Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

“ইলিশের মরশুমে স্বাদে মাতোয়ারা বাঙালি: বাজারে ফিরল রুপোলি সুখ”

ইলিশের মৌসুম এলেই বাঙালির রসনা উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে। রুপোলি ইলিশের সুবাস, স্বাদ আর নরম আঁশ ভরিয়ে তোলে প্রতিটি রান্নাঘর। বাজারে তাজা ইলিশ উঠতেই ক্রেতাদের ভিড় বাড়ে, আর শুরু হয় ইলিশপ্রেমীদের উৎসব।

ইলিশ—শুধু একটি মাছ নয়, এটি বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি, উৎসব, স্মৃতি, নদী, প্রকৃতি এবং রসনার ইতিহাসকে একসঙ্গে বেঁধে রাখে। ইলিশ শব্দটি উচ্চারণ করলেই কেমন যেন ভেতরে একটা গন্ধ এসে লাগে, ভাঁপ ওঠা পাতুরি, লম্বা কাটা ইলিশের ঝোল, কিংবা রাঁধুনির হাতে কমনীয়ভাবে তেলে ভাজা রুপোলি শরীরের সোনালি রং। বাঙালি জীবনের যে সকল খাদ্য স্মৃতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলেছে, তার মধ্যে ইলিশের জায়গা একেবারেই আলাদা। ইলিশ শুধু ভাতের সঙ্গে খাওয়া কোনও সাধারণ “মাছ” নয়—এটি উৎসব, এটি সামাজিকতার পরিচয়, এটি ঘরের বড়দের হাতের রান্নার প্রতি অদ্ভুত টান, এটি এক ধরনের পরিচয় যে আমরা বাঙালি, আমাদের স্মৃতিতে ইলিশের স্বাদ লীন হয়ে আছে।

ইলিশের গল্প শুরু হয় নদী থেকে। পদ্মা, মেঘনা, গঙ্গা—এই নদীগুলোর সঙ্গে ইলিশের সম্পর্ক বহুদিনের। নদীর স্রোতের স্বভাব, জলস্বাদ, খনিজের মাত্রা—সব মিলিয়ে ইলিশের মাংসের স্বাদ তৈরি হয় এমনভাবে, যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। এই কারণেই পদ্মার ইলিশকে বিশ্বে সেরা বলা হয়। এর মাংসে থাকে নরম, অসাধারণ স্নিগ্ধতা এবং অদ্ভুত এক মিষ্টি স্বাদ, যা মুখে নিতেই গলে যায়। পদ্মার ইলিশ নিয়ে যে আনন্দ, তা গঙ্গার ইলিশের সঙ্গে তুলনীয় হলেও দুইয়ের স্বাদে অল্প পার্থক্য রয়েছে। আবার সমুদ্র ইলিশের স্বাদ তুলনামূলক একটু ফিকে হলেও তার সাইজ বড় এবং তেলে ভাজার পর অন্য রকম স্বাদ তৈরি হয়।

ইলিশ যখন বর্ষার হাওয়ায় ভেসে নদীতে আসে, তখনই শুরু হয় বাঙালির উৎসব। রাধুনি, গৃহবধূ, বাবুর্চি, রেস্টুরেন্ট মালিক—যে-ই হোক না কেন, ইলিশের নাম শুনলেই রান্নাঘরের কল্পনায় যেন ঝড় ওঠে। পাটিসাপটা, পায়েস, লুচি—এসবের মতোই বঙ্গজীবনের এক অপরিহার্য অংশ ইলিশ। নববর্ষে ইলিশ-ভাত খাওয়া, দুর্গাপুজোর অষ্টমীর দিন ঘরে ইলিশ পড়া, বিয়ের সময় উপহারস্বরূপ ইলিশ দেওয়া—প্রাচীনকাল থেকেই এই সমস্ত রীতি প্রতিটি বাঙালি ঘরের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে গড়ে তুলেছে।

ইলিশের বাজার দৃশ্যই আলাদা এক নাটক। ভোরবেলা মাছবাজারে গেলে দেখা যায়, রুপোলি শরীরগুলো বরফের ওপর শুয়ে আছে, আর ক্রেতারা উচ্ছ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে এসে ফেনিয়ে ওঠা কণ্ঠে দামাদামি করছেন। মাছওয়ালার মুখ থেকে বের হয় ইলিশের নানা বিশেষণ—“মেদ ভরা”, “ডিমওলা”, “নদীর ইলিশ”, “এটা একেবারে মাঢো”, “খেয়ে দেখবেন, ঘরে সুগন্ধ ছড়িয়ে যাবে”—যেন ইলিশের প্রতিটি অংশের আলাদা গল্প রয়েছে। ক্রেতারাও কিন্তু কম যান না। তারা মাছের পেট দেখে বিচার করেন, আঁশের চকচকে ভাব পর্যবেক্ষণ করেন, লেজের নরমত্ব দেখে বুঝে নেন নদীর না সমুদ্রের ইলিশ। বাঙালির নজর থেকে কিছুই ছলতে পারে না।

ইলিশ কেনার আনন্দের মতো রান্নার প্রক্রিয়াটিও এক ধরনের শিল্প। ইলিশের মাংস কোমল, তাই রান্নার সময় একটু বাড়তি যত্ন প্রয়োজন। মশলার মাত্রা, তেলের গুণ, সর্ষের পেস্টের ঘনত্ব—সব মিলিয়ে রান্নার এক মায়াবি রসায়ন তৈরি হয়। ইলিশ পাতুরি যেদিন বাড়িতে রান্না হয়, সেদিন ঘরের প্রতিটি কোণে সর্ষের সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। কলাপাতায় মাখন-ধোয়া সর্ষে, নরম নারকেলবাটা, একটু কাঁচালঙ্কার গন্ধ—এ সবকিছু ইলিশের সঙ্গে মিশে এক অনবদ্য স্বাদের সৃষ্টি করে। আবার ইলিশ ভাপের স্নিগ্ধতা আলাদা, যেখানে মাংসের কোমলতা সম্পূর্ণ অক্ষত থাকে। একটি ভাপের প্লেটে যখন ইলিশের হালকা হলুদ মশলা সরে গিয়ে নিচ থেকে রুপোলি আভা দেখা দেয়, তখন মনে হয় যেন কোনও দূর নদীর স্রোত হঠাৎ করে থেমে এসেছে থালার মাঝখানে।

কিন্তু ইলিশের সবচেয়ে বিখ্যাত রূপ সম্ভবত ইলিশ মাছের ঝোল। এই ঝোল কিন্তু কোনও সাধারণ রোজকার ঝোল নয়। এতে থাকে হালকা হলুদ, পাতলা ঝোল, টমেটোর টক, কাঁচালঙ্কার ঝাঁজ, আর ভাতের সঙ্গে খাওয়ার জন্য অসাধারণ স্বাদ। কত ঘরেই না মা বা দিদার হাতের ইলিশের ঝোল খেয়ে বড় হয়েছি আমরা! সেই স্বাদ এতটাই গভীর যে আমরা যেখানেই যাই না কেন, স্মৃতিতে সেই স্বাদ ফিরে আসে। আবার অনেকেই পছন্দ করেন গরম তেলে ভাজা ইলিশ। হালকা নুন-মরিচ দিয়ে ভাজা হলেও তার নিজস্ব তেলের গন্ধ এমনই যে মাথা ভর্তি করে দেয় সুগন্ধে। ভাজা ইলিশ ভাতের সঙ্গে খাওয়ার আনন্দ একেবারেই আলাদা। ভাজা মাছের তেল দিয়ে যখন ভাত মাখানো হয়, তখন তা যেন সাধারণ খাবার নয়—বাঙালির খাদ্যরসিকতার এক অনন্ত ব্যঞ্জনা।

ইলিশ নিয়ে ভোজ তো হয়ই, কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আবেগ, স্মৃতি, পারিবারিক ভালবাসা। দিদিমা যখন কয়েক মাস পর বিদেশ থেকে ফিরে আসা নাতির জন্য পাতুরি বানান, মা যখন ছেলের জন্মদিনে বিশেষ ইলিশ ভাপ রান্না করেন, অথবা মাসিমা যখন উৎসবের দিনে প্রথম ইলিশ কাটতে দেন—এসবই ইলিশকে শুধু খাবার নয়, পারিবারিক আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছে দিয়েছে। এমনকি বাঙালির সাহিত্যেও ইলিশের উল্লেখ রয়েছে বহুবার। কাব্যে, কথায়, গল্পে ইলিশ এসেছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে, কখনও প্রেমের উপলক্ষ্যে, কখনও প্রাচুর্যের রূপক হিসেবে।

news image
আরও খবর

ইলিশের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো তার অভিবাসন পদ্ধতি। ইলিশ এক ধরনের সামুদ্রিক মাছ হলেও বর্ষায় নদীতে ডিম দিতে আসে। এই সময়েই নদীপথে ইলিশের আগমনকে ঘিরে আনন্দ বাড়ে। নদীতে উঠেই ইলিশের মাংস নরম হয়, তেল জমে, স্বাদ অসাধারণ হয়ে ওঠে। আবার গর্ভবতী ইলিশ বা ডিমওলা ইলিশের স্বাদ ও জনপ্রিয়তা আরও বেশি। ডিম ইলিশের শরীরের ভেতরে যে গ্রানুলের মতো ডিম থাকে, সেগুলোর স্বাদ, স্নিগ্ধতা ও মশলার সঙ্গে একাকার হয়ে যাওয়ার ক্ষমতা সত্যিই অনন্য।

বড় মাছের স্বাদ যেমন আলাদা, তেমনি ছোট ইলিশেরও আলাদা জায়গা আছে। ছোট ইলিশের কাঁটা নরম, মাংস নরম, আর রান্নার সময় তা দ্রুত গলে ঘন রস তৈরি করে। অনেকেই বলেন, ছোট ইলিশের পাতুরি বা ঝোলের স্বাদ বড় ইলিশের তুলনায় আরও মোলায়েম। বড় মাছ অবশ্যই বেশি তেল ধারণ করে এবং তার মাংস দৃঢ়। তাই বড় ইলিশ রান্না হয় পাতুরি, ভাপ, ঝোল—সবকিছুর জন্যই উপযোগী। তবে ইলিশ যত বড় হয়, তত তার কাঁটার গঠন শক্ত হয়। আবার ছোট মাছের কাঁটা নরম, তাই শিশু বা বয়স্কদের জন্য এটি অনেক সহজ।

বর্ষাকালে ইলিশের বাজার সাজে উৎসবের মতো। বর্ষার প্রথম বজ্রপাত নামলেই অনেকে বলে ওঠেন, “ইলিশ উঠবে এবার!” গঙ্গার ঘাটে নৌকাচালকদের চোখে তখন আনন্দ, কারণ তারা জানেন এটাই ইলিশের মৌসুম। জেলেরা নৌকা নিয়ে নদীতে পাড়ি দেন, ভোরবেলায় মেঘলা আকাশের নিচে নদীতে ইলিশ ধরা পড়ার মুহূর্তে যে দৃশ্য দেখা যায়, তা একদিকে প্রকৃতির, অন্যদিকে মানুষের জীবিকার অনন্য সমন্বয়। বাজারে সেই ইলিশ যখন আসে, তখন সুগন্ধ, রঙ, আকৃতি—সব মিলিয়ে ক্রেতাদের মাঝে এক ধরনের উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে।

ইলিশকে কেন্দ্র করে বাংলার উৎসব আরও বেড়ে ওঠে। অনেক পরিবারেই দুর্গাপুজোর সময় ইলিশ মাছ বাধ্যতামূলক। পুজোর আগে যে দিন নতুন ইলিশ আসে, সেদিন ঘরে বিশেষ রান্না হয়। নববিবাহিত দম্পতিকে আপ্যায়নে প্রায়ই উপহার দেওয়া হয় দু’টি ইলিশ—যা বাংলা সংস্কৃতিতে শুভ প্রতীক। বাঙালি সমাজে ইলিশের এই ‘জোড়া ইলিশ’ প্রথা বহুদিনের।

ইলিশ নিয়ে শুধু আনন্দ নয়, কিছু বিতর্কও রয়েছে। বর্ষায় ডিম দেওয়ার সময় ইলিশ ধরা নিয়ে বহুবার নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। কারণ অতিরিক্ত ইলিশ ধরা হলে প্রজাতির সংখ্যা কমে যেতে পারে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইলিশের স্বাদ হারিয়ে ফেলতে পারে। তাই সরকার অনেক সময় ২২ দিনের জন্য ইলিশ ধরা বন্ধ রাখে। এর ফলে জেলেদের আর্থিক সমস্যা হলেও নদীর পরিবেশ রক্ষায় এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইলিশকে টিকিয়ে রাখতে হলে নদীর প্রবাহ মুক্ত রাখা, দূষণ কমানো এবং বিজ্ঞানসম্মত মাছধরা পদ্ধতি অনুসরণ করা আবশ্যক।

ইলিশের জনপ্রিয়তা এতই বেশি যে আজ দেশ-বিদেশেও এটি ছড়িয়ে পড়েছে। লন্ডন, দুবাই, নিউইয়র্ক—যেখানেই বাঙালি কমিউনিটি আছে, সেখানেই ইলিশের চাহিদা বাড়ছে। অনেকে নিজের দেশ থেকে ইলিশ নিয়ে যান পরিবারের জন্য। আবার বিদেশে ইলিশের দাম কখনও এত বেশি হয় যে সাধারণ মানুষের পক্ষে কেনা কঠিন। কিন্তু বাঙালির জন্য ইলিশ মানে শুধু মাছ নয়—এটি নিজের মাটির গন্ধ, নদীর হাওয়া, বর্ষার আবহ, শৈশবের স্মৃতি—সবকিছুর এক অনবদ্য মিশ্রণ। তাই যে দেশেই থাকুন না কেন, বাঙালি ইলিশ দেখলে মনে হয় যেন বাড়ির কাছাকাছি চলে এলেন।

দুপুরবেলা গরম ভাতের সঙ্গে ইলিশ মাছের ঝোল বা সন্ধেবেলা পাতুরি—এইসব শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, মন ভরানোর জন্যও। ইলিশ খেতে বসলে মনে হয় ঘরের সবকিছু হালকা আলোয় জ্বলে উঠছে, যেন পরিবার, উৎসব আর স্মৃতির মেলবন্ধন এক থালায় জমা হয়েছে। কোনও মাছই এত আবেগ জাগাতে পারে না। ইলিশ তাই বাঙালির কাছে শুধু খাদ্য নয়—এটি জীবনযাপন, এটি স্মৃতি, এটি আনন্দের উৎস।

Preview image