দুর্গাপুজো ঘিরে নিজের পরিকল্পনার কথা জানালেন অভিনেতা সাহেব ভট্টাচার্য।
দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে শুধু একটি উৎসব নয়, বরং আবেগ, ঐতিহ্য এবং পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে সময় কাটানোর এক বিশেষ উপলক্ষ। পুজো এলেই কলকাতা যেন নতুন করে সেজে ওঠে। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে বড় রাস্তা—সর্বত্র আলো, মণ্ডপ, ঢাকের আওয়াজ আর মানুষের ভিড়ে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। পুজোর এই বিশেষ পরিবেশ থেকে দূরে থাকতে চান না অভিনেতা সাহেব ভট্টাচার্যও। এবারের দুর্গাপুজোয় কলকাতাতেই থাকার পরিকল্পনা তাঁর।
বরাবরই কলকাতায় পুজো কাটাতে পছন্দ করেন সাহেব। তাঁর কাছে পুজোর কলকাতার আবহের সঙ্গে অন্য কোনও কিছুর তুলনা চলে না। পুজোর কয়েকটা দিন শহরের পরিবেশে যে ইতিবাচক শক্তি তৈরি হয়, সেটিই তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে। সারা বছর মানুষের জীবনে নানা ধরনের সমস্যা, ব্যস্ততা ও চিন্তা থাকলেও দুর্গাপুজোর কয়েকটি দিন যেন সেই সমস্ত কিছু ভুলে মানুষ আনন্দে মেতে ওঠেন।
সাহেব ভট্টাচার্যের কথায়, পুজোর সময় কলকাতার মানুষকে দেখলে মনে হয় শহরটাই যেন বদলে গিয়েছে। সবাই যেন সেলিব্রেশন মুডে থাকেন। নতুন পোশাকে সেজে পরিবার-পরিজনকে সঙ্গে নিয়ে মানুষ ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে পড়েন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন প্রান্তে থাকে মানুষের ভিড়।
জীবনের নানা সমস্যা এবং ব্যস্ততার মধ্যেও পুজোর চারটে দিন মানুষ কীভাবে এতটা আনন্দ করতে পারেন, সেটাই অভিনেতাকে অবাক করে। তাঁর মতে, এই উৎসবের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই।
সারা বছর যে মানুষকে সামান্য পথ হাঁটতেও কষ্ট করতে দেখা যায়, পুজোর সময় সেই মানুষই ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে ঘুরে ঠাকুর দেখেন। ক্লান্তি যেন তখন কোনও বিষয়ই নয়। নতুন পোশাক পরে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোই হয়ে ওঠে আনন্দের অন্যতম কারণ।
সাহেবের কথায়, এই উন্মাদনা এবং আনন্দের আবহ অন্য কোথাও একইভাবে পাওয়া যায় কি না, তা নিয়ে তাঁর যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। পুজোর চারটে দিন মানুষ কীভাবে নিজেদের দুঃখ, চিন্তা এবং দৈনন্দিন সমস্যাগুলিকে একপাশে সরিয়ে রাখতে পারেন, সেটাই তাঁর কাছে কলকাতার দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় ম্যাজিক।
অভিনেতার ভাষায়, “পুজোর কলকাতা ম্যাজিক জানে।”
এই একটি বাক্যেই যেন ধরা পড়ে তাঁর কাছে কলকাতার পুজোর বিশেষত্ব। শহরের মানুষের উৎসবের প্রতি ভালোবাসা, পুজোর দিনগুলিতে একে অপরের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর এই সংস্কৃতিই কলকাতার দুর্গাপুজোকে অন্যরকম করে তুলেছে।
বর্তমানে অভিনেতা হিসেবে পুজোর সময় নানা ব্যস্ততা থাকে সাহেবের। পুজো পরিক্রমার সূত্রে বিভিন্ন মণ্ডপে যাওয়ার সুযোগও হয়। ফলে ভালো ভালো পুজো দেখার সুযোগ পান তিনি। কিন্তু ছোটোবেলার পুজোর আনন্দের সঙ্গে বর্তমান সময়ের পুজোর তুলনা করলে সেই সময়টাকেই যেন একটু বেশি সরল এবং আনন্দময় বলে মনে হয়।
ছোটোবেলায় পুজো মানেই ছিল স্কুলে ছুটি। পুজো আসার আগেই শুরু হয়ে যেত নতুন জামাকাপড় কেনার আনন্দ। বন্ধুদের মধ্যে আলোচনা চলত—কার কতগুলি নতুন পোশাক হয়েছে, কে কী কিনেছে। নতুন জামাকাপড় নিয়ে সেই উত্তেজনা আজও তাঁর স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছে।
তখন পুজোর সময় খাওয়া-দাওয়ার বিষয়টি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। বরং খেলনা এবং নতুন পোশাকই ছিল বেশি আকর্ষণের। বিশেষ করে ক্যাপ বন্দুক ছিল তাঁর ছোটোবেলার পুজোর অন্যতম প্রিয় জিনিস।
পুজোর সময় নতুন জুতো পরার ক্ষেত্রেও ছিল আলাদা পরিকল্পনা। নতুন জুতো পরে দীর্ঘক্ষণ হাঁটলে পায়ে ফোস্কা পড়ার সম্ভাবনা থাকত। তাই পুজোর আগেই নতুন জুতো পরে নেওয়া হত, যাতে পুজোর সময় হাঁটাহাঁটিতে কোনও সমস্যা না হয়।
ছোটোবেলার এই ছোট ছোট প্রস্তুতিই তখন পুজোর আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিত। এখন সেই সময়ের কথা মনে পড়লে স্বাভাবিকভাবেই নস্টালজিক হয়ে পড়েন অভিনেতা।
সময় বদলেছে। বদলে গিয়েছে পুজো উদযাপনের ধরনও। ছোটোবেলায় যে বিষয়গুলি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা ছিল, এখন সেগুলির জায়গায় এসেছে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর ইচ্ছা।
আর একটি বড় পরিবর্তন এসেছে উপহারের ক্ষেত্রেও। ছোটোবেলায় পুজোর সময় নতুন জামাকাপড় এবং উপহার পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতেন সাহেব। এখন পরিস্থিতি একেবারে উল্টো।
এখন তাঁকেই পরিবারের সদস্যদের এবং প্রিয়জনদের উপহার দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হয়। অর্থাৎ ছোটোবেলার সেই উপহার পাওয়ার ভূমিকা এখন বদলে গিয়ে উপহার দেওয়ার ভূমিকায় পরিণত হয়েছে।
এই পরিবর্তনকে জীবনের স্বাভাবিক পরিবর্তন হিসেবেই দেখেন অভিনেতা। ছোটোবেলায় যে আনন্দ অন্যদের কাছ থেকে পেতেন, এখন সেই আনন্দই অন্যদের দেওয়ার চেষ্টা করেন।
অভিনেতা হওয়ার সুবাদে এখন পুজোর সময় কলকাতার বিভিন্ন মণ্ডপে যাওয়ার সুযোগ পান সাহেব। পুজো পরিক্রমার কারণে শহরের বিভিন্ন প্রান্তের বেশ কিছু ভালো পুজো দেখাও হয়ে যায়।
ছোটোবেলায় পরিবারের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার যে আনন্দ ছিল, এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন পুজো মণ্ডপের থিম, প্রতিমা এবং মানুষের উৎসাহ কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান তিনি।
তবে ব্যস্ততার মধ্যেও পুজোর আসল আনন্দটা যেন হারিয়ে না যায়, সেটাই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁর কাছে পুজো শুধু মণ্ডপে গিয়ে প্রতিমা দেখার বিষয় নয়। পুজো মানে মানুষের সঙ্গে মানুষের দেখা হওয়া, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া এবং কয়েকটা দিন নিজের মতো করে উপভোগ করা।
বর্তমানে পুজোর সময় সাহেবের কাছে পরিবারের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কাজের ব্যস্ততার কারণে বছরের অন্যান্য সময়ে পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর সুযোগ সবসময় পাওয়া যায় না। তাই পুজোর কয়েকটা দিন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাতে চান তিনি।
ভাই-বোনেরাও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত এবং বিদেশ থেকে পুজোর সময় কলকাতায় ফিরে আসেন। ফলে এই সময়টা পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
ভাই-বোনেদের সঙ্গে গল্প করা, আড্ডা দেওয়া এবং একসঙ্গে সময় কাটানো—সব মিলিয়ে পুজো এখন তাঁর কাছে পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনেরও সময়।
ছোটোবেলায় পুজোর আনন্দ ছিল মূলত নিজের আনন্দকে কেন্দ্র করে। নতুন জামা, নতুন জুতো, খেলনা এবং ঠাকুর দেখা ছিল প্রধান আকর্ষণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই আনন্দের সংজ্ঞাও বদলে গিয়েছে। এখন পরিবারের মানুষগুলির সঙ্গে সময় কাটানোই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পরিবারের পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গেও সময় কাটাতে চান সাহেব। পুজোর চারদিন কাজের ব্যস্ততার বাইরে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সুযোগও তিনি উপভোগ করতে চান।
দুর্গাপুজোর সময় কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় বন্ধু এবং পরিচিতদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। ব্যস্ততার কারণে সারা বছর যাঁদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করা সম্ভব হয় না, পুজোর সময় তাঁদের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
তাই তাঁর কাছে পুজো মানে শুধু ঠাকুর দেখা নয়। বরং দীর্ঘদিন পর কাছের মানুষদের সঙ্গে দেখা করা, গল্প করা এবং একসঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোও উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাহেবের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে পুজোর সময় কলকাতার মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া ইতিবাচক শক্তির কথা। তাঁর মতে, জীবনের নানা সমস্যার মধ্যেও মানুষ এই কয়েকটা দিন আনন্দ করার জন্য আলাদা করে সময় বের করে নেন।
দৈনন্দিন জীবনে প্রত্যেকেরই কোনও না কোনও সমস্যা থাকে। কাজের চাপ, ব্যক্তিগত ব্যস্ততা কিংবা নানা ধরনের চিন্তা—সবকিছু নিয়েই মানুষকে চলতে হয়। কিন্তু দুর্গাপুজো যেন মানুষকে সাময়িকভাবে সেই চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দেয়।
নতুন জামাকাপড় পরে পরিবারের সঙ্গে বেরিয়ে পড়া, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরা—এই সাধারণ বিষয়গুলিই পুজোর সময় অসাধারণ আনন্দের কারণ হয়ে ওঠে।
এই কারণেই কলকাতার পুজো তাঁর কাছে বিশেষ। শহরের মানুষের এই উৎসবমুখর মনোভাবই পুজোর আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
ছোটোবেলার পুজো এবং বর্তমানের পুজোর মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকলেও আনন্দের জায়গাটি এখনও একই রকম রয়েছে। তখন পুজোর জন্য অপেক্ষা করা মানেই ছিল স্কুলের ছুটি এবং নতুন জামাকাপড়ের উত্তেজনা।
এখন পুজোর অপেক্ষা মানে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিকল্পনা, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ এবং শহরের বিভিন্ন মণ্ডপে যাওয়ার প্রস্তুতি।
ছোটোবেলায় নতুন জুতো পায়ে ফোস্কা না পড়ার জন্য আগেই পরে নেওয়া ছিল পুজোর প্রস্তুতির অংশ। এখন সেই জায়গায় এসেছে কাজের ব্যস্ততার মধ্যে নিজের জন্য এবং পরিবারের জন্য সময় বের করে নেওয়া।
অর্থাৎ পুজো বদলায়নি, বদলেছে পুজোকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।
অনেকেই পুজোর সময় শহরের বাইরে বা বিদেশে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু সাহেবের ক্ষেত্রে কলকাতা ছেড়ে যাওয়ার কোনও পরিকল্পনা নেই। বরাবরের মতো এবারও শহরেই থাকবেন তিনি।
কারণ তাঁর কাছে কলকাতার পুজোর পরিবেশের সঙ্গে অন্য কোনও কিছুর তুলনা চলে না। শহরের মণ্ডপ, মানুষের ভিড়, আলো, ঢাকের আওয়াজ এবং উৎসবের আবহ—সবকিছু মিলিয়ে কলকাতার দুর্গাপুজো তাঁর কাছে এক বিশেষ অভিজ্ঞতা।
পুজোর সময় কলকাতার রাস্তায় মানুষের যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়, সেটিই তাঁকে বারবার এই শহরের পুজোর কাছে টেনে আনে।
সাহেব ভট্টাচার্যের পুজোর পরিকল্পনা এবং স্মৃতির মধ্যে দিয়ে আসলে ফুটে ওঠে বাঙালির চিরচেনা দুর্গাপুজোর ছবি। ছোটোবেলায় যে শিশু নতুন জামা, নতুন জুতো এবং ক্যাপ বন্দুক নিয়ে পুজোর আনন্দে মেতে উঠত, সময়ের সঙ্গে সেই মানুষটিই আজ পরিবারের অন্য সদস্যদের উপহার দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন।
কিন্তু শৈশবের সেই আনন্দ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বরং স্মৃতির মধ্যে দিয়ে তা এখনও ফিরে আসে।
পুজোর সময় পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে পাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা এবং শহরের উৎসবের আবহের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাওয়া—এই সবকিছুর মধ্যেই যেন ছোটোবেলার সেই পুজোর একটা অংশ এখনও বেঁচে রয়েছে।
কলকাতার দুর্গাপুজো তাই সাহেবের কাছে শুধুমাত্র একটি উৎসব নয়। এটি তাঁর শৈশবের স্মৃতি, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ এবং শহরের মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আনন্দ করার একটি বিশেষ সময়।
জীবন যতই বদলাক, পুজোর কয়েকটা দিন যেন সবাইকে আবার সেই পুরনো আনন্দের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। আর কলকাতার এই বিশেষ উৎসবের আবহেই এবারও পরিবারের সঙ্গে পুজো কাটানোর পরিকল্পনা করেছেন সাহেব ভট্টাচার্য।
তাঁর কথায়, “পুজোর কলকাতা ম্যাজিক জানে।” সেই ম্যাজিকের টানেই প্রতি বছরের মতো এবারও কলকাতাতেই থাকবেন তিনি। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাবেন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেবেন এবং সুযোগ পেলেই শহরের পুজোর আবহ উপভোগ করবেন।
ছোটোবেলার ক্যাপ বন্দুক থেকে আজকের উপহার দেওয়ার দায়িত্ব—সময় বদলেছে, বদলেছে জীবনের অনেক কিছুই। কিন্তু দুর্গাপুজোকে ঘিরে কলকাতার প্রতি সেই ভালোবাসা এখনও একই রকম। আর সেই ভালোবাসাই হয়তো কলকাতার পুজোর সবচেয়ে বড় ম্যাজিক।