কেরল সাহিত্য উৎসবে এই প্রসঙ্গ উঠতেই রাখঢাক না করে রহমানের পক্ষে সওয়াল করলেন প্রকাশ, সঙ্গীতশিল্পীর পাশেই দাঁড়ালেন অভিনেতা।
গত কয়েক দিন ধরেই ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন অস্কারজয়ী সঙ্গীতশিল্পী ও সুরকার এ আর রহমান। বলিউডের অন্দরে ধর্মীয় বিভাজন ও পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে তিনি যে মন্তব্য করেছেন, তা ঘিরেই শুরু হয়েছে বিতর্কের ঝড়। রহমানের এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে সরব হয়েছেন অভিনেত্রী ও পরিচালক কঙ্গনা রনৌত। আর সেই বিতর্কে এ বার প্রকাশ্যে মুখ খুললেন অভিনেতা প্রকাশ রাজ—যাঁর বক্তব্য নতুন করে আগুনে ঘি ঢেলেছে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এ আর রহমান দাবি করেন, গত আট বছরে তিনি বলিউডে একাধিক কাজ হারিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, শিল্পের অন্দরে ক্রমশ বেড়ে চলা ধর্মীয় মেরুকরণ ও পক্ষপাতের কারণেই তাঁকে একাধিক প্রজেক্ট থেকে দূরে রাখা হয়েছে। রহমান স্পষ্ট ভাষায় জানান, তিনি কখনও কাজের জন্য তদবির বা “ভিক্ষা” চাইতে রাজি নন। তাঁর মতে, শিল্পীর কাজই তাঁর পরিচয় হওয়া উচিত, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় অবস্থান নয়।
এই মন্তব্য সামনে আসতেই তা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। কেউ তাঁর পাশে দাঁড়ান, কেউ আবার প্রশ্ন তোলেন তাঁর বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে।
এ আর রহমানের মন্তব্যের বিরুদ্ধে প্রথম সারিতে দাঁড়ান কঙ্গনা রনৌত। বরাবরই স্পষ্টভাষী ও রাজনৈতিক মতাদর্শে দৃঢ় কঙ্গনা সামাজিক মাধ্যমে ও প্রকাশ্যে রহমানের সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, রহমান নিজেই পক্ষপাতদুষ্ট এবং দ্বেষপরায়ণ।
কঙ্গনা দাবি করেন, তিনি নিজেও রাজনৈতিক মতের কারণে ইন্ডাস্ট্রিতে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, কিন্তু তবুও কখনও এ ভাবে প্রকাশ্যে অভিযোগ তোলেননি। তাঁর আরও অভিযোগ, নিজের পরিচালিত ছবি ‘ইমার্জেন্সি’-র চিত্রনাট্য শোনানোর জন্য তিনি এ আর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রহমান সেই গল্প পড়া তো দূরের কথা, তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেও রাজি হননি।
কঙ্গনার ভাষায়, তাঁকে জানানো হয়েছিল যে রহমান কোনও “একপেশে প্রচারমূলক” ছবির সঙ্গে যুক্ত হতে চান না। এই মন্তব্যকেই নিজের প্রতি অবমাননা হিসেবে দেখেন কঙ্গনা।
এই উত্তপ্ত আবহের মধ্যেই ‘কেরল সাহিত্য উৎসব’-এ এই প্রসঙ্গ উঠলে কোনও রাখঢাক করেননি প্রকাশ রাজ। বরং মঞ্চ থেকেই কঙ্গনার মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন তিনি এবং স্পষ্ট ভাবে এ আর রহমানের পাশে দাঁড়ান।
প্রকাশ রাজ বলেন,
“এ কী অবস্থা চারিদিকের? আমাদের দেশ কত অসাধারণ সুর, গান পেয়েছে রহমানের কাছ থেকে। উনি শুধু বলেছেন, কাজের জন্য ভিক্ষা চাইতে পারবেন না। তিনি এই সব কিছুর ঊর্ধ্বে।”
এই মন্তব্যেই থামেননি তিনি।
প্রকাশ রাজ আরও বলেন,
“চারিদিকে কেমন যেন ঘেউ ঘেউ শুরু হয়ে গিয়েছে। এক অভিনেত্রী তথা পরিচালক আছেন, যিনি ‘প্রোপাগান্ডা’ ছবিকে ‘ক্লাসিক’ বলে দাবি করেছেন। শুধুমাত্র ওঁর ছবিতে কাজ করতে রাজি হননি বলেই রহমানের বিরুদ্ধে এই আক্রমণ।”
যদিও তিনি নাম করে কঙ্গনা রনৌতের উল্লেখ করেননি, তবুও তাঁর মন্তব্য যে কঙ্গনাকেই লক্ষ্য করে, তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি কারও। এই ‘ঘেউ ঘেউ’ মন্তব্য দ্রুতই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
প্রকাশ রাজ বরাবরই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শিল্পীর স্বাধীন সত্তার পক্ষে সরব। তাঁর মতে, একজন শিল্পী কার সঙ্গে কাজ করবেন বা করবেন না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁর নিজের। সেই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক রঙ দিয়ে আক্রমণ করা অনুচিত।
তিনি মনে করেন, রহমান তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে যে অবদান রেখেছেন, তার তুলনায় এই বিতর্ক একেবারেই তুচ্ছ। প্রকাশ রাজের মতে, শিল্পকে শিল্প হিসেবেই দেখা উচিত—রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে নয়।
এই বিতর্ক নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—বলিউড কি সত্যিই ক্রমশ রাজনীতি ও ধর্মের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ছে? সাম্প্রতিক বছরগুলিতে একাধিক শিল্পী অভিযোগ করেছেন, তাঁদের রাজনৈতিক মত বা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাজ হারাতে হয়েছে।
কেউ কেউ মনে করেন, এই অভিযোগ অতিরঞ্জিত। আবার অনেকে মনে করেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় শিল্প জগতও আর নিরপেক্ষ নেই।
এ আর রহমানের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পীর মুখে এমন অভিযোগ আসা তাই বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে।
কঙ্গনা রনৌত দীর্ঘদিন ধরেই তথাকথিত ‘বলিউড লবি’-র বিরুদ্ধে মুখ খুলে আসছেন। তাঁর মতে, ইন্ডাস্ট্রিতে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ক্ষমতা ধরে রেখেছে এবং তাদের বিরোধিতা করলে কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে সমালোচকদের একাংশের দাবি, কঙ্গনা নিজেও প্রায়শই বিতর্ক উসকে দিয়ে আলোচনায় থাকতে চান। এ আর রহমানকে ঘিরে তাঁর মন্তব্যও সেই প্রবণতারই অংশ বলে মনে করছেন অনেকে।
এই বিতর্ক আসলে বড় একটি প্রশ্ন তুলে ধরছে—শিল্পীর স্বাধীনতা কোথায় শেষ হয়, আর আদর্শগত সংঘাত কোথা থেকে শুরু হয়? একজন শিল্পী যদি কোনও প্রজেক্টে কাজ করতে না চান, সেটিকে কি ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবে দেখা উচিত, না কি রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে?
প্রকাশ রাজের বক্তব্য অনুযায়ী, রহমানের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানো উচিত ছিল। অন্য দিকে কঙ্গনার মতে, এই সিদ্ধান্ত আসলে পক্ষপাতেরই বহিঃপ্রকাশ।
এই বিতর্ক সোশ্যাল মিডিয়ায়ও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কেউ প্রকাশ রাজের স্পষ্টভাষিতাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন, কেউ আবার তাঁকে পক্ষপাতদুষ্ট বলেও কটাক্ষ করেছেন।
এ আর রহমানের অনুরাগীরা তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে বলছেন, এমন একজন শিল্পীর সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অনুচিত। অন্য দিকে কঙ্গনার সমর্থকেরা মনে করছেন, তিনি একাই সাহস করে সত্য কথা বলছেন।
এই মুহূর্তে এ আর রহমান–কঙ্গনা রনৌত–প্রকাশ রাজকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক থামার কোনও ইঙ্গিত নেই। বরং প্রকাশ রাজের সাম্প্রতিক মন্তব্য এই আলোচনাকে আরও তীব্র করে তুলেছে। তাঁর বক্তব্যের পর থেকেই ফের নতুন করে বিতর্কের পারদ চড়েছে, এবং বিষয়টি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত মতবিরোধের স্তরে সীমাবদ্ধ না থেকে বলিউডের বৃহত্তর বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিয়েছে।
ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে প্রশ্ন উঠছে—এ আর রহমান যে ধর্মীয় পক্ষপাত ও আদর্শগত বিভাজনের কথা বলেছেন, তা কি সত্যিই বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা, নাকি বহু শিল্পীর নীরব বাস্তবতা? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই ভবিষ্যতে আরও অভিনেতা, পরিচালক কিংবা সঙ্গীতশিল্পীর মুখ খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, একবার এমন বিতর্ক শুরু হলে তা ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত আকার নেয়।
অন্য দিকে কঙ্গনা রনৌতও নিজের অবস্থান থেকে একচুল নড়তে নারাজ। তিনি আগেও বারবার ইন্ডাস্ট্রির তথাকথিত পক্ষপাত ও রাজনৈতিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। এই বিতর্কেও তাঁর বক্তব্য সেই পুরনো অবস্থানকেই আরও এক বার জোরালো করেছে। ফলে ভবিষ্যতে তাঁর তরফ থেকে আরও তীক্ষ্ণ প্রতিক্রিয়া আসতে পারে বলেই মনে করছেন অনেকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই বিতর্ক ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের অন্দরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা গভীর বিভাজনকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। এত দিন যা অনেকটাই আড়ালে ছিল বা ইঙ্গিতের মাধ্যমে বোঝা যেত, এ বার তা সরাসরি আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। শিল্পীর স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত আদর্শ, রাজনৈতিক অবস্থান এবং পেশাগত সিদ্ধান্ত—এই চারটি বিষয় এখন আর আলাদা করে দেখা যাচ্ছে না। বরং একে অপরের সঙ্গে এমন ভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে যে, একটি সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ছে বহু স্তরে।
এ আর রহমানের বক্তব্য সেই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি শুধুমাত্র নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেননি, বরং ইঙ্গিত দিয়েছেন এমন একটি পরিবেশের দিকে, যেখানে একজন শিল্পীকে তাঁর কাজের চেয়েও বেশি বিচার করা হচ্ছে তাঁর পরিচয় ও অবস্থানের ভিত্তিতে। অন্য দিকে কঙ্গনা রনৌত এই বক্তব্যকে দেখছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে। তাঁর মতে, শিল্প জগতে পক্ষপাত নতুন কিছু নয়, এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বৈষম্যের মোড়ক দেওয়া ঠিক নয়। এই দুই বিপরীত অবস্থানই বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে।
প্রকাশ রাজের মন্তব্য এই দ্বন্দ্বকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তিনি প্রকাশ্যে রহমানের পাশে দাঁড়িয়ে শুধু একজন শিল্পীকে সমর্থন করেননি, বরং পুরো ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, শিল্পের জায়গায় ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ঢুকে পড়লে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়। ফলে এই বিতর্ক এখন আর তিন জন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা গোটা বলিউডের চরিত্র নিয়েই প্রশ্ন তুলছে।
এই পরিস্থিতিতে বলিউডে মতের ঐক্যের চেয়ে মতভেদের ব্যবধান যে অনেক বেশি, তা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এক সময় যেখানে পেশাদার সম্পর্ক ও কাজই মুখ্য ছিল, সেখানে এখন আদর্শগত অবস্থান বড় ভূমিকা নিচ্ছে। কার সঙ্গে কাজ করা হবে, কোন প্রজেক্টে যুক্ত হওয়া হবে বা হবে না—এই সিদ্ধান্তগুলিও এখন নানা ভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
আগামী দিনে এই বাস্তবতা ইন্ডাস্ট্রির কাজের ধরণ ও পারস্পরিক সম্পর্কের সমীকরণে কী প্রভাব ফেলবে, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এই ধরনের বিতর্ক যদি আরও বাড়ে, তা হলে কি শিল্পীরা আরও স্পষ্ট ভাবে নিজেদের অবস্থান জানাতে বাধ্য হবেন? না কি পেশাগত নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেকেই নীরব থাকবেন? এক দিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অন্য দিকে কাজ হারানোর আশঙ্কা—এই টানাপড়েনই ভবিষ্যতের বলিউডকে নতুন রূপ দিতে পারে। আপাতত এই বিতর্ক সেই পরিবর্তনেরই একটি ইঙ্গিত, যা ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে