Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট ও হার্ট অ্যাটাকের তফাত কী? চিনুন উপসর্গগুলি

হার্ট অ্যাটাক ও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এক নয়। দু’টি সমস্যাই প্রাণঘাতী হলেও, কারণ, উপসর্গ ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে রয়েছে বেশ কিছু পার্থক্য। নানা পটেকরের মৃত্যুর প্রসঙ্গে জেনে নিন, এই দুই সমস্যার তফাত কী, কোন উপসর্গগুলি দেখা দেয় এবং কীভাবে দ্রুত জীবন বাঁচানোর পদক্ষেপ করা যায়।

কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট ও হার্ট অ্যাটাকের তফাত কী? চিনুন উপসর্গগুলি
health and wellness

নানা পটেকরের মৃত্যু: হার্ট অ্যাটাক ও কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের তফাত কী? চিনে নিন উপসর্গ ও বিপদের সংকেত

হার্ট অ্যাটাক ও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট—হৃদ্‌যন্ত্রের এই দুই সমস্যাকে অনেকেই একই বলে মনে করেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দু’টি সম্পূর্ণ আলাদা অবস্থা। দু’টিই প্রাণঘাতী হতে পারে, তবে এদের কারণ, লক্ষণ এবং চিকিৎসার পদ্ধতিতে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে হৃদ্‌যন্ত্রের পেশিতে রক্ত সরবরাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়। অন্য দিকে, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে হৃদ্‌যন্ত্র আচমকা কার্যকর ভাবে রক্ত পাম্প করা বন্ধ করে দেয়। ফলে মস্তিষ্ক-সহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলিতে রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছনো ব্যাহত হয়।

নানা পটেকরের মৃত্যুর প্রসঙ্গে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট নিয়ে আলোচনা সামনে আসার পর অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠেছে, হার্ট অ্যাটাক ও কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের মধ্যে আসল তফাত কোথায়? কোন সমস্যার ক্ষেত্রে কী কী উপসর্গ দেখা দেয়? কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে কি রোগীকে বাঁচানো সম্ভব? আর এমন পরিস্থিতিতে আশপাশের মানুষের কী করা উচিত?

হৃদ্‌রোগের বিপদের সংকেত সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং জরুরি অবস্থায় দ্রুত সঠিক পদক্ষেপ করা জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট কী? কেন আচমকা অজ্ঞান হয়ে যান রোগী?

কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া এমন একটি জরুরি অবস্থা, যেখানে হৃদ্‌যন্ত্র হঠাৎ কার্যকর ভাবে রক্ত পাম্প করতে পারে না। সাধারণত হৃদ্‌যন্ত্রের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় গুরুতর গোলযোগের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। হৃৎস্পন্দন অত্যন্ত দ্রুত, অনিয়মিত বা এমন ভাবে দুর্বল হয়ে যেতে পারে যে শরীরে প্রয়োজনীয় রক্ত সরবরাহ বজায় থাকে না।

হৃদ্‌যন্ত্র ঠিকমতো রক্ত পাম্প করতে না পারলে মস্তিষ্কে অক্সিজেন পৌঁছনো দ্রুত কমে যায়। এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে জ্ঞান হারাতে পারেন। স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নেওয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে অথবা শ্বাস অস্বাভাবিক, অনিয়মিত ও হাঁপানোর মতো হতে পারে।

কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত জরুরি চিকিৎসা শুরু না হলে মস্তিষ্ক ও শরীরের অন্যান্য অঙ্গে স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলে অপেক্ষা না করে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা পরিষেবার সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন।

কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট মানেই যে আগে থেকে কোনও উপসর্গ দেখা দেবে, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে কোনও স্পষ্ট সতর্কসংকেত ছাড়াই এই ঘটনা ঘটতে পারে। আবার কারও কারও ক্ষেত্রে বুক ধড়ফড় করা, মাথা ঘোরা, বুকের অস্বস্তি কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

হার্ট অ্যাটাক কী? হৃদ্‌যন্ত্রে ঠিক কী ঘটে?

হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন সাধারণত ঘটে যখন হৃদ্‌যন্ত্রের পেশিতে রক্ত সরবরাহকারী করোনারি ধমনিতে রক্ত চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধমনির ভিতরে চর্বিজাতীয় পদার্থের আস্তরণ বা প্লাক তৈরি হয়। সেই প্লাক ফেটে গেলে সেখানে রক্তের জমাট বাঁধতে পারে। এর ফলে ধমনির মধ্যে দিয়ে রক্ত চলাচল আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

হৃদ্‌যন্ত্রের পেশি কাজ করার জন্য অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্তের উপর নির্ভরশীল। রক্ত সরবরাহ কমে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে সেই পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। যত বেশি সময় রক্ত চলাচল বন্ধ থাকে, হৃদ্‌যন্ত্রের পেশির ক্ষতির আশঙ্কাও তত বাড়ে।

হার্ট অ্যাটাকের সময় হৃদ্‌যন্ত্রের পাম্প করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। কখনও গুরুতর অনিয়মিত হৃৎস্পন্দনও দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক থেকেই কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে। তবে প্রতিটি হার্ট অ্যাটাকের পরিণতি কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট নয়।

সঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছতে পারলে ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করা গেলে হৃদ্‌যন্ত্রের পেশির ক্ষতি কমানো এবং রোগীর প্রাণ বাঁচানোর সম্ভাবনা বাড়ে। তাই বুকে ব্যথা কিছুক্ষণ পরে কমে গেলেও সেটিকে অবহেলা করা উচিত নয়।

হার্ট অ্যাটাক ও কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?

দু’টি সমস্যার মধ্যে মূল পার্থক্য হল, হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে রক্ত সরবরাহে বাধা তৈরি হয়, আর কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে হৃদ্‌যন্ত্র কার্যকর ভাবে রক্ত পাম্প করতে ব্যর্থ হয়।

হার্ট অ্যাটাকের সময় রোগী অনেক ক্ষেত্রে সচেতন থাকেন। তাঁর বুকে ব্যথা, চাপ, অস্বস্তি, ঘাম বা শ্বাসকষ্ট হতে পারে। কিন্তু কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে রোগী সাধারণত হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়েন এবং স্বাভাবিক শ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

তবে এই পার্থক্য সব ক্ষেত্রে একই রকম হবে, এমন নয়। হার্ট অ্যাটাকের সময়ও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে। আবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কারণ সব সময় হার্ট অ্যাটাক নয়। হৃদ্‌যন্ত্রের বৈদ্যুতিক গোলযোগ, কিছু বংশগত হৃদ্‌রোগ এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও এর কারণ হতে পারে।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে রোগীকে বাঁচানোর জন্য সময় পাওয়া যেতে পারে বলে চিকিৎসা নিতে দেরি করা বিপজ্জনক। দু’টি অবস্থার ক্ষেত্রেই দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।

হার্ট অ্যাটাকের কী কী উপসর্গ দেখা যায়?

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সব রোগীর ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। কারও ক্ষেত্রে তীব্র বুকের ব্যথা দেখা যায়, আবার কারও ক্ষেত্রে উপসর্গ তুলনামূলক মৃদু হতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, ডায়াবিটিসে আক্রান্ত মানুষ এবং কিছু মহিলার ক্ষেত্রে প্রচলিত লক্ষণ ছাড়াও অন্য ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

১. বুকের মাঝখানে চাপ বা ব্যথা

হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম পরিচিত লক্ষণ হল বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী ভাব, চেপে ধরা বা ব্যথা। কয়েক মিনিট ধরে এই অস্বস্তি থাকতে পারে। কখনও ব্যথা কমে গিয়ে আবার ফিরে আসে।

২. হাত, কাঁধ, পিঠ বা চোয়ালে ব্যথা

বুকের অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়তে পারে এক বা দুই হাত, কাঁধ, পিঠ, ঘাড় কিংবা চোয়ালে। কখনও বুকের ব্যথা স্পষ্ট না থাকলেও শরীরের অন্য অংশে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।

৩. শ্বাসকষ্ট

বিশ্রামের সময় বা অল্প পরিশ্রমেই শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে। বুকের ব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট থাকলে বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কিছু ক্ষেত্রে বুকের ব্যথা ছাড়াও শ্বাসকষ্ট হতে পারে।

৪. ঠান্ডা ঘাম

কোনও স্পষ্ট কারণ ছাড়াই ঠান্ডা ঘাম হওয়া, শরীর দুর্বল লাগা কিংবা অস্বস্তি তৈরি হওয়া হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাব্য লক্ষণ হতে পারে।

৫. বমি বমি ভাব বা বমি

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে বমি বমি ভাব, বমি, পেটের উপরের দিকে অস্বস্তি বা বদহজমের মতো অনুভূতি দেখা যায়। অনেকে এই উপসর্গকে গ্যাস বা অম্বল ভেবে ভুল করতে পারেন।

৬. মাথা ঘোরা ও অস্বাভাবিক দুর্বলতা

মাথা হালকা লাগা, মাথা ঘোরা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা দুর্বলতাও হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের আগে সব সময় এক মাস ধরে নির্দিষ্ট উপসর্গ থাকবে, এমন কোনও নিয়ম নেই। কারও ক্ষেত্রে পরিশ্রমের সময় বারবার বুকের অস্বস্তি দেখা দিতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে কোনও পূর্বাভাস ছাড়াই হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। তাই নতুন বা অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের লক্ষণ কী কী?

কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, আক্রান্ত ব্যক্তি আচমকা সাড়া দেওয়া বন্ধ করে দেন এবং স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নিতে পারেন না।

সম্ভাব্য লক্ষণগুলি হল—

  • আচমকা অচেতন হয়ে পড়ে যাওয়া।

  • ডাকলে বা কাঁধে আলতো চাপ দিলে সাড়া না দেওয়া।

  • স্বাভাবিক শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া।

  • অনিয়মিত, ধীর বা হাঁপানোর মতো শ্বাস নেওয়া।

  • শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকা।

  • কখনও ঘটনার ঠিক আগে বুক ধড়ফড় করা, মাথা ঘোরা বা বুকের অস্বস্তি অনুভব করা।

মনে রাখতে হবে, কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সময় হাঁপানোর মতো অনিয়মিত শ্বাসকে স্বাভাবিক শ্বাস বলে ভুল করা উচিত নয়। কেউ অচেতন হয়ে পড়লে এবং স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস না নিলে দ্রুত জরুরি পরিষেবায় ফোন করতে হবে। কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সন্দেহ হলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তির সাহায্য নিয়ে অবিলম্বে সিপিআর শুরু করা প্রয়োজন।

news image
আরও খবর

হার্ট অ্যাটাক থেকে কি কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে?

হ্যাঁ, হার্ট অ্যাটাক কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের অন্যতম সম্ভাব্য কারণ। করোনারি ধমনিতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে হৃদ্‌যন্ত্রের পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই ক্ষতির কারণে হৃদ্‌যন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপে গোলযোগ দেখা দিতে পারে। এর ফলে বিপজ্জনক অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন তৈরি হয়ে হৃদ্‌যন্ত্রের পাম্প করার ক্ষমতা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

তবে হার্ট অ্যাটাক এবং কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট একে অপরের সমার্থক নয়। হার্ট অ্যাটাক হলে রোগী সচেতন থাকতে পারেন এবং তাঁর হৃদ্‌যন্ত্র কিছুটা হলেও রক্ত পাম্প করতে পারে। অন্য দিকে, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে শরীরে রক্ত সরবরাহ বজায় রাখার জন্য অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

এ কারণেই হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে হাসপাতালে যাওয়া প্রয়োজন। দ্রুত চিকিৎসা অনেক ক্ষেত্রে হৃদ্‌যন্ত্রের গুরুতর ক্ষতি এবং পরবর্তী জটিলতার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট কেন হয়?

কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল—

হৃদ্‌যন্ত্রের বৈদ্যুতিক গোলযোগ: ভেন্ট্রিকুলার ফিব্রিলেশন বা ভেন্ট্রিকুলার ট্যাকিকার্ডিয়ার মতো গুরুতর ছন্দের সমস্যা হৃদ্‌যন্ত্রকে কার্যকর ভাবে রক্ত পাম্প করতে বাধা দিতে পারে।

আগের হার্ট অ্যাটাক: আগে হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকলে হৃদ্‌যন্ত্রের পেশিতে ক্ষত তৈরি হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে সেই ক্ষত পরবর্তী সময়ে বিপজ্জনক ছন্দের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।

হৃদ্‌যন্ত্রের গঠনগত সমস্যা: কিছু ধরনের কার্ডিয়োমায়োপ্যাথি বা হৃদ্‌যন্ত্রের পেশির রোগ কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বংশগত হৃদ্‌রোগ: কিছু বিরল জিনগত সমস্যা হৃদ্‌যন্ত্রের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।

ওষুধের অতিরিক্ত মাত্রা বা বিষক্রিয়া: কিছু ওষুধের অতিরিক্ত মাত্রা, নির্দিষ্ট মাদকদ্রব্য বা বিষাক্ত পদার্থের প্রভাবে হৃদ্‌যন্ত্রের ছন্দ বিপজ্জনক ভাবে বদলে যেতে পারে। তবে ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন বা বন্ধ করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

অন্যান্য শারীরিক সমস্যা: রক্তে পটাশিয়াম বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রোলাইটের মাত্রায় গুরুতর পরিবর্তন, শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যর্থতা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া কিংবা কিছু গুরুতর শারীরিক পরিস্থিতিও কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কারণ হতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের আগে স্পষ্ট কোনও লক্ষণ থাকে না। তাই হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে সিপিআর কেন জরুরি?

সিপিআর বা কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন এমন একটি জরুরি জীবনরক্ষাকারী পদ্ধতি, যা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সময় শরীরে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ কিছুটা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এতে বুকের মাঝখানে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে চাপ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী কৃত্রিম শ্বাসও দেওয়া হতে পারে।

কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সময় হৃদ্‌যন্ত্র কার্যকর ভাবে রক্ত পাম্প করতে না পারায় মস্তিষ্কে অক্সিজেন পৌঁছনো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সিপিআর রক্ত চলাচলের কিছুটা বিকল্প তৈরি করে মস্তিষ্ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে।

সিপিআর হৃদ্‌যন্ত্রকে সব সময় স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনতে পারে না। কিছু ক্ষেত্রে ডিফিব্রিলেটর বা AED-এর সাহায্যে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে হৃদ্‌যন্ত্রের ছন্দ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হয়। কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ধরন অনুযায়ী এই চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কেউ অচেতন হয়ে পড়লে এবং স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস না নিলে—

1. প্রথমে নিশ্চিত করুন যে আশপাশের জায়গাটি নিরাপদ।

2. আক্রান্ত ব্যক্তিকে ডেকে ও কাঁধে আলতো চাপ দিয়ে সাড়া দিচ্ছেন কি না দেখুন।

3. দ্রুত স্থানীয় জরুরি চিকিৎসা পরিষেবায় ফোন করুন। ভারতে অ্যাম্বুল্যান্সের জন্য ১১২ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়।

4. ব্যক্তি সাড়া না দিলে এবং স্বাভাবিক শ্বাস না থাকলে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সন্দেহ করুন। প্রশিক্ষণ থাকলে অবিলম্বে সিপিআর শুরু করুন। প্রশিক্ষণ না থাকলেও জরুরি পরিষেবার ফোন-সহায়তা অনুসরণ করুন।

5. কাছে AED থাকলে সেটি চালু করে যন্ত্রের নির্দেশ অনুসরণ করুন।

প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে বুকের মাঝখানে মিনিটে ১০০–১২০ বার চাপ দেওয়া হয়। চাপের গভীরতা ও প্রতিবার চাপের পরে বুককে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে দেওয়ার নিয়মও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত না হলে জরুরি পরিষেবার নির্দেশ অনুসরণ করে বুকের উপর চাপ দেওয়ার সিপিআর শুরু করা যেতে পারে।

কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ক্ষেত্রে শুধু অ্যাম্বুল্যান্স আসার জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়। দ্রুত সিপিআর এবং প্রয়োজন হলে AED ব্যবহার আক্রান্ত ব্যক্তির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?

সব ধরনের হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির কারণগুলির নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন: উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিন ধরে থাকলে রক্তনালি ও হৃদ্‌যন্ত্রের উপর চাপ বাড়ে। নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিন।

কোলেস্টেরলের মাত্রা পরীক্ষা করুন: রক্তে LDL বা ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকলে ধমনিতে প্লাক তৈরির ঝুঁকি বাড়তে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি।

ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন: রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন বেশি থাকলে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। নিয়মিত পরীক্ষা, সুষম খাবার, শারীরিক সক্রিয়তা এবং নির্ধারিত চিকিৎসা অনুসরণ করুন।

ধূমপান এড়িয়ে চলুন: ধূমপান হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালির ক্ষতি করতে পারে। ধূমপান ছাড়লে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য হয়।

সুষম খাবার খান: শাকসব্জি, ফল, গোটা শস্য, ডাল, বাদাম ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখুন। অতিরিক্ত নুন, ট্রান্স ফ্যাট এবং বেশি পরিমাণে প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার অভ্যাস কমান।

নিয়মিত শরীরচর্চা করুন: বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত হাঁটা বা অন্য ব্যায়াম হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। আগে থেকে হৃদ্‌রোগ থাকলে ব্যায়াম শুরুর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ: নিয়মিত ঘুম এবং মানসিক চাপ সামলানোর স্বাস্থ্যকর অভ্যাস সামগ্রিক হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: পরিবারে অল্প বয়সে হৃদ্‌রোগের ইতিহাস থাকলে, আগে হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকলে অথবা ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা উচ্চ কোলেস্টেরল থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি মূল্যায়ন করান।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে কী করবেন?

বুকে চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম কিংবা হঠাৎ অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে বিষয়টিকে গ্যাস বা অম্বল ভেবে উপেক্ষা করবেন না। বিশেষ করে উপসর্গ নতুন হলে, কয়েক মিনিট স্থায়ী হলে বা বারবার ফিরে এলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা পরিষেবার সাহায্য নিন।

রোগীকে নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যেতে দেবেন না। সম্ভব হলে অ্যাম্বুল্যান্স ডাকুন, কারণ পথে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে জরুরি সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে ওষুধ খাওয়ানো বা আগে থেকে নেওয়া ওষুধের মাত্রা বাড়ানো উচিত নয়। জরুরি পরিষেবা বা চিকিৎসকের নির্দেশ অনুসরণ করুন। রোগী অচেতন হয়ে গেলে এবং স্বাভাবিক শ্বাস না থাকলে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে এবং দ্রুত সিপিআর শুরু করতে হবে।

শেষ কথা

হার্ট অ্যাটাক ও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট—দু’টি সমস্যাই অত্যন্ত গুরুতর, তবে এদের মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি। হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে হৃদ্‌যন্ত্রের পেশিতে রক্ত সরবরাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়, আর কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে হৃদ্‌যন্ত্র কার্যকর ভাবে রক্ত পাম্প করা বন্ধ করে দেয়। হার্ট অ্যাটাক থেকে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে, কিন্তু সব কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কারণ হার্ট অ্যাটাক নয়।

বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম কিংবা অস্বাভাবিক দুর্বলতার মতো লক্ষণ অবহেলা করবেন না। আর কেউ আচমকা অচেতন হয়ে পড়লে এবং স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস না নিলে দ্রুত জরুরি পরিষেবায় যোগাযোগ করুন, সিপিআর শুরু করুন এবং সম্ভব হলে AED ব্যবহার করুন। দ্রুত পদক্ষেপ, সঠিক প্রাথমিক চিকিৎসা এবং সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছনো—এই তিনটি বিষয় অনেক ক্ষেত্রে জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সতর্কতা: এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। হৃদ্‌রোগের লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিন।

Preview image