মৌসম ভবনের এই পূর্বাভাসের একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখা দরকার—এর অর্থ এই নয় যে দেশের কোথাও বৃষ্টি হবে না। পূর্বাভাসের মানচিত্রে এমন বেশ কিছু অঞ্চল রয়েছে, যেখানে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু। কোথাও বর্ষার বিদায়পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছে, কোথাও আবার সেই প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে। তবে বাংলায় এখনও বর্ষার আনুষ্ঠানিক বিদায়ের দিনক্ষণ জানানো হয়নি। ফলে পুজোর মরসুমে আবহাওয়া কেমন থাকবে, বর্ষা বিদায়ের পরেও বৃষ্টির সম্ভাবনা কতটা থাকবে—তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল ক্রমেই বাড়ছে। এর মধ্যেই সামনে এসেছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তা হল এল নিনো।
প্রশ্ন উঠছে, বর্ষার চার মাসের মরসুম শেষ হয়ে গেলেই কি বৃষ্টির পর্বও কার্যত শেষ? নাকি অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শরৎ ও হেমন্তের মরসুমেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বৃষ্টি হতে পারে? আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। এল নিনোর প্রভাব থাকলেও দেশের সর্বত্র একই ধরনের আবহাওয়া তৈরি হবে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বরং অঞ্চলভেদে বৃষ্টির পরিমাণে যথেষ্ট পার্থক্য দেখা যেতে পারে।
মৌসম ভবনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে এই সময়পর্বে অপেক্ষাকৃত শুষ্ক আবহাওয়া থাকার সম্ভাবনাই বেশি। তবে তার অর্থ এই নয় যে দেশের কোথাও বৃষ্টি হবে না। বরং পূর্বাভাসের মানচিত্রে এমন বেশ কিছু অঞ্চল রয়েছে, যেখানে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত কিংবা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে।
এই বৈপরীত্যটাই আবহাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশের সামগ্রিক বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় কম হতে পারে, কিন্তু একই সময়ে কয়েকটি রাজ্য বা অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিও হতে পারে। ফলে গোটা দেশের পূর্বাভাসকে কোনও একটি রাজ্য বা শহরের আবহাওয়ার সঙ্গে সরাসরি মিলিয়ে দেখা ঠিক নয়।
এবার যদি বর্ষার দিকে নজর দেওয়া যায়, দেখা যাচ্ছে, এ বার দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর বিদায়ের সময় দেশের মোট বৃষ্টিতে ঘাটতি রয়েছে। বর্ষার চার মাসে সামগ্রিক বৃষ্টির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ শতাংশে। অর্থাৎ দীর্ঘ বর্ষাকাল জুড়ে দেশের বিভিন্ন অংশে বৃষ্টির পরিমাণে উল্লেখযোগ্য তারতম্য দেখা গিয়েছে। কোথাও পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়েছে, আবার কোথাও বৃষ্টির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এমনকি একই রাজ্যের একাধিক জেলাতেও বৃষ্টির পরিমাণে পার্থক্য দেখা গিয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই এল নিনো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট অ্যান্ড সোসাইটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এল নিনো পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হতে পারে। শুধু তাই নয়, ২০২৭ সালের শুরুর দিকেও শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি বজায় থাকার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। ফলে আগামী কয়েক মাসে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি ভারতীয় উপমহাদেশের আবহাওয়ার উপরও এর প্রভাব নিয়ে নজর রাখছেন আবহবিদেরা।
ভারতে এল নিনোর কী প্রভাব?
সাধারণভাবে এল নিনোর সঙ্গে ভারতের বর্ষার দুর্বলতার একটি সম্পর্কের কথা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার অস্বাভাবিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত এই জলবায়ুগত পরিস্থিতি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতের ক্ষেত্রেও বর্ষা, বৃষ্টির বণ্টন এবং তাপমাত্রার উপর এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে নিয়মিত বিশ্লেষণ করা হয়।
তবে এল নিনো মানেই যে ভারতের সর্বত্র বৃষ্টি কমবে, এমন কোনও সরল নিয়ম নেই। আবহাওয়ার উপর একাধিক জলবায়ুগত কারণ একসঙ্গে কাজ করে। ফলে এল নিনোর পাশাপাশি ভারত মহাসাগরের পরিস্থিতি, বায়ুপ্রবাহ, স্থানীয় আবহাওয়ার ব্যবস্থা এবং অন্যান্য বৈশ্বিক জলবায়ু সূচকও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বর্তমান বিভিন্ন আবহাওয়া মডেলের ইঙ্গিত অনুযায়ী, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে দেশের বড় অংশে স্বাভাবিকের তুলনায় শুষ্ক আবহাওয়া থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেও আঞ্চলিক পার্থক্য থাকবে। অর্থাৎ কোনও কোনও এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হলেও অন্য কিছু এলাকায় বৃষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিকের কাছাকাছি বা তার বেশি হতে পারে।
বর্ষার সময়েও তার উদাহরণ দেখা গিয়েছে। দেশের সামগ্রিক বৃষ্টিপাতে ঘাটতি থাকলেও কিছু অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টি হয়েছে। কোথাও আবার অল্প সময়ের মধ্যে অতিভারী বৃষ্টি হয়েছে। ফলে শুধু মোট বৃষ্টির পরিমাণ দিয়ে একটি মরসুমের সম্পূর্ণ আবহাওয়ার ছবি বোঝা যায় না। বৃষ্টির সময়, বৃষ্টির বণ্টন এবং কোন অঞ্চলে কতটা বৃষ্টি হয়েছে—সবকিছুর উপর নজর রাখা প্রয়োজন।
বাংলার ক্ষেত্রে কী হতে পারে?
এখন প্রশ্ন, এল নিনোর এই সম্ভাব্য প্রভাব বাংলার আবহাওয়ায় কী ভাবে পড়তে পারে? এই মুহূর্তে বাংলায় বর্ষা বিদায়ের নির্দিষ্ট দিনক্ষণ জানানো হয়নি। ফলে আগামী কয়েক দিন বা সপ্তাহে বৃষ্টির সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বর্ষা বিদায়ের প্রক্রিয়া শুরু হলেও স্থানীয় আবহাওয়াজনিত কারণে কোথাও কোথাও বৃষ্টি হতে পারে।
অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে দেশের অধিকাংশ এলাকায় কম বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলেও তার অর্থ বাংলাতেও একই ছবি দেখা যাবে—এমনটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয় বাষ্পের প্রবাহ, নিম্নচাপ বা ঘূর্ণাবর্তের মতো স্থানীয় ও আঞ্চলিক আবহাওয়াব্যবস্থা তৈরি হলে বৃষ্টির পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।
তাই আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এল নিনোকে একমাত্র কারণ হিসেবে না দেখে সামগ্রিক আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতির দিকে নজর রাখা। আগামী কয়েক মাসে কোথাও শুষ্ক আবহাওয়া দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, আবার কোথাও স্বল্প সময়ের জন্য বৃষ্টিও হতে পারে।
সব মিলিয়ে, বর্ষার চার মাস শেষ হলেই যে বৃষ্টি একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নয়। বরং অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের আবহাওয়ার ছবিতে বৈচিত্র্য থাকার সম্ভাবনাই বেশি। সামগ্রিক পূর্বাভাস শুষ্ক আবহাওয়ার দিকে ইঙ্গিত করলেও অঞ্চলভেদে বৃষ্টির পার্থক্য থাকবে। এর সঙ্গে যদি এল নিনোর শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা যোগ হয়, তা হলে আগামী কয়েক মাসে আবহাওয়ার পরিবর্তনের উপর নজর রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে বাংলার ক্ষেত্রে বর্ষা কবে পুরোপুরি বিদায় নেয়, বঙ্গোপসাগরে কোনও নিম্নচাপ বা ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হয় কি না এবং তাপমাত্রার গতিপ্রকৃতি কেমন থাকে—এই বিষয়গুলিই আগামী দিনের আবহাওয়ার ছবি অনেকটাই স্পষ্ট করবে। তাই এখনই ‘বৃষ্টি শেষ’ বলে ধরে নেওয়ার কোনও কারণ নেই। বরং এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাবের পাশাপাশি স্থানীয় আবহাওয়াব্যবস্থার উপর নজর রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে আগামী কয়েক মাসে দেশের আবহাওয়ার ক্ষেত্রে একদিকে যেমন এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নজরে থাকবে, অন্য দিকে তেমনই নজর থাকবে আঞ্চলিক আবহাওয়াব্যবস্থার উপর। ২০২৬ সালের শেষ ভাগ থেকে ২০২৭ সালের শুরু পর্যন্ত এল নিনো শক্তিশালী থাকার পূর্বাভাস থাকায় আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি নিয়ে নজরদারি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে এল নিনোকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা পাওয়া যাবে না। কারণ ভারতের আবহাওয়া বহুস্তরীয় এবং একাধিক প্রাকৃতিক কারণের উপর নির্ভরশীল। তাই আগামী দিনে কোথাও বৃষ্টির ঘাটতি, কোথাও স্বাভাবিক বৃষ্টি এবং কোথাও আবার স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টির মতো পরস্পরবিরোধী পরিস্থিতি দেখা যেতেই পারে।
অর্থাৎ বর্ষার চার মাস শেষ হয়ে গেলেই বৃষ্টির অধ্যায় শেষ—এমনটা নয়। বরং বর্ষা-পরবর্তী মরসুমে বৃষ্টির চরিত্র বদলাতে পারে। আর এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাবের মধ্যে সেই পরিবর্তন বাংলার আবহাওয়ায় ঠিক কতটা পড়ে, তা বুঝতে আগামী কয়েক সপ্তাহের পূর্বাভাস এবং আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতির দিকে নজর রাখাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও সেটিকে সর্বত্র বৃষ্টিহীন আবহাওয়া হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং সামগ্রিক প্রবণতা শুষ্ক হলেও অঞ্চলভেদে পরিস্থিতির যথেষ্ট পার্থক্য থাকতে পারে।
বাংলার ক্ষেত্রেও তাই এখনই ধরে নেওয়ার কারণ নেই যে বর্ষা বিদায় নিলেই বৃষ্টির দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। বঙ্গোপসাগরের পরিস্থিতি, নিম্নচাপ বা ঘূর্ণাবর্তের সম্ভাবনা এবং স্থানীয় আবহাওয়াব্যবস্থার উপর নির্ভর করে মাঝেমধ্যেই বৃষ্টি হতে পারে।