Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার ইচ্ছা থাকলে দলের হয়েই বলতাম: ‘হোক কলরব’ মুক্তির পর রাজ চক্রবর্তী

“একজন চিকিৎসক যেমন রোগী কোন দলের সমর্থক সেটা দেখেন না, আমিও ‘রংহীন’ হয়েই ছবি পরিচালনা করেছি।”সাক্ষাৎকার দেওয়ার আগে কড়া শর্ত। রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন নয়। ‘দেশু ৭’ নিয়েও নয়! একই কথা শুনতে শুনতে ক্লান্ত তিনি। এ দিকে, বাঙালির প্রেমদিবসে ‘হোক কলরব’! ‘প্রেমিকসত্তা’ও কি অতীত ? আনন্দবাজার ডট কম-এর মুখোমুখি পরিচালক রাজ চক্রবর্তী।

প্রশ্ন: সরস্বতীপুজোয় বিপ্লবের বার্তা? রাজ চক্রবর্তী তো প্রেমের ছবির ‘স্পেশ্যালিস্ট’!

রাজ: (মাথা নাড়িয়ে প্রতিবাদ) পরিচালকের কোনও তকমা হতেই পারে না। ইনি প্রেমের ছবি বানাতে পারেন। উনি বিপ্লবের বার্তায় পারদর্শী। তা হলে তো সবটাই ভীষণ একঘেয়ে হয়ে যাবে। এই আপনিই কিন্তু তখন বলবেন, আমি তো একই রকম ছবি বানাই! শুভশ্রীকে নিয়ে পর পর ছবি বানালে যেমন বলেন, আমি অভিনেত্রী স্ত্রীকে নিয়েই ছবি বানাই। আসলে ঠিক কী বলতে চান? (একটু থেমে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে) পরিচালক হিসাবে আমি সব ধরনের ছবিই করতে চাই। এমন ছবি বানাতে চাই, যাতে আজ থেকে ২০ বছর পরে ছেলের সঙ্গে বসে ছবিটা নিয়ে আলোচনায় বসতে পারি।

প্রশ্ন: ‘হোক কলরব’ মুক্তির আগে কাকতালীয় ভাবে এসআইআর, স্ক্রিনিং কমিটি নিয়ে গোলযোগ, টলিউডের ‘লালবাজার অভিযান’! প্রেক্ষাপট তৈরিই ছিল?

রাজ: প্রথমটি ছা়ড়া বাকিগুলো ইন্ডাস্ট্রির অভ্যন্তরীণ সমস্যা। এরকম সমস্যা প্রত্যেক ইন্ডাস্ট্রিতেই কমবেশি থাকে।

প্রশ্ন: তা বলে লালবাজারে তারকারা!

রাজকেউ হেনস্থার শিকার হয়েছেন বলে মনে করেছেন। তাই লালবাজার গিয়েছেন। ঠিক জায়গাতেই তো গিয়েছেন! ওখানে প্রশাসনিক সহযোগিতা পাবেন। ঘরে বসে সমাজমাধ্যমে তো চাট্টি বাজে কথা লেখেননি!

প্রশ্ন: আপনি পর্দায় ‘কলরব’ তুললেন?

রাজ: অনেক দিন ধরেই ‘অ্যান্টি র‌্যাগিং’ নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে। ইদানীং মনে হয়, এখন যে ছবিগুলো করব, সেগুলো ইস্যুভিত্তিক ছবি হোক। ছবিতে বার্তা থাকুক। যে ছবি নিয়ে ১০ বা ২০ বছর পরেও কথা বলতে পারি। বিনোদনধর্মী বা ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ ছবিও বানাতে চাই। তার মাঝখানে না হয় একটু অন্য ধারার ছবিও বানালাম। ‘হোক কলরব’ এই ভাবনার ফসল। আর ‘র‌্যাগিং’-এর মধ্যে দিয়ে আমরা সবাই এসেছি। স্কুল-কলেজ, পাড়ার ক্লাব, পাড়ার রক, পেশাজীবন— কোথায় র‌্যাগিং নেই! কিন্তু গণ্ডি পেরোলেই ঘটে অঘটন। সেটা থামাতেই এই ছবির ভাবনা। এটা আরও একটি কারণ।

প্রশ্ন: রাজ চক্রবর্তীর সঙ্গে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, অভিনেতা-রাজনীতিবিদ পার্থ ভৌমিক ‘কমন ফ্যাক্টর’?

রাজ: কারণ, পরপর আমরা ‘আবার প্রলয়’, ‘হোক কলরব’ করলাম। এর পরে অন্যদের নিয়ে যখন কাজ করব, তখন তাঁরাও ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠবেন। আসলে পুরোটাই নির্ভর করে, আমরা কার সঙ্গে কত দিন ‘ঘর’ করছি। এঁরা একই ভাবে আমার ‘লাকি জুটি’ও। বলতে পারেন, এঁদের নিয়ে পরীক্ষানীরিক্ষা করাটাও তাই আমার পক্ষে সহজ (বলেই হাসি)। লিখবেন, এঁরা আমার ‘সচিন-সহবাগ’।

প্রশ্ন: বাকি অভিনেতাদের যখন বাছলেন, তখন তারকা বাছলেন না...

রাজ: এই ছবিতে তারকাদের তো দরকার পড়েনি! ‘সন্তান’ ছবিতে তারকার দরকার ছিল। ছবিতে মিঠুন চক্রবর্তী, শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়, ঋত্বিক চক্রবর্তীরা ছিলেন। এই ছবি তারকা তৈরির ছবি।

প্রশ্ন: ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে শাসকদলের বিধায়ক আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি ঘটনা পর্দায় দেখালেন। দর্শক কী বলছেন, ছবির গল্প দলের পক্ষে গেল না বিপক্ষে?

রাজআমি ছবির মাধ্যমে এটাই দর্শকদের বোঝাতে চেয়েছি, পরিচালক রাজ চক্রবর্তী আর বিধায়ক রাজ চক্রবর্তী এক নন। দুটো সত্তাকে আলাদা করতে জানি। এই ছবিতে কোনও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নেই। দর্শকেরাও ছবি দেখে নিশ্চয়ই বুঝেছেন। রাজনৈতিক এজেন্ডা থাকলে অবশ্যই নিজের দলের হয়েই বার্তা দিতাম। একজন চিকিৎসক যেমন রোগী কোন দলের সমর্থক সেটা দেখেন না, আমিও ‘রংহীন’ হয়েই ছবি পরিচালনা করেছি। বরং বলতে পারেন, খুব সাবধানি হয়ে প্রতিটা দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেছি। যাতে যা বলতে চাই, সেটা নিরপেক্ষ ভাবে দেখাতে পারি।

প্রশ্ন: ছাত্রাবস্থায় রাজনীতি আদৌ কাম্য? দুই বাংলার পরিস্থিতি দেখে কী মনে হয়?

রাজ: অবশ্যই ছাত্র আন্দোলন, ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজন আছে। যাবতীয় বিপ্লব, প্রতিবাদ তো ওঁরাই করেন। ওঁরা সমাজ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। ছাত্রাবস্থা থেকে রাজনীতি শুরু করলে দেশ কিন্তু ভাল নেতা পায়। এই মুহূর্তে যাঁরা তাবড় রাজনীতিবিদ, আমার মনে হয়, তাঁরা কোনও না কোনও সময় ছাত্রাবস্থাতেও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

প্রশ্ন: রাজ চক্রবর্তীও তা-ই?

news image
আরও খবর

রাজ: না, আমি ছাত্রাবস্থায় রাজনীতি করিনি। অনেক পরে এসেছি। আমার মতো অনেকেই পরে রাজনীতিকে ভালবেসে যোগ দিয়েছেন। (একটু থেমে) দেখুন, আমরা বাঙালি। আমাদের ডিএনএ-তে রাজনীতি। সরাসরি এই পেশায় না থাকলেও প্রত্যেকে কমবেশি রাজনীতিসচেতন। যেমন, আমাদের রক্তে ফুটবল-ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসা, উন্মাদনা রয়েছে, আমাদের রক্তে একই ভাবে শিল্প-সংস্কৃতি, ভাল খাবারের প্রতি ঝোঁক রয়েছে। এগুলো আমাদের থাকবে। চাইলেও, না-চাইলেও। রাজনীতিও তেমনই। যদিও এখনকার রাজনীতি সমাজমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ। এই প্রজন্ম এখানেই রাজনীতি করতে ভালবাসে। তাঁরা ভাবেন, আবার রাস্তায় নামবেন? জলে-ঝড়ে ঝান্ডা নিয়ে বেরোবেন? ব্যতিক্রমও আছেন। তাঁরা পথে নেমেই আন্দোলন করেন।

প্রশ্ন: পথে নামা সব আন্দোলন সফল? সাম্প্রতিক আরজি কর আন্দোলন কি তা-ই বলছে?

রাজ: কখনও হয়েছে, কখনও হয়নি। আরজি কর আন্দোলনকে আপনি এক ভাবে দেখছেন। আমি এক ভাবে দেখি। পার্থ ভৌমিক আর এক ভাবে দেখেন। প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গির ফারাক রয়েছে। আরজি কর নিয়ে ছবি বানাতে গেলেই এক এক জন পরিচালক এক এক ভাবে বানাবেন! কারণ, আসল গল্প কেউ জানেন না। সিবিআই তদন্তের পরেও কিন্তু প্রকৃত ঘটনা অজানাই। ফলে, আন্দোলন ব্যর্থ না সার্থক— এটা বলার জায়গা বোধহয় এখনও আসেনি। এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলি?

প্রশ্ন: বলুন না...

রাজ: আমি কিন্তু এমন লোকও দেখেছি, যাঁরা ঝান্ডা হাতে পথ হেঁটেছেন, তাঁরা পরের দিন বাড়ি ফিরে সুখে নিদ্রা গিয়েছেন! আবার আন্দোলন করতে এসে ‘বয়কট বাবলি’, ‘বয়কট বাংলা ছবি’ও করেছেন অনেকে। তাঁরাই কিন্তু মাল্টিপ্লেক্সে ‘স্ত্রী ২’ দেখে পার্টিতে মেতেছেন! এরকম আন্দোলন কোনও দিনই ধোপে টিকবে না। এটাও সমাজমাধ্যমে দেখানো ইদানীং কালের আন্দোলনের মতোই। আবার বলছি, সবাই নন। সিংহভাগ এই দলে। ব্যতিক্রমীদের অবশ্যই সাধুবাদ প্রাপ্য। তাঁরা কিন্তু আজও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। আজ ‘হোক কলরব’ হচ্ছে। আগামী দিনে হয়তো ‘আরজি কর আন্দোলন’ হবে! সারা ক্ষণ রাজ্য সরকারকে খারাপ বললে হবে? সরকার খারাপ হলে বার বার মানুষ নির্বাচনে জিতিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আনত না।

প্রশ্ন: ‘রংহীন’ ছবি বানানোর পরেই রাজ চক্রবর্তীর পরিচালনায় ‘লক্ষ্মী এল ঘরে’...

রাজ: আপনাদের সকলের কাছে হয়তো খবর নেই, এই ছবির পরিচালক অরিজিৎ টোটন চক্রবর্তী। আমার হয়তো কিছু সহযোগিতা রয়েছে। এটা আমার পরিচালনা নয়। এটি একটি সরকারি তথ্যচিত্র। পুরোটাই তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবনা।

প্রশ্ন: ছবির প্রসঙ্গে ফিরি। নতুনদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন? এই ছবিতেও এক ঝাঁক মঞ্চাভিনেতা...

রাজ: সেটা তো ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ ছবি থেকেই। ‘লে ছক্কা’, ‘কানামাছি’— কোনও ছবিতেই বাদ যায়নি। নতুনদের নিয়ে কাজের অনেক মজা, অনেক সুবিধা। কাজ করতে করতে ওদের থেকে অনেক কিছু শিখেছি। এই প্রজন্মের অনেক কিছু জানি না। ওদের দেখে সেগুলো রপ্ত করেছি। আবার নতুনদের না নিয়ে এলে ইন্ডাস্ট্রি যে ক্রমশ ছোট হয়ে আসবে! আমিই তো আর আগামী দিনে কাজ করতে পারব না।

প্রশ্ন: নিন্দকেরা যেমন বলে, টলিউড যেমন নির্দিষ্ট কিছু মুখে আটকে গিয়েছে...

রাজ: আপনিও তো সেই চেনামুখদেরই ঘুরিয়েফিরিয়ে ফোন করেন! (দম নিয়ে) সেটা নয়। টলিউড নির্দিষ্ট কিছু মুখে আটকে যায়নি। ছবি অনুযায়ী অভিনেতা বাছা হয়। নতুনদের সঙ্গে কাজ করতে অনেকে সাহস পান না। ভয় পান। সে ক্ষেত্রে নতুন কোনও অভিনেতা পরীক্ষায় পাশ করে এগিয়ে গেলে তাঁকে নিয়ে আরও পাঁচটা কাজ হয়।

প্রশ্ন: আপনার ছবি নতুন তারকার জন্ম দেবে?

রাজ: একটা নাম বলতে পারব না। অনেকগুলো নাম আছে। যেমন, ভাস্কর, অর্ক, অর্ণব, অভিকা, সায়ন্তন। আর দেবযানী। পার্থদার সঙ্গে নিয়মিত নাটক করেন। এঁরা প্রত্যেকে ভীষণ প্রতিভাধর।

এই কথোপকথনের মধ্য দিয়েই টলিউডের একটি দীর্ঘদিনের বিতর্কিত প্রসঙ্গ আবার সামনে আসে—ইন্ডাস্ট্রিতে কি সত্যিই নতুন মুখদের জায়গা পাওয়া কঠিন, নাকি বিষয়টি সাহস ও বিশ্বাসের অভাব? রাজের বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি সমস্যাটিকে একপাক্ষিক ভাবে দেখছেন না। তাঁর মতে, একই মুখ বারবার দেখা যাওয়ার কারণ আসলে অলসতা নয়, বরং বাণিজ্যিক ঝুঁকি ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। প্রযোজক ও পরিচালকরা এমন মুখের দিকেই ঝোঁকেন, যাঁদের বাজারমূল্য পরীক্ষিত।

তবে রাজ এটাও মানছেন, নতুনদের নিয়ে কাজ করতে ভয় পান অনেকেই। একটি ছবি ব্যর্থ হলে দায় গিয়ে পড়ে পরিচালকের উপরই। সেই জায়গায় নতুন কোনও অভিনেতা যদি অডিশন বা পরীক্ষার মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করতে পারে, তাহলে সুযোগ শুধু একবারেই থেমে থাকে না। বরং তখন সেই অভিনেতার জন্য কাজের দরজা খুলে যায়।

রাজ যে নামগুলো উল্লেখ করেছেন, সেগুলোও ইঙ্গিতবহ। তিনি কোনও একক “স্টার” তৈরির কথা বলছেন না, বরং একটি শক্তিশালী দল বা প্রজন্মের কথা বলছেন। ভাস্কর, অর্ক, অর্ণব, অভিকা, সায়ন্তন বা দেবযানীর মতো শিল্পীরা হয়তো এখন মূলধারার শিরোনামে নেই, কিন্তু থিয়েটার ও নাটকের মঞ্চে নিয়মিত কাজ করে নিজেদের দক্ষতা শানিয়ে তুলছেন।

এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বোঝা যায়, রাজের কাছে তারকাখ্যাতির চেয়ে অভিনয়শক্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ছবির মাধ্যমে হয়তো রাতারাতি “সুপারস্টার” তৈরি হবে না, কিন্তু যদি একদল দক্ষ অভিনেতা ইন্ডাস্ট্রিতে জায়গা করে নিতে পারেন, সেটাই টলিউডের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বেশি মূল্যবান হয়ে উঠবে।

Preview image