বাজেট বক্তৃতায় কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ জানান শুল্ক ছাড়ের ফলে একাধিক ক্যানসার চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের দাম কমবে। স্বাস্থ্য খাতে আর কী কী ঘোষণা করল কেন্দ্রীয় সরকার।
ক্যানসার চিকিৎসার খরচ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকলেও ওষুধের উচ্চমূল্যের কারণে বহু রোগী মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ করতে বাধ্য হন। সেই বাস্তবতার কথা মাথায় রেখেই কেন্দ্রীয় বাজেটে বড় ঘোষণা করল সরকার। ২০২৬ এবং ২০২৭ আর্থিক বর্ষের পূর্ণাঙ্গ বাজেটে ক্যানসারের ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের উপর থেকে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ওই ওষুধগুলির দাম সরাসরি কমবে বলে মনে করছেন চিকিৎসক মহল এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
এই ঘোষণার পর ক্যানসার আক্রান্ত রোগী এবং তাঁদের পরিবারের মধ্যে স্বস্তির হাওয়া বইছে। বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ক্যানসারের চিকিৎসা শুরু হলেও দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের চাপ সামলাতে না পেরে পরিবারগুলি ঋণের বোঝায় ডুবে যায় বা চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখে দিতে বাধ্য হয়। বিশেষ করে যেসব ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়, সেগুলির উপর শুল্ক আরোপের কারণে খুচরো বাজারে দাম অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যায়। এবার সেই শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে চিকিৎসার খরচ অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংসদে বাজেট পেশ করার সময় কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, শুল্ক ছাড়ের ফলে ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের দাম সরাসরি কমবে। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য হল গুরুতর অসুস্থতায় আক্রান্ত রোগীদের আর্থিক চাপ কমানো এবং স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও সহজলভ্য করা।
ক্যানসারের পাশাপাশি সাতটি বিরল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধও শুল্ক ছাড়ের আওতায় আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বিরল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ সাধারণত অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয় এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। এই ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড়ের সিদ্ধান্ত বহু পরিবারকে নতুন করে আশা দেখাবে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
চিকিৎসক মহলের একাংশের মতে, ক্যানসারের ওষুধের দাম কমলে চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। অনেক রোগী যাঁরা এতদিন খরচের ভয়ে উন্নত চিকিৎসা নিতে পারছিলেন না, তাঁরা এবার সেই সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলিতেও চিকিৎসা পরিকল্পনা আরও বাস্তবসম্মত ভাবে করা সম্ভব হবে।
অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট ভাষণে আরও বলেন, কেন্দ্রের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হল ভারতকে একটি বিশ্বব্যাপী জৈব ঔষধ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। এর ফলে ভবিষ্যতে গুরুতর অসুস্থতার চিকিৎসার জন্য বিদেশ নির্ভরতা কমবে এবং দেশীয় স্তরেই সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ উৎপাদন সম্ভব হবে। এই লক্ষ্য পূরণে জৈব প্রযুক্তি এবং ঔষধ গবেষণায় আরও বিনিয়োগ করা হবে বলে জানান তিনি।
বাজেটে বিশেষ ভাবে ক্যানসার ডায়াবিটিস এবং অটোইমিউন রোগের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এই তিন ধরনের রোগের চিকিৎসায় দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ সেবনের প্রয়োজন হয়। ফলে পরিবারের উপর আর্থিক চাপ ক্রমেই বাড়তে থাকে। সরকারের এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে সেই চাপ অনেকটাই কমাতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত শুধু রোগীদের জন্য নয়, গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধের দাম কমলে বিমা সংস্থার উপর চাপ কমবে, সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পগুলির ব্যয়ও তুলনামূলক ভাবে কমবে। এর ফলে আরও বেশি মানুষ সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে ভারত ইতিমধ্যেই চিকিৎসা পরিকাঠামোর দিক থেকে অনেকটা এগিয়েছে। তবে ওষুধের দাম বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। সেই জায়গায় শুল্ক ছাড় একটি বড় পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এর ফলে চিকিৎসা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়বে, যা রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাকেও বাড়াবে।
সরকার জানিয়েছে, স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও সহজলভ্য এবং মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য। শুধুমাত্র বড় শহর নয়, ছোট শহর এবং গ্রামাঞ্চলের রোগীরাও যাতে এই সুবিধা পান, সে দিকেও নজর রাখা হবে। ভবিষ্যতে ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে কেন্দ্র।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাজেটে ক্যানসারের ১৭টি ওষুধের উপর থেকে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত শুধু একটি অর্থনৈতিক ঘোষণা নয়। এটি লক্ষ লক্ষ ক্যানসার আক্রান্ত রোগী এবং তাঁদের পরিবারের কাছে নতুন আশার আলো। চিকিৎসা যাতে আর শুধুই সামর্থ্যের উপর নির্ভর না করে, সেই দিকেই এক ধাপ এগোল কেন্দ্র সরকার। এখন দেখার, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয় এবং তার সুফল কতটা দ্রুত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়।
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ক্যানসার চিকিৎসার কাঠামোয় এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ভারতের মতো দেশে যেখানে অধিকাংশ ক্যানসার রোগীর চিকিৎসার খরচ পরিবারকেই বহন করতে হয়, সেখানে ওষুধের দাম কমা মানেই চিকিৎসা ব্যবস্থায় বড় স্বস্তি। এখনও বহু পরিবার জমি বিক্রি করে, ঋণ নিয়ে বা সম্পত্তি বন্ধক রেখে চিকিৎসা চালান। শুল্ক ছাড়ের ফলে যদি ওষুধের দাম কিছুটা হলেও কমে, তবে সেই চাপ অনেকটাই লাঘব হবে।
চিকিৎসকদের মতে, ক্যানসারের ক্ষেত্রে নিয়মিত ওষুধ সেবন অত্যন্ত জরুরি। মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ হয়ে গেলে রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। খরচের কারণে অনেক রোগী চিকিৎসার সময়সীমা সম্পূর্ণ করতে পারেন না। এই নতুন সিদ্ধান্ত সেই সমস্যার সমাধানে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, আমদানি করা ক্যানসারের ওষুধের ক্ষেত্রে শুধু শুল্ক নয়, পরিবহণ খরচ এবং বাজারজাতকরণ ব্যয়ও দাম বাড়িয়ে দেয়। তবে শুল্ক প্রত্যাহার হলে মোট খরচের একটি বড় অংশ কমবে। এর প্রভাব সরাসরি খুচরো বাজারে পড়বে বলেই তাঁদের মত।
বিরল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত সাতটি ওষুধকে শুল্ক ছাড়ের আওতায় আনার সিদ্ধান্তও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিরল রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে কম হলেও চিকিৎসার খরচ অত্যন্ত বেশি। অনেক ক্ষেত্রেই একটি মাত্র ওষুধের দাম লক্ষাধিক টাকা ছাড়িয়ে যায়। ফলে পরিবারের পক্ষে সেই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে সেই পরিবারগুলির জন্য নতুন আশার দরজা খুলবে।
বাজেটে জৈব ঔষধ শিল্পের উপর জোর দেওয়ার বিষয়টিকেও ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ভারত যদি সত্যিই বিশ্বব্যাপী জৈব ঔষধ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, তবে কেবল আমদানির উপর নির্ভরশীল থাকতে হবে না। দেশীয় উৎপাদন বাড়লে কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাবে এবং ওষুধের দাম দীর্ঘমেয়াদে আরও কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পগুলিও উপকৃত হবে। আয়ুষ্মান ভারতের মতো প্রকল্পে ক্যানসার চিকিৎসার খরচ একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে। ওষুধের দাম কমলে একই বাজেটে আরও বেশি রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব হবে। ফলে স্বাস্থ্য পরিষেবার বিস্তৃত প্রভাব পড়বে সমাজের নিচুতলার মানুষের উপর।
তবে বিশেষজ্ঞরা এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শুধু শুল্ক ছাড় দিলেই সমস্যার পুরো সমাধান হবে না। ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং হাসপাতালের বিলিং কাঠামোতেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায়, ওষুধের দাম কমলেও হাসপাতালের অন্যান্য খরচ বেড়ে যায়। তাই এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে নজরদারি ব্যবস্থাও জোরদার করা জরুরি।
রোগী সংগঠনগুলির মতে, সরকারের এই ঘোষণার বাস্তব রূপ দ্রুত কার্যকর হওয়া দরকার। বাজেটে ঘোষণা হওয়ার পর অনেক সময় নীতি বাস্তবায়নে দেরি হয়। রোগীদের আশা, এই সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর হবে এবং বাজারে তার প্রভাবও দ্রুত দেখা যাবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ক্যানসারের ১৭টি ওষুধ এবং বিরল রোগের ওষুধে শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা স্বাস্থ্য খাতে একটি বড় পদক্ষেপ। এটি শুধু বর্তমান রোগীদের জন্য নয়, ভবিষ্যতের চিকিৎসা ব্যবস্থার দিকনির্দেশও স্থির করছে। চিকিৎসা যাতে বিলাসিতা না হয়ে অধিকার হয়ে ওঠে, এই সিদ্ধান্ত সেই পথেই এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।