জন্মহার কমে যাওয়া বর্তমানে একাধিক রাজ্যের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মোকাবিলায় উদ্যোগী অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার। চন্দ্রবাবু দাবি করেছেন, অভিনব পদ্ধতিতে জন্মহার সমস্যার মোকাবিলা করবে তাঁর সরকার।
অন্ধ্রপ্রদেশে জন্মহার কমে যাওয়ার সমস্যাকে সামনে রেখে এক অভিনব পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী N. Chandrababu Naidu। রাজ্যে যদি কোনও দম্পতি দুই বা তার বেশি সন্তানের জন্ম দেন, তবে তাঁদের ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। রাজ্যের বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই সম্ভাব্য প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। চলতি মাসের মধ্যেই এই প্রকল্প আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বর্তমানে শুধু অন্ধ্রপ্রদেশই নয়, ভারতের একাধিক রাজ্য জন্মহার কমে যাওয়ার সমস্যার মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পরিবার পরিকল্পনা, নগরায়ন, শিক্ষার প্রসার, কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে অনেক পরিবার এখন কম সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ফলে অনেক জায়গাতেই জন্মহার ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে জনসংখ্যার ভারসাম্যের উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অন্ধ্রপ্রদেশে বর্তমানে মোট প্রজনন হার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট (TFR) প্রায় ১.৫। অর্থাৎ গড়ে একটি দম্পতি জীবনে দেড়টি সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। জনসংখ্যার স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাধারণত এই হার ২.১ হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করা হয়। এটিকে ‘রিপ্লেসমেন্ট লেভেল’ বলা হয়। অর্থাৎ একটি প্রজন্মের মানুষকে প্রতিস্থাপন করার জন্য পরবর্তী প্রজন্মে যতজন মানুষের প্রয়োজন, সেই সংখ্যাকে ধরে রাখতে এই হার গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অন্ধ্রপ্রদেশে এই হার এখন সেই স্তরের নিচে নেমে এসেছে। ফলে আগামী দিনে রাজ্যের জনসংখ্যার গঠন বদলে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেই নতুন পরিকল্পনার কথা ভাবছে অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, যদি কোনও দম্পতি দুই বা তার বেশি সন্তানের জন্ম দেন, তবে সন্তান জন্মের সময়েই তাঁদের ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। সরকারের আশা, এই আর্থিক প্রণোদনা মানুষকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করতে পারে।
বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে N. Chandrababu Naidu বলেন, “আমরা একটি অভিনব পদ্ধতির কথা ভাবছি। কোনও দম্পতি যদি দুই বা তার বেশি সন্তানের জন্ম দেন, তবে আমরা তাঁদের ২৫ হাজার টাকা করে দেব। সন্তান জন্মের সময়েই এই টাকা দেওয়া হবে। এই প্রকল্প যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা জন্মহার বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ভারতের বেশ কিছু রাজ্যে জন্মহার দ্রুত কমছে। দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিতে এই প্রবণতা আরও বেশি স্পষ্ট। অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, কেরল, কর্নাটক— এই রাজ্যগুলিতে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার হার বেশি এবং পরিবার পরিকল্পনা সচেতনতা তুলনামূলকভাবে উন্নত। ফলে অনেক পরিবার এখন ছোট পরিবারে বিশ্বাস করে। এক বা দুই সন্তানের বেশি নিতে অনেকেই অনিচ্ছুক।
তবে জন্মহার কমে যাওয়ার ফলে ভবিষ্যতে একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। কারণ যদি জন্মহার খুব বেশি কমে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যেতে পারে। এর ফলে অর্থনীতির উপর চাপ বাড়তে পারে। বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বাড়লেও কর্মক্ষম তরুণ প্রজন্ম কমে গেলে সমাজে ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
বিশ্বের বহু দেশ ইতিমধ্যেই এই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। যেমন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, জার্মানি— এই দেশগুলিতে জন্মহার দীর্ঘদিন ধরে খুব কম। ফলে সেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। অনেক জায়গায় জনসংখ্যা কমতেও শুরু করেছে। এর ফলে শ্রমশক্তির ঘাটতি, অর্থনৈতিক চাপ এবং সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনের মতো সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই অনেক সরকার এখন জন্মহার বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা চালু করছে। অনেক দেশে সন্তান জন্ম দিলে নগদ অর্থ দেওয়া, কর ছাড়, শিশু লালনপালনের খরচে সহায়তা, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি— এই ধরনের নানা সুবিধা দেওয়া হয়।
অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের নতুন পরিকল্পনাও সেই ধরনের একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও এখনও প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়নি, তবে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে পরিষ্কার যে রাজ্য সরকার জন্মহার বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আর্থিক প্রণোদনা দিলেই জন্মহার বৃদ্ধি পাবে এমন নয়। এর সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক পরিবার সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিক্ষার খরচ, স্বাস্থ্য পরিষেবা, বাসস্থান, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা— এই সব বিষয় বিবেচনা করে। তাই জন্মহার বাড়াতে হলে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নীতিও প্রয়োজন।
তারপরও অনেকেই মনে করছেন, সরকারের এই উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। এটি বোঝাচ্ছে যে জনসংখ্যা নীতি এখন নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছে বিভিন্ন রাজ্য। একসময় যেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধ করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য, এখন সেখানে অনেক জায়গায় জন্মহার বৃদ্ধিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে।
অন্ধ্রপ্রদেশের এই সম্ভাব্য প্রকল্প সফল হলে ভবিষ্যতে অন্য রাজ্যগুলিও একই ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিতে যেখানে জন্মহার ইতিমধ্যেই কমে গেছে, সেখানে এই ধরনের পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের এই উদ্যোগ একটি নতুন জনসংখ্যা নীতির দিক নির্দেশ করছে। জন্মহার কমে যাওয়ার সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার যদি সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তবে তা ভবিষ্যতে জনসংখ্যার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ঘোষণার পর এই প্রকল্প বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং তা রাজ্যের মানুষের উপর কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।
উপসংহার:
সব মিলিয়ে বলা যায়, অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের এই সম্ভাব্য প্রকল্প বর্তমান সময়ের জনসংখ্যা নীতির একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে নিয়ে এসেছে। একসময় যেখানে অধিক জনসংখ্যা ছিল প্রশাসনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, সেখানে এখন পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। সমাজের পরিবর্তন, শিক্ষা বিস্তার, নগরায়ন, কর্মব্যস্ত জীবন এবং আর্থিক চাপ— এই সব কারণ মিলিয়ে বহু পরিবার এখন কম সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ফলে অনেক রাজ্যেই জন্মহার দ্রুত কমে আসছে। এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে সমাজ ও অর্থনীতির উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
অন্ধ্রপ্রদেশে বর্তমানে জন্মহার প্রতিস্থাপন স্তরের নিচে নেমে যাওয়ায় সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখছে। সেই কারণেই দুই বা তার বেশি সন্তান হলে দম্পতিদের আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার মতো একটি পরিকল্পনার কথা ভাবা হয়েছে। এই ধরনের উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হল মানুষকে সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করা এবং ভবিষ্যতের জনসংখ্যা কাঠামোকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখা। যদি এই প্রকল্প কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা শুধু জন্মহার বৃদ্ধিতেই সাহায্য করবে না, বরং পরিবারগুলিকে কিছুটা আর্থিক সহায়তাও দিতে পারে।
তবে বাস্তবিক দিক থেকে দেখলে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল। একটি পরিবার কতজন সন্তান নেবে, তা কেবল অর্থের উপর নির্ভর করে না। পরিবারের আর্থিক অবস্থা, শিক্ষার খরচ, স্বাস্থ্য পরিষেবা, বাসস্থান, কর্মসংস্থান, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা— এই সব বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আধুনিক সমাজে সন্তান লালনপালনের খরচ অনেক বেশি। ফলে অনেক দম্পতি সচেতনভাবে ছোট পরিবারকে বেছে নিচ্ছেন। তাই জন্মহার বৃদ্ধির জন্য শুধু আর্থিক প্রণোদনা যথেষ্ট নাও হতে পারে; এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতিও প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মাতৃত্বকালীন সহায়তা, শিশু লালনপালনের অবকাঠামো এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ উন্নত করতে পারে, তবে মানুষ আরও নিশ্চিন্তে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। পাশাপাশি কর্মজীবী নারীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাতৃত্বকালীন ছুটি, শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র, নমনীয় কর্মঘণ্টা— এই ধরনের নীতি অনেক ক্ষেত্রে জন্মহার বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা নিতে পারে।
বিশ্বের বহু দেশ ইতিমধ্যেই এই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশে জন্মহার দীর্ঘদিন ধরে কম থাকার ফলে জনসংখ্যার বয়স কাঠামো বদলে গেছে। সেখানে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু কর্মক্ষম তরুণ প্রজন্ম তুলনামূলকভাবে কম। এর ফলে অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই অনেক সরকার এখন জন্মহার বৃদ্ধির জন্য নানা ধরনের নীতি গ্রহণ করছে।
অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের পরিকল্পনাকেও সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের মধ্যে দেখা যায়। এটি শুধুমাত্র একটি আর্থিক প্রকল্প নয়, বরং ভবিষ্যতের জনসংখ্যা ভারসাম্য বজায় রাখার একটি প্রচেষ্টা। জনসংখ্যা কাঠামো সঠিক না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই সরকারের এই উদ্যোগকে অনেকেই একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
তবে এই প্রকল্প সফল হবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করবে তার বাস্তবায়নের উপর। কত দ্রুত এবং কতটা স্বচ্ছভাবে এই সুবিধা মানুষের কাছে পৌঁছায়, কতজন দম্পতি এই প্রকল্পের আওতায় আসেন এবং সমাজে এর বাস্তব প্রভাব কতটা পড়ে— সেই সব বিষয় আগামী দিনে পরিষ্কার হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই উদ্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জনসংখ্যা নীতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে হয়। সমাজের প্রয়োজন, অর্থনীতির বাস্তবতা এবং মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীতিও পরিবর্তিত হতে হয়। অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের এই পরিকল্পনা সেই পরিবর্তনেরই একটি উদাহরণ।
ভবিষ্যতে যদি এই প্রকল্প কার্যকর প্রমাণিত হয়, তবে অন্যান্য রাজ্যও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবতে পারে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে জন্মহার দ্রুত কমছে, সেখানে এই ধরনের নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
অতএব বলা যায়, জন্মহার বৃদ্ধি নিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের এই পরিকল্পনা শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভবিষ্যতের সমাজ ও অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টা। এখন দেখার বিষয়, ঘোষণার পর এই প্রকল্প বাস্তবে কতটা সফল হয় এবং তা মানুষের জীবন ও জনসংখ্যার প্রবণতার উপর কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।