠতে পারে।