ভ্রূণের হৃদ্‌যন্ত্রে ছিদ্র বা ব্লকেজসহ জন্মগত সমস্যাগুলি আগেভাগে শনাক্ত করতে গবেষকেরা তৈরি করেছেন নতুন ত্রিমাত্রিক এমআরআই মডেল। এই প্রযুক্তি গর্ভাবস্থায়ই শিশুর হার্ট ও অন্যান্য অঙ্গের সূক্ষ্ম অস্বাভাবিকতা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা-পরিকল্পনায় সহায়তা করবে
মানবশিশুর জন্মের আগে তার শরীরে কোনও অস্বাভাবিকতা রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নে বহু যুগ ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞান ব্যাকুল হয়ে পথ খুঁজেছে। আধুনিক বিজ্ঞান যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে—গর্ভের অন্ধকারেই ভবিষ্যতের শারীরিক সুস্থতার অনেক রহস্য লুকিয়ে থাকে। শিশুর হৃদ্যন্ত্র, মস্তিষ্ক, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গঠন, রক্তপ্রবাহ, এমনকি জিনগত ত্রুটির সূক্ষ্ম ইঙ্গিতও ধরা পড়ে গর্ভাবস্থাতেই—যদি থাকে সঠিক প্রযুক্তি। সেই প্রয়োজন থেকেই বিজ্ঞানীরা বারবার নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। এক সময়ে আল্ট্রাসাউন্ডই ছিল ভরসা, পরে এল ফিটাল ইকো কার্ডিওগ্রাফি। এবারে সেই পথ আরও বিস্তৃত করতে গবেষকেরা নিয়ে এলেন আরও উন্নত, আরও নির্ভুল, আরও ‘লাইফ-সেভিং’ এক অস্ত্র—ত্রিমাত্রিক এমআরআই মডেল।
আমেরিকার প্রসিদ্ধ ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (এমআইটি)-র গবেষকেরা তৈরি করেছেন এই নতুন ম্যাগনেটিক রেজ়োন্যান্স ইমেজ়িং পদ্ধতি। তারা দাবি করছেন—এবার শিশুর হৃদয়, মস্তিষ্ক, এমনকি শরীরের সূক্ষ্ম অঙ্গের গঠনও দেখা যাবে অত্যন্ত স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মতভাবে, এমনভাবে যেন চিকিৎসকেরা ত্রুটির ভেতরে হাত বাড়িয়ে দেখতে পাচ্ছেন। যা জন্মের আগেই রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা-পরিকল্পনা ও জীবনরক্ষার সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
শিশুর জন্মগত হৃদ্রোগ—বিশেষ করে ‘ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট’ বা ভিএসডি—দুনিয়া জুড়ে একটি সাধারণ কিন্তু গুরুতর সমস্যা। নবজাতকের হার্টে যদি ছিদ্র থাকে, তা শরীরের রক্তসঞ্চালনকে বিঘ্নিত করে। ফলে শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন, ফুসফুসে বারবার সংক্রমণ—এসব ঝুঁকি দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচার না করলে শিশুর জীবন হুমকির মুখে পড়ে। কিন্তু সমস্যা হল—গর্ভে থাকা ভ্রূণের হৃদ্যন্ত্র এত ছোট, এত দ্রুত নড়াচড়া করে যে প্রচলিত পদ্ধতিতে সবসময় ত্রুটি শনাক্ত করা সহজ হয় না।
এমআইটির এই নতুন মডেল—‘ফিটাল এসএমপিএল’—এই সীমাবদ্ধতাই ভেঙে দিয়েছে। ত্রিমাত্রিক (3D) ইমেজে ভ্রূণের হৃদ্যন্ত্রের প্রতিটি অংশ, প্রতিটি প্রকোষ্ঠ, এমনকি রক্তপ্রবাহের দিকও চিকিৎসকেরা স্পষ্টভাবে দেখতে পারবেন। যেন গর্ভের ভেতরে তৈরি হওয়া হৃদপিণ্ডটি হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন।
অভিনেত্রী বিপাশা বসুর কন্যা দেবীর জন্মের পরে যখন জানা যায় তার হার্টে ছিদ্র রয়েছে, তখন আলোচনায় আসে ‘ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট’ শব্দটি। নবীন বাবা-মায়ের কাছে এ এক দুঃস্বপ্ন। চিকিৎসকেরা বলেছিলেন—অস্ত্রোপচারের আগে শিশুটিকে কিছুটা বড় হতে দিতে হবে। তিন মাস পরে হয় সেই জটিল ওপেন হার্ট সার্জারি। দেবী সুস্থ হয়েছে, ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি দিনের অপেক্ষা ছিল যন্ত্রণার।
এই অভিজ্ঞতা শুধু দেবীর নয়—বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার শিশুই জন্মায় একই সমস্যা নিয়ে। আরও ভয়ঙ্কর হল, এই ছিদ্র বা ব্লকেজ গর্ভাবস্থায় শনাক্ত হয় না, ফলে জন্মের পরে হঠাৎ সমস্যার সূত্রপাত হয়। কেবল অভিভাবকরাই নয়, চিকিৎসকেরাও তখন অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ান।
এই কারণেই ফিটাল এসএমপিএল প্রযুক্তিকে অভূতপূর্ব বলে মনে করছেন গবেষকেরা। আগেই যদি ত্রুটি ধরা পড়ে, তবে জন্মের আগেই চিকিৎসা-পরিকল্পনা করা সম্ভব। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে গর্ভেই অস্ত্রোপচারও করা যায়।
এমআইটির ‘কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স ল্যাব’ (CSAIL) এই প্রযুক্তি তৈরি করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা মেশিন লার্নিংয়ের সহায়তায়। তাদের অ্যালগরিদ্ম অসংখ্য ভ্রূণের এমআরআই ডেটা ব্যবহার করে প্রশিক্ষিত হয়েছে, ফলে একবার ছবি স্ক্যান করলে তা ত্রিমাত্রিকে রূপান্তরিত হয়ে যায়।
এখানে ব্যবহৃত হয়েছে একটি বিশেষ ডিপ লার্নিং আর্কিটেকচার, যা ভ্রূণের অনবরত নড়াচড়ার মধ্যেও অঙ্গের বাস্তব আকার ধরতে পারে। প্রচলিত এমআরআই যেখানে নড়াচড়া বড় সমস্যা, সেখানে এসএমপিএল প্রতিটি মুহূর্তের ফ্রেম ধরে মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে তৈরি করে নিখুঁত 3D মডেল।
ফিটাল ইকো কার্ডিওগ্রাফি এখন পর্যন্ত ভ্রূণের হৃদ্যন্ত্র পরীক্ষা করার প্রচলিত পদ্ধতি। কিন্তু এতে কয়েকটি সীমাবদ্ধতা আছে—
হৃদ্যন্ত্রের খুব সূক্ষ্ম ছিদ্র সবসময় ধরা পড়ে না
ভ্রূণের অবস্থান অসুবিধাজনক হলে অনেক সময় স্পষ্ট দেখা যায় না
প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের অভাব অনেক দেশে বড় সমস্যা
ইকোতে ত্রিমাত্রিক ছবি পাওয়া যায় না—শুধু ইউনিটারাল ভিউ
নতুন ফিটাল এসএমপিএল প্রযুক্তি এসব সীমাবদ্ধতাকে পাশ কাটিয়ে—
✔ হৃদ্যন্ত্রের সম্পূর্ণ 3D ভিউ দেয়
✔ একটি অ্যাঙ্গেল নয়, সব দিক থেকে গঠন দেখা যায়
✔ আগাম সার্জিকাল পরিকল্পনা করা সহজ হয়
✔ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সূক্ষ্ম অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে
অর্থাৎ এটি কেবল পরীক্ষা নয়—এটি ভবিষ্যতের পথনির্দেশিকা।
চিকিৎসা-বিজ্ঞান বলছে—প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিশু জন্মায় জন্মগত হৃদরোগ নিয়ে। অনেক ক্ষেত্রেই জন্ম নেওয়ার কিছুক্ষণ পরে শ্বাসকষ্ট থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ঝুঁকি তৈরি হয়। ত্রুটি যদি অস্ত্রোপচারযোগ্য হয়, তবে সঠিক সময় চিকিৎসা দিলে জীবন বাঁচানো যায়।
এই নতুন প্রযুক্তি যেভাবে চিকিৎসা-পদ্ধতিতে বিপ্লব আনবে—
গর্ভাবস্থায় রোগ শনাক্ত – গর্ভে থাকতেই জানা যাবে ত্রুটি কোথায়
শিশুর জন্মের আগেই চিকিৎসা-পরিকল্পনা – কোন সার্জারি লাগবে, কী প্রস্তুতি প্রয়োজন
উন্নত নিওনেটাল কেয়ার – জন্মের মুহূর্তেই শিশুকে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেওয়া সম্ভব
জটিল কেসে গর্ভেই অস্ত্রোপচার – অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমাতে গর্ভেই সার্জারি করা যায়
শিশুর মৃত্যুহার কমে যাবে
এছাড়া জটিল হৃদরোগ বা মস্তিষ্কের গঠনের ত্রুটি থাকলে অভিভাবকদের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
ফিটাল এসএমপিএলের গবেষণায় সহযোগিতা করেছে—
বস্টন চিলড্রেন’স হসপিটাল
হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল
গবেষকেরা জানিয়েছেন, পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে জোরকদমে। বিভিন্ন হাসপাতালের ভ্রূণের এমআরআই ডেটার সঙ্গে মডেলের নির্ভুলতা মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক ফলাফল দেখাচ্ছে—
3D মডেল বাস্তব অঙ্গের গঠন প্রায় ৯৮% নির্ভুলভাবে দেখাতে সক্ষম
হৃদ্যন্ত্রের ছিদ্র শনাক্তে নির্ভুলতা ৯০%–৯৫%
ভ্রূণের অবস্থান নড়াচড়া কোনও সমস্যা সৃষ্টি করছে না
এটি মূলধারার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হলে ভ্রূণ চিকিৎসায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।
এআই-চালিত 3D মডেল কেবল হৃদ্যন্ত্রের ত্রুটি নয়, আরও অনেক ব্যাধির আগাম সতর্কতা দিতে পারবে—
মস্তিষ্কের গঠনে অস্বাভাবিকতা
স্পাইনা বিফিডা
জন্মগত কিডনি বা লিভারের সমস্যা
হাড়ের গঠনে ত্রুটি
জটিল ক্রোমোজোমাল ডিসঅর্ডারের ইঙ্গিত
ভবিষ্যতে এআই-মডেল হয়তো এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে যে, শুধু ছবি নয়—গর্ভের শিশুর ভবিষ্যৎ ঝুঁকিও পূর্বাভাস দিতে পারবে। এটাই ‘প্রেডিক্টিভ মেডিসিন’-এর নতুন অধ্যায়।
এই নতুন প্রযুক্তি চিকিৎসকদের হাত আরও শক্তিশালী করে দিয়েছে। শিশুর জন্মের পর নয়—জন্মের আগেই চিকিৎসা শুরু করার যুগ এবার সত্যিই শুরু হচ্ছে। অভিভাবকদের বুকের গভীরের আতঙ্ক অনেকটাই কমবে। শিশুর প্রতি দিনের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করা যাবে ত্রিমাত্রিকভাবে।
যেখানে হৃদ্যন্ত্রের মতো সূক্ষ্ম অঙ্গের সমস্যাই দুনিয়াজুড়ে মৃত্যুর বড় কারণ, সেখানে ফিটাল এসএমপিএল হতে চলেছে ভবিষ্যতের প্রধান রক্ষাকবচ।
যেখানে হৃদ্যন্ত্রের মতো সূক্ষ্ম অঙ্গের সমস্যাই দুনিয়াজুড়ে মৃত্যুর বড় কারণ, সেখানে ফিটাল এসএমপিএল হতে চলেছে ভবিষ্যতের প্রধান রক্ষাকবচ। কারণ প্রযুক্তির মূল শক্তিই হল—সমস্যাকে আগেভাগে ধরা, তার জটিলতা বোঝা এবং সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা। জন্মগত হৃদ্রোগের ক্ষেত্রে প্রতিটি সেকেন্ড মূল্যবান। জন্মের পরে যখন শিশুকে কৃত্রিমভাবে শ্বাস দিতে হয়, রক্তসঞ্চালন বজায় রাখতে অ্যাডভান্সড লাইফ সাপোর্ট লাগে, তখন চিকিৎসকেরা সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। কিন্তু যদি জন্মের আগেই সমস্ত তথ্য চিকিৎসকদের হাতে থাকে—শিশুর কোন প্রকোষ্ঠে ছিদ্র, কত বড়, রক্তপ্রবাহ কোন পথে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে—তাহলে চিকিৎসা পরিকল্পনা হয় আরও শক্তিশালী, আরও কার্যকর।
নতুন এই 3D এমআরআই মডেল চিকিৎসা ব্যবস্থায় ঠিক এই জায়গাতেই বিপ্লব আনতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফিটাল এসএমপিএল ভ্রূণের হৃদ্যন্ত্রকে শুধু দেখার সুযোগই দিচ্ছে না, বরং তা বিশ্লেষণ করার নতুন পথও দেখাচ্ছে। ত্রিমাত্রিক ডেটা ব্যবহার করে ভবিষ্যতে সার্জনরা ভার্চুয়াল অপারেশন সিমুলেশন করতে পারবেন—অপারেশনের প্রতিটি ধাপ আগে থেকে কল্পনা করে নেওয়া যাবে। এর ফলে অস্ত্রোপচারের সফলতার হার বাড়বে এবং ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে।
এ ছাড়া গর্ভের শিশুর অঙ্গের গঠন নিয়ে যাঁদের উদ্বেগ থাকে, তাঁদের জন্যও এই প্রযুক্তি আশীর্বাদ হতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, আল্ট্রাসাউন্ড কিছু সন্দেহজনক চিহ্ন দেখালেও তা যথেষ্ট স্পষ্ট হয় না। অভিভাবকেরা উত্কণ্ঠায় দিন কাটান—শিশুর মস্তিষ্ক ঠিকমতো তৈরি হচ্ছে কি না, মেরুদণ্ডে কোনও ত্রুটি আছে কি না, কিডনি বা ফুসফুস কতটা গঠিত হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর থাকে না। ফিটাল এসএমপিএল এই অনিশ্চয়তার জট খুলে দিতে পারে। স্বচ্ছ, নিখুঁত, ত্রিমাত্রিক চিত্র চিকিৎসকদের সন্দেহ দূর করবে, এবং অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় দুশ্চিন্তাও কমাবে।
সব মিলিয়ে, ফিটাল এসএমপিএল শুধু একটি প্রযুক্তি নয়—এটি ভবিষ্যতের জন্মপূর্ব চিকিৎসার ভিত্তি তৈরি করছে। গর্ভাবস্থায় ফিটাল কেয়ারকে সম্পূর্ণ নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পথে এটি এক মাইলস্টোন। আগামী কয়েক বছরে প্রযুক্তিটি আরও উন্নত হলে সম্ভবত প্রত্যেক গর্ভবতী নারীর জন্যই এটি হয়ে উঠবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্য-পরীক্ষা।