গলা বিশ্রামে থাকায় কথা বলা নিষেধ ইমন চক্রবর্তীর। তাই বাবার সঙ্গে মনের কথা ভাগ করে নিচ্ছেন কাগজ কলমে সেই নিঃশব্দ, আবেগঘন মুহূর্তই মন ছুঁয়েছে নেটিজেনদের।
কথা বলা বারণ’—এই ছোট্ট বাক্যটাই এখন ইমন চক্রবর্তীর দৈনন্দিন জীবনের একমাত্র নিয়ম। অতিরিক্ত ঠান্ডা লেগে গলার সমস্যায় ভুগছেন জনপ্রিয় এই গায়িকা। চিকিৎসকের স্পষ্ট নির্দেশ—গলাকে সম্পূর্ণ বিশ্রাম দিতে হবে। গান তো দূরের কথা, ঘরের মধ্যেও খুব প্রয়োজন ছাড়া কথা বলা নিষেধ। যাঁর জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত জুড়ে রয়েছে সুর, যাঁর পরিচয়ই গলার জাদুতে বাঁধা—তাঁর কাছে এই নির্দেশ নিঃসন্দেহে কঠিন। কিন্তু নিয়ম মানতেই হবে, কারণ গলাই যে তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ।
তবে কথা বলা বন্ধ থাকলেই কি অনুভূতি, আবেগ কিংবা ভালোবাসা থেমে যায়? ইমনের ক্ষেত্রে তার উত্তর একেবারেই ‘না’। গলার বিশ্রামের মাঝেও তিনি খুঁজে নিয়েছেন নিজস্ব এক বিকল্প পথ—যেখানে শব্দ নেই, কিন্তু অনুভূতির কোনও ঘাটতি নেই। সেই পথ হলো কাগজ আর কলম।
এই নির্দেশ মানা একজন সাধারণ মানুষের পক্ষেও কঠিন। আর সেখানে ইমন চক্রবর্তী—যাঁর পেশাই কণ্ঠনির্ভর। তবু নিজের কেরিয়ার, ভবিষ্যৎ এবং স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে কোনও রকম ঝুঁকি নিতে চাননি তিনি। চিকিৎসকের পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলছেন। কথা না বলার এই সময়টা তাঁর জীবনে এক নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছে—যেখানে শব্দ নেই, কিন্তু অনুভূতির গভীরতা আরও বেড়েছে।
গলা বিশ্রামের এই সময়ে ইমন বেশিরভাগ সময় কাটাচ্ছেন বাড়িতে। কাজের ব্যস্ততা আপাতত নেই। রেকর্ডিং, রিহার্সাল, স্টেজ শো—সবই স্থগিত। এই হঠাৎ পাওয়া অবসর তাঁর কাছে যেমন বিশ্রামের সুযোগ, তেমনই পরিবারকে আরও কাছ থেকে অনুভব করার এক বিশেষ সময়। বিশেষ করে বাবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এই সময়ে নতুন মাত্রা পেয়েছে।
ইমন ও তাঁর বাবার সম্পর্ক বরাবরই অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। কর্মব্যস্ত জীবনে সময় কম থাকলেও বাবা-মেয়ের মধ্যে যোগাযোগ কখনও কমেনি। ছোটবেলা থেকেই বাবাই ছিলেন ইমনের প্রথম শ্রোতা, প্রথম সমালোচক এবং সবচেয়ে বড় ভরসা। মেয়ের গান শোনা, রিহার্সালের ফাঁকে পরামর্শ দেওয়া কিংবা শুধু চুপচাপ পাশে বসে থাকা—সবকিছুতেই বাবার উপস্থিতি ছিল অবিচ্ছেদ্য।
স্বাভাবিক দিনে তাঁদের কথাবার্তা চলত অনর্গল। কখনও দিনের গল্প, কখনও হালকা খুনসুটি, কখনও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। ইমনের সাফল্যের পেছনে এই পারিবারিক সমর্থনের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু হঠাৎ করে যখন কথা বলাই নিষেধ হয়ে গেল, তখন প্রথম কয়েকদিন এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল দু’জনের মধ্যেই।
বাড়ির পরিবেশ যেন বদলে গিয়েছিল। কথা কম, নীরবতা বেশি। কিন্তু এই নীরবতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ইমনই প্রথম ভাবলেন বিকল্প কোনও উপায়ের কথা। কথা বলা যাবে না, কিন্তু যোগাযোগ তো থামানো যায় না। সেখান থেকেই শুরু কাগজ-কলমের নিঃশব্দ যাত্রা।
একটি সাদা কাগজ, একটি কলম—এই দু’টিই হয়ে উঠল তাঁদের কথোপকথনের মাধ্যম। ইমন কাগজে লিখে দিচ্ছেন মনের কথা, বাবার হাতে তুলে দিচ্ছেন। বাবা সেই কাগজেই উত্তর লিখে দিচ্ছেন। কখনও আবার নতুন কাগজে নতুন প্রশ্ন, নতুন উত্তর। এভাবেই দিনের পর দিন চলছে নিঃশব্দ সংলাপ।
এই লেখাগুলোতে কোনও বড় কথা নেই। কিন্তু ছোট ছোট বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে গভীর ভালোবাসা। কখনও ইমন লিখছেন, “আজ শরীর কেমন?”—বাবার উত্তর, “আগের থেকে ভালো, চিন্তা কোরো না।” কখনও বাবার প্রশ্ন, “ওষুধ খেয়েছ?”—ইমনের জবাব, “হ্যাঁ, সময়মতো।” কখনও আবার নিছক মজার ছলে লেখা, “আজ তুমি চা বানাবে।”
এই কাগজে লেখা কথোপকথন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এক ধরনের আবেগের দলিল হয়ে উঠেছে। শব্দ নেই, আওয়াজ নেই, তবু অনুভূতির কোনও ঘাটতি নেই। বরং এই নীরবতার মধ্যেই সম্পর্কের গভীরতা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি এই নিঃশব্দ কথোপকথনের একটি ঝলক সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাগ করে নেন ইমন চক্রবর্তী। একটি ছবি—যেখানে দেখা যায়, কাগজে লেখা মেয়ের অনুরোধ, বাবার প্রশ্ন আর তার উত্তর। খুব সাধারণ একটি মুহূর্ত, কিন্তু তার মধ্যেই ধরা পড়ে এক বিশেষ আবেগ।
ছবিটি প্রকাশ্যে আসতেই মুহূর্তের মধ্যে তা ভাইরাল হয়ে যায়। হাজার হাজার মানুষ সেই ছবি দেখেন, শেয়ার করেন, মন্তব্য করেন। নেটিজেনদের প্রতিক্রিয়া ছিল একেবারেই স্বতঃস্ফূর্ত। কেউ লিখেছেন, “এটাই আসল ভালোবাসা।” কেউ বলেছেন, “কথা না বলেও যে এতটা আপন হওয়া যায়, তা এই ছবি না দেখলে বুঝতাম না।”
এই সময়ে বাড়িতে বাবার সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি সময় কাটছে ইমনের। বাবা-মেয়ের সম্পর্ক এমনিতেই ভীষণ ঘনিষ্ঠ। স্বাভাবিক দিনে গল্প, হাসি, খুনসুটি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—সবই চলত কথার মাধ্যমে। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়েই বাবার দিন শুরু, আর বাবার সঙ্গেই দিনের শেষ। কিন্তু হঠাৎ করে যখন কথা বলা নিষিদ্ধ হয়ে গেল, তখন প্রথমে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল দু’জনেরই। কথার অভাবে যেন ঘরে এক ধরনের শূন্যতা নেমে আসে।
কিন্তু সেই শূন্যতা বেশিদিন থাকেনি। ইমনই প্রথম ভেবেছিলেন বিকল্প উপায়ের কথা। কাগজে মনের কথা লিখে বাবার হাতে তুলে দেওয়া—আর বাবা সেই কাগজেই উত্তর লিখে দিচ্ছেন। এভাবেই শুরু হয় এক নিঃশব্দ কথোপকথন। শব্দহীন, অথচ গভীর অনুভূতিতে ভরা।
কখনও কাগজে লেখা থাকছে, “আজ কী রান্না হবে?”
কখনও বাবার প্রশ্ন, “ওষুধ ঠিক সময়ে খেয়েছ তো?”
কখনও আবার ইমনের দুষ্টুমি ভরা লাইন, “তুমি চা বানাবে, না আমি?”
এই ছোট ছোট বাক্যের মধ্যেই ধরা পড়ছে বাবা-মেয়ের সম্পর্কের উষ্ণতা। কোনও উচ্চস্বরে বলা কথা নয়, তবু যেন সব বলা হয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি এই নিঃশব্দ কথোপকথনেরই কিছু মুহূর্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাগ করে নেন ইমন। একটি ছবি—যেখানে দেখা যাচ্ছে কাগজে লেখা মেয়ের অনুরোধ, বাবার প্রশ্ন, আর তার উত্তরের পর উত্তর। ছবি দেখেই বোঝা যায়, কথাবার্তা না থাকলেও আবেগে কোনও ঘাটতি নেই। বরং এই নীরবতার মধ্যেই যেন সম্পর্কের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ছবিটি প্রকাশ্যে আসতেই নেটদুনিয়ায় হাসি আর ভালোবাসার বন্যা বয়ে যায়। হাজার হাজার মানুষ কমেন্ট করে নিজেদের অনুভূতি ভাগ করে নেন। কেউ লেখেন, “এটাই আসল বাবা-মেয়ের সম্পর্ক।” কেউ বলেন, “কথা না বলেও যে এতটা আপন হওয়া যায়, এই ছবিই তার প্রমাণ।” আবার অনেকেই নিজেদের জীবনের সঙ্গে এই মুহূর্তের মিল খুঁজে পান।
আসলে বাবা-মেয়ের সম্পর্কের একটি বিশেষ রসায়ন থাকে—যা শব্দের ওপর নির্ভর করে না। ছোটবেলা থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত, বাবা অনেক সময় নীরব দর্শক হয়ে থাকেন। মেয়ের হাসি, কান্না, সাফল্য, কষ্ট—সবকিছুই তিনি বুঝে নেন চোখের ভাষায়। ইমন আর তাঁর বাবার এই নিঃশব্দ কথোপকথন সেই চিরচেনা সম্পর্ককেই যেন নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।
ইমন চক্রবর্তী বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির এমন এক নাম, যাঁর কেরিয়ার শুরু থেকেই আলাদা করে পরিচয়ের প্রয়োজন পড়েনি। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল খুব অল্প বয়সেই। ‘প্রাক্তন’ ছবির গান তাঁকে এনে দিয়েছিল জাতীয় স্বীকৃতি, আর তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক ছবিতে তাঁর কণ্ঠ দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে।
তবে এত সাফল্যের মাঝেও ইমন বরাবরই মাটিতে পা রেখে চলতে ভালোবাসেন। পরিবার তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। কাজের ব্যস্ততার মাঝেও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো তাঁর কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সবসময়ই আলোচনায় এসেছে—কখনও মজার গল্পে, কখনও আবেগঘন মুহূর্তে।
এই গলা বিশ্রামের সময়টা ইমনের কাছে যেমন শারীরিক বিশ্রামের, তেমনই মানসিকভাবে পরিবারকে আরও কাছ থেকে অনুভব করার সুযোগও এনে দিয়েছে। গান নেই, রেকর্ডিং নেই, মঞ্চ নেই—তবু এই সময়টা যে কতটা মূল্যবান, তা তিনি নিজেও বুঝতে পারছেন।
চিকিৎসকদের মতে, গায়কদের জন্য গলার বিশ্রাম অত্যন্ত জরুরি। সামান্য অবহেলা বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। সেই কারণেই ইমন কোনও ঝুঁকি নিতে চাননি। সম্পূর্ণ নিয়ম মেনেই চলছেন। কথা বলার বদলে লিখে যোগাযোগ—এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে নিজের কেরিয়ার এবং ভবিষ্যতের প্রতি দায়িত্ববোধ।
তবে এই নিয়ম মানার মাঝেই যে এমন সুন্দর, হৃদয়ছোঁয়া মুহূর্ত তৈরি হবে, তা হয়তো ইমন নিজেও ভাবেননি। কাগজে লেখা কয়েকটি বাক্য আজ হাজার হাজার মানুষের মন ছুঁয়ে গেছে। প্রমাণ করেছে, সম্পর্কের গভীরতা শব্দের ওপর নির্ভর করে না।
সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই মন্তব্য করেছেন, এই ছবি যেন আজকের ব্যস্ত জীবনে এক টুকরো শান্তি। যেখানে সবাই দ্রুত কথা বলে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়, সেখানে এই ধীর, নীরব কথোপকথন যেন আলাদা করে চোখে পড়ে। কেউ কেউ বলেছেন, “এই ছবি দেখে মনে পড়ে গেল ছোটবেলার দিনগুলো, যখন বাবা সব বুঝে নিতেন চোখের চাহনিতেই।”
ইমন চক্রবর্তীর এই মুহূর্ত আসলে শুধুই একটি ব্যক্তিগত ঘটনা নয়। এটি এক সার্বজনিক অনুভূতির প্রতিফলন। বাবা-মেয়ের সম্পর্ক, পারিবারিক বন্ধন, আর ভালোবাসার ভাষা—সবকিছুই এখানে একসঙ্গে ধরা দিয়েছে।
গলা বিশ্রামে থাকলেও ইমনের জীবনে ভালোবাসার কোনও বিশ্রাম নেই। গান আপাতত থেমে থাকলেও, আবেগ, সম্পর্ক আর অনুভূতির সুর ঠিকই বাজছে—নিঃশব্দে, গভীরভাবে। আর সেই সুরই আজ হাজারো মানুষের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
এই নিঃশব্দ কথোপকথন মনে করিয়ে দেয়, কখনও কখনও চুপ থাকাই সবচেয়ে জোরালো কথা বলে। শব্দ না থাকলেও অনুভূতির অভাব হয় না। ইমন চক্রবর্তীর জীবনের এই অধ্যায় সেই কথাই নতুন করে প্রমাণ করল।