Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

জিয়াগঞ্জের ছেলে থেকে বিশ্বমঞ্চের তারকা কত কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক অরিজিৎ সিং

অরিজিৎ সিংয়ের আকস্মিক ঘোষণার পর থেকেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও সম্পত্তি নিয়ে কৌতূহল তুঙ্গে। কত কোটি টাকার মালিক এই জনপ্রিয় গায়ক কী ধরনের বাড়ি ও বিলাসবহুল গাড়ির মালিক তিনি তা জানতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন অনুরাগীরা। সাধারণ জীবনযাপন করলেও অরিজিৎ সিংয়ের আয় ও সম্পত্তির পরিমাণ যে বিস্ময়কর, তা নিয়েই এখন চলছে নানা আলোচনা ও জল্পনা।

অরিজিৎ সিং—এই নামটি শুধু একজন গায়কের নয়, বরং আধুনিক ভারতীয় সঙ্গীতের এক আবেগ, এক অনুভূতির প্রতীক। তাঁর কণ্ঠে প্রেম যেমন মেলে, তেমনই বেদনা, বিচ্ছেদ, আশা, হতাশা—মানুষের জীবনের প্রতিটি অনুভূতির প্রতিফলন পাওয়া যায়। সেই অরিজিৎ সিং হঠাৎই এমন এক ঘোষণা করলেন, যা শুনে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছেন লক্ষ লক্ষ অনুরাগী। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া একটি পোস্টে তিনি জানিয়ে দেন, আর কোনও ছবিতে প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে কাজ করবেন না।

নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে অরিজিৎ লেখেন, এত বছর ধরে শ্রোতাদের ভালোবাসা ও সমর্থনের জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। তবে আনন্দের সঙ্গেই ঘোষণা করছেন যে তিনি প্লেব্যাক গান গাওয়া বন্ধ করছেন। তাঁর এই ঘোষণার পর থেকেই সঙ্গীতপ্রেমীদের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা, জল্পনা এবং আবেগের ঢেউ। কেউ বিশ্বাস করতে পারছেন না, কেউ আবার ভাবছেন—এ কি সত্যিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, নাকি সাময়িক বিরতি?

অরিজিৎ নিজে অবশ্য তাঁর পোস্টে স্পষ্ট করে বলেননি, কেন এমন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। তবে তিনি উল্লেখ করেছেন, তিনি সঙ্গীত তৈরি করা বন্ধ করবেন না। একজন শিল্পী হিসেবে আরও শেখার এবং নিজস্ব সৃষ্টিতে মন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি কিছু প্রতিশ্রুতি পূরণের কথাও উল্লেখ করেছেন, যার ফলে চলতি বছরে তাঁর কিছু কাজ মুক্তি পেতে পারে। এই বক্তব্য থেকেই অনেকে মনে করছেন, অরিজিৎ হয়তো প্লেব্যাক গান থেকে সাময়িক বিরতি নিচ্ছেন, কিন্তু সঙ্গীতজগত থেকে সম্পূর্ণ বিদায় নিচ্ছেন না।

তবে সত্য যাই হোক না কেন, তাঁর এই আকস্মিক ঘোষণায় মন ভেঙেছে লক্ষ লক্ষ ভক্তের। আসমুদ্রহিমাচল যাঁর গানের জাদুতে মুগ্ধ, সেই গায়কের কণ্ঠে আর নতুন সিনেমার গান শোনা যাবে না—এই ভাবনাই অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। সামাজিক মাধ্যমে ভক্তদের প্রতিক্রিয়া দেখলেই বোঝা যায়, অরিজিৎ সিং কতটা জনপ্রিয় এবং কতটা গভীরভাবে মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে যুক্ত।

এই ঘোষণার পর আরেকটি বিষয় নিয়ে নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়েছে—অরিজিৎ সিংয়ের সম্পত্তি ও আয়। এত বছর ধরে সফল ক্যারিয়ারের ফলে তিনি কত সম্পদের মালিক হয়েছেন, তা জানতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন তাঁর অনুরাগীরা। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত অরিজিৎ সিংয়ের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪১৪ কোটি টাকা। এই বিপুল সম্পদের পেছনে রয়েছে তাঁর দীর্ঘ দিনের কঠোর পরিশ্রম, প্রতিভা এবং অসাধারণ জনপ্রিয়তা।

অরিজিৎ সিংয়ের সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে মুম্বইয়ে বিলাসবহুল বাড়ি, দামি গাড়ির সংগ্রহ এবং একাধিক বিনিয়োগ। নবী মুম্বইয়ে তাঁর একটি বিলাসবহুল বাড়ির মূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা বলে জানা যায়। এছাড়াও মুম্বইয়ের বর্সোবাতে তাঁর একটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে বলে খবর। গায়কের গাড়ির সংগ্রহও বেশ নজরকাড়া। তাঁর কাছে রয়েছে রেঞ্জ রোভার, হামার এইচ৩, মার্সিডিজসহ একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি। পাশাপাশি জিয়াগঞ্জের বাড়িতে রয়েছে তাঁর সেই পরিচিত স্কুটি, যা দিয়ে তিনি প্রায়ই শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়ান। এমনকি আন্তর্জাতিক তারকা এড শিরানকেও সেই স্কুটিতে বসিয়ে জিয়াগঞ্জ ঘুরিয়েছিলেন অরিজিৎ—যা তাঁর সাধারণ জীবনযাপনের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

শুধু বিলাসবহুল জীবন নয়, অরিজিৎ সিংয়ের জীবনের আরেকটি দিকও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর টান। মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে তাঁর বাবার পরিচালিত ‘হেঁশেল’ নামে একটি পকেটবান্ধব রেস্তরাঁ রয়েছে, যেখানে এখনও মাত্র ৪০ টাকায় খাবার পাওয়া যায়। এত বড় তারকা হয়েও নিজের শহর এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখার এই মানসিকতা অরিজিৎ সিংকে আরও আলাদা করে তোলে।

আয়ের দিক থেকেও অরিজিৎ সিং ভারতের সবচেয়ে সফল গায়কদের মধ্যে অন্যতম। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর আনুমানিক বার্ষিক আয় প্রায় ৭০ কোটি টাকা। বলিউডে প্রতিটি গান গাওয়ার জন্য তিনি প্রায় ১০ লক্ষ টাকা পারিশ্রমিক নেন। লাইভ পারফর্ম্যান্সের জন্য তাঁর পারিশ্রমিক আরও বেশি—৫০ লক্ষ থেকে ১.৫ কোটি টাকা পর্যন্ত। বিদেশে শো হলে এই অঙ্ক আরও বেড়ে যায়। কোনও কোনও সূত্রের দাবি, একটি কনসার্টের জন্য তিনি প্রায় ২ কোটি টাকা নেন। এমনকি দুই ঘণ্টার লাইভ পারফর্ম্যান্সের জন্য প্রায় ১৪ কোটি টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক নেওয়ার খবরও পাওয়া যায়। এই বিপুল আয় তাঁকে কেবল ভারতের নয়, বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত সঙ্গীতশিল্পীদের একজন করে তুলেছে।

অরিজিৎ সিংয়ের এই সাফল্যের গল্প কিন্তু রাতারাতি তৈরি হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার জিয়াগঞ্জে জন্ম তাঁর। সেখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের প্রতি গভীর আকর্ষণ ছিল তাঁর। ২০০৫ সালে ‘ফেম গুরুকুল’ নামে একটি রিয়্যালিটি শোয়ের মাধ্যমে গায়ক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হলেও সেই অনুষ্ঠানে বিশেষ সাফল্য পাননি তিনি। তবে ব্যর্থতায় ভেঙে না পড়ে নিজের প্রতিভাকে আরও শান দেন অরিজিৎ।

দীর্ঘ সংগ্রাম এবং পরিশ্রমের পর ২০১১ সালে ‘মার্ডার ২’ ছবির ‘ফির মহব্বত’ গানটির মাধ্যমে বলিউডে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। তবে প্রকৃত সাফল্য আসে ২০১৩ সালে ‘আশিকি ২’ ছবির ‘তুম হি হো’ গানটির মাধ্যমে। এই গান শুধু জনপ্রিয় হয়নি, বরং বলিউডের ইতিহাসে অন্যতম আইকনিক গান হিসেবে জায়গা করে নেয়। ‘তুম হি হো’ গানটি অরিজিৎ সিংকে রাতারাতি তারকাখ্যাতি এনে দেয়। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে।

news image
আরও খবর

হিন্দি, বাংলা, মরাঠি, তেলুগু সহ একাধিক ভাষায় ৩০০টিরও বেশি গান গেয়েছেন অরিজিৎ সিং। তাঁর গাওয়া অধিকাংশ গানই সুপারহিট এবং মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। ‘চান্না মেরেয়া’, ‘আগর তুম সাথ হো’, ‘গেরুয়া’, ‘অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল’, ‘কেসরিয়া’, ‘ফির লে আয়া দিল’, ‘খয়রিয়াত’, ‘শায়দ’—এই গানগুলো শুধু জনপ্রিয় হয়নি, বরং আধুনিক ভারতীয় সঙ্গীতের এক নতুন দিশা তৈরি করেছে।

গানের জগতে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বহু পুরস্কার পেয়েছেন অরিজিৎ সিং। জাতীয় পুরস্কার থেকে শুরু করে একাধিক ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড তাঁর ঝুলিতে রয়েছে। ২০২৫ সালে সঙ্গীতে অবদানের জন্য তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করা হয়, যা তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম বড় অর্জন।

ডিজিটাল যুগে সঙ্গীতের জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রেও অরিজিৎ সিং এক অনন্য নজির তৈরি করেছেন। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় সঙ্গীত প্ল্যাটফর্ম স্পটিফাই পরপর সাত বছর তাঁকে ভারতের শীর্ষ শিল্পী হিসেবে মনোনীত করেছে। তাঁর গান কোটি কোটি মানুষ শোনেন, শেয়ার করেন এবং নিজেদের জীবনের অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে নেন।

এই কারণেই অরিজিৎ সিংয়ের প্লেব্যাক গান থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা এত বড় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সঙ্গীতজগতের সঙ্গে যুক্ত অনেক শিল্পীও এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সুরকার ও গায়ক অমল মালিক জানিয়েছেন, এই খবর শুনে তিনি হতাশ হয়েছেন, তবে অরিজিৎ সিংয়ের সিদ্ধান্তকে সম্মান করেন। র‍্যাপার বাদশাও অরিজিৎ সিংকে এই প্রজন্মের সেরা শিল্পী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

অরিজিৎ সিংয়ের জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো তাঁর সাধারণ জীবনযাপন। কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি এবং বিলাসবহুল জীবনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি এখনও সাধারণ মানুষের মতো জীবন কাটাতে পছন্দ করেন। জিয়াগঞ্জের রাস্তায় স্কুটিতে ঘোরা, নিজের শহরের মানুষের সঙ্গে মিশে থাকা—এই সবকিছুই তাঁকে অন্য তারকাদের থেকে আলাদা করে তোলে।

তাঁর জীবনের গল্প প্রমাণ করে, প্রতিভা এবং পরিশ্রম থাকলে ছোট শহর থেকেও বিশ্বমঞ্চে পৌঁছানো সম্ভব। জিয়াগঞ্জের সাধারণ ছেলে থেকে বলিউডের শীর্ষ প্লেব্যাক গায়ক হয়ে ওঠার এই যাত্রা শুধু সাফল্যের গল্প নয়, বরং অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং সংগ্রামের ইতিহাস।

আজ অরিজিৎ সিং শুধু একজন গায়ক নন, তিনি একটি অনুভূতি, একটি যুগের প্রতীক। তাঁর গান ছাড়া আধুনিক বলিউড কল্পনা করা কঠিন। তাই তাঁর প্লেব্যাক গান থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা শুধু একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং পুরো সঙ্গীতজগতের জন্য এক বড় ঘটনা।

তবে সময়ই বলবে, অরিজিৎ সিংয়ের এই সিদ্ধান্ত কতটা স্থায়ী। হয়তো তিনি নতুনভাবে ফিরে আসবেন, হয়তো নিজস্ব সৃষ্টিতে আরও বেশি মন দেবেন। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত—অরিজিৎ সিংয়ের কণ্ঠ, তাঁর সুর এবং তাঁর গান চিরকাল মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।

জিয়াগঞ্জের সেই সাধারণ ছেলে আজ কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক, ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় গায়ক এবং কোটি মানুষের ভালোবাসার প্রতীক। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় প্রমাণ করে, স্বপ্ন যদি বড় হয় এবং পরিশ্রম যদি সত্যিকারের হয়, তবে সাফল্য একদিন আসবেই।

অরিজিৎ সিংয়ের আকস্মিক ঘোষণার পর হয়তো নতুন করে শুরু হয়েছে তাঁর জীবনের আরেক অধ্যায়। সেই অধ্যায় কীভাবে লেখা হবে, তা সময়ই বলবে। কিন্তু তাঁর গান, তাঁর সুর এবং তাঁর অবদান ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।

Preview image