পাকিস্তান সীমান্তে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই আফগানিস্তান ভারতের প্রতি বড় বার্তা দিল-কাবুল এখন ওপেন ফর বিজনেস। আফগানিস্তানের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী নূরউদ্দিন আজিজি এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে ভারত চাইলে আফগানিস্তানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্পক্ষেত্রে ব্যাপক সুযোগ রয়েছে, এবং কাবুল তার জন্য সম্পূর্ণ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তালিবান সরকার ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন করে শক্ত করতে চাইছে, কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সীমান্ত বন্ধ হওয়া ও ট্রেড রুট বিঘ্নিত হওয়ায় আফগান অর্থনীতি কঠিন চাপে পড়েছে। ফলে ভারত এখন আফগানিস্তানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প অংশীদার হয়ে উঠছে।
আফগানিস্তান আবারও আন্তর্জাতিক ব্যবসার মানচিত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন করে মজবুত করার প্রতি তারা গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে—এমনটাই জানিয়েছেন আফগানিস্তানের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী নূরউদ্দিন আজিজি। পাকিস্তান সীমান্তে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা, বাণিজ্য রুট বন্ধ হয়ে যাওয়া, অর্থনীতির টানাপোড়েন—এই সবকিছুর মধ্যে দাঁড়িয়ে কাবুল থেকে ভারতের উদ্দেশে সরাসরি বার্তা এসেছে: “আফগানিস্তান ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত। ভারত এগিয়ে এলে সমস্ত ধরনের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা দেওয়া হবে।”পাকিস্তান সীমান্তে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও ট্রেড রুট বন্ধের ফলে আফগানিস্তান বড় অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতেই তালিবান সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী নূরউদ্দিন আজিজি ঘোষণা করেছেন যে কাবুল এখন ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তাঁর বক্তব্য, আফগানিস্তানের বিশাল খনিজ সম্পদ, রেয়ার আর্থ মিনারেল, কৃষিজ পণ্য ও নির্মাণ ক্ষেত্রে ভারতীয় কোম্পানির জন্য বিপুল সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে ভারত–আফগানিস্তান বাণিজ্য মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার, যা দুই দেশের সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম। ভারত যদি কূটনৈতিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করতে চায়, তাহলে তালিবান সরকার সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত বলেও মন্ত্রী জানিয়েছেন। পাকিস্তান সীমান্ত সংকটের মাঝে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে নতুন বাণিজ্যিক অধ্যায় শুরু করতে আগ্রহী কাবুল।
এই ঘোষণার সময়কালই প্রতীকী। কারণ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক বর্তমানে এক অস্থির পর্যায়ে পৌঁছেছে। সীমান্তে সংঘর্ষ, চলাচল নিয়ন্ত্রণ, সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ—সব মিলিয়ে দুই দেশের ঐতিহ্যবাহী ট্রেড রুট অনেকটাই অচল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে আফগানিস্তানের বাণিজ্য কাঠামো নতুন সঙ্গী খুঁজছে, এবং সেই জায়গায় ভারতের গুরুত্ব বহুগুণে বেড়েছে।তালিবান শাসিত আফগানিস্তান বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। এর মধ্যেই ভারতের প্রতি এই সরাসরি বাণিজ্য আহ্বান আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভবিষ্যতে ভারত–আফগানিস্তান সম্পর্ক কোন পথে এগোয় তা এখন সময়ই নির্ধারণ করবে।
বর্তমানে ভারত ও আফগানিস্তানের দুই দেশের বার্ষিক পারস্পরিক বাণিজ্য দাঁড়িয়েছে মাত্র প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আফগানিস্তানের শিল্পমন্ত্রী আজিজির মতে, এই অঙ্ক আফগানিস্তান ও ভারতের অর্থনৈতিক শক্তি, ভূরাজনৈতিক অবস্থান এবং দীর্ঘদিনের সম্পর্কের তুলনায় ‘অত্যন্ত কম’। তার দাবি, যদি দুই দেশ সক্রিয়ভাবে কাজ করে, তাহলে বাণিজ্য কয়েক গুণ বাড়তে পারে এবং বহু ভারতীয় কোম্পানির জন্য নতুন বাজার খুলে যেতে পারে।
তার মতে, আফগানিস্তান বিশেষত রেয়ার আর্থ মিনারেল, পাথর, কৃষিজ পণ্য, শুকনো ফল, মূল্যবান ধাতু, জ্বালানি খনিজ—এই সব ক্ষেত্রে ভারতের জন্য ‘অসীম সুযোগ’ তৈরি করতে পারে।
তালিবান সরকারের দখলের পরে ভারত কাবুলের দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোর কাজ সীমিত করে দেয়। নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়ে যাওয়ায় ভারতীয় কূটনীতিকরা দেশে ফিরতে বাধ্য হন।
আফগান সরকারের নতুন বার্তা—
“ভারত যদি পুনরায় কূটনৈতিক কার্যক্রম শুরু করে, তাহলে আমরা সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করব।”
এটি শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয়—এর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্যিক বাস্তবতার হিসাব। কারণ ভারতীয় কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রথম শর্তই হলো নিরাপত্তা। তালিবান চাইছে ভারত এই আস্থা ফিরে পাক।
আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশই পাকিস্তান সীমান্ত দিয়ে চলত। কিন্তু সাম্প্রতিক উত্তেজনা, ডুরান্ড লাইনে সংঘর্ষ, পাকিস্তানের কঠোর সীমান্ত নীতি, ট্রাক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা—সবকিছু মিলে আফগানিস্তান কার্যত বাণিজ্যিকভাবে ‘চাপের মধ্যে’ পড়ে যায়। ফলে ভারত হয়ে উঠছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প অংশীদার।
তালিবান সরকার শুধু ভারত নয়—ইরান ও মধ্য এশিয়ার রুটও বড় করে তোলার পরিকল্পনা করছে। ভারত এই নেটওয়ার্কের অন্যতম অভিনব সুযোগ হতে পারে।
আফগানিস্তানে রয়েছে বিশাল পরিমাণ তামা, লৌহ আকরিক, লিথিয়াম, রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস, মূল্যবান রত্ন, কয়লা, তেল ও গ্যাসের সম্ভাবনা।
আজিজির বক্তব্য অনুসারে—
“আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদের সঠিক ব্যবহার ভারতীয় কোম্পানিগুলি করলে আমরা তাদের সবচেয়ে বড় অংশীদার হিসেবে চাই।”
ভারতীয় রেল, রাস্তা নির্মাণ, হাসপাতাল, স্কুল, হাউজিং, এনার্জি, সোলার প্রকল্প—এসব ক্ষেত্রেও ভারতের অভিজ্ঞতা আফগানিস্তানের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা
বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি
নারী অধিকার ও মানবাধিকার ইস্যু
সন্ত্রাসবাদ নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগ
পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা
এই মুহূর্তে কাবুল নিজের অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য বৈদেশিক ব্যবসার উপর নির্ভর করছে। ভারত এখানে একদিকে ঐতিহাসিক বন্ধু, অন্যদিকে সম্ভাব্য বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি।
আশ্চর্যের বিষয়—আফগান সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী ভারতীয় নারী উদ্যোক্তা ও নারী কেন্দ্রিক সংস্থাগুলোকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
তালিবান শাসনে নারীদের অধিকার হ্রাস পেলেও, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য এই বার্তাটি একটি ‘পজিটিভ ডিপ্লোম্যাটিক সিগন্যাল’ বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
আজিজি জানিয়েছেন, ভারত–আফগান যোগাযোগ স্থায়ী করতে কাবুল দিল্লিতে একটি কমার্শিয়াল অ্যাটাশে পাঠাবে আসন্ন মাসের মধ্যেই। একই সঙ্গে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলমান।
এই পদক্ষেপ সরাসরি নির্দেশ দিচ্ছে যে আফগানিস্তান ভারতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসা-সম্পর্ক গড়তে প্রস্তুত।
আফগানিস্তান বহু শতাব্দী ধরে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য, সংস্কৃতি, ভাষা, শিল্প—সব ক্ষেত্রেই যোগাযোগ রাখছে।
ভারত ইতিমধ্যে আফগানিস্তানে ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে—ড্যাম, রাস্তা, হাসপাতাল, পার্লামেন্ট ভবন থেকে শুরু করে স্কুল নির্মাণ পর্যন্ত।
২০২১ সালের শাসন পরিবর্তনের পর ভারত কূটনৈতিকভাবে দূরত্ব বজায় রেখেছিল। তবে মানবিক সাহায্য, খাদ্যদ্রব্য, কোভিড ভ্যাকসিন, চিকিৎসা উপকরণ—এসব দেওয়া চলেছিল।
তালিবান সরকারের সাম্প্রতিক বার্তায় বোঝা যাচ্ছে, কাবুল ভারতের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক করতে আগ্রহী। ভারতও মধ্য এশিয়ায় নিজের উপস্থিতি আরও শক্ত করতে আফগানিস্তানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখে।
টরখাম ও চমন সীমান্তে সংঘর্ষ
পাকিস্তানের নীতির কারণে হাজার হাজার ট্রাক দাঁড়িয়ে
খাদ্যপণ্য, তেল, নির্মাণ সামগ্রী—সব ক্ষতিগ্রস্ত
এই ঘটনাগুলোর ফলে আফগানিস্তান পাকিস্তানের উপর নির্ভরতা কমাতে বাধ্য হচ্ছে এবং ভারতসহ অন্যান্য পথ খুঁজছে।
আফগানিস্তান চাইছে—
ইরানের চাবহার বন্দর
মধ্য এশিয়ার করিডর
এর মাধ্যমে ভারতীয় ব্যবসা সরাসরি প্রবেশ করুক।
মাইনিং, রোড-বিল্ডিং, ট্রান্সপোর্ট, এনার্জি, রেল, কৃষি—সবখানেই ভারতের অংশগ্রহণ।
ভারতীয় দূতাবাস পুরোদমে চালু করা।
বহু আফগান ছাত্র ভারতীয় কলেজে পড়াশোনা করতে চায়।
আফগান নাগরিকদের ভারতীয় হাসপাতালের উপর গভীর আস্থা রয়েছে।
মধ্য এশিয়ার দরজা খুলে যাবে
বিশাল মাইনিং বাজার
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ
কৃষিজ পণ্যের আমদানি
কৌশলগত অবস্থান
নিরাপত্তা ঝুঁকি
মানবাধিকার ইস্যু
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অনিশ্চিত
তবে তালিবানের সাম্প্রতিক ঘোষণায় অনেকেই বলছেন, বাস্তব অর্থনৈতিক প্রয়োজনে তারা সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়াতে ডিসিপ্লিন দেখাতে বাধ্য হবে।
আফগানিস্তান এখন সবচেয়ে বেশি যা চাইছে তা হলো—
স্থিতিশীলতা
ব্যবসা
বৈদেশিক বিনিয়োগ
কূটনৈতিক স্বীকৃতি
এই চারটি ক্ষেত্রেই ভারত বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে।
পাকিস্তান সীমান্তে অস্থিরতা আফগানিস্তানকে এই বার্তা স্পষ্টভাবে বুঝিয়েছে যে একজন বৈশ্বিক শক্তির সমর্থন ছাড়া তাদের অর্থনীতি এগোতে পারবে না। তাই ভারতকে তারা এখন ‘কী পার্টনার’ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।তালিবান শাসিত আফগানিস্তান বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। এর মধ্যেই ভারতের প্রতি এই সরাসরি বাণিজ্য আহ্বান আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভবিষ্যতে ভারত–আফগানিস্তান সম্পর্ক কোন পথে এগোয় তা এখন সময়ই নির্ধারণ করবে।