Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

‘সহজে এই পদ পাইনি’—লড়াইয়ের গল্প জানালেন ফোরামের কোষাধ্যক্ষ বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায়

সদস্যপদে সামান্য রদবদল হয়েছে—গত বছরের কোষাধ্যক্ষ সোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের জায়গায় এ বছর দায়িত্ব পেয়েছেন বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায়।

‘সহজে এই পদ পাইনি’—লড়াইয়ের গল্প জানালেন ফোরামের কোষাধ্যক্ষ বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায়
বিনোদন

ওয়েস্ট বেঙ্গল মোশন পিকচার্স আর্টিস্ট ফোরাম-এর বার্ষিক নির্বাচন মানেই টলিউডে রাজনৈতিক উত্তেজনার মতোই আলোড়ন। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের এই সংগঠন শুধু কর্মসংস্থান ও পেশাগত অধিকারের বিষয়েই কাজ করে না, বরং বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। সেই কারণেই এই নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে থাকেন গোটা ইন্ডাস্ট্রির মানুষ। এ বছর রবিবার অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনে বড় কোনও রাজনৈতিক পালাবদল না হলেও, নেতৃত্বের কাঠামোয় সামান্য কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ রদবদল ঘটেছে। তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা — আগামী এক বছরের জন্য কোষাধ্যক্ষ পদে অভিনেত্রী বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায়-এর নির্বাচিত হওয়া।

এই পদে পৌঁছতে যে তাঁকে লড়াই করতে হয়েছে, সে কথা নিজেই জানিয়েছেন আনন্দবাজার ডট কম-কে। তাঁর কথায়, “এই পদের প্রার্থী হিসাবে নাম দিই। এটা বলতে পারি, খুব সহজে এই পদ পাইনি।” শিল্পী সংগঠনের অর্থনৈতিক দায়িত্ব সামলানো যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর বিষয়, তা ইন্ডাস্ট্রির সকলেরই জানা। সেই জায়গায় একজন অভিনেত্রীর এই প্রথম নির্বাচনের মাধ্যমে কোষাধ্যক্ষ হওয়া টলিউডের সংগঠনী রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলেই মনে করছেন অনেকে।


আর্টিস্ট ফোরাম: টলিউডের প্রাণকেন্দ্র

ওয়েস্ট বেঙ্গল মোশন পিকচার্স আর্টিস্ট ফোরাম দীর্ঘদিন ধরেই বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম প্রধান সংগঠন হিসেবে কাজ করে আসছে। এই সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য শিল্পীদের স্বার্থরক্ষা, কাজের পরিবেশ উন্নত করা, শ্রমিক ও শিল্পীদের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা, এবং প্রয়োজনে আইনি সহায়তা প্রদান। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিমা, পেনশন, মেডিক্লেম প্রকল্পের মতো সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাও চালু রাখার চেষ্টা করে এই ফোরাম।

এই কারণেই ফোরামের প্রতিটি নির্বাচিত পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সভাপতি থেকে সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ থেকে সহ-সভাপতি— প্রত্যেকের হাতেই থাকে শিল্পীসমাজের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের ভার। ফলে বছরে একবার হওয়া এই নির্বাচন টলিউডে কার্যত এক ধরনের “মিনি ইলেকশন” হিসেবেই বিবেচিত হয়।


এ বছরের নির্বাচন: বড় বদল নয়, কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ রদবদল

রবিবার অনুষ্ঠিত হওয়া এবারের নির্বাচনে বড় কোনও নেতৃত্ব পরিবর্তন না হলেও, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন মুখ দেখা গিয়েছে। গত দু’বছর ধরে যেসব পদ নির্দিষ্ট ছিল, তার বেশির ভাগই এ বছরেও অপরিবর্তিত থাকছে।

যেমন —

  • সভাপতি পদে আবারও নির্বাচিত হয়েছেন প্রবীণ অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক।

  • কার্যকরী সভাপতি পদে বহাল রয়েছেন সুপারস্টার প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়।

  • সম্পাদক পদে এ বছরেও দায়িত্বে থাকছেন শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়।

এই তিনটি পদ গত কয়েক বছর ধরেই একই ব্যক্তিদের হাতে রয়েছে, যা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেয়। ইন্ডাস্ট্রির একাংশের মতে, অভিজ্ঞ নেতৃত্ব বজায় রাখার মাধ্যমেই ফোরাম শিল্পীদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করতে চায়।

তবে এ বছরের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক এসেছে কোষাধ্যক্ষ পদে — যেখানে অভিনেত্রী বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায় দায়িত্ব পেয়েছেন।


বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায়: অভিনয় থেকে সংগঠনের অর্থনৈতিক দায়িত্ব

বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায় টলিউডে পরিচিত মুখ। ছোটপর্দা ও বড়পর্দা— দুই মাধ্যমেই তিনি কাজ করেছেন। কিন্তু এই প্রথম তিনি শিল্পী সংগঠনের কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব পেলেন। কোষাধ্যক্ষ হিসেবে তাঁর দায়িত্ব হবে সংগঠনের আর্থিক লেনদেন, তহবিল ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প বাস্তবায়নের বাজেট নির্ধারণ এবং সদস্যদের কল্যাণমূলক প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখা।

আনন্দবাজার ডট কম-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাসবদত্তা জানান,

“এই পদের প্রার্থী হিসাবে নাম দিই। এটা বলতে পারি, খুব সহজে এই পদ পাইনি।”

তিনি আরও জানান, সোমবার ভোর সাড়ে তিনটেয় ভোটগণনা শেষ হয়। সাদা কাপড়ের ঘেরাটোপের মধ্যে রাতভর গণনা চলছিল। তাঁর কথায়, “দেখে মনে হচ্ছিল, যেন আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনা চলছে!”

এই বর্ণনা থেকেই বোঝা যায়, কতটা টানটান উত্তেজনার মধ্যে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।


নতুন টিম, নতুন দায়িত্ব

বাসবদত্তাকে তাঁর দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করবেন ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা দিগন্ত বাগচী। সংগঠনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় তাঁরা দু’জনে মিলেই কাজ করবেন বলে জানা গিয়েছে।

নতুন পদে দায়িত্ব পাওয়ার পর বাসবদত্তা জানিয়েছেন, শিল্পীদের কল্যাণমূলক প্রকল্প ফের চালু করাই তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তাঁর কথায়,

“শিল্পীদের জন্য মেডিক্লেমের ব্যবস্থা ছিল। সেটা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। খুব ইচ্ছা, ওই প্রকল্প আবার চালু করার।”

তিনি আরও বলেন,

“পাশাপাশি, যা যা করব, সবটাই আগে সংগঠনের বর্ষীয়ানদের জানিয়ে নেব।”

এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, অভিজ্ঞ সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সংগঠন পরিচালনা করতে চান তিনি।


পুরনো মুখের প্রত্যাবর্তন: দেবদূত ঘোষের ফেরা

এ বছরের নির্বাচনের আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল বহু বছর পর ফোরামে ফিরে আসা দেবদূত ঘোষ। তিনি এবছর সহকারী সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর সঙ্গে এই পদে রয়েছেন অভিনেতা আবীর চট্টোপাধ্যায়।

ফোরামের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দেবদূতের প্রত্যাবর্তন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে। একসময় তিনি সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং শিল্পীদের নানা আন্দোলন ও উদ্যোগে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁর ফেরায় সংগঠনে নতুন শক্তি আসবে বলেই আশাবাদী একাংশ।


অনুপস্থিত বড় তারকারা: নেই জিৎ, দেব, রাজ চক্রবর্তী

এই নির্বাচনের আর একটি দিক নজর কেড়েছে — বেশ কয়েকজন বড় তারকার অনুপস্থিতি। উল্লেখযোগ্য ভাবে এ বছর কোনও পদেই নেই সুপারস্টার জিৎ। একই ভাবে সংগঠনের কোনও পদে নেই অভিনেতা দেব, পরিচালক-প্রযোজক রাজ চক্রবর্তী-সহ টলিউডের বহু জনপ্রিয় মুখ।

news image
আরও খবর

যদিও এর অর্থ এই নয় যে তাঁরা সংগঠন থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন, তবে নেতৃত্ব কাঠামোয় তাঁদের অনুপস্থিতি ভবিষ্যতে ফোরামের নীতিনির্ধারণে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, বর্তমান প্রজন্মের বহু তারকা হয়তো সংগঠনের প্রশাসনিক কাজে যুক্ত হওয়ার চেয়ে নিজেদের কাজের দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে চাইছেন। আবার অন্যদের মতে, এটি ফোরামের ভেতরে এক ধরনের ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তনের ইঙ্গিতও হতে পারে।


সহ-সভাপতি ও কার্যকরী কমিটি: অভিজ্ঞদের দাপট

এ বছর সহ-সভাপতি পদে যাঁরা দায়িত্বে থাকছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন:

  • চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী

  • ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত

  • লাবণী সরকার

  • শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়

  • ভরত কল

এই তালিকা থেকেই বোঝা যায়, ফোরামের শীর্ষ নেতৃত্বে অভিজ্ঞ ও প্রবীণ শিল্পীদের উপস্থিতি বজায় রাখা হয়েছে। তাঁরা প্রত্যেকে নিজেদের অভিনয় জীবনের পাশাপাশি সংগঠনের কাজেও বহু বছর ধরে যুক্ত।

কার্যকরী কমিটিতে রয়েছেন —

  • কুশল চক্রবর্তী

  • বিদীপ্তা চক্রবর্তী

  • শুভ্রজিৎ দত্ত

  • সুদীপ মুখোপাধ্যায়

  • গৌরব চট্টোপাধ্যায়

  • সুদীপ মুখোপাধ্যায় (নাম দু’বার এসেছে)

  • এবং আরও অনেকে

এই কমিটি সংগঠনের দৈনন্দিন কার্যক্রম, সদস্যদের সমস্যা সমাধান, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং শিল্পীদের সঙ্গে প্রযোজক ও পরিচালক মহলের যোগাযোগ রক্ষা করার কাজ করে থাকে।


বাসবদত্তার লক্ষ্য: শিল্পীদের কল্যাণে নতুন উদ্যোগ

কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বাসবদত্তা যে বিষয়গুলিকে অগ্রাধিকার দিতে চান, তার মধ্যে অন্যতম হলো শিল্পীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা। অতীতে ফোরামের উদ্যোগে শিল্পীদের জন্য মেডিক্লেম প্রকল্প চালু হয়েছিল, যা নানা কারণে বন্ধ হয়ে যায়।

বাসবদত্তা জানিয়েছেন, এই প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করতে তিনি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবেন। তাঁর মতে,

“শিল্পীরা অনেক সময় অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে কাজ করেন। অসুস্থতা বা দুর্ঘটনার সময় তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য এমন প্রকল্প খুব প্রয়োজন।”

এছাড়াও তিনি সংগঠনের আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা, নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রকল্প চালু করা এবং সিনিয়র শিল্পীদের সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়েও কাজ করতে চান।


টলিউডে সংগঠনের ভূমিকা: অতীত থেকে বর্তমান

ওয়েস্ট বেঙ্গল মোশন পিকচার্স আর্টিস্ট ফোরাম শুধু একটি প্রশাসনিক সংগঠন নয় — এটি টলিউডের ইতিহাসের অংশ। বহু বছর ধরে এই সংগঠন শিল্পীদের ন্যায্য পারিশ্রমিক, কাজের সময়সূচি, নিরাপদ কাজের পরিবেশ এবং পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য লড়াই করেছে।

একাধিক সময় এই ফোরাম শিল্পী ও প্রযোজকদের মধ্যে সংঘাত মেটাতে মধ্যস্থতা করেছে। কখনও কখনও কাজ বন্ধের মতো কঠোর পদক্ষেপও নিতে হয়েছে শিল্পীদের স্বার্থ রক্ষায়। ফলে সংগঠনের নেতৃত্বে কারা রয়েছেন, তা শুধু সাংগঠনিক বিষয় নয় — তা গোটা ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ নির্ধারণ করে।

এই প্রেক্ষাপটে বাসবদত্তার মতো একজন অভিনেত্রীর কোষাধ্যক্ষ হওয়া শুধু একটি পদ পরিবর্তন নয়, বরং সংগঠনের অভ্যন্তরে প্রজন্মগত পরিবর্তনের ইঙ্গিতও বহন করে বলে মনে করছেন অনেকেই।

অভিজ্ঞতা বনাম নতুনত্ব: নেতৃত্বে ভারসাম্যের চেষ্টা

এ বছরের নির্বাচনের ফলাফল দেখে স্পষ্ট — ফোরাম একদিকে যেমন অভিজ্ঞ নেতৃত্ব বজায় রাখতে চেয়েছে, তেমনই অন্যদিকে নতুন মুখদের জায়গা করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সভাপতি ও কার্যকরী সভাপতি পদে রঞ্জিত মল্লিক ও প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের পুনর্নির্বাচন সংগঠনের ধারাবাহিকতার প্রতীক। আবার বাসবদত্তা, দিগন্ত বাগচী, আবীর চট্টোপাধ্যায়ের মতো অপেক্ষাকৃত নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে নেওয়া এক ধরনের প্রস্তুতি।

এই ভারসাম্য বজায় রাখাই যে ফোরামের মূল কৌশল, তা নেতৃত্বের গঠন থেকেই বোঝা যাচ্ছে।

Preview image