হাজারদুয়ারির বাইরেও লুকিয়ে রয়েছে মুর্শিদাবাদের বিস্ময়—জৈন, আর্মেনীয় ও উপনিবেশিক ইতিহাসের ছোঁয়ায় গড়ে ওঠা সেই সব জায়গা, যা চেনা ভ্রমণের বাইরে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে।
নবাবিয়ানার সঙ্গেই মিশে জৈন থেকে আর্মেনীয় ঐতিহ্য: চেনা মুর্শিদাবাদেই হোক অন্য রকম ভ্রমণ
শুধুই নবাবি আমলের স্মৃতি নয়—বাংলার এক সময়ের রাজধানী মুর্শিদাবাদ ইতিউতি ছড়িয়ে রেখেছে বহুস্তরীয় ইতিহাসের চিহ্ন। ভাগীরথীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই প্রাচীন জনপদ এককালে ছিল বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও প্রশাসনের কেন্দ্র। নবাবদের জৌলুস, সিল্ক-মসলিনের খ্যাতি, রায়বেঁশে নাচ, টেরাকোটার কারুকাজ, জৈন বণিকদের কোঠি, আর্মেনীয় ব্যবসায়ীদের চার্চ—সব মিলিয়ে মুর্শিদাবাদ যেন এক চলমান ইতিহাসের পাঠশালা।
আমরা সাধারণত হাজারদুয়ারি, ইমামবাড়া, কাটরা মসজিদ, ওয়াসেফ মঞ্জিলের মধ্যেই মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ সীমাবদ্ধ রাখি। কিন্তু এই শহরকে সত্যিকারের চিনতে হলে সেই চেনা ছক ভাঙতে হবে। জৈন কোঠির অলিন্দে, বড়নগরের টেরাকোটা মন্দিরে, সয়দাবাদের আর্মেনীয় চার্চে কিংবা ডাচ গোরস্থানের নীরবতায় লুকিয়ে রয়েছে এক অন্য ইতিহাস।
সম্প্রতি আয়োজিত ‘মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ ফেস্টিভ্যাল’ সেই অচেনা ঐতিহ্যকে সামনে এনে নতুন পর্যটন মানচিত্র আঁকার চেষ্টা করেছে। ৬-৮ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত এই উৎসবের লক্ষ্য ছিল—অযত্নে নষ্ট হতে বসা ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং বিকল্প পর্যটনের সম্ভাবনা তুলে ধরা।
১৭শ ও ১৮শ শতকে মুর্শিদাবাদ ছিল বাংলার প্রশাসনিক রাজধানী। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ এই শহরকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে তোলেন। ভাগীরথীর তীরবর্তী অবস্থান এবং নদীপথে বাণিজ্যের সুবিধা শহরটিকে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কেন্দ্রে পরিণত করে।
ফলতই এখানে এসে বসতি গড়েন হিন্দু জমিদার, জৈন বণিক, আর্মেনীয় ব্যবসায়ী, ডাচ ও ব্রিটিশ বণিকেরা। এই মিলনেই তৈরি হয় এক অনন্য সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ।
আজও সেই ইতিহাসের চিহ্ন পাওয়া যায়—কোথাও প্রাসাদোপম অট্টালিকা, কোথাও পাথরখচিত সমাধিফলক, কোথাও পোড়ামাটির সূক্ষ্ম কারুকাজ।
বড়নগর: রানি ভবানীর টেরাকোটার স্বপ্ন
ভাগীরথীর এক পারে আজিমগঞ্জ, অন্য পারে জিয়াগঞ্জ। সেখান থেকে সহজেই পৌঁছনো যায় বড়নগর। শোনা যায়, নাটোরের রানি ভবানী বড়নগরকে ‘গুপ্ত বারাণসী’ রূপে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
চার বাংলা মন্দির
বড়নগরের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপত্য নিদর্শন হল চার বাংলা মন্দির। ভাগীরথীর তীরে একটি প্রাঙ্গণ ঘিরে মুখোমুখি চারটি কুঁড়েঘর আকৃতির মন্দির। প্রতিটির সামনেই তিন খিলানের প্রবেশপথ, ভিতরে তিনটি করে শিবলিঙ্গ।
এই মন্দিরগুলির গাত্রে পোড়ামাটির কারুকাজে ফুটে উঠেছে রামায়ণ-মহাভারতের দৃশ্য, গ্রামীণ সমাজজীবন, নৃত্য-সংগীতের চিত্র। প্রতিটি ফলকে সূক্ষ্ম নকশা—যেন মাটির উপর ইতিহাসের লেখা।
চার বাংলা ছাড়াও বড়নগরে রয়েছে গঙ্গেশ্বর মন্দির, অষ্টভুজাকৃতি ভবানীশ্বর মন্দির। কিছু মন্দির সময়ের সঙ্গে ক্ষয়ে গেছে, কিছু সংরক্ষিত। তবে প্রতিটিই বাংলার টেরাকোটা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
আজিমগঞ্জ-জিয়াগঞ্জ: জৈন বণিকদের ঐশ্বর্য
প্রায় ৩০০ বছর আগে রাজস্থান থেকে কয়েকজন জৈন বণিক নবাবি আমলে বঙ্গে এসে ব্যবসা শুরু করেন। তাঁদের মধ্যে মানিকচাঁদ ছিলেন অন্যতম। নবাব ও ইংরেজ শাসকদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তাঁরা বিপুল সম্পদ অর্জন করেন। তাঁদের উত্তরসূরিরাই পান ‘জগৎ শেঠ’ উপাধি।
পরে দুগার, নওলাখা, সিংঘী, দুধোরিয়া—এমন বহু জৈন পরিবার এখানে বসতি গড়ে তোলে। আজিমগঞ্জ-জিয়াগঞ্জ অঞ্চলে তাঁদের প্রাসাদোপম কোঠি, মন্দির ও বাগানবাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে।
কাঠগোলা প্যালেস
১৮৭০ সালে লক্ষ্মীপৎ সিংহ দুগার নির্মাণ করেন কাঠগোলা প্যালেস। সুবিশাল আমবাগান ঘেরা এই অট্টালিকায় রয়েছে গ্রিক ও রাজস্থানি স্থাপত্যশৈলীর মিশ্রণ।
ভিতরে রয়েছে বিশাল বেলজিয়াম কাচের আয়না, রাজকীয় পালঙ্ক, প্রাচীন অলঙ্কার, বাসনপত্র। একই প্রাঙ্গণে রয়েছে আদিনাথ মন্দির ও দাদা ওয়াড়ি।
আজ কাঠগোলা প্যালেস একটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র এবং আংশিক সংগ্রহশালা। এখান থেকে ঘুরে নেওয়া যায় জগৎ শেঠের বাড়ি ও মন্দির।
আর্মেনীয় চার্চ: বাণিজ্যের আন্তর্জাতিক ইতিহাস
বহরমপুরের কাছে সয়দাবাদে রয়েছে আর্মেনিয়ান চার্চ। অষ্টাদশ শতকে খোজা পিট্রুস উসকান এটি নির্মাণ করেন। এক সময় ধ্বংসপ্রায় হয়ে পড়া এই গির্জাটি সম্প্রতি সংস্কার করা হয়েছে।
চার্চ প্রাঙ্গণে রয়েছে আর্মেনীয় ব্যবসায়ীদের সমাধিফলক। এই স্থাপত্য প্রমাণ করে—মুর্শিদাবাদ শুধু নবাবি রাজধানী নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্রও ছিল।
ডাচ গোরস্থান: উপনিবেশিক ছাপ
ডাচ বণিকদের উপস্থিতির সাক্ষী ডাচ কবরস্থান। নীরব এই স্থানে রয়েছে বিশাল পাথরের সমাধি, খোদাই করা লিপি। প্রতিটি সমাধি যেন ইউরোপীয় বাণিজ্য ইতিহাসের দলিল।
শহেরওয়ালি খাবার: রন্ধনে সংস্কৃতির মেলবন্ধন
মুর্শিদাবাদে এসে শুধু স্থাপত্য নয়, রসনাও তৃপ্ত করতে হবে।
রাজস্থান থেকে আসা জৈন সম্প্রদায়ের ‘শহেরওয়ালি’ খাবার এখানে বিশেষ জনপ্রিয়। জৈন নিরামিষ রন্ধনপ্রণালীর সঙ্গে মিশেছে বাংলার পাঁচফোড়ন, নবাবি কেওড়া জল, জাফরান।
এ ছাড়া রয়েছে নবাবি বিরিয়ানি, কাবাব। মিষ্টির মধ্যে জনপ্রিয় রসকদম্ব ও ছানাবড়া।
হেরিটেজ ফেস্টিভ্যাল: সংরক্ষণের ডাক
‘মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি’ ২০১০ সাল থেকে ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করছে। তাঁদের লক্ষ্য—
জৈন কোঠি ও মন্দির সংরক্ষণ
স্থানীয় মানুষকে যুক্ত করা
তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষামূলক ভ্রমণে উৎসাহিত করা
বিকল্প পর্যটন গড়ে তোলা
পর্যটনের প্রসার হলে কর্মসংস্থান বাড়বে, স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে—এমনটাই মত সংগঠনের উদ্যোক্তাদের।
মুর্শিদাবাদ মানেই অনেকের চোখে নবাবি ইতিহাস, হাজারদুয়ারি, সিরাজ-উদ্দৌলার স্মৃতি আর পলাশির প্রান্তর। কিন্তু এই শহর ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলকে একটু গভীর ভাবে দেখলে বোঝা যায়, এটি কেবল একটি প্রাক্তন রাজধানী নয়—বরং বহু সংস্কৃতির সহাবস্থানের এক অনন্য দলিল। ওলন্দাজ, আর্মেনীয়, জৈন, নবাবি, ব্রিটিশ—সব মিলিয়ে মুর্শিদাবাদ যেন ইতিহাসের বহুস্তরীয় এক পুথি, যার প্রতিটি পাতা আলাদা গল্প বলে।
ওলন্দাজ কবরস্থান: নীরব সাক্ষী এক বিদেশি অধ্যায়ের
কাশিমবাজারের কালিকাপুরের কাছে অবস্থিত ওলন্দাজ কবরস্থানটি মুর্শিদাবাদের মিশ্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এক সময় কাশিমবাজার ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্র। ডাচ বা ওলন্দাজ বণিকেরা এখানে কারখানা ও গুদাম স্থাপন করেছিলেন। রেশম, সুতি কাপড় ও নানা পণ্য ইউরোপে রফতানি হত এই অঞ্চল থেকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কারখানা, বাণিজ্যকেন্দ্র বিলীন হয়ে গেলেও রয়ে গিয়েছে কবরস্থানটি—অতীতের এক নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে।
উচ্চ চূড়াওয়ালা সমাধি, ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতি, ল্যাটিন বা ডাচ ভাষায় খোদাই করা শিলালিপি—সব মিলিয়ে এই কবরস্থান যেন বাংলার মাটিতে এক টুকরো ইউরোপ। এখানে দাঁড়িয়ে অনুভব করা যায় ১৭-১৮ শতকের সেই সময়কে, যখন ভাগীরথীর তীর ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ব্যস্ত জলপথ। ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এটি এক অনিবার্য গন্তব্য।
নবাবি স্থাপত্যের শিখর: হাজারদুয়ারি ও নিজামত কেল্লা
লালবাগে পৌঁছলেই চোখে পড়ে মুর্শিদাবাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ—হাজারদুয়ারি প্রাসাদ। ১৮৩৭ সালে তদানীন্তন নবাব নাজিম হুমায়ুন জাহের বাসভবন হিসেবে ব্রিটিশরা ইতালীয় শৈলীতে নির্মাণ করেছিল এই ত্রিতল গম্বুজওয়ালা বিশাল প্রাসাদ। ১২০টি ঘর ও ৮টি গ্যালারিসহ এই স্থাপত্যকীর্তির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক তার দরজার সংখ্যা। মোট ১০০০ দরজা—যার মধ্যে ৯০০টি আসল এবং ১০০টি কৃত্রিম। শত্রু বিভ্রান্ত করার কৌশল হিসেবে এই ভুয়ো দরজাগুলি তৈরি করা হয়েছিল বলে শোনা যায়।
বর্তমানে এটি একটি জাদুঘর। ভিতরে রয়েছে নবাবি আমলের অস্ত্রশস্ত্র, রাজকীয় আসবাব, বেলজিয়াম কাচের ঝাড়লণ্ঠন, বিরল চিত্রকর্ম এবং নানা ঐতিহাসিক দলিল। প্রতিটি গ্যালারি যেন এক একটি সময়ের দরজা খুলে দেয়।
প্রাসাদের সামনেই রয়েছে সিরাজ-উদ্দৌলার তৈরি এক গম্বুজের মদিনা মসজিদ। মসজিদের চত্বরে রয়েছে সুউচ্চ ঘড়িঘর ও ঐতিহাসিক ‘বাচ্চাওয়ালি কামান’। কথিত আছে, এই কামানের গর্জনে গর্ভবতী নারীর গর্ভপাত হয়েছিল—সেখান থেকেই তার এই নামকরণ।
প্রাসাদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বড় ইমামবাড়া, যা শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আর হাজারদুয়ারির পিছনে দক্ষিণ দিকে গঙ্গার তীরে রয়েছে ওয়াসেফ মঞ্জিল—নবাব ওয়াসেফ আলি মির্জার অতিথিনিবাস। গঙ্গার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাসাদ সূর্যাস্তের আলোয় এক অপার্থিব সৌন্দর্য ধারণ করে।
গঙ্গা আরতি ও নদীপারের সন্ধ্যা
ভাগীরথী নদী স্থানীয়দের মুখে ‘গঙ্গা’ নামেই পরিচিত। প্রতিদিন সন্ধ্যায় নদীর ঘাটে আয়োজন করা হয় গঙ্গা আরতি। জিয়াগঞ্জ সদর ঘাট সুন্দরভাবে বাঁধানো। সূর্য ডোবার সময় নদীর জলে আকাশের রঙের প্রতিফলন এক অনন্য আবহ তৈরি করে। আরতির সময় ঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি, প্রদীপের আলো—সব মিলিয়ে এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
এই সময় নদীর ধারে বসে স্থানীয় স্ট্রিট ফুড উপভোগ করা যায়। ফুচকা, ঝালমুড়ি, চপ-তেলেভাজা, মুড়ি-ঘুগনি—সব মিলিয়ে সন্ধ্যা কাটে জমজমাট ভাবে। নদীপারের এই প্রাণচাঞ্চল্য মুর্শিদাবাদের আরেকটি জীবন্ত মুখ।
তাঁতিপাড়া: সিল্কের সুর
মুর্শিদাবাদ মানেই সিল্ক। লালপাড় গরদ শাড়ি, বালুচরি, মসলিন—এই সবের উৎপত্তিস্থল দেখতে চাইলে যেতে হবে জিয়াগঞ্জের তাঁতিপাড়ায়। সদরঘাট থেকে টোটো করে অল্প সময়েই পৌঁছে যাওয়া যায়।
গলিতে ঢুকলেই কানে আসে তাঁত বোনার ছন্দময় শব্দ। প্রতিটি ঘর যেন এক একটি কর্মশালা। হাতে ও পায়ে সমান দক্ষতায় তাঁতিরা বুনে চলেছেন শাড়ি। একটি শাড়ি তৈরি করতে ৫ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত সময় লাগে—নকশা ও সূক্ষ্ম কারুকাজের উপর নির্ভর করে।
তাঁতিপাড়ার দোকানগুলিতে পাওয়া যায় পিওর সিল্ক, বালুচরি, গরদ, মসলিনের বিপুল সম্ভার। কিনুন বা না কিনুন, এই সৃষ্টির প্রক্রিয়া কাছ থেকে দেখা এক অনন্য অভিজ্ঞতা। বুঝতে পারা যায়, একটি শাড়ির মধ্যে কত শ্রম, সময় ও ঐতিহ্য জড়িয়ে থাকে।
শহেরওয়ালি খাবার: স্বাদের মেলবন্ধন
আজিমগঞ্জে গেলে চেখে দেখতে পারেন ‘শহেরওয়ালি’ খাবার। রাজস্থান থেকে আগত জৈন বণিকেরা যখন এখানে বসতি স্থাপন করেন, তাঁদের নিজস্ব নিরামিষ খাদ্যসংস্কৃতি বাংলার স্বাদ ও নবাবি রন্ধনশৈলীর সঙ্গে মিশে তৈরি হয় এক অভিনব ধারা।
পাঁচফোড়ন, কেওড়া জল, জাফরান—সব মিলিয়ে তৈরি হয় সূক্ষ্ম স্বাদের পদ। নিরামিষ হলেও এই খাবারের বৈচিত্র্য ও স্বাদ মন কাড়ে। মিষ্টির মধ্যে রসকদম্ব, ছানাবড়া বিশেষ জনপ্রিয়।
রায়বেঁশে: হারিয়ে যেতে বসা এক নৃত্যঐতিহ্য
মুর্শিদাবাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রায়বেঁশে নৃত্য। এক সময় নবাবের পদাতিক সৈন্যরা এই নৃত্য পরিবেশন করতেন। পরে তা বাউরি ও ডোম সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
ঢোল ও কাঁসির তালে, ডান পায়ে নূপুর বেঁধে পুরুষেরা তেজোদীপ্ত ভঙ্গিতে এই নৃত্য পরিবেশন করেন। কখনও দাঁড়িয়ে, কখনও বসে, কখনও লাফিয়ে—অসাধারণ শারীরিক দক্ষতার পরিচয় মেলে এতে। আজ এই নৃত্যশৈলী হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে বিশেষ অনুষ্ঠান বা উৎসবে এর দেখা মেলে। ভ্রমণের সময় যদি এই নৃত্যের সাক্ষী হওয়া যায়, তা নিঃসন্দেহে বাড়তি প্রাপ্তি।
৩-৪ দিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা
প্রথম দিন
লালবাগ: হাজারদুয়ারি, ইমামবাড়া, কাটরা মসজিদ, ওয়াসেফ মঞ্জিল
দ্বিতীয় দিন
আজিমগঞ্জ-জিয়াগঞ্জ: কাঠগোলা প্যালেস, জগৎ শেঠ বাড়ি, জৈন মন্দির
তৃতীয় দিন
বড়নগর: চার বাংলা মন্দির, ভবানীশ্বর মন্দির
সয়দাবাদ: আর্মেনিয়ান চার্চ
ডাচ গোরস্থান
চতুর্থ দিন
কাশিমবাজার রাজবাড়ি, নসিপুর রাজবাড়ি, পলাশি যুদ্ধক্ষেত্র
কোথায় থাকবেন?
বহরমপুরে রয়েছে একাধিক আধুনিক হোটেল।
আজিমগঞ্জে জৈন কোঠিতে ‘হেরিটেজ স্টে’ সুবিধা পাওয়া যায়।
কাঠগোলা প্যালেস সংলগ্ন এলাকায় থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
কাশিমপুর রাজবাড়িতেও হেরিটেজ থাকার সুযোগ বাড়ছে।
কেন অন্য রকম ভাবে মুর্শিদাবাদ ঘুরবেন?
কারণ—
এটি শুধু নবাবি শহর নয়
এটি বহুসংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র
এখানে ইতিহাসের স্তর রয়েছে বহুস্তরীয়
বিকল্প পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে
চেনা হাজারদুয়ারির বাইরে পা রাখলেই দেখা যাবে—এই শহরের প্রতিটি অলিগলি ইতিহাসের গল্প বলে।
উপসংহার
মুর্শিদাবাদ শুধু অতীতের স্মৃতি নয়—এটি জীবন্ত ঐতিহ্য। নবাবিয়ানার জৌলুস, জৈন বণিকদের ঐশ্বর্য, আর্মেনীয় চার্চের নীরবতা, টেরাকোটার শিল্পকীর্তি—সব মিলিয়ে এটি এক বহুরঙা ইতিহাসের শহর।
তাই পরের বার মুর্শিদাবাদ গেলে শুধু দর্শনীয় স্থান দেখে ফিরবেন না—সময় নিয়ে শহরের পরতে পরতে ডুব দিন। নবাবিয়ানার পাশাপাশি ছুঁয়ে দেখুন জৈন, আর্মেনীয়, ডাচ ও বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতির মেলবন্ধন।
চেনা মুর্শিদাবাদই তখন হয়ে উঠবে এক নতুন অভিজ্ঞতা।
আপনি চাইলে আমি এটাকে ফিচার স্টোরি ফরম্যাট, ম্যাগাজিন লেআউট ভার্সন, অথবা ট্রাভেল ব্লগ SEO অপ্টিমাইজড ভার্সন করে দিতে পারি।