Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

নতুন বছরে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার অবসান হোক মানসিক চাপ কমাতে ধ্যানের সহজ পদ্ধতি শিখে নিন

মানসিক চাপ কমাতে ধ্যান বা মেডিটেশন কার্যকরী হলেও, শুধু চোখ বন্ধ করে মনঃসংযোগ করা যথেষ্ট নয়। দুশ্চিন্তা এবং অবসাদ দূর করতে ধ্যানের বিভিন্ন পদ্ধতি শেখা প্রয়োজন। এই পদ্ধতিগুলি আপনাকে শান্তি এবং মনের স্বস্তি এনে দিতে সাহায্য করবে।

নতুন বছরে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার অবসান হোক মানসিক চাপ কমাতে ধ্যানের সহজ পদ্ধতি শিখে নিন
স্বাস্থ্য ও জীবনধারা

মানসিক চাপ কমাতে ধ্যান: সহজ ও কার্যকরী পদ্ধতি

আজকাল আমাদের জীবনযাত্রায় অনেকটা চাপ এবং উদ্বেগ বিরাজমান। অফিসের কাজ, সংসারের দায়িত্ব, পারিবারিক সমস্যা, সামাজিক সম্পর্কের জটিলতা—এসবের কারণে মনের মধ্যে এক প্রকার চাপ বা উদ্বেগ তৈরি হয়। অনেকেই এই চাপ থেকে মুক্তি পেতে নানা উপায় অবলম্বন করেন, কিন্তু সবচেয়ে কার্যকরী এবং প্রাচীন পদ্ধতি হল ধ্যান বা মেডিটেশন।

মানসিক চাপ এবং তার প্রভাব

মানসিক চাপ বা স্ট্রেস আমাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার উপর অনেক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। এটা ধীরে ধীরে অবসাদ এবং উদ্বেগের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। মানসিক চাপের কারণে মাথাব্যথা, ঘুমের সমস্যা, মনঃসংযোগের অভাব, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি শারীরিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তবে, নিয়মিত ধ্যানের অভ্যাস আমাদের মানসিক চাপ কমাতে এবং শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

ধ্যানের মাধ্যমে মনের অশান্তি এবং শারীরিক চাপ হ্রাস পায়। ধ্যান করার সময় আমরা মনকে একাগ্র করতে শিখি, যা আমাদের চিন্তা এবং উদ্বেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। গবেষণায় বলা হয়েছে, দিনে মাত্র ১০ মিনিট ধ্যান করার মাধ্যমে আমাদের মস্তিষ্কে নানা পরিবর্তন আসতে শুরু করে এবং এটি আমাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য উপকারী।

ধ্যানের প্রভাব: গবেষণার তথ্য

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ-এর একটি গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, যারা প্রতিদিন ১০ মিনিট ধ্যান করেন, তাদের মস্তিষ্কে নানা ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে। ধ্যান শারীরিক চাপ কমাতে, অবসাদ এবং উদ্বেগের স্তর হ্রাস করতে, মনোযোগ বাড়াতে এবং সার্বিকভাবে সুস্থ থাকতে সাহায্য করে। ধ্যান শুধু মানসিক প্রশান্তি এনে দেয় না, বরং এটি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। শারীরিকভাবে, ধ্যান উচ্চ রক্তচাপ কমাতে, হার্ট রেট নিয়ন্ত্রণ করতে, এবং ইমিউন সিস্টেমের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে।

ধ্যানের পদ্ধতি: ধীরেই শুরু করুন

ধারণা করা হয়, ধ্যানের মাধ্যমে চোখ বন্ধ করে বসে এক মুহূর্তে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। কিন্তু এটি সঠিক নয়। প্রথমে মন শান্ত করা একটু কঠিন হতে পারে, তবে ধীরে ধীরে অভ্যাসে আসলে এটি সম্ভব। এখানে কিছু ধ্যানের সহজ পদ্ধতি দেওয়া হলো, যা আপনি নিয়মিত অনুশীলন করতে পারেন।

১. নিরিবিলি এবং শান্ত পরিবেশ

প্রথমেই এমন একটি শান্ত পরিবেশ খুঁজে নিন যেখানে আপনি অসন্তুষ্টি বা বিরক্তি অনুভব করবেন না। যদি সম্ভব হয়, এমন একটি জায়গা বেছে নিন যেখানে হাওয়া-বাতাস চলাচল করে। এটি আপনাকে আরও বেশি প্রশান্তি দেবে। আপনার পছন্দের স্থান নির্বাচন করুন—এটি হতে পারে আপনার ঘর, বাগান বা একটি নিরিবিলি পার্ক।

২. পোশাক

ধ्यान করার সময় আপনার পোশাক হালকা এবং আরামদায়ক হওয়া উচিত। কঠিন বা আঁটসাঁট পোশাক পরলে শরীরে অস্বস্তি হবে, যা ধ্যানের প্রতি মনোযোগ নষ্ট করতে পারে। তাই পোশাক নির্বাচনের সময় আরামদায়ক কিছু পরুন, যাতে শরীরে কোনও ধরনের চাপ না আসে।

৩. প্রথমে চোখ বন্ধ করা

ধ্যান শুরু করার জন্য প্রথমে আপনার চোখ বন্ধ করুন। এর মাধ্যমে আপনি নিজের মধ্যে এবং চারপাশের পরিবেশ থেকে আলাদা হয়ে একটি নিরিবিলি অবস্থানে চলে আসবেন। যদি আপনার মন শান্ত না থাকে এবং নানা চিন্তা আসতে থাকে, তা হলে চিন্তা করবেন না। এই পরিস্থিতি প্রাথমিকভাবে স্বাভাবিক। নিয়মিত অভ্যাসে মন শান্ত হবে এবং আপনি ধ্যানের সঠিক পদ্ধতি শিখতে পারবেন।

ধ্যানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি

ধ্যানের বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে, তবে নিচে তিনটি সহজ এবং কার্যকরী পদ্ধতি বর্ণনা করা হল, যা আপনি শিখে এবং অভ্যাসে আনতে পারেন:

প্রথম পদ্ধতি: অতীতের সুখী স্মৃতি মনে করা

প্রথম ধাপে চোখ বন্ধ করে বসে, আপনি প্রথমে মনের মধ্যে নানা চিন্তা আসতে দেখবেন। এটি একেবারেই স্বাভাবিক। আপনি যদি একবারে সমস্ত চিন্তা দূর করতে না পারেন, তবে কিছুটা সময় নিয়ে অতীতের সুখী স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করুন। একে বলা হয় "Visualization Technique"। এখানে আপনি অতীতের কোন একটি সুন্দর মুহূর্ত, আপনার প্রিয় জায়গা বা পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে কাটানো ভাল সময় মনে করতে পারেন। এই পদ্ধতিতে মনের নেতিবাচক চিন্তা দূর হয় এবং মন প্রশান্তি লাভ করে। এই অভ্যাসটি আপনাকে টানা ৩ মিনিট করে করতে হবে।

দ্বিতীয় পদ্ধতি: শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতি মনোযোগ দেওয়া

এবার ধ্যানের পরবর্তী পদ্ধতি হলো শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতি মনোযোগ দেওয়া। চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিন এবং ধীরে ধীরে ছাড়ুন। এটি আপনার শরীর এবং মনের মধ্যে শান্তির এক অনুভূতি সৃষ্টি করবে। শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার সময় আপনার মনের মধ্যে অন্য কোনো চিন্তা চলে আসতে পারে, তবে আপনি শুধু শ্বাস নেওয়া এবং ছাড়ার উপর মনোযোগ দিন। এটি ৩ মিনিটের জন্য করুন।

news image
আরও খবর

তৃতীয় পদ্ধতি: চারপাশের পরিবেশ অনুভব করা

ধ্যানের শেষ পদ্ধতিটি হলো চারপাশের পরিবেশকে অনুভব করা। আপনি যখন ধ্যান করছেন, তখন খুবই সূক্ষ্মভাবে চারপাশের শব্দ, গন্ধ এবং অনুভূতিগুলি অনুভব করার চেষ্টা করুন। যেমন: বাতাসের স্রোত, পাখির গানের শব্দ, বা হালকা গন্ধের অনুভূতি। এটি আপনার মনকে সম্পূর্ণভাবে বর্তমান অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে এবং মনের চাপ অনেকটাই কমে যাবে। এই অভ্যাসটি ২ মিনিটের জন্য করুন।

ধ্যানের সুফল

ধ্যানের অভ্যাসের ফলে আপনার শরীর ও মনের মধ্যে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এটি:

  1. মানসিক চাপ কমায়: ধ্যানের মাধ্যমে মনের অশান্তি দূর হয় এবং মন শান্ত থাকে।

  2. উদ্বেগ এবং অবসাদ কমায়: নিয়মিত ধ্যান উদ্বেগ এবং অবসাদ কমাতে সাহায্য করে।

  3. ভাল ঘুমের নিশ্চয়তা দেয়: ধ্যান করা মানে মনের শান্তি পাওয়া, যা গভীর এবং ভাল ঘুমের জন্য প্রয়োজন।

  4. সামাজিক জীবন উন্নত করে: ধ্যানের মাধ্যমে মনের মধ্যে ধৈর্য বৃদ্ধি পায়, যা সামাজিক সম্পর্কের উন্নতিতে সাহায্য করে।

  5. শারীরিক সুস্থতা বাড়ায়: ধ্যানের মাধ্যমে শরীরের শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং শারীরিক সুস্থতা বজায় থাকে।

  6. কর্মক্ষমতা বাড়ায়: ধ্যান কর্মক্ষমতা এবং মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে।

 

উপসংহার

নতুন বছরে নিজের জীবনকে আরও শান্তিপূর্ণ, সুস্থ এবং আনন্দময় করে তুলতে ধ্যান বা মেডিটেশন একটি অত্যন্ত কার্যকরী উপায় হতে পারে। বর্তমান যুগে, যেখানে প্রত্যেকটি মুহূর্তে আমাদের জীবনে নানা চাপ, উদ্বেগ এবং দুশ্চিন্তা চলে আসে, সেখানে ধ্যান আমাদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে, যখন আমরা অফিস, সংসার, এবং অন্যান্য দায়িত্বের মাঝে চাপ অনুভব করি, তখন ধ্যানের মাধ্যমে মানসিক শান্তি ও প্রশান্তি অর্জন করা সম্ভব।

প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট ধ্যান করার অভ্যাস আপনার জীবনে অনেক পরিবর্তন আনতে পারে। আপনি যখন ধ্যান করবেন, তখন আপনার মস্তিষ্ক কিছুটা সময়ের জন্য দৈনন্দিন চিন্তা এবং উদ্বেগ থেকে মুক্তি পাবে। এটি আপনার চিন্তার মানে উন্নতি ঘটাবে এবং মনকে আরও একাগ্র এবং পরিষ্কার করে তুলবে। ধ্যানের মাধ্যমে আমরা আমাদের অবচেতন মনের চাপ হ্রাস করতে পারি এবং মানসিক অবসাদ ও উদ্বেগের মাত্রা কমাতে পারি।

গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ধ্যান আমাদের মস্তিষ্কে নানা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সাহায্য করে। প্রতিদিন ১০ মিনিট ধ্যান করলে আমাদের মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়ে এবং মনের অশান্তি কমে যায়। এটি শুধু মানসিক শান্তি দেয় না, বরং শারীরিক সুস্থতার জন্যও উপকারী। ধ্যান উচ্চ রক্তচাপ কমাতে, মনোযোগ বাড়াতে এবং ঘুমের সমস্যা সমাধান করতে সাহায্য করে।

ধ्यानের সহজ পদ্ধতিগুলি আপনার দৈনন্দিন জীবনে সহজেই অভ্যাসে পরিণত করা সম্ভব। আপনাকে প্রথমেই একটি শান্ত এবং নিরিবিলি পরিবেশ বেছে নিতে হবে, যেখানে কোলাহল কম হবে এবং আপনি একাগ্রভাবে ধ্যান করতে পারবেন। পোশাক হালকা হওয়া উচিত, যাতে শরীরে কোনো অস্বস্তি না হয়। চোখ বন্ধ করে প্রথমে অতীতের সুন্দর স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করুন, পরে শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর মনোযোগ দিন এবং শেষে চারপাশের পরিবেশ অনুভব করুন। এসব পদ্ধতিতে ধ্যানের অভ্যাস গড়ে তুললে, আপনি দেখবেন ধীরে ধীরে আপনার মনের চাপ কমে গেছে এবং জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি আরও ইতিবাচক হয়ে উঠেছে।

এছাড়া, ধ্যান শুধু মানসিক চাপ কমায় না, এটি আমাদের আত্মবিশ্বাসও বাড়ায়। যখন আমাদের মন শান্ত থাকে, তখন আমরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারি এবং কাজের প্রতি মনোযোগ রাখতে পারি। এটি আমাদের কর্মক্ষমতাকেও উন্নত করে। কর্মক্ষেত্রে চাপ এবং উদ্বেগের কারণে অনেক সময় আমাদের কার্যক্ষমতা কমে যায়, কিন্তু ধ্যান আমাদের সেই চাপ দূর করতে সাহায্য করে এবং কাজে আরও সফল হতে সহায়তা করে।

নতুন বছরে আপনি যদি আপনার জীবনে শান্তি এবং সুস্থতা আনতে চান, তবে ধ্যানের অভ্যাস শুরু করুন। এটি আপনার জীবনকে শুধু শান্তিপূর্ণ এবং সুস্থ করবে না, বরং আপনার চিন্তাভাবনা, অনুভূতি এবং কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। আপনি দেখবেন, ধীরে ধীরে আপনার মন আরও শান্ত, সুস্থ এবং ইতিবাচক হয়ে উঠেছে। আপনার জীবনের মান বৃদ্ধি পাবে, এবং আপনি আরও শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবেন। তাই, শুরু করুন আজই ধ্যানের অভ্যাস এবং অনুভব করুন জীবনের নতুন দিক।

 

Preview image