আবার খবরে উর্ফী জাভেদ! এ বার আলোচনা তাঁর ধর্ম নিয়ে। সম্প্রতি অন্য এক নেটপ্রভাবী ফয়জান আনসারি দাবি করেছেন, উর্ফীকে ইসলাম ধর্ম সম্প্রদায় থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরিবর্তে তাঁকে নাকি হিন্দুধর্ম গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তারই জবাবে উর্ফীর দাবি, তিনি নাস্তিক। কোনও ধর্মই তিনি মানেন না।সম্প্রতি একটি ভিডিয়োবার্তায় ফয়জানের দাবি, উর্ফী ইসলাম ধর্মাবলম্বী হলেও সেই ধর্ম মানেন না, কোরান মানেন না। উল্টে নিজের ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর কথা বলেন। তাই তিনি এক মৌলানার কাছে লিখিত অভিযোগে উর্ফীকে ধর্মচ্যুত করার আবেদন জানিয়েছেন।
উর্ফী এ ব্যাপারে স্পষ্টবাদী। ফয়জানের বক্তব্য উড়িয়ে দিয়ে তাঁর দাবি, কোনও ধর্ম সম্প্রদায়ই তাঁকে ধর্মীয় আচার-আচরণ নিয়ে নির্দেশ দিতে পারে না। বহিষ্কারেরও কোনও প্রশ্ন নেই। হিন্দুধর্ম গ্রহণ করে নাম বদলে ‘গীতা ভরদ্বাজ’ রাখার পরামর্শও দিতে পারেন না কেউ। তাঁর যুক্তি, তিনি কোনও ধর্মেই বিশ্বাসী নন। সেই কারণে কোনও ধর্মাচরণও করেন না তিনি।উর্ফীর সাফ কথা, “আমি নিজেই অনেক আগে ধর্ম ত্যাগ করেছি। এখন এ সব কে বানাচ্ছে? কে বলেছে এ সব? এমন কোনও খবর নেই। যাঁরা করছেন, তাঁরা হয়তো এ সব বানিয়ে বলছেন। আমি কোনও ধর্ম মানি না। আমি একজন নাস্তিক। তা হলে আমাকে কোন ধর্মসম্প্রদায় থেকে বার করে দেওয়া হবে?” তিনি বরং পাল্টা জানতে চেয়েছেন, যাঁর কোনও ঠিকানাই নেই, তাঁকে অন্যেরা কোথা থেকে বার করে দেবেন?
উর্ফী জাভেদের সাম্প্রতিক মন্তব্য ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা শুধুই এক জন সেলিব্রিটির ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এই ঘটনা আবারও সামনে এনে দিয়েছে ধর্ম, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সমাজের নৈতিকতার ধারণা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ভুয়ো খবর ছড়িয়ে পড়ার বাস্তবতাকে। “আমি নিজেই অনেক আগে ধর্ম ত্যাগ করেছি… আমি কোনও ধর্ম মানি না, আমি একজন নাস্তিক”— উর্ফীর এই সাফ কথা যেন এক সঙ্গে বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কে তাঁকে ধর্ম থেকে ‘বার’ করে দিচ্ছে? কারা এই খবর ছড়াচ্ছে? আর একজন ব্যক্তি যখন নিজেকে নাস্তিক বলে ঘোষণা করেন, তখন সমাজের প্রতিক্রিয়াই বা কেন এত তীব্র হয়ে ওঠে?
প্রথমেই আসা যাক উর্ফীর বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ধর্ম ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত তিনি নতুন করে নেননি। অনেক আগেই তিনি নিজেকে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে তাঁকে ঘিরে যে ‘ধর্মচ্যুত’ করার গুঞ্জন, তা তাঁর নিজের জীবনে নতুন কোনও মোড় নয়। বরং তাঁর বক্তব্য, এই সব খবর সম্পূর্ণ বানানো। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—যাঁর কোনও ধর্মীয় ঠিকানাই নেই, তাঁকে আবার কোন ধর্মসম্প্রদায় থেকে বার করে দেওয়া হবে? এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে গোটা বিতর্কের সারবত্তা।
ভারতীয় সমাজে ধর্ম শুধুই বিশ্বাসের বিষয় নয়, এটি পরিচয়েরও বড় অংশ। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই মানুষকে কোনও না কোনও ধর্মীয় পরিচয়ে বেঁধে ফেলা হয়। সেই পরিচয় সামাজিক আচরণ, পোশাক, খাবারদাবার থেকে শুরু করে বিবাহ, মৃত্যু—সব কিছুতেই প্রভাব ফেলে। ফলে কেউ যখন প্রকাশ্যে বলেন, “আমি কোনও ধর্ম মানি না”, তখন তা অনেকের কাছেই অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উর্ফীর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তিনি শুধু নাস্তিক বলেই নিজেকে পরিচয় দেননি, বরাবরই সমাজের প্রচলিত পোশাক-নৈতিকতা, নারী শরীর নিয়ে দ্বিচারিতা এবং রক্ষণশীল মানসিকতার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। ফলে তাঁর নাস্তিক পরিচয় আরও বেশি আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—ধর্ম ত্যাগ করা আর ধর্ম থেকে বহিষ্কৃত হওয়া এক জিনিস নয়। ধর্ম ত্যাগ ব্যক্তির নিজস্ব সিদ্ধান্ত। কিন্তু ধর্ম থেকে বহিষ্কার সাধারণত কোনও সংগঠন বা ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত। উর্ফী যেটা বলতে চেয়েছেন, তা হল—তিনি নিজেই অনেক আগেই ধর্মীয় পরিচয় ঝেড়ে ফেলেছেন। কাজেই এখন তাঁকে ‘বার করে দেওয়া’ বা ‘বহিষ্কার’ করার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে যুক্তির জায়গা খুব কম। গুজব, আবেগ আর রাজনৈতিক-ধর্মীয় উদ্দেশ্য মিলিয়ে অনেক সময় এমন সব খবর ছড়িয়ে পড়ে, যার বাস্তব ভিত্তি প্রায় নেই বললেই চলে।
উর্ফীর ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। তিনি বারবার বলেছেন, কেউ তাঁকে ধর্ম ত্যাগ করতে বাধ্য করেনি। এটি তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত। অথচ বহু সমালোচক তাঁর বক্তব্যকে এমন ভাবে উপস্থাপন করছেন, যেন তিনি ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। আসলে ব্যক্তিগত নাস্তিকতা আর ধর্মবিদ্বেষ এক নয়। একজন মানুষ ঈশ্বরে বিশ্বাস না করতেই পারেন, আবার অন্যের বিশ্বাসকে সম্মানও করতে পারেন। উর্ফীর বক্তব্যে কোথাও অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি ঘৃণা বা অবমাননার সুর নেই। বরং তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা অবিশ্বাস নিয়ে অন্যদের এত মাথাব্যথা কেন?
এই প্রসঙ্গে ভারতীয় সংবিধানের কথাও উঠে আসে। ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের ধর্ম পালনের যেমন অধিকার আছে, তেমনই ধর্ম না মানার অধিকারও রয়েছে। সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে বিশ্বাস করার পাশাপাশি অবিশ্বাস করার স্বাধীনতাও অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ উর্ফী আইনত যা করছেন, তা সম্পূর্ণ বৈধ। কিন্তু সামাজিক স্তরে সেই স্বাধীনতা অনেক সময় মান্যতা পায় না। বিশেষ করে যখন বিষয়টি কোনও পরিচিত মুখের সঙ্গে জড়িত থাকে।
উর্ফীর বক্তব্যের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তাঁর আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। তিনি বলেছেন, যাঁর কোনও ঠিকানাই নেই, তাঁকে কোথা থেকে বার করা হবে? এখানে ‘ঠিকানা’ বলতে তিনি ধর্মীয় পরিচয়কেই বোঝাতে চেয়েছেন। সমাজে অনেক সময় ধর্মকে মানুষের স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু উর্ফী সেই ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করছেন। তিনি বলতে চাইছেন, মানুষ শুধুই ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন ব্যক্তি নিজের পছন্দ, মতাদর্শ, জীবনদর্শনের ভিত্তিতেও নিজের পরিচয় গড়ে তুলতে পারেন।
তবে উর্ফীর এই বক্তব্যে সমর্থনের পাশাপাশি সমালোচনাও এসেছে। একদল মনে করছেন, তিনি ইচ্ছাকৃত ভাবে বিতর্ক উসকে দিচ্ছেন। তাঁদের দাবি, পোশাক বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনার পর এবার ধর্মীয় ইস্যু তুলে এনে তিনি লাইমলাইটে থাকার চেষ্টা করছেন। কিন্তু অন্য পক্ষের যুক্তি, উর্ফী যদি চুপ করে থাকতেন, তা হলে ভুয়ো খবর আরও ছড়াত। তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়ে আসলে গুজবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন।
সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আজকাল কোনও তথ্য যাচাই না করেই তা ভাইরাল হয়ে যায়। উর্ফীর ধর্ম ত্যাগ বা ধর্ম থেকে বহিষ্কারের খবরও সম্ভবত এমনই কোনও পোস্ট বা ভিডিও থেকে ছড়িয়েছে। এরপর তা নানা রকম ব্যাখ্যা, মন্তব্য, ট্রোলের মাধ্যমে আরও বিকৃত হয়েছে। উর্ফীর বক্তব্য সেই প্রবণতার বিরুদ্ধেই এক ধরনের প্রতিবাদ। তিনি সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন—এই সব কে বানাচ্ছে? কে বলেছে? এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু খুব কম মানুষই খোঁজার চেষ্টা করছেন।
উর্ফীর নাস্তিক পরিচয় নতুন কিছু নয়। আগেও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস না করার কথা বলেছেন। কিন্তু প্রতিবারই এই বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে, কারণ সমাজ এখনও নাস্তিকতাকে স্বাভাবিক চোখে দেখতে অভ্যস্ত নয়। বিশেষ করে যখন একজন নারী, তাও আবার গ্ল্যামার দুনিয়ার কেউ, প্রকাশ্যে এমন কথা বলেন, তখন প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হয়। অনেকেই ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বদলে তাঁর পোশাক, জীবনযাপন, সামাজিক আচরণ টেনে এনে তাঁকে আক্রমণ করেন। যেন নাস্তিক হওয়া আর ‘ভাল মানুষ’ হওয়া পরস্পরের বিপরীত।
এই জায়গাতেই উর্ফীর বক্তব্য সমাজের আয়নার মতো কাজ করে। তিনি দেখিয়ে দেন, আমরা আসলে কতটা সহনশীল। আমরা কি সত্যিই অন্যের মতামত মেনে নিতে পারি, নাকি শুধু নিজেদের বিশ্বাসকেই একমাত্র সত্য বলে ধরে রাখি? উর্ফী কাউকে ধর্ম ত্যাগ করতে বলছেন না, কাউকে নাস্তিক হতে আহ্বানও জানাচ্ছেন না। তিনি শুধু নিজের অবস্থান স্পষ্ট করছেন। অথচ সেই স্পষ্টতাই অনেকের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে।
এখানে নারীস্বাধীনতার প্রসঙ্গও জড়িয়ে আছে। উর্ফী বরাবরই বলেছেন, তিনি নিজের শরীর, পোশাক এবং জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে চান। ধর্ম ত্যাগের ঘোষণা সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। বহু ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধিনিষেধ নারীর উপরই বেশি চাপিয়ে দেওয়া হয়—কী পরবেন, কী করবেন, কী করবেন না। উর্ফীর নাস্তিকতা সেই নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধেই এক ধরনের ব্যক্তিগত প্রতিবাদ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
তবে সমালোচকদের কথাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অনেকেই মনে করেন, উর্ফীর বক্তব্যের ভাষা আরও সংযত হতে পারত। ধর্ম একটি সংবেদনশীল বিষয়, সেখানে ‘আমার কোনও ঠিকানাই নেই’—এ ধরনের মন্তব্য কিছু মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে। যদিও উর্ফীর বক্তব্যের মূল সুর আত্মরক্ষামূলক, তবু শব্দচয়ন নিয়ে বিতর্ক হওয়াই স্বাভাবিক।
সব মিলিয়ে উর্ফীর এই মন্তব্য আবারও দেখিয়ে দিল, ভারতীয় সমাজ এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে। এক দিকে আমরা আধুনিকতা, ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা বলি; অন্য দিকে কেউ সেই স্বাধীনতা ব্যবহার করলেই আমরা অস্বস্তিতে পড়ি। উর্ফী কোনও ধর্ম মানেন না—এটি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। সেটি মেনে নেওয়া বা না নেওয়া প্রত্যেকের নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ভুয়ো খবর ছড়ানো, তাঁকে হুমকি দেওয়া বা সামাজিক ভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা গণতান্ত্রিক সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।
উর্ফীর প্রশ্ন—“আমাকে কোন ধর্মসম্প্রদায় থেকে বার করে দেওয়া হবে?”—আসলে আমাদেরই উদ্দেশে ছোড়া। আমরা কি মানুষকে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের খাঁচায় বন্দি করে রাখতে চাই, নাকি তার বাইরেও একজন ব্যক্তিকে দেখতে পারি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু উর্ফী নয়, আমাদের নিজেদের মানসিকতার দিকেও তাকাতে হবে।