Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

পাঁচ বছরের মেয়ের জন্য সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনায় বছরে এক লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে কত টাকা পাওয়া যাবে

পাঁচ বছরের মেয়ের জন্য সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনায় বছরে এক লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করলে মেয়াদ শেষে কত টাকা পাওয়া যেতে পারে, তার সম্পূর্ণ হিসাব ও লাভের বিশ্লেষণ জানুন সহজভাবে।

সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করা প্রতিটি বাবা মায়ের স্বাভাবিক দায়িত্ব। বিশেষ করে কন্যাসন্তানের শিক্ষা, বিবাহ এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য অনেক অভিভাবকই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কথা ভাবেন। বর্তমান সময়ে যখন বাজারের ওঠানামা, শেয়ার বাজারের ঝুঁকি এবং অনিশ্চিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনেক পরিবারকে চিন্তায় ফেলেছে, তখন সরকারি সঞ্চয় প্রকল্পগুলির প্রতি মানুষের আস্থা আরও বেড়েছে। সেই সমস্ত প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় এবং নির্ভরযোগ্য প্রকল্প হল সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা।

ধরা যাক আপনার মেয়ের বয়স এখন পাঁচ বছর। আপনি যদি এখন থেকেই পরিকল্পিতভাবে প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করেন, তাহলে মেয়ের বয়স একুশ বছরে পৌঁছনোর সময় একটি বড় অঙ্কের তহবিল তৈরি করা সম্ভব। অনেক অভিভাবকেরই প্রশ্ন, প্রতি বছর যদি এক লক্ষ টাকা করে বিনিয়োগ করা হয়, তাহলে মেয়াদ শেষে মোট কত টাকা পাওয়া যেতে পারে। এই প্রশ্নের উত্তর বোঝার জন্য প্রথমে সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনার কাঠামো, নিয়ম এবং সুবিধাগুলি পরিষ্কারভাবে জানা প্রয়োজন।

সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা হল ভারত সরকারের একটি বিশেষ সঞ্চয় প্রকল্প, যা শুধুমাত্র কন্যাসন্তানের জন্য চালু করা হয়েছে। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হল মেয়েদের শিক্ষা ও বিবাহের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই অ্যাকাউন্ট মেয়ের জন্মের পর থেকে দশ বছরের মধ্যে যে কোনও সময় খোলা যায়। অ্যাকাউন্ট খোলার পর প্রথম পনেরো বছর নিয়মিত টাকা জমা করতে হয়। তবে অ্যাকাউন্টের মেয়াদ থাকে একুশ বছর পর্যন্ত। অর্থাৎ পনেরো বছর টাকা জমা দেওয়ার পরও পরবর্তী ছয় বছর পর্যন্ত সেই টাকা সুদসহ বৃদ্ধি পেতে থাকে।

এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল চক্রবৃদ্ধি সুদের সুবিধা। চক্রবৃদ্ধি সুদের ফলে শুধু জমা করা টাকার উপর নয়, জমা হওয়া সুদের উপরও আবার সুদ যোগ হয়। ফলে দীর্ঘ সময়ের মধ্যে টাকা অনেক বেশি পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। এছাড়া এই প্রকল্প সম্পূর্ণ সরকারি গ্যারান্টি দ্বারা সুরক্ষিত, ফলে মূলধন হারানোর ঝুঁকি নেই।

এবার আসা যাক একটি বাস্তব উদাহরণে। ধরুন আপনার মেয়ের বর্তমান বয়স পাঁচ বছর। আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন প্রতি বছর এক লক্ষ টাকা করে সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনায় বিনিয়োগ করবেন। এই বিনিয়োগ আপনি করবেন টানা পনেরো বছর। অর্থাৎ মেয়ের বয়স পাঁচ বছর থেকে উনিশ বছর পর্যন্ত আপনি প্রতি বছর টাকা জমা করবেন।

এই ক্ষেত্রে আপনার মোট বিনিয়োগের অঙ্ক হবে পনেরো লক্ষ টাকা। কারণ প্রতি বছর এক লক্ষ টাকা করে পনেরো বছর জমা করলে মোট জমা হয় পনেরো লক্ষ টাকা। কিন্তু এই পনেরো লক্ষ টাকা শুধু জমা থাকেই না, এর উপর নিয়মিত সুদ যোগ হতে থাকে। বর্তমান সুদের হার অনুযায়ী সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনায় দীর্ঘমেয়াদে উল্লেখযোগ্য রিটার্ন পাওয়া যায়।

বর্তমান সুদের হার ধরে হিসাব করলে দেখা যায়, মেয়ের বয়স একুশ বছরে পৌঁছনোর সময় আপনার মোট প্রাপ্তির অঙ্ক প্রায় ত্রিশ লক্ষ থেকে বত্রিশ লক্ষ টাকার কাছাকাছি হতে পারে। অর্থাৎ আপনার পনেরো লক্ষ টাকার বিনিয়োগের উপর সুদ থেকে প্রায় পনেরো থেকে সতেরো লক্ষ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত আয় হতে পারে। ফলে মোট তহবিল দাঁড়ায় ত্রিশ লক্ষ টাকারও বেশি।

এই হিসাবটি আনুমানিক। কারণ সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনার সুদের হার সরকার সময় সময় পরিবর্তন করতে পারে। যদি ভবিষ্যতে সুদের হার বাড়ে, তাহলে আপনার প্রাপ্তির অঙ্ক আরও বাড়তে পারে। আবার সুদের হার কমলে রিটার্ন কিছুটা কম হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই প্রকল্প সাধারণত স্থিতিশীল এবং লাভজনক রিটার্ন দিয়ে থাকে।

অনেক অভিভাবকের মনে প্রশ্ন আসে, কেন সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা এত জনপ্রিয়। এর প্রধান কারণ হল নিরাপত্তা এবং নিশ্চিত লাভ। শেয়ার বাজার বা মিউচুয়াল ফান্ডের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে যেখানে লাভের নিশ্চয়তা নেই, সেখানে সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনায় মূলধন এবং সুদ উভয়ই সরকারি গ্যারান্টিতে সুরক্ষিত। তাই যারা ঝুঁকি নিতে চান না, তাদের জন্য এই প্রকল্প অত্যন্ত উপযোগী।

এই প্রকল্পের আরেকটি বড় সুবিধা হল কর ছাড়। সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনায় বিনিয়োগ করা টাকা আয়কর আইনের অধীনে ছাড়যোগ্য। এছাড়া মেয়াদ শেষে যে টাকা পাওয়া যায়, সেটিও করমুক্ত। অর্থাৎ এটি একটি সম্পূর্ণ করমুক্ত বিনিয়োগ ব্যবস্থা। ফলে যারা ট্যাক্স বাঁচাতে চান এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য তহবিল তৈরি করতে চান, তাদের জন্য এই প্রকল্প বিশেষভাবে উপযোগী।

news image
আরও খবর

অনেক অভিভাবক মনে করেন, বছরে এক লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবে এই প্রকল্পে কম অঙ্ক দিয়েও বিনিয়োগ শুরু করা যায়। কেউ চাইলে বছরে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েও অ্যাকাউন্ট চালু করতে পারেন। আবার যার আর্থিক সামর্থ্য বেশি, তিনি সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারেন। ফলে এই প্রকল্পটি সব শ্রেণির মানুষের জন্যই উপযোগী।

এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনায় বিনিয়োগের মূল লক্ষ্য শুধুমাত্র টাকা জমা করা নয়, বরং ভবিষ্যতের বড় আর্থিক প্রয়োজনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। আজকের দিনে শিক্ষা ব্যয়, উচ্চশিক্ষার খরচ এবং বিবাহের খরচ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। একটি সাধারণ পরিবারের পক্ষেও এই ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে উঠছে। যদি আগে থেকেই পরিকল্পিতভাবে সঞ্চয় করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে আর্থিক চাপ অনেকটাই কমে যায়।

ধরা যাক, মেয়ের বয়স একুশ বছর হলে সে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে চাইবে বা কোনও পেশাগত কোর্সে ভর্তি হতে চাইবে। সেই সময় কয়েক লক্ষ টাকা প্রয়োজন হতে পারে। আবার বিবাহের সময়ও বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়। যদি আগে থেকেই ত্রিশ লক্ষ টাকার মতো একটি তহবিল তৈরি থাকে, তাহলে এই ধরনের বড় ব্যয় সহজেই সামাল দেওয়া সম্ভব।

সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা শুধু আর্থিক লাভের বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক বার্তাও বহন করে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার কন্যাসন্তানের গুরুত্ব তুলে ধরতে চেয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সমাজে কন্যাসন্তানকে বোঝা হিসেবে দেখা হত। কিন্তু এই প্রকল্পের মাধ্যমে কন্যাসন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য পরিকল্পিত সঞ্চয়ের ধারণা জনপ্রিয় হয়েছে।

অনেক অভিভাবক এখন মেয়ের জন্মের পরপরই সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনায় অ্যাকাউন্ট খুলে দেন। এতে সময় বেশি পাওয়া যায় এবং চক্রবৃদ্ধি সুদের সুবিধা আরও বেশি পাওয়া সম্ভব হয়। যত তাড়াতাড়ি বিনিয়োগ শুরু করা যায়, তত বেশি লাভ পাওয়া যায়। তাই যারা এখনও এই প্রকল্পে বিনিয়োগ শুরু করেননি, তাদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হতে পারে।

তবে এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করার আগে কিছু বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন। প্রথমত, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। মাঝপথে টাকা তুলে নেওয়ার সুযোগ সীমিত। তাই বিনিয়োগ করার আগে নিজের আর্থিক পরিস্থিতি ভালোভাবে বিবেচনা করা উচিত। দ্বিতীয়ত, সুদের হার ভবিষ্যতে পরিবর্তিত হতে পারে। যদিও দীর্ঘমেয়াদে এই প্রকল্প সাধারণত লাভজনক, তবুও নির্দিষ্ট অঙ্কের নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়।

এছাড়া বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র একটি প্রকল্পের উপর নির্ভর না করে, অন্যান্য সঞ্চয় প্রকল্পের সঙ্গেও বিনিয়োগ করা যেতে পারে। যেমন পিপিএফ, মিউচুয়াল ফান্ড, ফিক্সড ডিপোজিট ইত্যাদি। এতে ঝুঁকি কমে এবং মোট রিটার্ন আরও ভারসাম্যপূর্ণ হয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা কন্যাসন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য একটি শক্তিশালী আর্থিক হাতিয়ার। পাঁচ বছরের মেয়ের জন্য প্রতি বছর এক লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করলে মেয়াদ শেষে ত্রিশ লক্ষ টাকারও বেশি তহবিল তৈরি করা সম্ভব। এটি শুধু একটি সংখ্যার হিসাব নয়, বরং একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের ভিত্তি।

আজ যদি আপনি ছোট অঙ্ক দিয়েও বিনিয়োগ শুরু করেন, ভবিষ্যতে তার ফল বহু গুণে ফিরে আসতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টাকা বাড়বে, আর আপনার মেয়ের ভবিষ্যৎ আরও সুরক্ষিত হবে। তাই দেরি না করে আজ থেকেই পরিকল্পিত সঞ্চয়ের পথে এগিয়ে যাওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

এই ধরনের পরিকল্পিত বিনিয়োগ শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, বরং সমাজের জন্যও ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দিতে পারে। কারণ আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ও নিরাপদ ভবিষ্যৎই একটি শক্তিশালী সমাজ গঠনের ভিত্তি।

Preview image