Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

‘শ্রেয়সকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দুর্ভাগ্যজনক,’ দু’বছর পর ভুলস্বীকার কেকেআরের তখনকার কোচ পণ্ডিতের

চন্দ্রকান্ত পণ্ডিত মনে করেন শ্রেয়স আয়ার, ফিল সল্টদের ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেকেআরের পক্ষে যায়নি। কোচ হিসাবে তাঁর খারাপই লেগেছিল কেকেআর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত।শ্রেয়স আয়ারের নেতৃত্বে ২০২৪ সালে আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল কলকাতা নাইট রাইডার্স। তার পরও শ্রেয়সকে দলে রাখেননি কেকেআর কর্তৃপক্ষ। ট্রফি দেওয়া অধিনায়ককে ছেড়ে দেওয়া যে বড় ভুল হয়েছিল, তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন বেঙ্কি মাইসোরেরা। শ্রেয়সকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত যাঁরা নিয়েছিলেন, তাঁদের অন্যতম দলের প্রাক্তন কোচ চন্দ্রকান্ত পণ্ডিত।

‘রেভস্পোর্টজ়’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভুল স্বীকার করে নিয়েছেন পণ্ডিত। ক্রিকেটপ্রেমীদের বিস্মিত করা সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘‘ওকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটা দুর্ভাগ্যজনক। শ্রেয়স দুর্দান্ত ক্রিকেটার। অধিনায়ক হয়ে কেকেআরকে ট্রফি দিয়েছে। ও যেভাবে দল পরিচালনা করত, সেটাও প্রশংসনীয়। কিন্তু কখনও কখনও কিছু পরিস্থিতি এবং বৃহত্তর কৌশল এই রকম খেলোয়াড়দের ছেড়ে দিতে বাধ্য করে। কেকেআরের কোচ হিসাবে নিশ্চিত ভাবে এই সিদ্ধান্তটা আমার খারাপই লেগেছিল। এটা বলতে পারি, ওকে ইচ্ছাকৃত বাদ দেওয়া হয়নি। দু’পক্ষের মধ্যে সবকিছু ঠিকঠাক ছিল না। শুধু শ্রেয়স নয়, ফিল সল্ট এবং অন্যদের ক্ষেত্রেও আমার একই মতামত। ওই সিদ্ধান্তগুলো আমাদের পক্ষে আসেনি।’’ কেকেআর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল? পণ্ডিত বলেছেন, ‘‘সকলের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। শাহরুখ খান, জুহি চাওলা, জয় মেহতা বা বেঙ্কি মাইসোর, সকলের কাছ থেকে খুব সহযোগিতা পেয়েছি।’’

পণ্ডিত মনে করেন, ভারতীয় দলে শ্রেয়সের পাকা জায়গা পাওয়া উচিত। এ নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘‘ভারতীয় দলের জায়গা পাওয়ার প্রতিযোগিতা এখন খুব তীব্র। সে জন্যই শ্রেয়সের জায়গা এখনও পাকা হয়নি। ভারতের হয়ে শ্রেয়সের পারফরম্যান্স বেশ ভাল। দুর্ভাগ্যবশত ওকে বাদ পড়তে হয়েছে। তবে এ রকম পরিস্থিতি অস্বাভাবিক নয়। দল নির্বাচনের সময় তারুণ্য এবং অভিজ্ঞতার ভারসাম্য রাখার কথা ভাবা হয়। এটা একটা চ্যালেঞ্জ। আমাদের দারুণ সব প্রতিভা রয়েছে। দলে সকলকে জায়গা দেওয়া কঠিন হয়।’’ পণ্ডিত আরও বলেছেন, ‘‘ভারতীয় দলে জায়গা পাওয়ার প্রতিযোগিতা খুব তীব্র। সমান যোগ্যতাসম্পন্ন একাধিক খেলোয়াড় রয়েছে। তবে একটা কথা বলব, শ্রেয়স পঞ্জাব কিংসকেও দুর্দান্ত নেতৃত্ব দিচ্ছে। ওর ব্যাটিংয়েও পরিণতির ছাপ স্পষ্ট। অত্যন্ত নির্ভিক ক্রিকেটার। ম্যাচ জেতার দিকেই নজর থাকে ওর। পরিস্থিতি নিয়ে খুব একটা ভাবে না।’’পণ্ডিত মনে করেন, শ্রেয়সের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দলে থাকা উচিত ছিল। এ নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘‘শ্রেয়সের বিশ্বকাপে সুযোগ না পাওয়াটা হতাশাজনক। ও যদি আর একটা সুযোগ পায়, তা হলে খুশিই হব। দল নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নির্বাচকদের। সব সময় সমালোচনার পক্ষে নই আমি। অতীতেও এমন হয়েছে। উদাহরণ হিসাবে পদ্মাকর শিভালকরের কথা বলতে পারি। ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পরও জাতীয় দলে সুযোগ হয়নি বিষাণ সিংহ বেদী থাকায়। এগুলো খেলার অংশ। মনে হয়, শ্রেয়স এগুলো বোঝে। এখন যে ভাবে ক্রিকেট খেলছে তাতে মনে হচ্ছে, বাদ পড়া নিয়ে আর ভাবছে না। দলে ফেরাই ওর লক্ষ্য। দলে ফিরতে কতটা আন্তরিক, তার ছাপ দেখা যাচ্ছে ওর পারফরম্যান্সে।’’

পণ্ডিতের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে Shreyas Iyer-এর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দলে না থাকা নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা আসলে ভারতীয় ক্রিকেটের বৃহত্তর বাস্তবতারই প্রতিফলন। একজন প্রতিভাবান ব্যাটসম্যান, যিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেকে একাধিকবার প্রমাণ করেছেন, তিনি যখন বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে সুযোগ পান না, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—দল নির্বাচন কি শুধুই পারফরম্যান্সের উপর নির্ভর করে, নাকি আরও নানা অদৃশ্য সমীকরণ কাজ করে?

পণ্ডিতের বক্তব্যে প্রথমেই যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হল হতাশা। তিনি সরাসরি বলেছেন যে শ্রেয়সের সুযোগ না পাওয়া হতাশাজনক। এই মন্তব্য শুধুমাত্র একজন ক্রিকেট বিশ্লেষকের ব্যক্তিগত মত নয়, বরং বহু ক্রিকেটপ্রেমীর অনুভূতির প্রতিফলন। কারণ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রেয়স আইয়ারের ব্যাটিং ধারাবাহিকতা, বিশেষ করে মিডল অর্ডারে তার স্থিরতা, ভারতীয় দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানদের ভূমিকা অনেক সময় আন্ডাররেটেড হয়ে যায়। ওপেনাররা দ্রুত রান করলে যেমন প্রশংসা পান, তেমনই ফিনিশারদেরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু মাঝের ওভারগুলোতে ইনিংস গড়ে তোলার কাজটা যে কতটা কঠিন, তা বোঝেন কেবল প্রকৃত ক্রিকেট অনুরাগীরা। এই জায়গাতেই শ্রেয়স আইয়ার নিজেকে আলাদা করে তুলেছিলেন। স্পিন বোলিংয়ের বিরুদ্ধে তার দক্ষতা, ইনিংস গড়ার ক্ষমতা এবং চাপের মধ্যে খেলার মানসিকতা তাকে বিশেষ করে তোলে।

তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—তাহলে কেন তিনি দলে জায়গা পেলেন না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের দল নির্বাচনের জটিল প্রক্রিয়ার দিকে তাকাতে হবে। ভারতীয় দলের মতো একটি শক্তিশালী স্কোয়াডে জায়গা পাওয়া সহজ নয়। এখানে প্রতিটি পজিশনের জন্য একাধিক খেলোয়াড় প্রতিযোগিতা করেন। কখনও ফর্ম, কখনও ফিটনেস, কখনও আবার টিম কম্বিনেশন—এই সবকিছু মিলিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পণ্ডিত নিজেও এই বাস্তবতাকে স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, “দল নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নির্বাচকদের।” এই কথার মধ্যে এক ধরনের নিরপেক্ষতা রয়েছে। তিনি সমালোচনা করতে চান না, কারণ তিনি জানেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা কঠিন। বাইরে থেকে দেখলে অনেক কিছু সহজ মনে হলেও, ভিতরের পরিস্থিতি অনেক জটিল।

এখানেই তিনি একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনে আনেন—Padmakar Shivalkar। ঘরোয়া ক্রিকেটে অসাধারণ পারফরম্যান্স করার পরও তিনি জাতীয় দলে সুযোগ পাননি, কারণ সেই সময় দলে ছিলেন কিংবদন্তি স্পিনার Bishan Singh Bedi। এই উদাহরণটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে ক্রিকেটে প্রতিভা থাকলেই সুযোগ মিলবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। কখনও কখনও একজন দুর্দান্ত খেলোয়াড়ও শুধুমাত্র সময় ও পরিস্থিতির কারণে পিছিয়ে পড়েন।

এই প্রসঙ্গে শ্রেয়স আইয়ারের অবস্থানও অনেকটা একই রকম। তিনি খারাপ খেলছেন না, বরং ভালো খেলেই যাচ্ছেন। কিন্তু দলের প্রয়োজন, কৌশল, এবং অন্য খেলোয়াড়দের উপস্থিতি—এই সবকিছু মিলিয়ে হয়তো তাকে বাইরে রাখা হয়েছে। এটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং পরিস্থিতিগত সিদ্ধান্ত।

news image
আরও খবর

পণ্ডিতের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল শ্রেয়সের মানসিকতা নিয়ে তার মন্তব্য। তিনি বলেছেন, এখন যেভাবে শ্রেয়স ক্রিকেট খেলছেন, তাতে মনে হচ্ছে তিনি বাদ পড়া নিয়ে আর ভাবছেন না। এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একজন খেলোয়াড়ের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল মানসিক দৃঢ়তা বজায় রাখা।

একজন ক্রিকেটার যখন দলে সুযোগ পান না, তখন তার সামনে দুটি পথ থাকে—হতাশ হয়ে পড়া, অথবা আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসা। শ্রেয়স আইয়ার যে দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছেন, তা তার পারফরম্যান্সেই স্পষ্ট। তিনি রান করছেন, ম্যাচ জিতিয়ে দিচ্ছেন, এবং নিজের দক্ষতাকে আরও শানিত করছেন।

এই মানসিকতা একজন চ্যাম্পিয়নের লক্ষণ। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, যারা বড় খেলোয়াড় হয়েছেন, তারা কখনও ব্যর্থতা বা বাদ পড়াকে শেষ বলে মনে করেননি। বরং সেটাকেই প্রেরণা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। শ্রেয়স আইয়ারের ক্ষেত্রেও একই বিষয়টি দেখা যাচ্ছে।

এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য—ভারতীয় ক্রিকেটে প্রতিযোগিতার মাত্রা। বর্তমান সময়ে ভারতের বেঞ্চ স্ট্রেংথ এতটাই শক্তিশালী যে, যে কোনও পজিশনে একাধিক বিশ্বমানের খেলোয়াড় রয়েছেন। ফলে একজন খেলোয়াড়ের জায়গা পাওয়া যেমন কঠিন, তেমনই জায়গা ধরে রাখাও কঠিন। এই প্রতিযোগিতাই ভারতীয় ক্রিকেটকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।

তবে এই প্রতিযোগিতার মধ্যে কিছু প্রতিভা হয়তো সাময়িকভাবে আড়ালে থেকে যায়। শ্রেয়স আইয়ার সেই তালিকায় পড়তে পারেন। কিন্তু তার পারফরম্যান্স এবং মানসিকতা যদি একইভাবে বজায় থাকে, তাহলে দলে তার ফিরে আসা সময়ের অপেক্ষা মাত্র।

পণ্ডিতের বক্তব্যে যে সংযম এবং ভারসাম্য দেখা যায়, তা প্রশংসনীয়। তিনি একদিকে যেমন হতাশা প্রকাশ করেছেন, অন্যদিকে নির্বাচকদের সিদ্ধান্তকেও সম্মান জানিয়েছেন। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমান সময়ে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, যখন সামান্য বিষয় নিয়েও অতিরিক্ত সমালোচনা দেখা যায়।

শেষ পর্যন্ত, এই পুরো বিষয়টি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—ক্রিকেট শুধুমাত্র প্রতিভার খেলা নয়, এটি সময়, সুযোগ, এবং মানসিক শক্তিরও খেলা। শ্রেয়স আইয়ারের মতো একজন খেলোয়াড় যদি এই সমস্ত চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে নিজের পারফরম্যান্স বজায় রাখতে পারেন, তাহলে তার সাফল্য অনিবার্য।

ভবিষ্যতে তিনি আবারও জাতীয় দলে ফিরবেন কি না, তা সময়ই বলবে। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত—তার বর্তমান পারফরম্যান্স এবং মনোভাব তাকে সেই পথেই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এবং হয়তো খুব শিগগিরই আমরা তাকে আবারও বড় মঞ্চে দেখতে পাব, যেখানে তিনি নিজের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারবেন।

এই কারণেই পণ্ডিতের মন্তব্য শুধুমাত্র একটি মতামত নয়, বরং একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন—যেখানে সাফল্য এবং ব্যর্থতা, সুযোগ এবং বঞ্চনা—সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় একজন ক্রিকেটারের যাত্রা।

Preview image