শুভশ্রী জানান মেসির সঙ্গে দেখা করার জন্য তিনি আগেই আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। সেই আমন্ত্রণ অনুযায়ী শনিবার সকালে নির্দিষ্ট হোটেলে পৌঁছন অভিনেত্রী। সেখানেই প্রথমবার মেসির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় এবং সেই মুহূর্তেই দুজনের ছবি তোলা হয়।
অবশেষে মুখ খুললেন অভিনেত্রী শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়। লিয়োনেল মেসির সঙ্গে ছবি তোলার পর থেকেই সমাজমাধ্যমে একের পর এক কটাক্ষ, কুৎসা ও আক্রমণের মুখে পড়তে হয় তাঁকে। শুধু তাঁকেই নয়, এই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন তাঁর পরিবারও। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে আইনের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হন তাঁর স্বামী, পরিচালক ও তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক রাজ চক্রবর্তী। দীর্ঘ নীরবতার পর অবশেষে সেই দিনের প্রতিটি ঘটনা নিয়ে প্রকাশ্যে নিজের বক্তব্য রাখলেন শুভশ্রী নিজে।
মেসির ভারত সফর নিয়ে গোটা দেশ জুড়ে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। কলকাতায় তাঁর আগমন ঘিরে আবেগ, প্রত্যাশা এবং উত্তেজনার পারদ ছিল তুঙ্গে। সেই আবহেই শুভশ্রীর সঙ্গে মেসির একটি ছবি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যেই তা ঘিরে শুরু হয় বিতর্ক। প্রশ্ন উঠতে থাকে—কেন শুধু শুভশ্রী? কীভাবে তিনি মেসির এত কাছে পৌঁছলেন? তিনি কি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন?
এই সমস্ত প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে শুভশ্রী প্রথমেই স্পষ্ট করেন, তাঁর মেসির সঙ্গে দেখা করার বিষয়টি কোনওভাবেই আচমকা বা অনধিকার প্রবেশের ফল নয়। অভিনেত্রীর কথায়, তিনি আগেই আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন মেসির সঙ্গে দেখা করার জন্য। সেই আমন্ত্রণ অনুযায়ীই শনিবার সকালে নির্দিষ্ট একটি হোটেলে পৌঁছন তিনি।
শুভশ্রী জানান, সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ তিনি হোটেলে পৌঁছন। প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পর, সকাল দশটা থেকে দশটা পনেরোর মধ্যে প্রথমবার লিয়োনেল মেসির সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। সেখানেই তাঁরা ছবি তোলেন। এই সাক্ষাৎ এবং ছবি তোলার ঘটনাটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত ও অনুমোদিত পরিবেশেই হয়েছে বলে জানান অভিনেত্রী।
তিনি আরও বলেন, যখন তিনি হোটেল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন মেসির জনসংযোগকারী দলের পক্ষ থেকে তাঁকে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। তাঁদের বক্তব্য ছিল, মেসিকে ঘিরে নানা রকম ব্যবস্থাপনা রয়েছে এবং শুভশ্রী উপস্থিত থাকলে আয়োজনের ক্ষেত্রে সুবিধা হতে পারে। এই অনুরোধেই তিনি যুবভারতীর উদ্দেশে রওনা দেন।
কিন্তু এখান থেকেই শুরু হয় বিতর্কের দ্বিতীয় অধ্যায়। কেন বাংলা ছবি থেকে শুধু শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়কেই আমন্ত্রণ জানানো হল, তিনি কি শাসক দলের বিধায়কের স্ত্রী বলেই এই সুযোগ পেয়েছেন—এই ধরনের প্রশ্ন উঠতে শুরু করে বিভিন্ন মহলে। এই প্রসঙ্গে শুভশ্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এই প্রশ্নের উত্তর তাঁর দেওয়ার নয়। তাঁর মতে, এই বিষয়ে মেসির পিআর টিমই সবথেকে ভাল উত্তর দিতে পারবে।
হোটেল থেকে যুবভারতী পৌঁছনোর পথে তাঁর সহযোগী দলের কয়েকজন সদস্য ইনস্টাগ্রামে সেই ছবিগুলি পোস্ট করার চেষ্টা করেন। কিন্তু মাঠে জ্যামার চালু থাকায় তখন কোনও ছবি পোস্ট করা যায়নি বলে জানান শুভশ্রী। তাঁর দাবি, এই বিষয়টি সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত সমস্যার ফল।
সাড়ে এগারোটা নাগাদ মেসি যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে পৌঁছন। শুভশ্রী জানান, তিনিও নিজের চোখে মাঠের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে দেখেছেন। ভিড়, বিশৃঙ্খলা এবং অব্যবস্থার ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর সামনে। এই পুরো পরিস্থিতির জন্য তিনি আয়োজকদের দায়ী করেন। পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে উঠতেই তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে যান।
ঠিক এই সময়েই ঘটে যায় বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। শুভশ্রীর দাবি, প্রযুক্তিগত গোলযোগের কারণে সেই ছবিগুলি তাঁর ইনস্টাগ্রামে পোস্ট হয়ে যায়। তিনি তখন বানতলায় শুটিংয়ে পৌঁছেছেন। সেখানে গিয়েই তিনি প্রথম লক্ষ্য করেন, তাঁর প্রোফাইলে মেসির সঙ্গে তোলা ছবি পোস্ট হয়ে গিয়েছে।
এই ছবি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই শুরু হয় একের পর এক আক্রমণ। শুভশ্রী প্রশ্ন তোলেন, “আমি নিজেও মাঠের পাশের তাঁবুতে বসে মেসিকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। আপনারা কী ভাবে দেখবেন? কিন্তু আমি কি মাঠে ছিলাম? আমি কি আপনাদের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম? যে ভাবে আমাকে কটাক্ষ করা হচ্ছে, যেন আমি মেসির পাশে মাঠে দাঁড়িয়েছিলাম।”
তিনি আরও বলেন, “হোটেলে গিয়ে ছবি তোলা কি আমার দোষ? ভুল সময়ে প্রযুক্তিগত কারণে ছবি পোস্ট হয়ে যাওয়া আমার ভুল হতে পারে। কিন্তু তার জন্য এতটা ঘৃণা?”
শুভশ্রীর বক্তব্যে উঠে আসে নারী বিদ্বেষের প্রসঙ্গও। ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি বলেন, “আমি একজন নারী। আমি বাংলা ছবির অভিনেত্রী বলেই কি আমাকে এভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে? বলিউডেও তো করিনা কপূর গিয়েছিলেন। শাহরুখ খান কি আসেননি ছবি তুলতে? তখন তো এমন প্রশ্ন ওঠেনি।”
শুধু তাই নয়, তাঁকে নিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণও করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন শুভশ্রী। তাঁকে কারও প্রাক্তন প্রেমিকা বলে কটাক্ষ করা হয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে অশালীন মন্তব্য করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে অভিনেত্রীর প্রশ্ন, “২০২৬ আসতে চলেছে। মহিলা হয়েও মহিলাদের এই ভাবে সম্বোধন করা হচ্ছে। এটা কি আমাদের সমাজের পরিচয়?”
তবে সবথেকে গুরুতর অভিযোগ আসে শেষের দিকে। শুভশ্রী জানান, প্রথম দিকে তিনি মানুষের আবেগ বোঝার চেষ্টা করছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, মেসিকে ঘিরে মানুষের যে আবেগ, তার থেকেই এই প্রতিক্রিয়া। কিন্তু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয় যখন আক্রমণের নিশানা হয়ে ওঠে তাঁর ছোট সন্তানরা।
শুভশ্রী বলেন, “কাল থেকে আমার বাচ্চাদের আক্রমণ করা শুরু হয়েছে। বলা হচ্ছে, ছোট বাচ্চা দুটোকে মেরে ফেলা হবে। আমি একজন মা। এটা আমি কোনওভাবেই মেনে নিতে পারি না।”
এই হুমকির পরই বিষয়টি আর শুধুমাত্র ট্রোলিং বা সমাজমাধ্যমের কটাক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয়, যেখানে নিরাপত্তা এবং পরিবারের সুরক্ষা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়। তখনই আইনি পদক্ষেপের পথে হাঁটেন পরিচালক ও তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক রাজ চক্রবর্তী। বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এটি আর মত প্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে পড়ে না, বরং তা সরাসরি হুমকি এবং অপরাধের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে।
গোটা ঘটনায় ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় এক ভয়াবহ বাস্তবতা। একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী হওয়ার পাশাপাশি শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় একজন মা এবং একজন সাধারণ নাগরিকও। কিন্তু সমাজমাধ্যমের অদৃশ্য আক্রমণের সামনে সেই পরিচয়গুলো যেন গৌণ হয়ে যায়। ট্রোলিংয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ঘৃণা, বিদ্বেষ এবং হিংস্র মানসিকতা যে কতটা বিপজ্জনক রূপ নিতে পারে, এই ঘটনা তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
মেসি-কাণ্ড ঘিরে এই বিতর্ক নতুন করে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সমাজমাধ্যমে দায়িত্ববোধ কোথায়? সেলিব্রিটিদের ব্যক্তিগত পরিসর বলে কি আদৌ কিছু রয়েছে? জনপ্রিয় হলেই কি কাউকে প্রকাশ্য কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়? শুভশ্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি কোনও বিশেষ সুবিধা চাননি, কোনও নিয়ম ভাঙেননি। তিনি শুধুমাত্র একটি আমন্ত্রণ রক্ষা করেছিলেন এবং একটি নির্ধারিত পরিবেশে ছবি তুলেছিলেন। তবুও তাঁকে যেভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে, তা অনেকের কাছেই অযৌক্তিক এবং অমানবিক বলে মনে হয়েছে।
এই বিতর্কে বারবার উঠে এসেছে নারী বিদ্বেষের প্রসঙ্গ। একজন মহিলা অভিনেত্রী বলেই কি তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ বেশি করে প্রশ্নের মুখে পড়ে? একই ঘটনা যদি কোনও পুরুষ তারকার ক্ষেত্রে ঘটত, তবে কি প্রতিক্রিয়া একই রকম হতো? শুভশ্রীর প্রশ্নগুলো আসলে বৃহত্তর সামাজিক মানসিকতার দিকেই আঙুল তুলেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হল, এই আক্রমণের নিশানা হয়ে ওঠে তাঁর ছোট সন্তানরা। মতের অমিল বা ক্ষোভ প্রকাশের নামে শিশুদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া যে কতটা ভয়াবহ, তা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। এখানেই ট্রোলিং আর অপরাধের মধ্যে থাকা সূক্ষ্ম সীমারেখা ভেঙে পড়ে।
এই ঘটনার মাধ্যমে আরও একবার সামনে এল—ভক্তি, আবেগ এবং উন্মাদনার সীমা কোথায় টানা উচিত। কোনও তারকাকে ভালোবাসা আর অন্ধ উন্মাদনার মধ্যে পার্থক্য না থাকলে তার মূল্য দিতে হয় নিরপরাধ মানুষদের। শুভশ্রীর ক্ষেত্রে সেই মূল্য দিতে হয়েছে মানসিক যন্ত্রণা, নিরাপত্তাহীনতা এবং পরিবারকে ঘিরে গভীর আতঙ্কের মাধ্যমে।
মেসি-কাণ্ড শুধু একটি ছবি বা একটি উপস্থিতির বিতর্ক নয়। এটি সমাজমাধ্যমের নৈতিকতা, নাগরিক দায়িত্ব এবং মানবিকতার পরীক্ষাও বটে।