Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ক্যান্সারের ওষুধের দাম কমার সম্ভাবনা! স্বস্তি মিলতে পারে রোগী ও পরিবারের

কেন্দ্রের নতুন সিদ্ধান্তে নন-শিডিউলড ক্যান্সারের ওষুধে ট্রেড মার্জিন সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে, ফলে ওষুধের দাম কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ক্যান্সার রোগীদের জন্য বড় স্বস্তি! ওষুধের দাম কমতে পারে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত, ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের

ক্যান্সারের মতো মারণরোগের চিকিৎসায় বিপুল খরচের বোঝা থেকে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে বড় পদক্ষেপ নিল কেন্দ্রীয় সরকার। এবার নন-শিডিউলড ক্যান্সার প্রতিরোধী ওষুধের ক্ষেত্রে ট্রেড মার্জিন সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশে বেঁধে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে নির্দিষ্ট কিছু জীবনদায়ী ওষুধের দাম সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকাশিত বিবৃতিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। সরকারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই উদ্যোগ কার্যকর হলে ক্যান্সার রোগী ও তাঁদের পরিবারের বছরে প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।

ক্যান্সারের চিকিৎসায় স্বস্তির নতুন সম্ভাবনা

ভারতে ক্যান্সার চিকিৎসার বিপুল ব্যয় বহু পরিবারের কাছে বড় আর্থিক সমস্যা। রোগ নির্ণয়ের পর অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন, টার্গেটেড থেরাপি এবং অন্যান্য চিকিৎসার খরচ সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করতে হয় এমন রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসার ব্যয় আরও বেড়ে যায়।

অনেক সময় প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম এতটাই বেশি হয় যে রোগীর পরিবারকে সঞ্চয় ভাঙতে, ঋণ নিতে কিংবা অন্য গুরুত্বপূর্ণ খরচ কমাতে হয়। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের নতুন সিদ্ধান্ত ক্যান্সার চিকিৎসাকে তুলনামূলক সাশ্রয়ী করার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সরকার জানিয়েছে, নন-শিডিউলড অ্যান্টি-ক্যান্সার ওষুধের সরবরাহ ও বিক্রির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মুনাফা নিয়ন্ত্রণ করাই এই সিদ্ধান্তের প্রধান উদ্দেশ্য।

কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার?

কেন্দ্রীয় সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, নন-শিডিউলড ক্যান্সার প্রতিরোধী ওষুধের ট্রেড মার্জিন সর্বাধিক খুচরো বিক্রয়মূল্য বা MRP-এর ৩০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে।

ট্রেড মার্জিন বলতে ওষুধের সরবরাহ ও বিক্রয়ব্যবস্থায় ক্রয়মূল্য এবং খুচরো বিক্রয়মূল্যের মধ্যকার ব্যবধানকে বোঝানো হয়। এই ব্যবধান অস্বাভাবিক বেশি হলে রোগীদের অনেক বেশি টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে হয়।

কেন্দ্রের দাবি, নতুন ব্যবস্থায় সরবরাহ ও বিক্রয়স্তরে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এর ফলে ওষুধের সর্বাধিক খুচরো মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।

তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সব ক্যান্সারের ওষুধের দাম একই হারে কমবে না। কোন ওষুধের বর্তমান মূল্য কত, তার ট্রেড মার্জিন কত এবং নতুন নিয়ম অনুযায়ী মূল্য কীভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে, তার উপর প্রকৃত মূল্যহ্রাস নির্ভর করবে।

সুপ্রিম কোর্টের উদ্বেগের পর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ

সম্প্রতি ক্যান্সারের ওষুধের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট। আদালতে আলোচনার সময় ওষুধের ক্রয়মূল্য ও সর্বাধিক খুচরো বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বিপুল ব্যবধানের বিষয়টি সামনে আসে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি ক্যান্সারের ওষুধ খুচরো বিক্রেতাদের কাছে প্রায় ২,৭০০ টাকায় পৌঁছলেও তার সর্বাধিক খুচরো মূল্য প্রায় ২৭,০০০ টাকা নির্ধারিত থাকার উদাহরণ আদালতের নজরে আনা হয়।

এমন বিপুল ব্যবধান রোগীদের আর্থিক স্বার্থের পক্ষে কতটা ক্ষতিকর, সেই প্রশ্ন ওঠে। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছেও এই বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।

এই প্রেক্ষাপটে ট্রেড মার্জিন নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আগামী দিনে ওষুধের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কেন এত বেশি দামে বিক্রি হচ্ছিল ক্যান্সারের ওষুধ?

কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথরিটি বা NPPA-র বাজার বিশ্লেষণে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন নন-শিডিউলড ক্যান্সারের ওষুধের ক্ষেত্রে গড় মার্ক-আপ প্রায় ১৭০ শতাংশ। কিছু ক্ষেত্রে এই মূল্যবৃদ্ধি ৭০০ শতাংশ বা তারও বেশি পর্যায়ে পৌঁছেছে।

অর্থাৎ ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা থেকে বিভিন্ন সরবরাহ ও বিপণন স্তর পেরিয়ে রোগীর হাতে পৌঁছনোর সময় দামে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটতে পারে।

এমনকি একই ওষুধ হাসপাতালের ফার্মেসি, সাধারণ ওষুধের দোকান এবং অনলাইন ফার্মেসিতে ভিন্ন মূল্যে বিক্রি হওয়ার ঘটনাও দেখা যায়।

এই ধরনের মূল্যবৈষম্য নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যেই নতুন নিয়ম আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষত যেসব ওষুধ দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় নিয়মিত প্রয়োজন হয়, সেগুলির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি কমানো রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কোন কোন ক্যান্সারের ওষুধের দাম কমতে পারে?

কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নন-শিডিউলড বিভাগের ব্র্যান্ডেড ও জেনেরিক উভয় ধরনের ক্যান্সারের ওষুধ এই ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে।

দেশে প্রস্তুত ও আমদানি করা ওষুধের পাশাপাশি পেটেন্টযুক্ত এবং পেটেন্টমুক্ত ওষুধও এই উদ্যোগের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

তবে সব ওষুধের চূড়ান্ত তালিকা এখনও প্রকাশিত হয়নি। ডিরেক্টরেট জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেস বা DGHS-এর অধীন একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি সংশ্লিষ্ট ওষুধগুলির তালিকা চূড়ান্ত করবে।

তারপর NPPA প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি জারি করবে। সেই বিজ্ঞপ্তিতেই কোন ওষুধের ক্ষেত্রে নতুন মূল্যনীতি কার্যকর হবে, তা স্পষ্ট হওয়ার কথা।

আগে থেকেই কিছু ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে

ভারতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকাভুক্ত নির্দিষ্ট ক্যান্সারের ওষুধের ক্ষেত্রে আগে থেকেই সরকারি মূল্যনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে।

এই ওষুধগুলি ড্রাগস প্রাইসেস কন্ট্রোল অর্ডার বা DPCO, 2013-এর অধীনে নির্ধারিত সর্বোচ্চ মূল্যের নিয়ম অনুসরণ করে।

news image
আরও খবর

কিন্তু নন-শিডিউলড ওষুধের ক্ষেত্রে একই ধরনের সরাসরি মূল্যসীমা সবসময় প্রযোজ্য নয়। ফলে কিছু ওষুধের বিপণন ও বিক্রয়স্তরে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

নতুন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার মূলত সেই ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতে চাইছে।

২০১৯ সালেও বড় পদক্ষেপ নিয়েছিল কেন্দ্র

ক্যান্সারের ওষুধের দাম কমাতে কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগ এই প্রথম নয়।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে NPPA মোট ৪২টি নির্বাচিত নন-শিডিউলড ক্যান্সার প্রতিরোধী ওষুধের ট্রেড মার্জিন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেই পদক্ষেপের ফলে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ওষুধের সর্বাধিক খুচরো মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে মূল্যহ্রাসের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯১ শতাংশ পর্যন্ত।

মোট ৫২৬টি ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে সেই উদ্যোগের প্রভাব পড়ে এবং রোগীদের বার্ষিক প্রায় ৯৮৪ কোটি টাকা সাশ্রয় হওয়ার কথা সরকার জানিয়েছে।

আগের এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এবার আরও বিস্তৃত পরিসরে মূল্যনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বছরে ২৫০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা

কেন্দ্রীয় সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন ট্রেড মার্জিন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর হলে ক্যান্সার রোগীদের বছরে প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।

যেসব পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে ব্যয়বহুল ক্যান্সারের ওষুধ কিনতে হয়, তাদের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে এই সাশ্রয়ের পরিমাণ একটি সরকারি পূর্বাভাস। প্রকৃত আর্থিক সুবিধা নির্ভর করবে কতগুলি ওষুধ নতুন ব্যবস্থার আওতায় আসছে, সংশোধিত দাম কত নির্ধারিত হচ্ছে এবং রোগীরা সেই সুবিধা পাচ্ছেন কি না, তার উপর।

ওষুধের সরবরাহ যাতে বন্ধ না হয়, সেদিকেও নজর

শুধু দাম কমানো নয়, বাজারে প্রয়োজনীয় ক্যান্সারের ওষুধের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার।

সরকারি ঘোষণায় জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট নন-শিডিউলড ক্যান্সারের ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলিকে বর্তমান উৎপাদনের মাত্রা বজায় রাখতে হবে।

কারণ মূল্যনিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। দাম কমলেও যদি বাজারে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া না যায়, তাহলে রোগীদের সমস্যার সমাধান হবে না।

সেই কারণেই নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্য এবং ওষুধের ধারাবাহিক সরবরাহ—দুই বিষয়েই ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সাধারণ মানুষের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত?

ভারতের বহু পরিবারের কাছে ক্যান্সারের চিকিৎসা শুধু একটি স্বাস্থ্যসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকটের কারণও।

বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের ক্ষেত্রে জীবনদায়ী ওষুধের উচ্চমূল্য চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ক্যান্সার প্রতিরোধী ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে এলে কিছু রোগীর নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার আর্থিক চাপ কমতে পারে। একই সঙ্গে চিকিৎসার ব্যয় সম্পর্কে স্বচ্ছতা বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

তবে চিকিৎসার মোট খরচের মধ্যে ওষুধ ছাড়াও হাসপাতাল, পরীক্ষা, অস্ত্রোপচার এবং অন্যান্য পরিষেবার ব্যয় রয়েছে। তাই ওষুধের মূল্যহ্রাস মানেই সম্পূর্ণ ক্যান্সার চিকিৎসার খরচ ৭০ শতাংশ কমে যাওয়া নয়।

কবে থেকে মিলবে কম দামে ওষুধ?

কেন্দ্রীয় সরকার ৮ অক্টোবর নতুন সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করলেও সংশ্লিষ্ট সব ওষুধের সংশোধিত মূল্যতালিকা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

বিশেষজ্ঞ কমিটির তালিকা এবং NPPA-র আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর নির্দিষ্ট ওষুধের নতুন দাম ও কার্যকারিতার সময় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

ততদিন রোগীদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ চালিয়ে যাওয়া উচিত। শুধুমাত্র দামের কারণে চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া ওষুধ পরিবর্তন বা বন্ধ করা উচিত নয়।

সব মিলিয়ে ক্যান্সারের ওষুধের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে লাগাম টানতে কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্ত দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন দেখার, কত দ্রুত নতুন নিয়ম কার্যকর হয় এবং তার সুফল কতটা সরাসরি রোগীদের কাছে পৌঁছয়।

Preview image