Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

শীতের সকালে জগিং হাঁটা বা দৌড়ের পর কী খাবেন, জানুন ফিটনেস বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

শীতের সকালে জগিং বা হাঁটার পর কী খেলে শরীর সবচেয়ে বেশি উপকার পায়, তা অনেকেই ঠিক জানেন না। ব্যায়ামের পর সঠিক খাবার বেছে নিলে শক্তি ফেরে দ্রুত, পেশিও পায় পুষ্টি। এখানে জেনে নিন কোন খাবারগুলো আপনার জন্য সবচেয়ে উপযোগী

শীত পড়তেই সকালগুলি হয়ে ওঠে খানিক অলস, কিন্তু সেই অলসতাকে দূরে সরিয়ে ফিটনেস সচেতন অনেকেই রোজ ভোরবেলা জগিং, দৌড়োনো বা দ্রুত হাঁটার অভ্যাস বজায় রাখেন। ঠান্ডা হাওয়া, কুয়াশার ভিতর দৌড়োনোর অনুভূতি যেমন মনকে সতেজ করে, তেমনই শরীরের জন্যও অত্যন্ত উপকারী। কিন্তু দৌড়োনোর ঠিক পরে কী খাওয়া উচিত তা অনেকেই জানেন না। অনেক সময় ভুল খাবার খেয়ে নেওয়ার কারণে শরীরের উপকার তো দূরের কথা, উল্টে ক্ষতিও হতে পারে। তাই ব্যায়ামের পরে খাদ্যাভ্যাস কেমন হবে, তা জেনে রাখা অত্যন্ত দরকার।

মানুষ যখন দৌড়োয় বা জগিং করে, তখন শরীর প্রচুর এনার্জি খরচ করে। পেশি ব্যবহার হয়, ঘাম ঝরে, হার্টবিট বাড়ে, শরীর গরম হয়—এ সবই শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু দৌড় শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ভিতরে যে জলশূন্যতা তৈরি হয়, ইলেক্ট্রোলাইটের ঘাটতি তৈরি হয় এবং পেশি যে পরিশ্রম করে ক্লান্ত হয়ে পড়ে—তাকে সঠিক পুষ্টির মাধ্যমে সন্তুলিত করা জরুরি। ভুল খাবার বেছে নিলে দৌড়োনোর উপকারিতা অনেকটাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দৌড়োনোর পরই যদি কেউ ঠান্ডা জল, খুব গরম কফি বা মিষ্টি পানীয় খেয়ে নেয়, তবে তা শরীরের জন্য মোটেও উপকারী নয়। বরং শরীরে যে ক্যালোরি খরচ হয়েছিল তা আবার বেড়ে যেতে পারে।

এখনকার দিনে অফিসে দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা, সেই সঙ্গে অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, স্ট্রেস, রাতে কম ঘুম—এসব কারণে শরীরের এনার্জি ব্যালান্স দ্রুত নষ্ট হয়। এই পরিস্থিতিতে ব্যায়ামই শরীরকে সুস্থ রাখার অন্যতম উপায়। তবে ব্যায়াম করার পর কীভাবে খাবার তালিকা বানাবেন, তার নিয়ম না জানলে দৌড়োনোর উপকার অনেকটাই কমে যায়। তাই জগিং বা দৌড়ানোর পরে ঠিক কী খাবেন, কতটা খাবেন এবং কখন খাবেন—এই সবকিছুর বিশদ ধারণা থাকা জরুরি।


জগিং বা দৌড়োনোর মাঝখানে কী খাবেন?

শরীরচর্চার মাঝে খাবার নয়, শুধু জল—এই নিয়মই সেরা।
অনেকেই ভাবেন জগিং-এর মাঝখানে ব্ল্যাক কফি বা এনার্জি ড্রিঙ্ক খেলে এনার্জি দ্রুত ফেরে। কিন্তু ভারতের আবহাওয়ায় ঘাম ঝরানোর সময়ে ক্যাফেইনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে তা শরীরের উপর চাপ বাড়ায়। ক্যাফেইন ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই দৌড়োনোর মাঝখানে:

  • এক চুমুক জল

  • অথবা ইলেক্ট্রোলাইট মেশানো লঘু পানীয়

এ দু’টো ছাড়া অন্য কিছু না খেলেই ভাল।


জগিং করে ফিরে এসে প্রথমে কী করবেন? (Post-Run Hydration)

দৌড়িয়ে ফিরে এসেই শরীর ক্লান্ত থাকে। পেশিগুলো শক্ত হয়ে আসে, শরীরে ঘাম ঝরার কারণে সোডিয়াম-পটাশিয়ামের ঘাটতি হয়। এই অবস্থায় প্রথমেই প্রয়োজন শরীরের জলের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা।

১) জল পান

খুব দ্রুত অনেকটা জল খেয়ে ফেলা উচিত নয়। বরং:

  • এক গ্লাস জল

  • কিছুটা সময় পর আরও আধ গ্লাস

  • এভাবে ধীরে ধীরে জল পান করুন

এতে শরীর সহজে জল শোষণ করতে পারে।

২) ইলেক্ট্রোলাইট ড্রিঙ্ক

বাজারচলতি এনার্জি ড্রিঙ্ক নয়—তা হলে শরীরে অপ্রয়োজনীয় চিনি ঢুকে যাবে।
তার বদলে ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর ইলেক্ট্রোলাইট ড্রিঙ্ক বানিয়ে নিতে পারেন।


ঘরে তৈরি ইলেক্ট্রোলাইট / এনার্জি ড্রিঙ্ক (৩টি উপকারী রেসিপি)

রেসিপি ১: নারকেল জল + লেবু + পিঙ্ক সল্ট

নারকেল জল শরীরের জন্য আদর্শ কারণ এতে থাকে পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, সোডিয়াম—যা ঘামের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়।

উপকরণ:

  • ১ গ্লাস নারকেল জল

  • অর্ধেক লেবুর রস

  • এক চিমটে পিঙ্ক সল্ট বা সৈন্ধব লবণ

উপকারিতা:

  • মুহূর্তে শক্তি ফেরায়

  • ডিহাইড্রেশন কমায়

  • খনিজের ঘাটতি পূরণ করে


রেসিপি ২: ডাবের জল + কমলালেবুর রস + মুসাম্বি + লেবু + পুদিনা

এই পানীয়টি ভিটামিন সি-তে ভরপুর, ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

উপকরণ:

  • ২ কাপ জল

  • ১ কাপ ডাবের জল

  • আধ কাপ কমলালেবুর রস

  • এক চামচ মুসাম্বির রস

  • এক চামচ লেবুর রস

  • আধ চামচ সৈন্ধব লবণ

  • ১–২ চামচ মধু

  • কয়েকটি পুদিনা পাতা

উপকারিতা:

  • অত্যন্ত শক্তিবর্ধক

  • পেশির ক্লান্তি কমায়

  • শরীরকে ঠান্ডা রাখে


রেসিপি ৩: অ্যাপল সাইডার ভিনিগার ড্রিঙ্ক

অ্যাপল সাইডার ভিনিগার শরীরের পিএইচ স্তর ঠিক রাখে এবং হজম শক্তি বাড়ায়।

উপকরণ:

  • ২ গ্লাস জল

  • ২ চামচ ACV

  • ১ চামচ লেবুর রস

  • ১–২ চামচ মধু

  • আধ চামচ পিঙ্ক সল্ট

উপকারিতা:

  • ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি কমায়

  • হজম শক্তি উন্নত করে

  • ক্লান্তি দূর করে


দেরিতে খাবার নয়—সময় মেনে খাবেন (One-Hour Rule)

দৌড়ানোর প্রায় এক ঘণ্টা পরে খেতে হবে। কারণ:

  • প্রথমেই ইলেক্ট্রোলাইট ও জল চাহিদা পূরণ করতে হয়

  • পাকস্থলী তখনই খাবার গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হয়

  • শরীর তখন পুষ্টি শোষণ করতে সক্ষম থাকে

দৌড়োনোর পরে খাবারের মূল লক্ষ্য হলো:


এক ঘণ্টা পরে কী খাবেন? (Balanced Recovery Meal)

এখানে খেয়াল রাখতে হবে যে খাবারে তিনটি উপাদান সমানমাত্রায় থাকা জরুরি:

  • প্রোটিন

  • হেলদি ফ্যাট

  • গুড কার্বোহাইড্রেট

১) চিকেন-সব্জি স্যান্ডউইচ + ফল

অফিসগামীদের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক।

উপকারিতা:

  • চিকেনে ভালো প্রোটিন রয়েছে

  • সব্জিতে ফাইবার

  • রুটি বা ব্রেড থেকে কার্বোহাইড্রেট

  • আপেল/নাশপাতি/পেয়ারা শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট দেয়


২) ডালিয়ার খিচুড়ি বা চিঁড়ের পোলাও

হালকা, পুষ্টিকর, সহজ পাচ্য।

উপকারিতা:

  • ফাইবারে ভরপুর

  • কম তেলে রান্না করা যায়

  • দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকে


৩) বেসনের চিল্লা / মাল্টিগ্রেন রুটি + সব্জি + ডিম বা চিকেন

যাঁরা নিরামিষ খান তাঁদের জন্য আছে পনির বা মাশরুম।

উপকারিতা:

  • বেসনে প্রোটিন

  • রুটিতে কার্ব

  • সব্জিতে ভিটামিন-ফাইবার


৪) দই বা দুধ দিয়ে স্মুদি

বিশেষত শীতকালে খুব উপকারী।

স্মুদি বানাতে পারেন

  • দুধ

  • আপেল

  • কলা

  • মুসাম্বি

  • কিছু বাদাম

উপকারিতা:

  • পেশির জন্য কেসিন প্রোটিন

  • ফলের প্রাকৃতিক গ্লুকোজ

  • হজমশক্তি উন্নত করে


৫) বাড়িতে তৈরি প্রোটিন শেক

বাজারের প্রোটিনে প্রিজারভেটিভ থাকে, তাই ঘরোয়া পদ্ধতিতে বানানোই উত্তম।

উপকরণ:

  • ১টি পাকা কলা

  • ২ চামচ পিনাট বাটার

  • ১ চামচ ভ্যানিলা প্রোটিন পাউডার

  • আধ কাপ দই

  • আধ চামচ দারচিনি

উপকারিতা:

  • দ্রুত শক্তি ফেরে

  • পেশির পুনর্গঠন হয়

  • লম্বা সময় পেট ভরা থাকে


হাঁটা বা দৌড়ানোর পরে কী খাওয়া যাবে না?

দৌড় শেষ করে ভুল খাবার খেলে পুরো পরিশ্রম নষ্ট হয়ে যায়। যেমন:

 ঠান্ডা জল

ইনস্ট্যান্ট শক হতে পারে, গলা ব্যথা, সর্দি-কাশি দেখা দিতে পারে।

 খুব গরম কফি বা চা

পানিশূন্যতা বাড়ায়, ক্যালোরিও বাড়ে।

 বাজারের মিষ্টি এনার্জি ড্রিঙ্ক

চিনি অতিরিক্ত থাকে, ওজন বাড়ায়।

 ভাজাভুজি

পেট ভারী হয়, হজম খারাপ হয়।

 প্যাকেটজাত জুস

অতিরিক্ত চিনি ও প্রিজারভেটিভ থাকে।


ব্যায়ামের পরে খাবার কেন জরুরি? কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ

  • পেশিতে গ্লাইকোজেনের ঘাটতি পূরণ করতে

  • শরীরের ক্ষয় হওয়া টিস্যু মেরামত করতে

  • ক্লান্তি কমাতে

  • বিপাকক্রিয়া সক্রিয় রাখতে

  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে


উপসংহার

দৌড়োনো বা জগিং শরীরকে সুস্থ রাখার অন্যতম সহজতম উপায়। কিন্তু ব্যায়ামের পরে খাবার নিয়ে যদি অসাবধানতা থাকে, তবে পরিশ্রমের ফল মেলে না। তাই দৌড়ানোর পরে:

  • আগে জল

  • তারপর ইলেক্ট্রোলাইট

  • এক ঘণ্টা পরে সুষম প্রাতরাশ

এই নিয়ম মানলে শরীর শুধু সুস্থই থাকবে না, ওজনও কমবে, পেশিও শক্তিশালী হবে। প্রতিদিন নিয়ম মেনে সঠিক খাবার গ্রহণ করলে ব্যায়ামের ফল দ্বিগুণ হবে। তাই ব্যায়ামের পর শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ব্যায়ামের ফলে শরীরের গ্লাইকোজেন কমে যায়, পেশির সূক্ষ্ম ক্ষতও তৈরি হয়—এ সময় আদর্শ খাবার হল প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেটের সঠিক মিশ্রণ। যেমন ডিম, দুধ, দই, ওটস, চিনাবাদাম, কলা বা হোল গ্রেন ব্রেড। এগুলি শক্তি দ্রুত ফিরিয়ে আনে ও পেশির পুনর্গঠনে সাহায্য করে। সঙ্গে পর্যাপ্ত জল বা ইলেক্ট্রোলাইট নিলে শরীর হাইড্রেটেড থাকে। নিয়মিত এই অভ্যাস গড়ে তুললে শরীর আরও ফিট ও কর্মশক্তিতে ভরপুর থাকবে।

Preview image