শিয়ালদা থেকে নির্বাচন কমিশন অফিস পর্যন্ত মিছিল করে SIR প্রক্রিয়ায় ২৭ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগে সরব হল ISF। নওশাদ সিদ্দিকী ভোটাধিকার রক্ষা ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান।
ভোটাধিকার রক্ষার দাবিতে এবার পথে নামল ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট বা ISF। SIR প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই প্রক্রিয়ার ফলে প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এই অভিযোগকে সামনে রেখে শিয়ালদা থেকে নির্বাচন কমিশন অফিস পর্যন্ত মিছিল করে প্রতিবাদ জানায় ISF। মিছিলে নেতৃত্ব দেন ISF নেতা তথা বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী। তাঁর দাবি, ভোটাধিকার দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার থেকে কোনও নাগরিককে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা হলে তা শুধু প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, গণতন্ত্রের উপর সরাসরি আঘাত।
SIR বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া ভোটার তালিকা যাচাই ও সংশোধনের সঙ্গে যুক্ত। ভোটার তালিকায় নাম, বাবার নাম, ঠিকানা বা অন্যান্য তথ্যের ত্রুটি সংশোধনের উদ্দেশ্যে এই প্রক্রিয়া চালানো হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ISF-এর অভিযোগ, সংশোধনের নামে বহু সাধারণ মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গরিব, প্রান্তিক, সংখ্যালঘু, শ্রমজীবী ও গ্রামীণ এলাকার মানুষ এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে পারেন বলে দাবি দলটির।
শিয়ালদা থেকে নির্বাচন কমিশন অফিস পর্যন্ত মিছিলকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। মিছিলে ISF কর্মী-সমর্থকদের হাতে ছিল ভোটাধিকার রক্ষার দাবি-সংবলিত পোস্টার ও ব্যানার। তাঁদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া মানে একজন নাগরিকের রাজনৈতিক অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেওয়া। ভোট দেওয়ার অধিকার শুধু একটি নির্বাচনী অধিকার নয়, এটি নাগরিকত্ব, অংশগ্রহণ এবং গণতান্ত্রিক মর্যাদার প্রতীক। তাই কোনও প্রক্রিয়ায় যদি বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়ে থাকে, তবে তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া জরুরি।
নওশাদ সিদ্দিকী এই ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করা চলবে না। যাঁদের নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ উঠছে, তাঁদের প্রত্যেককে ন্যায্য সুযোগ দিতে হবে। শুধু নোটিস পাঠিয়ে বা তথ্যের অসঙ্গতির কথা বলে কাউকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না। প্রত্যেক নাগরিকের কথা শোনা, নথি যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়া এবং ভুল থাকলে তা সংশোধনের ব্যবস্থা করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব।
ISF-এর দাবি, SIR প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা থাকা দরকার। কোন ভিত্তিতে কার নাম বাদ পড়ছে, কোন নথিকে গ্রহণযোগ্য ধরা হচ্ছে, কীভাবে আপত্তি জানানো যাবে এবং কত দিনের মধ্যে নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্তির সুযোগ মিলবে—এই সব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর সাধারণ মানুষের জানা উচিত। কারণ ভোটার তালিকা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলে তা সরাসরি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রভাবিত করে।
এই মিছিল থেকে নওশাদ সিদ্দিকী আরও বলেন, গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিরপেক্ষ হওয়া জরুরি। কমিশন যদি মানুষের আস্থা ধরে রাখতে চায়, তবে প্রতিটি পদক্ষেপে স্বচ্ছতা, মানবিকতা এবং ন্যায়বিচারের নীতি বজায় রাখতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক সাধারণ মানুষ জানতেই পারছেন না তাঁদের নাম তালিকায় আছে কি না। অনেকেই আবার নথিপত্র নিয়ে সংশোধনের প্রক্রিয়া কীভাবে করবেন, তা বুঝতে পারছেন না। ফলে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি বাড়ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভোটার তালিকা নিয়ে এই ধরনের বিতর্ক নির্বাচনের আগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ ভোটার তালিকাই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভিত্তি। এই তালিকায় যদি গরমিল, বাদ পড়া বা ভুল তথ্যের অভিযোগ ওঠে, তবে তা রাজনৈতিক দলগুলির কাছে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। ISF সেই ইস্যুকেই সামনে এনে পথে নেমেছে। দলটির দাবি, ২৭ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লক্ষ লক্ষ পরিবারের ভোটাধিকার, ভবিষ্যৎ ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন।
মিছিলকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নজরকাড়া ছিল। শিয়ালদা থেকে নির্বাচন কমিশন অফিস পর্যন্ত পথের বিভিন্ন অংশে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। যাতে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেদিকে প্রশাসনের নজর ছিল। তবে ISF-এর কর্মী-সমর্থকরা শান্তিপূর্ণভাবে তাঁদের দাবিদাওয়া তুলে ধরেন বলে জানা যায়। নির্বাচন কমিশনের কাছে ডেপুটেশন জমা দেওয়ার মাধ্যমে দলটি অবিলম্বে বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানায়।
এই ঘটনার পর রাজ্য রাজনীতিতে SIR প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি ইতিমধ্যেই ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলছে। অন্যদিকে প্রশাসনিক মহলের যুক্তি, ভোটার তালিকা নির্ভুল করা একটি নিয়মিত ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া। তবে প্রশ্ন উঠছে, নির্ভুলতা আনতে গিয়ে যদি প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়ে যায়, তবে তার দায় কে নেবে?
নওশাদ সিদ্দিকীর বক্তব্য অনুযায়ী, ভোটাধিকার কোনও রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। এটি দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। তাই কোনও মানুষকে সন্দেহ, ত্রুটি বা তথ্যগত সমস্যার কারণে চূড়ান্তভাবে বাদ দেওয়ার আগে বহুস্তরীয় যাচাই ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। তিনি দাবি করেন, প্রান্তিক মানুষের হাতে সবসময় পর্যাপ্ত নথি থাকে না। অনেকেই কাজের সূত্রে বাড়ির বাইরে থাকেন। অনেকের ঠিকানা পরিবর্তন হয়েছে। কারও নামের বানানে ভুল থাকতে পারে। এই ধরনের বাস্তব সমস্যাকে মাথায় রেখেই কমিশনের কাজ করা উচিত।
ISF-এর এই কর্মসূচির রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। সাম্প্রতিক সময়ে নওশাদ সিদ্দিকী বিভিন্ন জনস্বার্থমূলক ও ভোটাধিকার-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে সরব হয়েছেন। SIR প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর অবস্থান দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত বলে দাবি ISF নেতৃত্বের। তাঁদের মতে, আজ যদি ২৭ লক্ষ মানুষের নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ উপেক্ষা করা হয়, তবে আগামী দিনে আরও বড় অংশের মানুষ ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কায় পড়তে পারেন।
এই ইস্যুতে সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। অনেকেই জানতে চাইছেন, তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় আছে কি না, থাকলেও তথ্য ঠিক আছে কি না, আর কোনও ভুল থাকলে কীভাবে সংশোধন করা যাবে। ISF-এর দাবি, নির্বাচন কমিশনের উচিত গ্রামে গ্রামে, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সচেতনতা শিবির করা। শুধু অনলাইন বা অফিস-নির্ভর প্রক্রিয়ায় প্রান্তিক মানুষদের সমস্যার সমাধান হবে না। মাঠপর্যায়ে সহায়তা কেন্দ্র খুলে প্রত্যেককে সাহায্য করতে হবে।
সব মিলিয়ে, শিয়ালদা থেকে নির্বাচন কমিশন অফিস পর্যন্ত ISF-এর মিছিল রাজ্যের রাজনৈতিক আবহে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। SIR প্রক্রিয়ায় ২৭ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে যে প্রশ্নগুলি উঠেছে, তা শুধু একটি দলীয় প্রতিবাদের বিষয় নয়; এটি ভোটাধিকার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে কী পদক্ষেপ করে এবং সংশ্লিষ্ট মানুষদের নাম পুনরায় যাচাই বা অন্তর্ভুক্তির জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটার তালিকার নির্ভুলতা যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি প্রকৃত ভোটারদের অধিকার রক্ষা করা। সংশোধনের নামে যদি সাধারণ মানুষ আতঙ্কে থাকেন, তবে সেই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই ISF-এর এই প্রতিবাদ আগামী দিনে আরও বৃহত্তর রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। নওশাদ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে এই আন্দোলন ভোটাধিকার রক্ষার দাবিকে সামনে এনে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিল।
এই প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে ISF স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে কোনও প্রকৃত ভোটারকে বাদ দেওয়া হলে তা মেনে নেওয়া হবে না। নওশাদ সিদ্দিকী বলেন, নির্বাচন কমিশনের উচিত প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা এবং যাঁদের নাম বাদ পড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তাঁদের দ্রুত পুনরায় যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়া। সাধারণ মানুষের মধ্যে যাতে আতঙ্ক না ছড়ায়, তার জন্য কমিশনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট নির্দেশিকা ও সহায়তা কেন্দ্র চালু করার দাবিও জানানো হয়। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই ইস্যু আগামী দিনে রাজ্যের নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্নে ISF-এর এই আন্দোলন আরও জোরদার হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।