Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

জোশ হ্যাজলউড ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১ম অ্যাশেস টেস্টে বাদ, দলের জন্য বড় ধাক্কা

অস্ট্রেলিয়ার পেস বোলার জোশ হ্যাজলউড ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১ম অ্যাশেস টেস্ট থেকে বাদ পড়েছেন, যা অস্ট্রেলিয়ার দলের জন্য একটি বড় ধাক্কা হতে পারে।

ফিটনেস সমস্যায় জর্জরিত 'মেট্রোনোম' পেসার। হ্যাজলউডের অনুপস্থিতি কি ইংল্যান্ডের 'ব্যাজবল' কৌশলের সামনে অস্ট্রেলিয়ার তুরুপের তাস কেড়ে নিলো? এক গভীর বিশ্লেষণ।

ভূমিকা: এজবাস্টনের যুদ্ধের আগেই প্রথম আঘাত

অ্যাশেজ! ক্রিকেট অভিধানের সবচেয়ে তীব্র, ঐতিহাসিক এবং আবেগপূর্ণ দ্বৈরথ। যখন ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া একে অপরের মুখোমুখি হয়, তখন তা শুধু একটি ক্রিকেট সিরিজ থাকে না; তা হয়ে ওঠে দুটি দেশের সম্মান, ঐতিহ্য এবং মনস্তাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। আর এই হাই-ভোল্টেজ সিরিজের প্রথম টেস্ট, বিশেষ করে ইংল্যান্ডের মাটিতে, প্রায়শই পুরো সিরিজের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়।

ঠিক এমন এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের প্রাক্কালে, অস্ট্রেলিয়ান শিবির এক বিশাল ধাক্কার সম্মুখীন হলো। দলের পেস আক্রমণের অন্যতম স্তম্ভ, 'মেট্রোনোম' খ্যাত জোশ হ্যাজলউড, ফিটনেস সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে বার্মিংহামের এজবাস্টনে অনুষ্ঠিতব্য প্রথম অ্যাশেজ টেস্ট থেকে ছিটকে গেছেন।

এই খবরটি অস্ট্রেলিয়ান সমর্থকদের কাছে যতটা না হতাশাজনক, তার চেয়ে অনেক বেশি উদ্বেগজনক অধিনায়ক প্যাট কামিন্স এবং কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ডের জন্য। কারণ হ্যাজলউড শুধু একজন বোলার নন; তিনি ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার বোলিং কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু, বিশেষ করে ইংল্যান্ডের 'ব্যাজবল' নামক আক্রমণাত্মক ব্যাটিং দর্শনের বিরুদ্ধে প্রধান অস্ত্র। এই এক অনুপস্থিতি অস্ট্রেলিয়ার entire বোলিং আক্রমণের ভারসাম্য, পরিকল্পনা এবং মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তাকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছে।

হ্যাজলউড কেন এত অপরিহার্য? 'মেট্রোনোম'-এর শূন্যতা

জোশ হ্যাজলউডকে বুঝতে হলে শুধু তার উইকেটের কলাম দেখলে চলবে না। তিনি প্যাট কামিন্সের মতো বিধ্বংসী গতির নন, কিংবা মিচেল স্টার্কের মতো ভয়ঙ্কর সুইংয়ের জাদুকর নন। হ্যাজলউডের শক্তি তার রোবটিক ধারাবাহিকতা। তিনি হলেন সেই বোলার, যিনি দিনের পর দিন, সেশনের পর সেশন, অফ স্টাম্পের বাইরে একটি নির্দিষ্ট চ্যানেলে বল করে যেতে পারেন। এই কারণেই তাকে 'মেট্রোনোম' বলা হয়—একটানা, নিখুঁত ছন্দে বল করে যাওয়া।

ইংল্যান্ডের মাটিতে তার কার্যকারিতা: ইংল্যান্ডের কন্ডিশন হ্যাজলউডের বোলিং শৈলীর জন্য আদর্শ। এখানকার ডিউক বল, স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া এবং ঘাসের পিচ তার সামান্য সিম মুভমেন্টকে মারাত্মক করে তোলে। ২০১৯ সালের অ্যাশেজ সিরিজেই তার প্রমাণ মিলেছিল। সেবার তিনি মাত্র ৪ টেস্টে ২০ উইকেট নিয়েছিলেন, যা অস্ট্রেলিয়ার অ্যাশেজ ধরে রাখার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। তিনি বারবার ইংলিশ টপ অর্ডারকে ভাঙনের মুখে ফেলেছিলেন।

কৌশলগত গুরুত্ব: আধুনিক ক্রিকেটে, বিশেষ করে টেস্টে, পেস বোলিং একটি পার্টনারশিপের খেলা। হ্যাজলউড হলেন সেই বোলার যিনি এক প্রান্ত থেকে ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে যান। তিনি ব্যাটসম্যানকে এক ইঞ্চিও জায়গা দেন না, রান আটকে রাখেন। এর ফলেই অন্য প্রান্ত থেকে প্যাট কামিন্স বা স্পিনার নাথান লায়ন আক্রমণের সুযোগ পান এবং উইকেট তুলে নেন। হ্যাজলউডের এই চাপ সৃষ্টির ক্ষমতাই (building pressure) অস্ট্রেলিয়ান বোলিং আক্রমণের মূল ভিত্তি। তার অনুপস্থিতি মানে, এই ভিত্তিটাই আজ নড়বড়ে।

'ব্যাজবল'-এর বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার প্রধান অস্ত্রের পতন

বেন স্টোকস এবং ব্রেন্ডন ম্যাককালামের অধীনে ইংল্যান্ড টেস্ট ক্রিকেট খেলার ধরণটাই বদলে ফেলেছে। তাদের এই অতি-আক্রমণাত্মক 'ব্যাজবল' কৌশল গত এক বছরে প্রায় প্রতিটি প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করেছে। তারা টেস্টে ওয়ানডের গতিতে রান তোলে, বোলারদের ওপর শুরু থেকেই আধিপত্য বিস্তার করে।

অস্ট্রেলিয়া যখন এই অ্যাশেজের পরিকল্পনা করছিল, তখন 'ব্যাজবল' মোকাবিলার প্রধান দায়িত্বটা ছিল হ্যাজলউডের কাঁধেই। কেন?

১. অব্যর্থ লাইন ও লেংথ: 'ব্যাজবল'-এর মূল মন্ত্র হলো বাজে বলকে শাস্তি দেওয়া। হ্যাজলউড হলেন সেই বোলার, যিনি বাজে বল প্রায় দেনই না। তার ধারাবাহিক অফ-স্টাম্প লাইন ইংলিশ ব্যাটসম্যানদের হাত খোলার সুযোগ দিতো না। ২. ধৈর্যের পরীক্ষা: জ্যাক ক্রলি, বেন ডাকেট বা হ্যারি ব্রুকের মতো আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যানদের ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়ার জন্য হ্যাজলউডের মতো বোলারের বিকল্প নেই। ৩. অ্যান্টি-ব্যাজবল অস্ত্র: যেখানে অন্যান্য বোলাররা আক্রমণের মুখে খেই হারিয়ে ফেলেন, সেখানে হ্যাজলউড তার পরিকল্পনায় অটল থাকতে পারেন।

তার অনুপস্থিতি ইংল্যান্ডের জন্য একটি বিশাল মনস্তাত্ত্বিক জয়। বিশেষ করে ইংলিশ ওপেনাররা, যারা হ্যাজলউডের সিম মুভমেন্টে সবচেয়ে বেশি ভুগতেন, তারা এখন অনেক নির্ভার হয়ে প্রথম টেস্ট শুরু করতে পারবেন। অস্ট্রেলিয়াকে এখন এমন একজনকে খুঁজে বের করতে হবে, যিনি এই বিশাল শূন্যস্থান পূরণ করতে পারেন।

বিকল্প কে? স্কট বোল্যান্ড বনাম মাইকেল নেসার

হ্যাজলউডের ছিটকে যাওয়া মানে, অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত 'পেস ত্রয়ী' (কামিন্স, স্টার্ক, হ্যাজলউড) ভাঙা। এখন অধিনায়ক কামিন্সের সামনে দুটি প্রধান বিকল্প রয়েছে: স্কট বোল্যান্ড অথবা মাইকেল নেসার।

স্কট বোল্যান্ড: ধারাবাহিকতার প্রতিমূর্তি স্কট বোল্যান্ড ২০২১-২২ অ্যাশেজে রূপকথার মতো আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। তার অবিশ্বাস্য বোলিং গড় (মাত্র ১৩.৪২) তাকে টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম সেরা বোলারে পরিণত করেছে। বোল্যান্ডের বোলিং শৈলী অনেকটা হ্যাজলউডের মতোই—তিনিও অফ-স্টাম্প চ্যানেলে ক্রমাগত বল ফেলে ব্যাটসম্যানকে পরাস্ত করতে পারেন। তিনি সম্প্রতি ভারতের বিরুদ্ধে ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালেও দুর্দান্ত বোলিং করেছেন।

মাইকেল নেসার: অলরাউন্ড প্যাকেজ ও কাউন্টি অভিজ্ঞতা মাইকেল নেসার হয়তো বোল্যান্ডের মতো পরিসংখ্যানগতভাবে উজ্জ্বল নন, কিন্তু তার ঝুলিতে এমন কিছু আছে যা অস্ট্রেলিয়ার জন্য খুবই লোভনীয়—ব্যাটিং ক্ষমতা এবং ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে খেলার টাটকা অভিজ্ঞতা। নেসার গত কয়েক মাস ধরে ইংলিশ কাউন্টি ক্রিকেটে গ্ল্যামারগানের হয়ে খেলছেন। তিনি ব্যাটে-বলে দুই বিভাগেই অসাধারণ পারফর্ম করেছেন।

  • পক্ষে: ব্যাটিং গভীরতা বাড়াবেন (যা ইংল্যান্ডে খুবই জরুরি), ডিউক বলে খেলার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা।

  • বিপক্ষে: বোল্যান্ডের তুলনায় বোলিংয়ে ধারাবাহিকতা কিছুটা কম।

অস্ট্রেলিয়ান টিম ম্যানেজমেন্টের এই সিদ্ধান্তটি প্রথম টেস্টের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা নেবে। তারা কি বোল্যান্ডের নিখুঁত বোলিংয়ের ওপর ভরসা রাখবেন, নাকি নেসারের অলরাউন্ড দক্ষতা এবং কাউন্টি অভিজ্ঞতার ওপর বাজি ধরবেন?

এক দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগের নাম: হ্যাজলউডের ফিটনেস

অস্ট্রেলিয়ান সমর্থকদের জন্য সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, হ্যাজলউডের এই চোট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি একটি চলমান সমস্যার অংশ। গত দুই বছর ধরেই তিনি বারবার ফিটনেস সমস্যায় ভুগছেন।

  • ২০২১-২২ অ্যাশেজ: অ্যাডিলেড টেস্টের পর সাইড স্ট্রেইনের কারণে সিরিজের বাকি ম্যাচগুলো খেলতে পারেননি।

  • ২০২২-২৩ হোম সামার: ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে খেলার পর আবার চোট। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সিরিজে প্রায় বসেই ছিলেন।

  • ২০২৩ ভারত সফর: বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফির আগে অ্যাকিলিস টেন্ডনের সমস্যায় পড়েন এবং একটিও ম্যাচ না খেলে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন।

  • আইপিএল এবং ডব্লিউটিসি ফাইনাল: আইপিএলে কিছু ম্যাচ খেললেও, ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে তাকে পূর্ণ ছন্দে মনে হয়নি।

অস্ট্রেলিয়ান মেডিক্যাল টিম স্পষ্টতই একটি "রক্ষণশীল" নীতি নিয়েছে। তারা হ্যাজলউডকে প্রথম টেস্টে খেলিয়ে দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চায়নি। তাদের আশা, এই বিশ্রামের ফলে তিনি লর্ডসে দ্বিতীয় টেস্টের জন্য সম্পূর্ণ ফিট হয়ে ফিরতে পারবেন।

কিন্তু এটি একটি বড় জুয়া। অ্যাশেজ সিরিজ খুব ঘন ঘন অনুষ্ঠিত হয় (কম সময়ে ৫টি টেস্ট)। যদি হ্যাজলউডের শরীর এই ধকল নিতে না পারে, তবে অস্ট্রেলিয়ার পুরো পেস ব্যাটারিকেই হয়তো অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়তে হবে।

উপসংহার: গভীরতার পরীক্ষা এবং সুযোগের হাতছানি

কোনো সন্দেহ নেই, প্রথম অ্যাশেজ টেস্টের আগে জোশ হ্যাজলউডের ছিটকে যাওয়া অস্ট্রেলিয়ার জন্য একটি বিরাট ধাক্কা। এটি তাদের পরিকল্পনা, ভারসাম্য এবং আত্মবিশ্বাসে আঘাত হেনেছে। ইংল্যান্ডের 'ব্যাজবল' ব্রিগেড এই খবরে নিশ্চিতভাবেই উৎসাহিত বোধ করবে।

কিন্তু, একটি চ্যাম্পিয়ন দলের পরিচয় হয় তার বেঞ্চের শক্তিতে। অস্ট্রেলিয়া বর্তমানে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়ন। তাদের হাতে স্কট বোল্যান্ডের মতো প্রমাণিত পারফর্মার এবং মাইকেল নেসারের মতো কাউন্টি-অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার রয়েছে।

হ্যাজলউডের এই অনুপস্থিতি প্যাট কামিন্সের অধিনায়কত্বেরও এক কঠিন পরীক্ষা। তাকে এখন নতুন করে কৌশল সাজাতে হবে, তার বাকি বোলারদের থেকে সেরাটা বের করে আনতে হবে এবং প্রমাণ করতে হবে যে অস্ট্রেলিয়ান দল এক বা দুই জন তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়।

প্রথম টেস্ট শুরুর আগেই অ্যাশেজের নাটক জমে উঠেছে। এজবাস্টনে অস্ট্রেলিয়া কি তাদের সেরা পেসারের অভাব বোধ করবে, নাকি স্কট বোল্যান্ড বা মাইকেল নেসারের মতো কেউ নতুন নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হবেন? উত্তরটা সময়ই বলে দেবে। তবে এটা স্পষ্ট যে, অস্ট্রেলিয়ার অ্যাশেজ ধরে রাখার মিশনটি প্রথম বল মাঠে গড়ানোর আগেই অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়লো।

Preview image