২০২৫-২৬ রঞ্জি ট্রফিতে মুম্বইয়ের জন্য রান না পাওয়ার বিষয়ে সরফরাজ খান বলেছেন, কোনও হতাশা নেই। তিনি আত্মবিশ্বাসী যে তার ব্যাটিং ফেরত আসবে।
২০২৫-২৬ রঞ্জি ট্রফিতে রান নেই? তবুও ‘কোনও হতাশা নেই’—মুম্বাইয়ের এই ব্যাটিং স্তম্ভের এমন বক্তব্যের পেছনের ক্রিকেটীয় দর্শন কী? এক কিংবদন্তি রান-মেশিনের সাময়িক ফর্ম বিপর্যয় এবং তার প্রত্যাবর্তনের রোডম্যাপ।
মুম্বাই:
মহারাষ্ট্রের ক্রিকেটীয় রাজধানী মুম্বাই, যা ৪২ বার রঞ্জি ট্রফি জয় করে ভারতীয় ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে, সেখানে পারফর্ম করা কেবল একটি খেলা নয়, এটি একটি কঠিন পরীক্ষা। এই শহরের নামকরা ক্রিকেট স্কুল থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়দের কাঁধে চাপানো থাকে অদম্য 'খাদুস' (Khadoos) মানসিকতা এবং রানের পাহাড় গড়ার ঐতিহাসিক চাপ। সেই চাপের মাঝে দাঁড়িয়ে, বিগত কয়েক মৌসুম ধরে যিনি নিজেকে ঘরোয়া ক্রিকেটের ‘রান মেশিন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেই সরফরাজ খান বর্তমানে এক অভূতপূর্ব রান খরার মুখোমুখি।
২০২৫-২৬ রঞ্জি ট্রফির প্রথম কয়েকটি ম্যাচে সরফরাজ খানের ব্যাট প্রত্যাশিতভাবে কথা বলেনি। যে ব্যাটসম্যানের ব্যাট থেকে নিয়মিতভাবে তিন অঙ্কের স্কোর আসত, যিনি প্রতি বছর ৯০০-এর বেশি রান করার অভ্যাসে অভ্যস্ত ছিলেন, তার এই সাময়িক নীরবতা মুম্বাইয়ের ক্রিকেট ভক্তদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তবে এই উদ্বেগকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন স্বয়ং সরফরাজ।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে জানিয়েছেন, “কোনও হতাশা নেই। আমি জানি আমার ফর্ম ফিরে আসবে। কঠোর পরিশ্রম করছি এবং আমার খেলার প্রতি আস্থা রাখছি। আমি জানি, বড় রান আসবে।”
এই মন্তব্যটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও, এর গভীরে রয়েছে এক পাকা ক্রিকেট মস্তিষ্কের পরিচয়। এটি নিছক একটি বিবৃতি নয়, বরং নিজের দক্ষতা ও কঠোর পরিশ্রমের প্রতি এক অটল বিশ্বাস, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।
ক্রিকেটীয় জগতে ফর্ম হলো একটি অস্থায়ী ব্যাপার, কিন্তু ক্লাস বা দক্ষতা হলো চিরন্তন। সরফরাজ খান সম্ভবত সেই হাতেগোনা কিছু ক্রিকেটারের মধ্যে পড়েন, যারা জানেন যে তাদের ক্লাস সাময়িক ফর্ম বিপর্যয়ের চেয়ে অনেক বড়। এই আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি শুধুমাত্র তাঁর মানসিক দৃঢ়তা নয়, বরং বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান।
পরিসংখ্যানের পাহাড়: রান মেশিন সরফরাজ (২০১৯-২০২৪)
রঞ্জি ট্রফির ইতিহাসে সরফরাজ খানের মতো ধারাবাহিকতা খুব কম ব্যাটসম্যানই দেখাতে পেরেছেন। ২০১৯-২০ মৌসুমে তিনি প্রায় ৯০০-এর বেশি রান করেছিলেন, যা ছিল অবিশ্বাস্য। এর পরের মৌসুমগুলি কোভিড এবং অন্যান্য কারণে ব্যাহত হলেও, ২০২১-২২ এবং ২০২২-২৩ মৌসুমে তার রান সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো, যেখানে তিনি নিয়মিত ডাবল সেঞ্চুরি এবং ট্রিপল সেঞ্চুরির কাছাকাছি ইনিংস খেলেছেন।
বিস্ময়কর গড়: দীর্ঘতম ফরম্যাটে তার ফার্স্ট-ক্লাস ক্যারিয়ারের ব্যাটিং গড় বিশ্বের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানদের গড়ের কাছাকাছি বা তার চেয়েও বেশি ছিল। এই গড় ইঙ্গিত দেয় যে, প্রতিবার যখন তিনি ক্রিজে আসেন, তখন বড় রান করার সম্ভাবনা থাকে।
বিশাল ইনিংসের অভ্যেস: সরফরাজের ব্যাটিংয়ের বিশেষত্ব হলো, তিনি শুধু সেঞ্চুরি করেই থামেন না, বরং সেই সেঞ্চুরিকে বিশাল স্কোরে (১৫০, ২০০, ২৫০+) রূপান্তরিত করেন। এটি কেবল দক্ষতার পরিচায়ক নয়, বরং মনোযোগ এবং শারীরিক সামর্থ্যের প্রমাণ।
যে খেলোয়াড় এমন পরিসংখ্যান নিয়ে এসেছেন, তার কাছে একটি খারাপ স্পেল বা দুটি কম স্কোর কোনো স্থায়ী সমস্যা নয়, বরং দ্রুত সমাধানযোগ্য একটি গ্লানি মাত্র। এই ইতিহাসই সরফরাজকে 'হতাশা' নামক অনুভূতি থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করে।
মুম্বাইয়ের হয়ে খেলার চাপ অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় অনেক বেশি। এখানকার খেলোয়াড়দের প্রতি মুহূর্তেই নিজেদের প্রমাণ করতে হয়। এই চাপ শুধুমাত্র দলের প্রত্যাশা নয়, বরং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় টেস্ট দলে মুম্বাইয়ের আধিপত্য ধরে রাখার গুরুভার।
বর্তমানে সরফরাজের উপর দ্বিগুণ চাপ:
ক. জাতীয় দলের দরজা: দীর্ঘদিন ধরেই সরফরাজের নাম ভারতীয় টেস্ট দলের আশেপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। তার ঘরোয়া পারফরম্যান্স জাতীয় দলের নির্বাচকদের আলোচনায় ছিল। কিন্তু ক্রমাগত উপেক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত দলে জায়গা না পাওয়ায় একটি সূক্ষ্ম হতাশা তৈরি হতেই পারে। এই সময়ে যদি রঞ্জিতে তাঁর ব্যাট নীরব থাকে, তবে জাতীয় দলের দরজা আরও পিছিয়ে যেতে পারে—এই মনস্তাত্ত্বিক চাপটি বেশ তীব্র।
খ. মিডিয়ার মনোযোগ: যেহেতু তার রান না পাওয়ার বিষয়টি বড় খবর, তাই প্রতি ইনিংসে মিডিয়া এবং ভক্তদের মনোযোগ তাঁর ওপর থাকে। প্রতিটি ডট বল, প্রতিটি অসফল শট যেন মাইক্রোস্কোপের নিচে পরীক্ষা করা হয়। সরফরাজ যখন বলেন, "ক্রিকেটে এমন সময় আসে যখন ফলাফল আপনার অনুকূলে থাকে না," তখন তিনি এই বহিরাগত চাপকেই ইঙ্গিত করছেন। একজন পরিণত খেলোয়াড় জানেন যে, এই সময়ে নিজেকে মিডিয়ার আলোচনা থেকে দূরে রেখে শুধু প্রক্রিয়ার উপর ফোকাস করতে হয়।
সরফরাজের সমাধান: কঠোর পরিশ্রম ও আস্থা সরফরাজের মন্তব্যটিই প্রমাণ করে যে তিনি এই চাপ সামলাতে সক্ষম। তিনি 'হতাশা' নিয়ে আলোচনা না করে 'কঠোর পরিশ্রম' এবং 'আত্মবিশ্বাস'-এর উপর জোর দিয়েছেন। এটি ক্রিকেটীয় মনোবিজ্ঞানে একটি আদর্শ উদাহরণ: প্রতিকূল সময়ে ফলাফল নিয়ে চিন্তা না করে কেবল রুটিন এবং প্রস্তুতির উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা।
রঞ্জি ট্রফির মতো দীর্ঘ এবং তীব্র প্রতিযোগিতায় একজন ব্যাটসম্যানের পক্ষে প্রতিটি ম্যাচে রান করা প্রায় অসম্ভব। একজন ব্যাটসম্যানের ফর্ম একটি নির্দিষ্ট চক্র অনুসরণ করে:
ক. প্রতিপক্ষের বিশ্লেষণ: সরফরাজ যখন টানা রান করেছেন, তখন প্রতিপক্ষ দলগুলি তাকে নিয়ে বিশেষভাবে গবেষণা করেছে। তারা তার দুর্বলতাগুলি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে (যেমন শর্ট বল বা অফ-স্টাম্পের বাইরের বল)। এই বছর হয়তো তাঁর বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া কৌশলগুলো সফল হচ্ছে। এই মুহূর্তে সরফরাজের কাজ হলো, প্রতিপক্ষের এই কৌশলকে ভেঙে নতুন উপায়ে রান করা।
খ. শারীরিক এবং মানসিক ক্লান্তি: একজন খেলোয়াড় যখন টানা কয়েক বছর ব্যাটিংয়ে সাফল্যের শীর্ষে থাকেন, তখন শারীরিক এবং মানসিক ক্লান্তি আসে। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে আইপিএল খেলা, তারপর বিভিন্ন ঘরোয়া টুর্নামেন্ট এবং আন্তর্জাতিক দলের আশেপাশে থাকার চাপ—এই সব মিলিয়ে খেলার মান বজায় রাখা কঠিন। এই সময়টা হয়তো সেই ক্লান্তির ফল।
গ. টেকনিক্যাল সামান্য ত্রুটি: অনেক সময় টানা রান করার পর ব্যাটসম্যানদের টেকনিকে সূক্ষ্ম ত্রুটি দেখা যায়, যা সহজে ধরা পড়ে না। হয়তো তার ফুটওয়ার্কে সামান্য সমস্যা হচ্ছে, অথবা শট খেলার সময় ওজন স্থানান্তরে (Weight Transfer) দেরি হচ্ছে। সরফরাজ যখন বলছেন, "নিজেকে ভালোভাবে প্রস্তুত করছি," তখন তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে এই সামান্য টেকনিক্যাল ত্রুটিগুলো নিয়ে তিনি কোচিং স্টাফদের সাথে কাজ করছেন।
সরফরাজ খানকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন তার সতীর্থ এবং মুম্বাই দলের কোচিং স্টাফরা। এই সমর্থন মুম্বাই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের (এমসিএ) দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অংশ। মুম্বাই দল জানে যে একজন ম্যাচ উইনারকে খারাপ সময়ে সমর্থন দেওয়া কতটা জরুরি।
কোচের ভূমিকা: কোচিং স্টাফরা নিশ্চয়ই তাঁকে ক্রমাগত খেলার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসার পরামর্শ দিচ্ছেন। মুম্বাইয়ের দর্শনে বিশ্বাস রাখা হয়, একজন ভালো খেলোয়াড়কে একবার সুযোগ দিলে সে নিজেই ঘুরে দাঁড়ায়। অতিরিক্ত উপদেশ বা চাপ না দিয়ে তাকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
সতীর্থদের বিশ্বাস: দলের মধ্যে একজন খেলোয়াড়ের প্রতি সতীর্থদের আস্থা তার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরফরাজ জানেন যে, ড্রেসিং রুমে কেউ তাঁর ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে না। এটি তাঁকে বাইরে থেকে আসা সমালোচনার মোকাবিলা করতে সাহায্য করে।
এই সমর্থন তাঁকে যে কোনো মুহূর্তে দলের জন্য সেরাটা দিতে উৎসাহিত করবে। এই সমর্থনই সরফরাজকে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে এবং তিনি মনে করেন যে রঞ্জি ট্রফির পরবর্তী ম্যাচে তাঁর ভালো পারফরম্যান্স থাকবে।
সরফরাজের এই সাময়িক ফর্ম বিপর্যয় ক্রিকেটের ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। বহু কিংবদন্তি ক্রিকেটার তাঁদের ক্যারিয়ারের শুরুতে বা মাঝে এমন সময়ের সম্মুখীন হয়েছেন।
ভিরাট কোহলি: সাম্প্রতিক সময়ে বিরাট কোহলির ফর্ম নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল। তিনিও বারবার বলেছিলেন যে তিনি তাঁর 'প্রক্রিয়া' এবং 'কঠোর পরিশ্রম' নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। শেষ পর্যন্ত, তিনি রানের ধারায় ফিরেছেন।
চেতেশ্বর পূজারা: টেস্ট ক্রিকেটের এই বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যানও নিয়মিত ফর্মের ওঠা-নামার মধ্য দিয়ে যান। কিন্তু তাঁর ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস এবং খেলার প্রতি ভালোবাসা তাঁকে সবসময় প্রত্যাবর্তন করতে সাহায্য করেছে।
এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে, একজন বিশ্বমানের খেলোয়াড়ের জীবনে এমন সময় আসা স্বাভাবিক। এই সময়টা শুধু রান করার নয়, বরং মানসিক কাঠিন্য এবং ধৈর্য পরীক্ষার সময়। সরফরাজ খানের বক্তব্য এই মানসিক পরিপক্কতারই প্রতিচ্ছবি। তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, এই 'পার্ট অফ গেম'-কে সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে পারলেই তিনি আরও শক্তিশালী ক্রিকেটার হয়ে উঠবেন।
২০২৫-২৬ রঞ্জি ট্রফির দ্বিতীয়ার্ধ সরফরাজ খানের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। প্রথমত, মুম্বাইয়ের ট্রফি জেতার লক্ষ্য পূরণে তাঁর বড় রান অত্যন্ত জরুরি। দ্বিতীয়ত, জাতীয় দলের দরজা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়নি—একটি বিশাল ইনিংসের বিস্ফোরণই নির্বাচকদের মনোযোগ আবার তাঁর দিকে ফিরিয়ে আনতে পারে।
তাঁর "বড় রান আসবে" এই মন্তব্যটি কেবল একটি আশা নয়, এটি একটি প্রতিশ্রুতি। একজন ব্যাটসম্যান যখন নিশ্চিত থাকেন যে, তার পরিশ্রম এবং দক্ষতা তাঁকে ব্যর্থ করবে না, তখন তাঁর প্রত্যাবর্তন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। সরফরাজ খানের মতো তার্কিক এবং আত্মবিশ্বাসী ব্যাটসম্যানের ক্ষেত্রে, এই 'রান খরা' হয়তো কেবল পরবর্তী ব্যাটিং বিস্ফোরণের আগের শান্ত মুহূর্ত।
মুম্বাইয়ের সমর্থকরা জানে, এই ‘থালা’ (নেতা বা মাথা) তার সবচেয়ে কঠিন সময়েই সেরাটা দেন। সরফরাজের অদম্য মনোবল এবং ধৈর্যই তাঁকে তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। তাঁর এই আত্মবিশ্বাসই কেবল তাঁর ফর্মকে ফিরিয়ে আনবে না, বরং মুম্বাইয়ের ড্রেসিং রুমকেও আরও বেশি অনুপ্রাণিত করবে। ক্রিকেটের বাইরেও এই সম্পর্কের গুণমান রয়ে গেছে। মুম্বাই ক্রিকেট এখন শুধু সরফরাজের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায়।