Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

হালিশহরে পুলিশি গাফিলতি স্পষ্ট! আইও সাসপেন্ড, মৃত তৃণমূলকর্মীর স্ত্রীকে চাকরি ও ১০ লক্ষ সাহায্য

মৃত তৃণমূলকর্মীর স্ত্রীর চাকরির ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর। পাশাপাশি দুই শিশুর ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে পরিবারের হাতে ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য তুলে দেন শুভেন্দু অধিকারী।

হালিশহরে পুলিশি হেফাজতে তৃণমূলকর্মীর মৃত্যু: IO সাসপেন্ড, IC ‘ক্লোজ়’, পরিবারকে ১০ লক্ষ ও চাকরির ঘোষণা শুভেন্দুর

হালিশহরে পুলিশি হেফাজতে এক তৃণমূলকর্মীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি এবং প্রশাসনিক মহল। ঘটনার পর মৃত তৃণমূলকর্মী বিরজু কেওটের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে তাঁর বাড়িতে গেলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ঘটনাটিকে রাজ্য সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিকদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তের কথাও ঘোষণা করেন তিনি।

ঘটনায় তদন্তকারী পুলিশ আধিকারিক বা IO-কে সাসপেন্ড করা হয়েছে। পাশাপাশি হালিশহর থানার দায়িত্বে থাকা আইসি-কে ‘ক্লোজ়’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের পরিভাষায় কোনও আধিকারিককে ‘ক্লোজ়’ করা হলে তাঁকে সংশ্লিষ্ট থানার সক্রিয় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পুলিশ লাইনে বা কম্পালসরি ওয়েটিংয়ে পাঠানো হয়। পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর তদন্ত চলাকালীন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের দায়িত্বে রেখে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে যাতে প্রশ্ন না ওঠে, সেই প্রেক্ষাপটেই এই পদক্ষেপ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, হালিশহরের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও সরকার প্রশ্ন তুলেছে। মৃতের পরিবারের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে শোনা হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে একই সঙ্গে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণের জন্য প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। সেই কারণে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত দায় নির্ধারণ করা হবে।

হালিশহরের এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পুলিশি হেফাজতে কোনও ব্যক্তির মৃত্যু হলে প্রশাসনের দায়িত্ব, পুলিশি জবাবদিহি, মানবাধিকার এবং তদন্তের স্বচ্ছতা—সবকিছু নিয়েই স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন ওঠে। ফলে প্রথম থেকেই বিষয়টির দিকে নজর ছিল রাজনৈতিক দলগুলির পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও।

কে ছিলেন বিরজু কেওট?

প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির নাম বিরজু কেওট। তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর স্ত্রী জেনি শর্মা কেওট কাঞ্চরাপাড়া পুরসভার প্রাক্তন কাউন্সিলর বলে সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিরজুকে চাঁদাবাজি-সহ কয়েকটি অভিযোগের মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছিল। আদালতে পেশ করার পর তাঁকে পাঁচ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁর মৃত্যুর খবর সামনে আসে।

মৃতের স্ত্রীর অভিযোগ, পুলিশ লকআপে বিরজুর উপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা বিচারাধীন তদন্তের বিষয় এবং ময়নাতদন্ত ও সরকারি তদন্তের রিপোর্টের আগে মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

এই কারণেই মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার যে অভিযোগ তুলেছে, তা সত্য কি না, পুলিশি হেফাজতে থাকার সময় ঠিক কী ঘটেছিল, কোনও নিয়ম লঙ্ঘন হয়েছিল কি না এবং কোনও নির্দিষ্ট পুলিশকর্মীর দায় রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত থেকেই পাওয়ার কথা।

মৃতের বাড়িতে শুভেন্দু অধিকারী

সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬, মৃত তৃণমূলকর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে হালিশহরে যান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রশাসন ও পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা। সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজেপি বিধায়ক অর্জুন সিংহ এবং স্থানীয় নেতারাও ওই সফরে উপস্থিত ছিলেন।

মৃতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলার পর শুভেন্দু জানান, ওই পরিবার প্রশাসনের কাছে বিচার চেয়েছে এবং তাঁদের বিভিন্ন অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে পরিবারের পাশে থাকার বার্তাও দেন তিনি।

ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—মৃত ব্যক্তি রাজ্যের বর্তমান শাসকদলের বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী হিসেবে পরিচিত হলেও রাজ্য সরকার তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যেও এই রাজনৈতিক পার্থক্যের প্রসঙ্গ উঠে আসে। তবে হেফাজতে মৃত্যুর মতো গুরুতর ঘটনায় রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে প্রশাসনিক জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারই প্রধান হওয়া উচিত—এই বার্তাই সরকারের পদক্ষেপের মাধ্যমে সামনে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

পুলিশের গাফিলতি নিয়ে প্রশ্ন, IO সাসপেন্ড

পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ঘোষণাগুলির একটি ছিল তদন্তকারী আধিকারিকের সাসপেনশন। কোনও হেফাজত-মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তকারী আধিকারিকের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ উঠলে সেই আধিকারিক দায়িত্বে থাকলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে IO-কে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে হালিশহর থানার আইসি-কেও সক্রিয় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রথমে বিভিন্ন প্রতিবেদনে আইসি-কে ‘ক্লোজ়’ করার কথা জানানো হয়। এর অর্থ তাঁকে সংশ্লিষ্ট থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে বা অপেক্ষাকালীন দায়িত্বে পাঠানো।

এর ফলে দুটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, রাজ্য সরকার অভিযোগকে প্রাথমিক স্তরেই গুরুত্ব দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, তদন্ত চলাকালীন সংশ্লিষ্ট থানার প্রশাসনিক কাঠামো থেকে অভিযুক্ত বা প্রশ্নের মুখে থাকা আধিকারিকদের দূরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

news image
আরও খবর

তবে সাসপেনশন বা ক্লোজ় হওয়া নিজে থেকেই কারও অপরাধ প্রমাণ করে না। এগুলি প্রশাসনিক পদক্ষেপ। প্রকৃত দায় নির্ধারণ করবে তদন্ত এবং প্রয়োজন হলে পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া।

ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ

পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় নিয়ম এবং নির্ধারিত প্রোটোকল মেনে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসক শিল্পী গৌরীসারিয়াকে। উত্তর ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসনের সরকারি ওয়েবসাইটেও শিল্পী গৌরীসারিয়াকে জেলার বর্তমান District Magistrate & Collector হিসেবে দেখানো হয়েছে।

প্রকাশিত বাংলা সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী এবং মৃতের পরিবারকে নিয়মিত অবহিত রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

এই নির্দেশ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হেফাজতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবারের অন্যতম প্রধান দাবি থাকে তদন্তের স্বচ্ছতা। তদন্ত কোন পর্যায়ে রয়েছে, কী প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কী ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—এই বিষয়গুলিতে পরিবারকে অন্ধকারে না রাখার চেষ্টা করা হলে প্রশাসনের উপর আস্থা বজায় রাখতে তা সাহায্য করতে পারে।

ম্যাজিস্ট্রেট তদন্তে সাধারণত ঘটনার ধারাবাহিকতা, পুলিশি রেকর্ড, গ্রেফতার ও হেফাজতের নথিপত্র, চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাক্ষ্য এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। এই নির্দিষ্ট ঘটনায় কোন কোন বিষয় তদন্তের আওতায় রাখা হবে, তা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষই নির্ধারণ করবে।

ময়নাতদন্তের রিপোর্টের দিকে নজর

পুলিশি হেফাজতে কোনও ব্যক্তির মৃত্যু হলে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে। হালিশহরের ক্ষেত্রেও তাই ময়নাতদন্তের ফলাফলের দিকে নজর রয়েছে।

মৃতের পরিবার যে নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছে, তার সঙ্গে কোনও চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত প্রমাণের মিল রয়েছে কি না, শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল কি না, থাকলে তার প্রকৃতি কী, মৃত্যু ঠিক কী কারণে ঘটেছে—এই সব প্রশ্নের ক্ষেত্রে ফরেন্সিক এবং ময়নাতদন্তের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

ফলে রাজনৈতিক বক্তব্য বা অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, বরং তদন্তের নথি, ফরেন্সিক তথ্য এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন।

মৃতের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সহায়তা

মুখ্যমন্ত্রীর সফরের আরও একটি বড় ঘোষণা হল মৃতের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য। সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা সহায়তার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।

পরিবারের পক্ষ থেকে এমন আর্থিক সাহায্যের নির্দিষ্ট আবেদন না থাকলেও বাড়িতে থাকা দুই শিশুর ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে সাহায্যের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বাংলা সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিবারের একজন উপার্জনক্ষম সদস্যের আকস্মিক মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট পরিবারের সামনে তাৎক্ষণিক আর্থিক অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে ছোট শিশুদের শিক্ষা, দৈনন্দিন খরচ এবং পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। সেই পরিস্থিতিতে সরকারি আর্থিক সহায়তা পরিবারটির জন্য কিছুটা হলেও সুরাহা করতে পারে।

তবে আর্থিক ক্ষতিপূরণ কখনও ন্যায়বিচারের বিকল্প নয়। এই ঘটনার ক্ষেত্রেও আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয় এবং দায়ী কেউ থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

 

 

Preview image