Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কারপাল টানেল সিনড্রোমে আর নয় যন্ত্রণা যোগেই মিলবে আরাম

কম্পিউটারে কাজ, রান্না, ভারী জিনিস তোলা বা দৈনন্দিন ঘরের কাজের সময় অনেকেরই কব্জিতে ব্যথা শুরু হয়। সাধারণ সমস্যা মনে করে অবহেলা করলে তা ধীরে ধীরে গুরুতর আকার নিতে পারে। তবে নিয়মিত যোগাসনের সহজ কিছু পদ্ধতি কব্জির যন্ত্রণা কমাতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে মণিবন্ধ চক্র অনুশীলন করলে কব্জির শক্তি বাড়ে এবং ব্যথা ধীরে ধীরে কমে।

কারপাল টানেল সিনড্রোমে আর নয় যন্ত্রণা যোগেই মিলবে আরাম
স্বাস্থ্য ও জীবনধারা

কিছুক্ষণ কম্পিউটারে মাউস চালানোর পর হঠাৎ হাতের কব্জিতে তীব্র ব্যথা শুরু হয় অনেকের। কখনও কখনও সেই ব্যথা এতটাই বাড়ে যে আঙুল অবশ হয়ে যায়, মুঠো করে কিছু ধরার শক্তিও আর থাকে না। শুধু অফিসের কাজ নয়, রান্না করা, ঘরের নানা কাজকর্ম, ভারী জিনিস তোলা কিংবা দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার করলেও অনেকের কব্জিতে একই ধরনের যন্ত্রণা দেখা দেয়। প্রথমে বিষয়টিকে সাধারণ ব্যথা ভেবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যা ভয়াবহ আকার নিতে পারে। তাই কব্জির ব্যথাকে কখনওই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।

কব্জিতে ব্যথা হওয়ার কারণ অনেক। বয়সজনিত সমস্যা, অতিরিক্ত কাজের চাপ, ভুল ভঙ্গিতে কাজ করা, দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে হাত ব্যবহার করা, হাড় ও স্নায়ুর সমস্যা সবই এর জন্য দায়ী হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কব্জির ব্যথার অন্যতম বড় কারণ হল রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস। এই রোগে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিজের অস্থিসন্ধির ওপর আক্রমণ করে। ফলে কব্জি ও আঙুলের গাঁটে গাঁটে তীব্র ব্যথা, ফোলা এবং শক্ত হয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। ধীরে ধীরে হাতের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাও কমে যেতে পারে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল স্নায়ুর সমস্যা। কব্জির কাছে একটি সরু নালির মতো অংশ রয়েছে, যাকে কারপাল টানেল বলা হয়। এটি অনেকটা সুড়ঙ্গের মতো গঠনযুক্ত। এই সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে চলে গিয়েছে মিডিয়ান স্নায়ু, যা হাতের অনুভূতি ও নড়াচড়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনও কারণে যদি এই স্নায়ু চাপের মধ্যে পড়ে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে কব্জি ও আঙুলে অসহনীয় ব্যথা, অবশভাব, ঝিনঝিনে অনুভূতি এবং দুর্বলতা দেখা দেয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই সমস্যাকে বলা হয় কারপাল টানেল সিনড্রোম।

বর্তমান জীবনে এই সমস্যা দ্রুত বাড়ছে। দীর্ঘ সময় কম্পিউটার ব্যবহার, স্মার্টফোনে অতিরিক্ত কাজ, অফিসের চাপ, ঘরের কাজের ভার এবং শারীরিক বিশ্রামের অভাবের কারণে কব্জির ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। ফলে অল্প বয়সেই অনেক মানুষ কব্জির ব্যথা ও স্নায়ুর সমস্যায় ভুগছেন। বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। কারণ তাঁদের ঘরের কাজ, রান্না, অফিসের কাজ এবং পারিবারিক দায়িত্ব সব মিলিয়ে হাতের ওপর চাপ তুলনামূলক বেশি পড়ে।

কব্জির ব্যথা কমানোর জন্য অনেকেই ব্যথানাশক ওষুধ বা মলম ব্যবহার করেন। সাময়িকভাবে এতে আরাম মিললেও সমস্যার মূল কারণ থেকে যায়। দীর্ঘদিন ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হলে শরীরের ওপর তার বিরূপ প্রভাবও পড়তে পারে। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কব্জির ব্যথা কমানোর জন্য প্রাকৃতিক ও নিরাপদ উপায় সবচেয়ে কার্যকর। সেই ক্ষেত্রে যোগাসন একটি অত্যন্ত উপকারী পদ্ধতি।

যোগাসন শুধু শরীরচর্চা নয়, এটি শরীর ও মনের ভারসাম্য রক্ষার একটি বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। নিয়মিত যোগাভ্যাস করলে শরীরের পেশি, স্নায়ু ও অস্থিসন্ধির কার্যক্ষমতা বাড়ে। রক্তসঞ্চালন স্বাভাবিক হয় এবং শরীরের নানা ধরনের ব্যথা ধীরে ধীরে কমে যায়। কব্জির ব্যথা কমানোর জন্য বিশেষভাবে কার্যকর একটি যোগাসনের নাম হল মণিবন্ধ চক্র।

মণিবন্ধ চক্র এমন একটি সহজ যোগাভ্যাস, যা নিয়মিত করলে হাতের পেশি ও স্নায়ুর সক্রিয়তা বাড়ে। এই ব্যায়াম খুব কঠিন নয় এবং যে কোনও বয়সের মানুষ এটি করতে পারেন। সবচেয়ে বড় কথা হল, এটি করতে কোনও বিশেষ যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় না এবং খুব বেশি সময়ও লাগে না।

মণিবন্ধ চক্র করার জন্য প্রথমে একটি চেয়ারের ওপর সোজা হয়ে বসতে হবে। পিঠ টানটান রাখতে হবে এবং দুই পা মাটিতে স্বাভাবিকভাবে রাখতে হবে। শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখা খুব জরুরি। এরপর কাঁধের উচ্চতায় দুই হাত সামনে দিকে প্রসারিত করতে হবে। কনুই সোজা রাখতে হবে, যাতে হাত পুরোপুরি প্রসারিত থাকে।

এরপর দুই হাতের পাতা মুঠো করতে হবে। হাত সোজা ও টানটান রাখতে হবে। শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রেখে মুষ্টিবদ্ধ দুই হাত একসঙ্গে কব্জি থেকে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরাতে হবে। এই ঘোরানো অন্তত দশ বার করতে হবে। তারপর একইভাবে ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে দশ বার ঘোরাতে হবে। পুরো সময় শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে হবে এবং শরীরকে যতটা সম্ভব শিথিল রাখতে হবে।

এই যোগাভ্যাস নিয়মিত করলে কব্জির মিডিয়ান স্নায়ুর সক্রিয়তা বাড়ে। ফলে স্নায়ুর ওপর চাপ কমে এবং ব্যথা ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। হাতের সূক্ষ্ম রক্তনালির মাধ্যমে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক হয়। এতে পেশিতে টান ধরার প্রবণতা কমে যায় এবং হাতের শক্তি বাড়ে।

মণিবন্ধ চক্র নিয়মিত করলে হাতের অস্থিসন্ধিগুলির স্বাভাবিক নড়াচড়া বজায় থাকে। কব্জি ও আঙুলের গাঁটে জমে থাকা জড়তা দূর হয়। ফলে কব্জি ও আঙুলের ব্যথা ধীরে ধীরে কমে যায়। যারা দীর্ঘদিন ধরে বাতজনিত ব্যথায় ভুগছেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও এই যোগাভ্যাস উপকারী হতে পারে।

news image
আরও খবর

তবে মনে রাখতে হবে, এই যোগাসন সবাই করতে পারবেন না। যদি কারও হাতের হাড় ভাঙা থাকে বা সম্প্রতি অস্ত্রোপচার হয়ে থাকে, তাহলে এই ব্যায়াম করা উচিত নয়। কব্জিতে গুরুতর আঘাত থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কারণ ভুলভাবে ব্যায়াম করলে সমস্যার অবনতি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কব্জির ব্যথা কমানোর জন্য শুধু যোগাসন নয়, জীবনযাত্রার কিছু পরিবর্তনও জরুরি। কম্পিউটারে কাজ করার সময় সঠিক ভঙ্গিতে বসা, নিয়মিত বিরতি নেওয়া, হাত ও কব্জির ওপর অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করলে কব্জির সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

বর্তমান ব্যস্ত জীবনে মানুষ শরীরের ছোটখাটো সমস্যাকে গুরুত্ব দিতে চায় না। কিন্তু সময়মতো যদি কব্জির ব্যথার দিকে নজর না দেওয়া হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতে বড় সমস্যার রূপ নিতে পারে। তাই কব্জির ব্যথাকে অবহেলা না করে সময়মতো সচেতন হওয়া জরুরি। নিয়মিত যোগাভ্যাস, সঠিক জীবনযাপন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করলে কব্জির ব্যথা থেকে অনেকটাই মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

মণিবন্ধ চক্র শুধু একটি ব্যায়াম নয়, এটি হাতের সুস্থতার জন্য একটি কার্যকর প্রাকৃতিক উপায়। প্রতিদিন কয়েক মিনিট সময় বের করে এই যোগাভ্যাস করলে কব্জির ব্যথা কমে, হাতের শক্তি বাড়ে এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম করা সহজ হয়ে ওঠে। তাই সুস্থ কব্জি ও শক্ত হাতের জন্য নিয়মিত মণিবন্ধ চক্র অভ্যাস করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কব্জির ব্যথা শুধু শারীরিক সমস্যা নয়, এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। অনেক সময় দেখা যায়, সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর হাত শক্ত হয়ে থাকে, কব্জি বাঁকাতে অসুবিধা হয় বা আঙুলে ঝিনঝিনে অনুভূতি দেখা দেয়। প্রথমদিকে এই লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব না দিলেও ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে। ফলে কাজের গতি কমে যায় এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কব্জির সমস্যার অন্যতম কারণ হল দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে হাত ব্যবহার করা। কম্পিউটারে কাজ করার সময় অনেকেই ভুল ভঙ্গিতে হাত রাখেন। এতে কব্জির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। একইভাবে মোবাইল ফোন দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা, ভারী জিনিস তোলা কিংবা একটানা ঘরের কাজ করাও কব্জির পেশি ও স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই চাপ জমতে জমতে ব্যথার কারণ হয়ে ওঠে।

কব্জির ব্যথা যদি দীর্ঘদিন অবহেলা করা হয়, তাহলে তা আরও জটিল সমস্যার দিকে নিয়ে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আঙুলে অনুভূতি কমে যায়, হাত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সূক্ষ্ম কাজ করা কঠিন হয়ে ওঠে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনও হতে পারে। তাই প্রাথমিক পর্যায়েই সমস্যার দিকে নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

এই ধরনের সমস্যায় যোগাসন একটি নিরাপদ ও কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হয়। যোগাসনের মাধ্যমে শরীরের পেশি ও স্নায়ুর মধ্যে সমন্বয় তৈরি হয়। নিয়মিত যোগাভ্যাস করলে শরীরের রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি পায় এবং অস্থিসন্ধিগুলির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বজায় থাকে। বিশেষ করে মণিবন্ধ চক্র কব্জির জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি যোগাভ্যাস।

মণিবন্ধ চক্র নিয়মিত করলে শুধু কব্জির ব্যথাই কমে না, হাতের সামগ্রিক শক্তিও বাড়ে। যারা দীর্ঘ সময় কম্পিউটারে কাজ করেন, তাঁদের জন্য এই যোগাভ্যাস বিশেষভাবে উপযোগী। একইভাবে যাঁরা ঘরের কাজ করেন বা শারীরিক পরিশ্রম করেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর হতে পারে।

তবে মনে রাখতে হবে, যোগাসন কোনও জাদু নয়। নিয়মিত ও ধৈর্যের সঙ্গে অভ্যাস করলে তবেই এর সুফল পাওয়া যায়। কয়েক দিন অনুশীলন করে ফল না পেলে হতাশ হওয়া উচিত নয়। ধীরে ধীরে শরীরের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।

পাশাপাশি কব্জির সুস্থতার জন্য কিছু সাধারণ অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। কাজের মাঝে মাঝেই হাত বিশ্রাম দেওয়া, কব্জির হালকা ব্যায়াম করা, সঠিক ভঙ্গিতে বসে কাজ করা এবং পর্যাপ্ত ঘুম নেওয়া কব্জির সমস্যাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। সুস্থ জীবনযাত্রা ও নিয়মিত যোগাভ্যাসের মাধ্যমে কব্জির ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

Preview image