শুভমান গিলের দুরন্ত দ্বিশতরান ও রোহিত শর্মার দাপুটে সেঞ্চুরিতে ৪০৬ রানের বিশাল লক্ষ্য অনায়াসে টপকে গেল ভারত। দুই ওপেনারের ব্যাটিং ঝড়ে এল দুর্দান্ত জয়।
শুভমান গিলের বিধ্বংসী দ্বিশতরান এবং রোহিত শর্মার দাপুটে শতরানের সৌজন্যে একদিনের ক্রিকেটে ইতিহাস গড়ল ভারত। ওয়েস্ট ইন্ডিজের দেওয়া ৪০৬ রানের বিশাল লক্ষ্যও যেন টিম ইন্ডিয়ার সামনে কোনও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারল না। গুয়াহাটির বর্ষাপাড়া স্টেডিয়ামে সিরিজের দ্বিতীয় একদিনের ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৮ উইকেটে হারিয়ে তিন ম্যাচের সিরিজ ২-০ ব্যবধানে নিজেদের করে নিল ভারত। ব্যাট হাতে গিল ও রোহিতের অসাধারণ পারফরম্যান্সের সামনে ক্যারিবিয়ান বোলাররা কার্যত অসহায় হয়ে পড়েন।
চারশোর বেশি রান তাড়া করে একদিনের ক্রিকেটে জয় পাওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা। ভারত এই ম্যাচে সেই বিরল তালিকায় নিজেদের নাম লিখিয়ে ফেলল। এর আগে ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার দেওয়া ৪৩৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করে ৪৩৮-৯ রান করে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৪০৫ রান টপকে সেই তালিকায় দ্বিতীয় দল হিসেবে জায়গা করে নিল ভারত।
ম্যাচের শুরুতে অবশ্য পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্যরকম ছিল। টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ শুরু থেকেই ভারতীয় বোলারদের উপর আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলতে থাকে। ক্যারিবিয়ান ব্যাটাররা একের পর এক বড় শট খেলতে থাকেন এবং ভারতীয় বোলিংয়ের অনভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে স্কোরবোর্ডে বিশাল রান তুলে দেন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ওপেনার জন ক্যাম্পবেল ছিলেন অন্যতম বড় আকর্ষণ। মাত্র ৬৮ বলে শতরান পূর্ণ করে ভারতীয় বোলিং আক্রমণকে কার্যত চাপে ফেলে দেন তিনি। তাঁর বিধ্বংসী ইনিংসে ছিল একাধিক বাউন্ডারি ও বড় শট। ক্যাম্পবেলের আক্রমণাত্মক ব্যাটিং ওয়েস্ট ইন্ডিজকে শুরুতেই বড় রানের ভিত গড়ে দেয়।
তিন নম্বরে নেমে অধিনায়ক শাই হোপও নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন। দীর্ঘ সময় ক্রিজে থেকে ভারতীয় বোলারদের বিরুদ্ধে রান সংগ্রহ করেন তিনি। ৯৪ বলে ১০৪ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন হোপ। তাঁর শতরান ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসকে আরও শক্তিশালী করে।
এরপর আমির জানগোও ভারতীয় বোলারদের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন। মাত্র ৭৭ বলে ১১৪ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলেন তিনি। ফলে নির্ধারিত ওভারের শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্কোর পৌঁছে যায় ৪০৫ রানে। একদিনের ক্রিকেটে নিজেদের প্রথম চারশো পেরোনো স্কোরও গড়ে ফেলে ক্যারিবিয়ান দল।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৪০৫ রান দেখে অনেকেই মনে করেছিলেন, ভারতীয় ব্যাটিংয়ের সামনে এবার কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। কিন্তু ভারতীয় ইনিংস শুরু হওয়ার পর সেই ধারণা দ্রুত বদলে যায়। দুই অভিজ্ঞ ওপেনার রোহিত শর্মা এবং শুভমান গিল শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেন।
প্রথম উইকেটে রোহিত ও গিল মিলে ২৫৫ রানের বিশাল জুটি গড়ে ভারতকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ এনে দেন। নতুন বলে ক্যারিবিয়ান বোলারদের কোনও সুযোগ না দিয়ে দু’জনেই একের পর এক বাউন্ডারি হাঁকাতে থাকেন।
রোহিত শর্মা নিজের অভিজ্ঞতার পরিচয় দেন। মাত্র ৭২ বলে শতরান পূর্ণ করেন তিনি। একদিনের ক্রিকেটে এটি তাঁর কেরিয়ারের ৩৫তম শতরান। ৩৯ বছর বয়সেও তাঁর ব্যাটিংয়ের ধার যে এতটুকু কমেনি, এই ইনিংস তারই প্রমাণ। রোহিতের ১০১ রানের ইনিংস সাজানো ছিল ১০টি চার এবং ৬টি ছক্কায়।
এই ইনিংসের মধ্যেই আরও একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক স্পর্শ করেন রোহিত। একদিনের ক্রিকেটে ১২ হাজার রানের গণ্ডি পেরিয়ে যান তিনি। এই ফরম্যাটে ১২ হাজার রান করা ক্রিকেটারদের তালিকায় সপ্তম ব্যাটার হিসেবে নিজের জায়গা করে নেন ভারতীয় তারকা।
তবে রোহিতকে ছাপিয়ে দিনের সবচেয়ে বড় নায়ক হয়ে ওঠেন শুভমান গিল। ভারতীয় অধিনায়কীয় ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি তাঁর ইনিংস ছিল রেকর্ডে ভরা। শুরু থেকেই অত্যন্ত আগ্রাসী মেজাজে ব্যাট করেন গিল। মাত্র ৬২ বলে শতরান পূর্ণ করেন তিনি।
এরপর আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে তাঁর ব্যাটিং। দ্বিশতরানে পৌঁছতে গিল মাত্র ১১৭ বল নেন। এর ফলে একদিনের ক্রিকেটে দ্রুততম দ্বিশতরানের নতুন নজির গড়েন তিনি। এর আগে ঈশান কিষানের ১২৬ বলে দ্বিশতরানের রেকর্ড ছিল। সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস তৈরি করেন গিল।
গিলের এই দ্বিশতরান তাঁর একদিনের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের দ্বিতীয় ডাবল সেঞ্চুরি। ১৩৩ বলের অপরাজিত ইনিংসে তিনি ২৬টি চার এবং ৮টি ছক্কা মারেন। তাঁর ব্যাটিংয়ের আগ্রাসন, শটের বৈচিত্র্য এবং বড় রান তাড়া করার মানসিকতা ম্যাচের পুরো চিত্রটাই বদলে দেয়।
রোহিত আউট হওয়ার পর বিরাট কোহলি ক্রিজে আসেন। তবে বেশি সময় টিকে থাকতে পারেননি তিনি। ২৯ রান করে ফিরে যান কোহলি। এরপর ঋতুরাজ গায়কোয়াড়কে সঙ্গে নিয়ে ভারতকে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে দেন গিল। ঋতুরাজ অপরাজিত থাকেন ৩১ রানে।
শেষ পর্যন্ত ৪৩.৩ ওভারে মাত্র ২ উইকেট হারিয়ে ৪০৬ রান তুলে ম্যাচ জিতে নেয় ভারত। অর্থাৎ হাতে তখনও ৩৯ বল বাকি। চারশোর বেশি রান তাড়া করতে নেমে এমন স্বচ্ছন্দ জয় নিঃসন্দেহে ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে থাকল।
ভারতের এই জয়ের পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান অবশ্যই শুভমান গিলের। তাঁর অপরাজিত ২২৩ রানের ইনিংস শুধু ম্যাচ জেতায়নি, একাধিক রেকর্ডও তৈরি করেছে। ম্যাচের সেরা ক্রিকেটারও নির্বাচিত হন গিল।
অন্যদিকে রোহিত শর্মার ১০১ রান ভারতীয় ইনিংসের ভিত মজবুত করে দেয়। দু’জনের ওপেনিং জুটি ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলাররা কোনও পর্যায়েই এই জুটি ভাঙার মতো ধারাবাহিক চাপ তৈরি করতে পারেননি।
তবে ভারতের ব্যাটিং যতই প্রশংসা কুড়োক, এই ম্যাচে ভারতীয় বোলিং নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল। ৪০৫ রান করার পরেও ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ জিততে পারেনি। এর অন্যতম কারণ ভারতীয় বোলিংয়ের দুর্বলতা এবং পরে ভারতীয় ব্যাটারদের অসাধারণ পারফরম্যান্স।
ভারতের হয়ে কুলদীপ যাদব দুটি উইকেট নেন। ২০০ একদিনের উইকেটের মাইলফলকও স্পর্শ করেন তিনি এবং দ্রুততম ভারতীয়দের তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেন। কিন্তু অন্য প্রান্ত থেকে কোনও বোলারই খুব বেশি ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেননি।
গুরনুর ব্রার ১০ ওভারে ৯৬ রান খরচ করেন। অভিষেককারী আকিব নবি ৮.৫ ওভারে দেন ৮৪ রান। প্রসিদ্ধ কৃষ্ণাও প্রতি ওভারে প্রায় ৯ রান করে দেন। রবীন্দ্র জাদেজার ১০ ওভারে খরচ হয় ৭৫ রান। ফলে ভারতীয় বোলিং ইউনিটের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে নতুন বলে ভারতীয় পেসারদের পারফরম্যান্স নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যশপ্রীত বুমরাহ এশিয়ান গেমসের কারণে জাপানে থাকায় ভারতীয় বোলিং আক্রমণে তাঁর অভাব স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছে। এই ম্যাচে কুলদীপ যাদব একমাত্র বোলার হিসেবে নিয়মিতভাবে উইকেট নেওয়ার হুমকি তৈরি করতে পেরেছেন।
রবীন্দ্র জাদেজার কাছ থেকেও আরও কার্যকর বোলিংয়ের প্রত্যাশা ছিল। মাঝের ওভারে উইকেট তুলে নিয়ে প্রতিপক্ষের রান করার গতি কমানোর ক্ষেত্রে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। কিন্তু এই ম্যাচে ৭৫ রান খরচ করে তিনি সেই প্রভাব তৈরি করতে পারেননি।
অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিং অবশ্য যথেষ্ট প্রশংসা পাওয়ার মতো। ক্যাম্পবেল, হোপ এবং জানগো—তিন ব্যাটারই শতরান করেন। তিনজনের শতরানের সৌজন্যে দল ৪০৫ রানে পৌঁছয়। আন্তর্জাতিক একদিনের ক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য এটি একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।
কিন্তু বিশাল স্কোর করেও ম্যাচ জিততে না পারায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য হতাশার কারণ রয়েছে। বিশেষ করে ৪০৫ রান করার পরেও ভারত মাত্র দুই উইকেট হারিয়ে সেই রান পেরিয়ে যাওয়ায় ক্যারিবিয়ান বোলিং নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এই জয়ের ফলে তিন ম্যাচের সিরিজও ভারতের দখলে চলে গেল। প্রথম ম্যাচে জয় পাওয়ার পর দ্বিতীয় ম্যাচেও দুর্দান্ত সাফল্য পেয়ে ভারত সিরিজে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল। ফলে তৃতীয় ম্যাচটি এখন নিয়মরক্ষার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিরিজের তৃতীয় একদিনের ম্যাচ শনিবার নিউ চণ্ডীগড়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেখানে ভারতের সামনে সুযোগ থাকবে সিরিজ ৩-০ ব্যবধানে শেষ করার। অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের লক্ষ্য থাকবে শেষ ম্যাচে জয় তুলে নিয়ে সম্মানজনকভাবে সিরিজ শেষ করা।
তবে দ্বিতীয় ম্যাচের পর ভারতীয় দলের সামনে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি উঠে এসেছে। একদিকে ব্যাটিং বিভাগে গিল ও রোহিতের অসাধারণ পারফরম্যান্স দলকে বিপুল রান তাড়া করে জয় এনে দিয়েছে। অন্যদিকে বোলিং বিভাগে ৪০৫ রান খরচ করার বিষয়টি টিম ম্যানেজমেন্টকে ভাবাবে।
বিশেষ করে বড় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে চারশো রান দিয়ে দিলে শুধু ব্যাটিংয়ের উপর নির্ভর করে ম্যাচ জেতা সবসময় সম্ভব হবে না। ফলে পরবর্তী ম্যাচগুলিতে ভারতীয় বোলারদের কাছ থেকে আরও ধারাবাহিক পারফরম্যান্স প্রত্যাশিত থাকবে।
তবে গুয়াহাটির এই ম্যাচটি মূলত মনে থাকবে শুভমান গিলের দুর্দান্ত দ্বিশতরান এবং রোহিত শর্মার শতরানের জন্য। ৪০৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ৪৩.৩ ওভারে জয়—এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় ভারতীয় ওপেনাররা কতটা আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন।
ম্যাচের সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ওয়েস্ট ইন্ডিজ — ৪০৫/৭
আমির জানগো — ১১৪
শাই হোপ — ১০৪
জন ক্যাম্পবেল — ১০১
কুলদীপ যাদব — ২/৬৫
ভারত — ৪০৬/২ (৪৩.৩ ওভার)
শুভমান গিল — অপরাজিত ২২৩
রোহিত শর্মা — ১০১
ঋতুরাজ গায়কোয়াড় — অপরাজিত ৩১
ফলাফল: ভারত ৮ উইকেটে জয়ী
সিরিজ: ভারত ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে
ম্যাচের সেরা: শুভমান গিল
সব মিলিয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৪০৫ রানের পাহাড়সমান লক্ষ্যও ভারতের ব্যাটিং শক্তির সামনে টিকল না। রোহিতের অভিজ্ঞতা এবং গিলের আগ্রাসী ব্যাটিং মিলে ভারতকে এনে দিল অবিশ্বাস্য জয়। বিশেষ করে ২২৩ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে শুভমান গিল এই ম্যাচের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকলেন। তাঁর দ্রুততম দ্বিশতরান, রোহিতের ৩৫তম ওডিআই সেঞ্চুরি এবং চারশোর বেশি রান তাড়া করে ভারতের জয়—সব মিলিয়ে গুয়াহাটির রাতটি ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে রইল।