বৈদ্যুতিক যানবাহন বা ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) শুধু ভবিষ্যতের পরিবহণ নয় এটি আধুনিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড। বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণ কমানো, ফসিল ফুয়েলের ওপর নির্ভরতা হ্রাস, এবং নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তির প্রসারের জন্য EV এর গুরুত্ব প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কিন্তু একটি EV তৈরি করতে যেসব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান দরকার তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে Rare Earth Permanent Magnets (REPM)।
বৈদ্যুতিক যানবাহন বা ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) শুধু ভবিষ্যতের পরিবহণ নয়—এটি আধুনিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড। বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণ কমানো, ফসিল ফুয়েলের ওপর নির্ভরতা হ্রাস, এবং নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তির প্রসারের জন্য EV-এর গুরুত্ব প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কিন্তু একটি EV তৈরি করতে যেসব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান দরকার—তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে Rare Earth Permanent Magnets (REPM)।
ভারতের EV বাজার দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু এর সবচেয়ে স্ট্র্যাটেজিক উপাদান—রেয়ার আর্থ ম্যাগনেট—প্রায় সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। আর এই আমদানি-নির্ভরতার ৯০%-ই আসে চীন থেকে। এর ফলে ভারতের EV-নির্ভর ভবিষ্যৎ কার্যত এক বিদেশি দেশের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
এই প্রেক্ষাপটে ভারত সরকার ঘোষণা করেছে প্রায় ₹৭,২৮০ কোটি টাকার 'Rare Earth Permanent Magnet Manufacturing Scheme', যার লক্ষ্য—দেশে প্রথমবারের মতো রেয়ার আর্থ ম্যাগনেট উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা, EV-মোটর প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভর হওয়া, এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার মতো শক্তি অর্জন।
এই ৪,০০০ শব্দের প্রতিবেদনে আমরা বিশদে তুলে ধরব—
এই স্কিম আসলে কী?
কেন এটি ভারতের জন্য ‘গেমচেঞ্জার’?
কীভাবে এটি EV শিল্পকে বদলে দেবে?
চ্যালেঞ্জগুলো কোথায়?
বিশ্ব রাজনীতির সঙ্গে রেয়ার আর্থের সম্পর্ক কী?
ভবিষ্যতে ভারত কোথায় পৌঁছাতে পারে?
রেয়ার আর্থ বা Rare Earth Elements (REEs) শুনতে খুব দামি বা বিরল মনে হলেও এগুলো প্রকৃতিতে প্রচুর রয়েছে। সমস্যা হলো—এগুলো উত্তোলন ও পরিশোধন অত্যন্ত কঠিন এবং ব্যয়বহুল। এজন্যই এগুলো বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের তালিকায় পড়ে।
এগুলো দিয়ে তৈরি হয়—
EV মোটরের হাই-টর্ক ম্যাগনেট
উইন্ড টারবাইনের চুম্বক
স্মার্টফোন
MRI মেশিন
ড্রোন
মিসাইল গাইডেন্স সিস্টেম
স্যাটেলাইট
বিশেষ করে Neodymium–Praseodymium (NdPr) magnets ছাড়া আধুনিক EV মোটর তৈরি practically অসম্ভব।
বিশ্বের ৭০% রেয়ার আর্থ খনন চীনে
৯০% প্রক্রিয়াকরণ চীনে
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যাগনেট উৎপাদকও চীন
ফলে EV উৎপাদক দেশগুলোর ওপর চীনের ‘স্ট্র্যাটেজিক কন্ট্রোল’ রয়েছে।
ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল EV বাজার।
২০২৪–২৫ সালে EV বিক্রি বেড়েছে ৪৭%
২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের রাস্তায় থাকবে ১ কোটি+ EV
টু-হুইলার EV-তে ভারত ইতিমধ্যেই বিশ্বে শীর্ষ পাঁচে
কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—
EV-মোটরের জন্য প্রয়োজনীয় NdFeB (Neodymium–Iron–Boron) ম্যাগনেট দেশেই তৈরি হয় না।
তার ফলে—
উৎপাদন ব্যয় বাড়ে
আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে
বিদেশি নীতি সিদ্ধান্তে ভারত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
সরবরাহ ব্যাহত হলে পুরো EV বাজার থমকে যাবে
এই সংকট সমাধানের লক্ষ্যেই এসেছে নতুন স্কিম।
সরকারের স্কিমে মূল ৪টি স্তম্ভ রয়েছে—
এই স্কিমের মাধ্যমে দেশে তৈরি হবে—
Sintered NdFeB Magnets
Bonded Magnets
Hybrid Magnets
এই কারখানাগুলো প্রথমবারের মতো ভারতের EV-উৎপাদনকারী সংস্থাকে স্থানীয়ভাবে ম্যাগনেট সরবরাহ করতে সক্ষম হবে।
উৎপাদন বাড়ালে কোম্পানিগুলো পাবে অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা।
এর ফলে—
কোম্পানিগুলো নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করবে
বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় নামতে পারবে
ভারতকে ‘Rare Earth Magnet Hub’ করার লক্ষ্য পূরণ হবে
কারখানা তৈরির জন্য ২ বছর সময়, যা সাধারণত খুব কম।
এর মানে—সরকার চায় দ্রুত ফল।
ভারত চাইলে—
অস্ট্রেলিয়া
যুক্তরাষ্ট্র
ভিয়েতনাম
ব্রাজিল
এই দেশগুলোর সঙ্গে রেয়ার আর্থ আমদানির চুক্তি করবে।
এমনকি ভারতের নিজস্ব খনি থেকেও Monazite Sand থেকে Rare Earth Extraction বাড়ানো হবে।
এখন পর্যন্ত—
একটি EV-এর মোটর খরচের প্রায় ৩০–৪০% যায় ম্যাগনেট আমদানি করতে।
স্কিম কার্যকর হলে এই ব্যয় অন্তত ২০–৩০% কমবে।
যন্ত্রাংশ দেশে তৈরি হলে—
আমদানি শুল্ক কমবে
লজিস্টিক খরচ কমবে
উৎপাদন সময় কমবে
এর ফলে EV-এর দাম আরও কমে আসবে।
রেয়ার আর্থের ওপর ভিত্তি করে—
মাইনিং
প্রসেসিং
ম্যাগনেট ম্যানুফ্যাকচারিং
EV মোটর কারখানা
এই সব ক্ষেত্রেই নতুন কর্মসংস্থান হবে।
বর্তমানে চীন–জাপান–কোরিয়া বিশ্ব বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।
ভারতের নতুন স্কিম তাকে প্রথমবার এই ‘High-Value Chain’-এ ঢোকার সুযোগ করে দেবে।
এটি পরিবেশগত ও প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল।
এখানে ব্যর্থ হলে ম্যাগনেট উৎপাদন সম্ভব হবে না।
ম্যাগনেট সলিউশন পেলেও ব্যাটারি সমস্যা রয়ে যাবে।
ভারতকে ব্যাটারি সেল উৎপাদনেও আত্মনির্ভর হতে হবে।
চীন চাইলে—
দাম কমিয়ে ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে বাজার থেকে সরিয়ে দিতে পারে
এক্সপোর্ট নিষেধাজ্ঞা দিয়ে চাপ তৈরি করতে পারে
ভারতকে রেয়ার আর্থ টেকনোলজিতে বিশেষজ্ঞ তৈরি করতে হবে।
রেয়ার আর্থ এখন শুধু খনিজ নয়—এটি জিও-পলিটিকাল হথিয়ার।
চীন অতীতে—
জাপানের বিরুদ্ধে REE রপ্তানি বন্ধ করেছিল
দামের ওপর নিঃশর্ত আধিপত্য দেখিয়েছে
ফলে ভারতকে অত্যন্ত সতর্কভাবে এগোতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে ভারত ৩টি পদক্ষেপ নিলে রেয়ার আর্থ শিল্পে বিশ্বের শীর্ষে উঠতে পারে—
স্থানীয় খনি উন্নয়ন
গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ
উন্নত ম্যাগনেট প্রযুক্তির গবেষণা কেন্দ্র
এই স্কিম সেই পথের প্রথম ধাপ।
EV-এর দাম কমবে
চার্জিং অবকাঠামো বাড়বে
পরিবেশ দূষণ কমবে
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব কমবে
ভারত সরকারের Rare Earth Magnet Scheme শুধু একটি শিল্পনীতি নয়—এটি ভবিষ্যতের অর্থনীতি, পরিবেশ, প্রযুক্তি এবং শক্তি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই স্কিমের ফলে—
ভারত EV-এ আত্মনির্ভর হবে
বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে বড় ভূমিকা নেবে
চীনের ওপর নির্ভরতা কমবে
দেশে উন্নত প্রযুক্তি শিল্পের উন্নয়ন হবে
এই স্কিমের অধীনে দেশে উচ্চমানের NdFeB ম্যাগনেট তৈরির জন্য উৎপাদন ইউনিট গড়ে তোলা হবে, যা প্রথমবারের মতো ভারতীয় EV প্রস্তুতকারীদের স্থানীয়ভাবে চুম্বক সরবরাহের সুযোগ করে দেবে। স্কিমে রয়েছে পাঁচ বছরের Production Linked Incentive (PLI), উন্নত প্রযুক্তি স্থাপনের জন্য দুই বছরের সেটআপ সময়, এবং আন্তর্জাতিক খনিজ-সহযোগ partnership তৈরির উদ্যোগ। এর ফলে EV মোটরের উৎপাদন ব্যয় কমবে, আমদানির উপর নির্ভরতা হ্রাস পাবে এবং ভবিষ্যতে EV-র দাম কমার সম্ভাবনা বাড়বে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়—Rare Earth প্রসেসিং পরিবেশগতভাবে জটিল, প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত দক্ষতার প্রয়োজন হয়, এবং চীনের দামের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করাও কঠিন। তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত যদি স্থানীয় খনি উন্নয়ন, গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন পার্টনারশিপ এবং গবেষণায় জোর দেয়, তবে আগামী দশ বছরে দেশে Rare Earth Magnet উৎপাদন একটি বহুমূল্য প্রযুক্তি শিল্পে পরিণত হতে পারে।
এই স্কিম কেবল EV শিল্প নয়, বরং ভারতের প্রতিরক্ষা, মহাকাশ, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং উচ্চ প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি খাতে এক নতুন যুগের সূচনা করবে বলে মনে করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ভারতকে চীনের বিকল্প হিসেবে বৈশ্বিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেবে—এবং ভারতের প্রযুক্তিগত স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে আসবে।