সৌকর্য ঘোষাল পরিচালিত ‘ওসিডি’ মুক্তির অপেক্ষায়, মুখ্য ভূমিকায় জয়া আহসান — একান্ত সাক্ষাৎকারে জানালেন নানা অজানা কথা।
মুক্তির অপেক্ষায় সৌকর্য ঘোষাল পরিচালিত নতুন ছবি ‘ওসিডি’ (OCD)। মুখ্য ভূমিকায় রয়েছেন দুই বাংলার জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া আহসান। ছবির নাম শুনলেই প্রথমে মনে হয়, এটি হয়তো শুধুই অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডার নিয়ে তৈরি কোনও মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার। কিন্তু জয়ার কথায়, এই ছবিটি সেই চেনা ছকের বাইরে গিয়ে অনেক গভীর, অনেক কঠিন এবং অনেক বেশি মানবিক প্রশ্ন তুলতে চলেছে। সম্প্রতি একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি ছবির চরিত্র, সমাজের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় এবং নিজের ব্যক্তিগত জীবনের নানা অজানা দিক নিয়ে কথা বললেন অকপটে।
এই দীর্ঘ কথোপকথনে উঠে এল শিশু নির্যাতন, পিডোফিলিয়া, মানসিক স্বাস্থ্য, অভিনেত্রী হয়ে ওঠার পেছনে তাঁর দিদিমার ভূমিকা এবং অভিনয়জীবনের নানা অনুভবের গল্প।
‘ওসিডি’: নামের মধ্যেই লুকিয়ে প্রশ্ন
‘ওসিডি’ ছবির পোস্টারে রয়েছে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন — OCD?
এই প্রশ্নচিহ্নই আসলে গোটা ছবির মেজাজ বোঝায় বলে মনে করেন জয়া আহসান।
তিনি বললেন,
“ছবিতে আমার চরিত্রের নাম শ্বেতা। সে পেশায় একজন ডার্মাটোলজিস্ট। বাইরে থেকে তাকে খুব স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে দেখা যায়। কিন্তু তার ভেতরের জগৎ একেবারেই অন্যরকম। সে সত্যিই ওসিডিতে আক্রান্ত কি না, নাকি তার সমস্যার উৎস অন্য কোথাও — সেটাই ছবির মূল প্রশ্ন।”
এই ছবিতে শ্বেতার জীবনের শৈশব, মানসিক যন্ত্রণা এবং অতীতের কিছু ভয়ংকর অভিজ্ঞতার ছায়া ধীরে ধীরে প্রকাশ পাবে। জয়ার কথায়,
“এই ছবিতে ওসিডি নিয়ে সরাসরি কোনও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়নি দর্শকের উপর। বরং প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হয়েছে — আমরা নিজেরাই ভাবব, শ্বেতার সমস্যার নাম কী হতে পারে।”
কেন সৌকর্য ঘোষালের ছবিতে আবার কাজ?
সৌকর্য ঘোষালের সঙ্গে জয়ার আগেও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে — বিশেষ করে ‘ভূতপরী’ ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার কারণেই নতুন ছবিতে কাজ করতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করেননি তিনি।
জয়া বললেন,
“সৌকর্য এমন একজন পরিচালক, যিনি অভিনেতাকে শুধু চরিত্র দেন না, একটা জার্নি দেন। ‘ভূতপরী’র পর আবার যখন বললেন, ‘ওসিডি’র কথা, তখনই মনে হয়েছিল — এমন চরিত্র তো আমি আগে করিনি।”
তিনি আরও জানান, বাংলা ছবিতে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ খুব বেশি হয়নি। বিশেষ করে ওসিডির মতো জটিল মানসিক অবস্থাকে এত গভীরভাবে দেখানোর চেষ্টা খুব কম ছবিতেই দেখা গেছে।
“এই চরিত্রে চারটে আলাদা শেড রয়েছে। একজন চিকিৎসক হিসেবে শ্বেতা, একজন নারী হিসেবে তার অনুভব, একজন শিশু হিসেবে তার ট্রমা এবং একজন মানুষ হিসেবে তার ভেতরের লড়াই — এই চার স্তরেই চরিত্রটা গড়ে উঠেছে,” বলেন জয়া।
ওসিডি কি শুধু পরিচ্ছন্নতা নিয়ে?
সাধারণত সমাজে ওসিডি বলতে বোঝানো হয়, অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতা বা জিনিসপত্র ঠিকঠাক সাজিয়ে রাখার প্রবণতা। কিন্তু ‘ওসিডি’ ছবিটি এই ধারণাকে ভেঙে দেয়।
জয়া ব্যাখ্যা করলেন,
“ওসিডি মানে শুধু হাত ধোয়া বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা নয়। এটা আসলে এক ধরনের মানসিক অবস্থা, যেখানে মানুষের মাথায় কিছু চিন্তা বা ভয় বারবার ঘুরতে থাকে, যেগুলো সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।”
ছবিতে শ্বেতার জীবনে সেই ভয় ও অস্থিরতার উৎস কোথায়, তা ধীরে ধীরে উন্মোচিত হবে। দর্শককে ভাবতে বাধ্য করবে — সত্যিই কি ওসিডি সমস্যার মূল কারণ, নাকি শ্বেতার অতীতের কোনও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তার বর্তমান জীবনকে প্রভাবিত করছে?
পিডোফিলিয়া ও শিশু নির্যাতন: সিনেমার সাহসী বিষয়
এই ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর দিক হল শিশু নির্যাতন ও পিডোফিলিয়া প্রসঙ্গ। জয়া স্পষ্ট ভাষায় বলেন,
“আমরা বাংলা ছবিতে ‘মিটু’ নিয়ে কথা বলি, সমলিঙ্গ সম্পর্ক নিয়ে কথা বলি, কিন্তু পিডোফিলিয়া নিয়ে কেন কথা বলি না?”
তার মতে, শিশু নির্যাতন এমন এক সামাজিক ব্যাধি, যা নিয়ে সমাজ এখনো মুখ খুলতে ভয় পায়। অথচ এর প্রভাব মানুষের জীবনে ভয়াবহ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
“শৈশব হচ্ছে জীবনের ভিত। সেই ভিত যদি ভেঙে যায়, তাহলে বড় হয়ে মানুষ অনেকটাই ডিস্টার্বড হয়ে ওঠে,” বলেন জয়া।
ছবিতে শ্বেতার শৈশবের কিছু ভয়ংকর অভিজ্ঞতা দেখানো হয়েছে, যা তার পরবর্তী জীবনের আচরণ ও মানসিক অবস্থার উপর গভীর প্রভাব ফেলে।
পরিবারেই সবচেয়ে বেশি বিপদ?
জয়ার মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে ঘরের ভেতর থেকেই — পরিচিত মানুষের হাতেই।
তিনি বলেন,
“সাধারণত আমরা ভাবি, বাইরের লোকজন থেকে বিপদ আসবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, পরিবারের সদস্য, আত্মীয় বা পরিচিত কেউই শিশুদের উপর নির্যাতন করে।”
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হল, অনেক বাবা-মা এই ধরনের ঘটনা সামনে এলে তা ধামাচাপা দিতে চান। ভবিষ্যতের কথা ভেবে, সমাজের ভয় থেকে, লজ্জার কারণে তাঁরা অনেক সময় সন্তানদের মুখ বন্ধ করে দেন।
“আমি দেখেছি বাবা-মা বলছেন, ‘চুপ থাক, এসব বলো না।’ আবার শুনেছি, ‘ও বাড়িয়ে বলছে।’ কিন্তু এতে ক্ষতি হয় শুধু শিশুটিরই,” বলেন জয়া।
এই ছবির মাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তা ও সচেতনতার বার্তা দিতে চান নির্মাতারা। তিনি মনে করেন, আজকাল শিশুদের গুড টাচ-ব্যাড টাচ শেখানো হচ্ছে — সেটাও খুব জরুরি উদ্যোগ।
অভিনয়ের সময় আবেগতাড়িত হওয়া মুহূর্ত
‘ওসিডি’ ছবিটি করতে গিয়ে একাধিক দৃশ্যে আবেগে ভেসে গিয়েছিলেন জয়া। বিশেষ করে শ্বেতা ও তার দিদিমার সম্পর্কের দৃশ্যগুলো তাঁকে খুব নাড়া দিয়েছে।
তিনি বলেন,
“এই ছবির দিদিমার সঙ্গে কিছু দৃশ্য করতে গিয়ে আমার নিজের দিদিমার কথা খুব মনে পড়েছে।”
এই প্রসঙ্গেই উঠে আসে জয়ার জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায় — তাঁর অভিনয়জীবনের পেছনে দিদিমার অবদান।
অভিনেত্রী হওয়ার পেছনে দিদিমার সবচেয়ে বড় ভূমিকা
জয়া অকপটে স্বীকার করেন, আজ তিনি যে অভিনেত্রী হয়েছেন, তার নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা তাঁর দিদিমার।
“ছোটবেলায় বুঝিনি। এখন বুঝতে পারি, উনি আমাকে কতটা তৈরি করে দিয়েছেন,” বলেন জয়া।
তিনি জানান, তাঁর দিদিমাই তাঁকে আবৃত্তি শিখিয়েছেন, হাত ধরে আর্ট ক্লাসে নিয়ে গিয়েছেন, প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। শৈশব থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর পরিচয় গড়ে উঠেছে এই মানুষটির হাত ধরেই।
“আমি আজ অভিনয় করছি — এর পেছনে আমার দিদিমার অবদান সবচেয়ে বেশি। উনি আমাকে মানুষ হিসেবে তৈরি করেছেন। এখন বুঝতে পারি, আমার কতটা জুড়ে রয়েছেন উনি,” আবেগঘন কণ্ঠে বলেন অভিনেত্রী।
এই অনুভূতি ছবির চরিত্রের সঙ্গে তাঁর সংযোগ আরও গভীর করে তুলেছে বলে জানান তিনি।
‘ওসিডি’ করতে গিয়ে নিজের ওসিডি আবিষ্কার!
হালকা মেজাজে জয়া জানান, এই ছবি করতে গিয়ে তিনি বুঝেছেন, তাঁর নিজের মধ্যেও নাকি কিছুটা ওসিডি রয়েছে!
হেসে বলেন,
“আমার পরিচ্ছন্নতার ওসিডি নেই। কিন্তু শট দেওয়ার সময় বারবার জিজ্ঞেস করি — ঠিক হলো তো? আবার দেব? তখন পরিচালক বলেন, ‘জয়া এবার কিন্তু নষ্ট হয়ে যাবে।’ তখন বুঝি এটা আমার ওসিডি।”
এছাড়াও কোনও ঘরে ঢুকে দেওয়ালে ঝোলানো ছবি বা ফ্রেম একটু বেঁকে থাকলে, তাঁর হাত নিশপিশ করে ওঠে। তিনি উঠে গিয়ে সেটি ঠিক না করা পর্যন্ত শান্তি পান না।
“এসব ছোট ছোট ব্যাপারই হয়তো আমার ওসিডি,” বলেন জয়া মুচকি হেসে।
ভারত-বাংলাদেশ ছবির আদানপ্রদান নিয়ে কী বললেন জয়া?
দুই বাংলায় সমান জনপ্রিয় জয়া আহসান। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ভারত ও বাংলাদেশের ছবিতে নিয়মিত কাজ করে চলেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে যৌথ কাজের সংখ্যা কিছুটা কমেছে।
এই প্রসঙ্গে জয়া বলেন,
“এখন তো নির্বাচনের আগে এই জিনিসগুলো একটু কম হচ্ছে। পরিস্থিতি একটু স্থিতিশীল হোক। তারপর নিশ্চয়ই আবার কাজ হবে — আমি আশাবাদী।”
তিনি মনে করেন, দুই বাংলার সংস্কৃতি ও ভাষাগত মিল এত গভীর যে সিনেমার মাধ্যমে সেই সম্পর্ক আরও শক্ত হওয়া উচিত।
‘ওসিডি’ কেন আলাদা?
জয়ার মতে, ‘ওসিডি’ শুধুই একটি থ্রিলার বা মানসিক রোগ নিয়ে ছবি নয়। এটি আসলে মানুষের ভেতরের ক্ষত, সমাজের অন্ধকার দিক এবং নিরাময়ের পথ খোঁজার গল্প।
“এই ছবিটা যাঁরা অভিনয়নির্ভর ছবি দেখতে ভালোবাসেন, তাঁদের খুব ভালো লাগবে,” বলেন তিনি।
ছবিতে কোনও সহজ উত্তর নেই, নেই কোনও ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট সিদ্ধান্ত। বরং দর্শককে ভাবতে বাধ্য করবে — মানুষের আচরণের পেছনে আসল কারণ কী? আমরা কি কাউকে বিচার করার আগে তার অতীত, তার যন্ত্রণা বোঝার চেষ্টা করি?
শিশুদের সুরক্ষার বার্তা
‘ওসিডি’ ছবির অন্যতম মূল বার্তা হল — শিশুদের নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব।
জয়া বলেন,
“এই ছবিটা বাচ্চাদের সুরক্ষার কথা বলে। পরিবারের সকলকে নিয়ে দেখুন।”
তিনি মনে করেন, শিশুদের কোনও আচরণ অস্বাভাবিক মনে হলে তা এড়িয়ে না গিয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। কারণ অনেক সময় সেই আচরণের পেছনে লুকিয়ে থাকে গভীর ট্রমা।
জয়া আহসান: অভিনয়ের বাইরে এক সংবেদনশীল মানুষ
এই সাক্ষাৎকারে শুধু একজন অভিনেত্রী নয়, একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবেও ধরা দিলেন জয়া আহসান। শিশু নির্যাতনের মতো কঠিন বিষয় নিয়ে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, দিদিমার প্রতি কৃতজ্ঞতা, নিজের দুর্বলতাকে স্বীকার করার সাহস — সব মিলিয়ে তাঁর ব্যক্তিত্বের এক মানবিক দিক উঠে এসেছে।
তিনি বলেন,
“আমরা অনেক কিছু ইগনোর করি। কিন্তু মানুষের ভিতরে কতটা যন্ত্রণা জমে থাকে, সেটা বুঝি না। এই ছবিটা সেই জায়গায় আলো ফেলতে চায়।”