কোলেস্টেরল কমাতে ব্যবহৃত স্ট্যাটিন ওষুধ দীর্ঘদিন খেলে কিডনির উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক তথ্য
কোলেস্টেরল আমাদের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও এর মাত্রা বেড়ে গেলে তা হৃদযন্ত্রের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে তাই চিকিৎসকেরা দীর্ঘদিন ধরেই কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে স্ট্যাটিন গোষ্ঠীর ওষুধ ব্যবহার করে আসছেন এই ওষুধ লিভারের একটি নির্দিষ্ট এনজাইমের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয় যার ফলে শরীরে কোলেস্টেরল উৎপাদন কমে যায় এবং রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে ফলে হার্ট অ্যাটাক স্ট্রোকসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব হয়।
তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় এই বহুল ব্যবহৃত ওষুধকে ঘিরে এক নতুন প্রশ্ন উঠে এসেছে গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে দীর্ঘদিন ধরে স্ট্যাটিন গ্রহণ করলে কিডনির উপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে যা অনেক ক্ষেত্রেই প্রথম দিকে বোঝা যায় না এবং ধীরে ধীরে গুরুতর সমস্যার দিকে নিয়ে যেতে পারে এই বিষয়টি চিকিৎসাবিজ্ঞানের জগতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আমেরিকার খ্যাতনামা জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অফ পাবলিক হেলথ এর গবেষক ডা জুং ইম শিনের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় এই বিষয়টি সামনে আসে এই গবেষণাটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চিকিৎসাবিষয়ক জার্নাল জার্নাল অফ দ্য আমেরিকান সোসাইটি অফ নেফ্রোলজিতে প্রকাশিত হয় যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল সংখ্যক রোগীর উপর পর্যবেক্ষণ চালিয়ে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণায় প্রায় আট দশমিক চার বছর ধরে চল্লিশ হাজারেরও বেশি রোগীকে পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং দেখা যায় যারা নিয়মিত এবং উচ্চ মাত্রায় স্ট্যাটিন গ্রহণ করেছেন তাদের মধ্যে কিডনি সংক্রান্ত সমস্যার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি লক্ষ্য করা গেছে বিশেষ করে যারা উচ্চ ডোজে এই ওষুধ গ্রহণ করেন তাদের ক্ষেত্রে কিডনি ফেলিওরের ঝুঁকি প্রায় পনেরো শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে যা নিঃসন্দেহে একটি উদ্বেগজনক তথ্য।
এই গবেষণায় আরও দেখা যায় স্ট্যাটিন ব্যবহারকারীদের মধ্যে কয়েকটি নির্দিষ্ট কিডনি সমস্যার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এর মধ্যে অন্যতম হল অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি যা হঠাৎ করে কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়ার একটি গুরুতর অবস্থা এই ঝুঁকি প্রায় ত্রিশ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারে এছাড়া ক্রনিক কিডনি ডিজিজ অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি কিডনি সমস্যা যেখানে কিডনি ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এই ঝুঁকিও ছত্রিশ শতাংশ পর্যন্ত বেশি দেখা গেছে।
এর পাশাপাশি কিডনির প্রদাহজনিত সমস্যা যেমন নেফ্রাইটিস বা রেনাল স্ক্লেরোসিসের মতো অবস্থার ঝুঁকিও প্রায় পঁয়ত্রিশ শতাংশ বেশি হতে পারে এই সব সমস্যাই ধীরে ধীরে শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে এবং রোগীর জীবনযাত্রার মান মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই সমস্যাগুলি অনেক সময় প্রথম দিকে তেমন কোনো লক্ষণ দেখায় না ফলে রোগী বুঝতেই পারেন না যে তার কিডনি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যখন সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে তখন চিকিৎসা আরও জটিল হয়ে ওঠে অনেক ক্ষেত্রে ডায়ালিসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের মতো বড় চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে যা মানসিক এবং আর্থিকভাবে রোগীর উপর বিশাল চাপ তৈরি করে।
তবে গবেষকরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে এই ফলাফলকে সরাসরি কারণ হিসেবে ধরা ঠিক নয় অর্থাৎ স্ট্যাটিন খাওয়া মানেই কিডনি নষ্ট হয়ে যাবে এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি বরং এটি একটি পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক যা দেখায় যে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়তে পারে তাই এই বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
চিকিৎসকদের মতে স্ট্যাটিন এখনও হৃদরোগ প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর একটি ওষুধ এবং অনেক ক্ষেত্রেই এটি জীবন রক্ষাকারী হিসেবে কাজ করে তাই শুধুমাত্র এই গবেষণার ভিত্তিতে হঠাৎ করে ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে বরং রোগীর শারীরিক অবস্থা ঝুঁকি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ওষুধ গ্রহণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
এক্ষেত্রে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি যারা দীর্ঘদিন ধরে স্ট্যাটিন ব্যবহার করছেন তাদের নিয়মিত কিডনি ফাংশন পরীক্ষা করা উচিত যাতে কোনো সমস্যা শুরু হওয়ার আগেই তা ধরা পড়ে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায় এছাড়া স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন যেমন সুষম খাদ্য গ্রহণ নিয়মিত ব্যায়াম ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করাও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অনেক ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র ওষুধের উপর নির্ভর না করে জীবনধারার পরিবর্তনের মাধ্যমে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এতে শরীরের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে না এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকা যায় তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলা যায় স্ট্যাটিন ওষুধ একদিকে যেমন হৃদরোগ প্রতিরোধে কার্যকর তেমনি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি গবেষণার এই নতুন তথ্য আমাদের আরও সতর্ক হতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যতে আরও উন্নত ও নিরাপদ চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কারের পথ খুলে দেয় তাই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত এবং নিজের শরীরের যত্ন নেওয়াই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
বর্তমান সময়ে জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলে কোলেস্টেরল সমস্যা প্রায় প্রতিটি পরিবারের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অনিয়মিত ঘুম মানসিক চাপ এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে তাই চিকিৎসকেরা প্রায়ই স্ট্যাটিন গোষ্ঠীর ওষুধ ব্যবহার করার পরামর্শ দেন যাতে খারাপ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো যায় এই ওষুধ বহু বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তবে যেকোনো ওষুধের মতোই এরও কিছু সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে যা অনেক সময় দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় কিডনির উপর এর প্রভাব নিয়ে যে নতুন তথ্য সামনে এসেছে তা আমাদের আরও সচেতন হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে কারণ শরীরের প্রতিটি অঙ্গ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এবং একটি অঙ্গের সমস্যা অন্য অঙ্গের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে তাই শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসা নয় বরং পুরো শরীরের সামগ্রিক সুস্থতার দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
অনেক সময় দেখা যায় রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই দীর্ঘদিন একই মাত্রায় ওষুধ খেয়ে চলেন যা ভবিষ্যতে সমস্যার কারণ হতে পারে আবার কেউ কেউ হঠাৎ করে ওষুধ বন্ধ করে দেন যা আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে তাই নিয়মিত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধের ডোজ পরিবর্তন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাও খুবই প্রয়োজনীয় বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে স্ট্যাটিন গ্রহণ করছেন তাদের কিডনি এবং লিভারের কার্যকারিতা নিরীক্ষণ করা উচিত রক্ত পরীক্ষা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় টেস্টের মাধ্যমে খুব সহজেই বোঝা যায় শরীরের ভেতরে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে এতে করে কোনো সমস্যা প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়ে এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়।
একই সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তেল মশলাযুক্ত খাবার কম খাওয়া বেশি পরিমাণে শাকসবজি ফলমূল এবং ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম যেমন হাঁটা যোগব্যায়াম বা হালকা শরীরচর্চা কোলেস্টেরল কমাতে এবং হৃদযন্ত্রকে শক্তিশালী রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত অতিরিক্ত মানসিক চাপ হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং শরীরে নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে তাই পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া ধ্যান করা এবং নিজের পছন্দের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা শরীর ও মনের সুস্থতার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের সদস্যদের সচেতন করাও গুরুত্বপূর্ণ কারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা একা একজনের মাধ্যমে নয় বরং পুরো পরিবারের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে তবেই তা কার্যকর হয় নিয়মিত স্বাস্থ্য আলোচনা এবং সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে অনেক বড় রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে যা আমাদের চিকিৎসা পদ্ধতিকে আরও উন্নত করতে সাহায্য করছে তাই কোনো একটি গবেষণার ভিত্তিতে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই বরং তথ্যকে সঠিকভাবে বোঝা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
সবশেষে বলা যায় সুস্থ থাকার জন্য সচেতনতা নিয়মিত পরীক্ষা এবং সঠিক জীবনযাপন এই তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্ট্যাটিন ওষুধ অনেকের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও এর ব্যবহার সবসময় বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে হওয়া উচিত নিজের শরীরের প্রতি যত্নবান হওয়া এবং সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই দীর্ঘ সুস্থ জীবনের মূল চাবিকাঠি।