মহিলাদের টি-টোয়েন্টি সিরিজে দারুণ লড়াই দ্বিতীয় ম্যাচে ভারতকে ১৯ রানে হারিয়ে সমতা ফেরাল অস্ট্রেলিয়া ফলে তৃতীয় ম্যাচেই ঠিক হবে সিরিজের ভাগ্য।
ক্যানবেরার মানুকা ওভাল-এ অনুষ্ঠিত মহিলাদের টি-টোয়েন্টি সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচ শুধু একটি সাধারণ আন্তর্জাতিক লড়াই ছিল না—এটি ছিল রেকর্ড, প্রত্যাবর্তন, চাপ ও মানসিক দৃঢ়তার এক জটিল মিশ্রণ। একদিকে ভারতের অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বাধিক ম্যাচ খেলে ইতিহাস গড়লেন, অন্যদিকে ম্যাচের ফলাফল ভারতীয় শিবিরের জন্য হতাশাজনক। ১৯ রানের পরাজয়ে সিরিজে সমতা ফেরাল অস্ট্রেলিয়া, আর সব হিসাব গড়াল নির্ণায়ক তৃতীয় ম্যাচের দিকে।
টস করতে নামার মুহূর্তেই ইতিহাস রচনা করেন হরমনপ্রীত। তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ৩৫৬তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নেমে তিনি ছাপিয়ে যান নিউ জিল্যান্ডের কিংবদন্তি ক্রিকেটার সুজ়ি বেটস-কে। বেটস খেলেছিলেন ৩৫৫টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। দীর্ঘ ক্যারিয়ার, ধারাবাহিকতা ও ফিটনেস—এই তিনের অনন্য সমন্বয়েই সম্ভব হয়েছে হরমনের এই কীর্তি।
তাঁর পরিসংখ্যানও সমান উজ্জ্বল—
টেস্ট: ৬ ম্যাচ, ২০০ রান
একদিনের ক্রিকেট: ১৬১ ম্যাচ, ৪৪০৯ রান
টি-টোয়েন্টি: ১৮৯ ম্যাচ, ৩৭৮৪ রান
মোট রান: ৮৩৯৩
শতরান: ৮
অর্ধশতরান: ৩৮
মোট উইকেট: ৭৫
একজন অলরাউন্ডার হিসেবে তিনি শুধু ব্যাটে নয়, বল হাতেও বহুবার দলকে ভরসা দিয়েছেন। কিন্তু ব্যক্তিগত সাফল্যের দিনটি দলগত জয় এনে দিতে পারল না।
অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের ভিত গড়ে দেন দুই ওপেনার—জর্জিয়া ভল ও বেথ মুনি। শুরু থেকেই তাঁরা ভারতীয় বোলিং আক্রমণের উপর চাপ তৈরি করেন। পাওয়ার প্লে-তে ঝুঁকি না নিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ক্রিকেট খেলেন দু’জনেই।
ভল খেলেন ৫৭ বলে ৮৮ রানের ঝকঝকে ইনিংস। তাঁর স্ট্রোকপ্লে ছিল নিখুঁত—কভার ড্রাইভ, পুল, স্কোয়ার কাট—সব শটেই ছিল আত্মবিশ্বাসের ছাপ। অন্যদিকে মুনি ৩৯ বলে ৪৬ রান করে ইনিংসকে স্থিরতা দেন। তাঁদের ১৪.৫ ওভারে ১২৮ রানের জুটি কার্যত ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
এই জুটির সময় ভারতের বোলাররা লাইন-লেন্থে ধারাবাহিকতা রাখতে পারেননি। ফিল্ডিংয়েও কয়েকটি ছোটখাটো ভুল ম্যাচের চিত্র পাল্টে দেয়। যদিও শেষ পাঁচ ওভারে ভারত ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। পরপর উইকেট তুলে রান আটকে দেয়। তবু ২০ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে ১৬৩ রান তোলে অস্ট্রেলিয়া—যা প্রতিযোগিতামূলক স্কোর।
১৬৪ রানের লক্ষ্য টি-টোয়েন্টিতে অপ্রাপ্য নয়। ওপেনিং জুটিতে স্মৃতি মন্ধানা ও শেফালি বর্মা ইতিবাচক সূচনা দেন। পাওয়ার প্লে-র মধ্যে ৫০ রান তুলে তাঁরা চাপ সরিয়ে দেন অস্ট্রেলিয়ার উপরেই।
কিন্তু শেফালি ২৯ ও মন্ধানা ৩১ রানে আউট হতেই ছন্দ হারায় ভারত। মিডল অর্ডারে ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি। হরমনপ্রীত ৩৬ রানের লড়াকু ইনিংস খেললেও প্রয়োজন ছিল কাউকে সঙ্গ দেওয়ার।
জেমাইমা রদ্রিগেজ মাত্র ৪ রান করে ফিরলে চাপ বাড়ে। রিচা ঘোষ ১৯ রান করলেও ম্যাচ বের করার মতো বড় ইনিংস গড়তে পারেননি। আমনজ্যোৎ কৌর ও দীপ্তি শর্মা ব্যর্থ হন। ফলে নিয়মিত ব্যবধানে উইকেট পড়তে থাকে।
জরুরি রানরেট ক্রমশ বাড়তে থাকে। শেষ পাঁচ ওভারে প্রয়োজনীয় রান পৌঁছে যায় নাগালের বাইরে। শেষ পর্যন্ত ২০ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে ১৪৪ রানেই থামে ভারত। ১৯ রানের ব্যবধানে ম্যাচ জিতে সিরিজে সমতা ফেরায় অস্ট্রেলিয়া।
অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণ ছিল পরিকল্পিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। অ্যাশলি গার্ডনার ৩ উইকেট তুলে ম্যাচের গতি থামিয়ে দেন। পাশাপাশি অ্যানাবেল সাগারল্যান্ড, কিম গার্থ ও অধিনায়ক সোফি মলিনিউ ২টি করে উইকেট নেন।
তাঁদের পরিকল্পনা ছিল স্পষ্ট—ভারতের আক্রমণাত্মক ব্যাটারদের শর্ট বল ও গতি পরিবর্তনের মাধ্যমে বিভ্রান্ত করা। স্লোয়ার ও ইয়র্কারের নিখুঁত প্রয়োগ ভারতের রান তাড়াকে কঠিন করে তোলে।
১. মিডল অর্ডারের ভাঙন: ওপেনিংয়ের পর কেউ বড় ইনিংস খেলতে পারেননি।
২. ডেথ ওভারে রান আটকে দেওয়া: শেষ দিকে উইকেট তুললেও ১৬৩ রানের স্কোর প্রতিরোধ করা যায়নি।
৩. চাপ সামলাতে ব্যর্থতা: বাড়তি রানরেটের চাপ ব্যাটারদের ভুল শট খেলতে বাধ্য করেছে।
৪. ফিল্ডিংয়ের ছোট ভুল: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সামান্য ভুলও বড় হয়ে দেখা দেয়।
প্রথম ম্যাচ ডাকওয়ার্থ-লুইস নিয়মে জিতেছিল ভারত। ফলে দ্বিতীয় ম্যাচ ছিল অস্ট্রেলিয়ার জন্য ‘ডু অর ডাই’। সেই চ্যালেঞ্জে তারা সফল। এখন সিরিজ ১-১। তৃতীয় ম্যাচ কার্যত ফাইনাল।
এই লড়াই শুধু দুই দলের মধ্যে নয়—এটি মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষাও। ভারতের জন্য ইতিবাচক দিক হল, শুরুর ব্যাটিং ছন্দ। নেতিবাচক দিক মিডল অর্ডারের ভঙ্গুরতা। অস্ট্রেলিয়ার শক্তি তাদের গভীরতা ও অভিজ্ঞতা।
ব্যক্তিগত কীর্তি যত বড়ই হোক, ক্রিকেট শেষ পর্যন্ত দলগত খেলা। হরমনপ্রীতের বিশ্বরেকর্ড নিঃসন্দেহে ভারতীয় ক্রিকেটের গর্বের বিষয়। কিন্তু এই ম্যাচ শিখিয়ে দিল—রেকর্ড নয়, শেষ হাসি হাসতে গেলে প্রয়োজন সম্পূর্ণ দলগত পারফরম্যান্স।
ক্যানবেরার এই সন্ধ্যা তাই স্মরণীয় দুই কারণে—
এক, ভারতীয় অধিনায়কের ঐতিহাসিক মাইলফলক।
দুই, অস্ট্রেলিয়ার দৃঢ় প্রত্যাবর্তন।
এখন সব চোখ নির্ণায়ক তৃতীয় ম্যাচে। সিরিজ কার ঝুলিতে যাবে—হরমনের রেকর্ডময় নেতৃত্বে ভারত, না কি অস্ট্রেলিয়ার লড়াকু ব্রিগেড? উত্তর মিলবে পরের লড়াইয়ে।
মহিলাদের টি-টোয়েন্টি সিরিজের শুরুটা হয়েছিল নাটকীয়ভাবে। প্রথম ম্যাচে বৃষ্টির কারণে খেলা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ফল নির্ধারিত হয় ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে। সেই ম্যাচ জিতে সিরিজে এগিয়ে গিয়েছিল ভারত। ফলে দ্বিতীয় ম্যাচ অস্ট্রেলিয়ার কাছে ছিল কার্যত ‘ডু অর ডাই’। হারলেই সিরিজ খোয়াতে হত। সেই চাপের ম্যাচেই ঘুরে দাঁড়াল অস্ট্রেলিয়া। ক্যানবেরার মানুকা ওভাল-এ ১৯ রানের জয় শুধু স্কোরলাইনের সমতা ফেরায়নি, মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও সিরিজকে নতুন মোড় দিয়েছে।
এখন পরিস্থিতি ১-১। তৃতীয় ম্যাচ কার্যত ফাইনাল। তিন ম্যাচের এই সংক্ষিপ্ত সিরিজে গতি, মানসিকতা ও পরিকল্পনা—এই তিন উপাদানই নির্ণায়ক হয়ে উঠেছে। প্রথম ম্যাচে ভারতের জয় কিছুটা পরিস্থিতির সহায়তায় এলেও দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার জয় এসেছে নিখাদ ক্রিকেটীয় দক্ষতায়। ফলে নির্ণায়ক ম্যাচে আত্মবিশ্বাসের পাল্লা কার দিকে ভারী থাকবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
ভারতের জন্য ইতিবাচক দিক অবশ্যই ওপেনিং জুটি। স্মৃতি মন্ধানা ও শেফালি বর্মা পাওয়ার প্লে-তে আক্রমণাত্মক সূচনা দিতে পারছেন। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে দ্রুত শুরুই ম্যাচের ভিত্তি গড়ে দেয়। প্রথম দুই ম্যাচেই ভারতের ওপেনাররা সেই কাজটি ভালোভাবে করেছেন। কিন্তু সমস্যা শুরু হচ্ছে মিডল অর্ডারে। বড় রান তাড়া করতে গেলে বা প্রতিযোগিতামূলক স্কোর তুলতে গেলে মাঝের সারির ব্যাটারদের দায়িত্ব নিতে হয়। দ্বিতীয় ম্যাচে সেই জায়গাতেই ভাঙন দেখা গেছে।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার শক্তি তাদের গভীরতা। ওপেনিং জুটি বড় রান করলে যেমন ম্যাচের গতি তৈরি হয়, তেমনি মাঝের সারি ও বোলিং বিভাগেও রয়েছে ধারাবাহিকতা। অভিজ্ঞতা, ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা এবং চাপের মুহূর্তে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়া—এই দিকগুলোতেই অস্ট্রেলিয়া এগিয়ে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধারাবাহিক সাফল্যের পেছনে এই মানসিক দৃঢ়তাই বড় কারণ।
নির্ণায়ক ম্যাচে তাই লড়াইটা শুধু ব্যাট-বলের নয়; এটি মানসিক শক্তিরও পরীক্ষা। ভারত কি মিডল অর্ডারের সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারবে? অস্ট্রেলিয়া কি একই ছন্দ বজায় রাখতে পারবে? টি-টোয়েন্টির দ্রুত গতির খেলায় ছোট ছোট মুহূর্তই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে।
দ্বিতীয় ম্যাচটি বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে ভারতের অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর-এর জন্য। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বাধিক ম্যাচ খেলার নজির গড়ে তিনি ছাপিয়ে গেছেন নিউ জিল্যান্ডের কিংবদন্তি সুজ়ি বেটস-কে। ৩৫৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ—এই সংখ্যা শুধু দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পরিচয় নয়, ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, ফিটনেস ও মানসিক দৃঢ়তারও প্রতীক।
টেস্ট, একদিন ও টি-টোয়েন্টি—তিন ফরম্যাটেই তাঁর উপস্থিতি ভারতীয় ক্রিকেটকে সমৃদ্ধ করেছে। ব্যাট হাতে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস, বল হাতে কার্যকর স্পেল, আর নেতৃত্বে আগ্রাসী মনোভাব—সব মিলিয়ে তিনি আধুনিক ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের অন্যতম মুখ। তাঁর রেকর্ড নিঃসন্দেহে দেশের গর্ব।
কিন্তু এই ম্যাচ শিখিয়ে দিল আরেকটি কঠিন সত্য—ক্রিকেট শেষ পর্যন্ত দলগত খেলা। একজন খেলোয়াড় যত বড়ই হোন, তাঁর সাফল্য তখনই পূর্ণতা পায় যখন দল জয় পায়। দ্বিতীয় ম্যাচে হরমনপ্রীত নিজেও ৩৬ রানের লড়াকু ইনিংস খেলেছিলেন, কিন্তু পর্যাপ্ত সমর্থন পাননি। মিডল অর্ডারের ব্যর্থতা ও বোলিংয়ের শুরুতে নিয়ন্ত্রণ হারানো—এই দুই কারণেই ম্যাচ হাতছাড়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে ভারতের সামনে। ব্যক্তিগত মাইলফলক অনুপ্রেরণা জোগায়, কিন্তু দলগত সাফল্য নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সমন্বিত প্রয়াস। ওপেনারদের দেওয়া ভালো শুরু কাজে লাগাতে হলে মাঝের সারিকে দায়িত্ব নিতে হবে। একইসঙ্গে বোলিং আক্রমণকে প্রথম থেকেই চাপ তৈরি করতে হবে।
ক্যানবেরার এই সন্ধ্যা তাই দুই বিপরীত আবেগের গল্প। একদিকে ঐতিহাসিক রেকর্ড, অন্যদিকে হতাশাজনক ফলাফল। হরমনপ্রীতের অর্জন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে, কিন্তু একইসঙ্গে এই ম্যাচ দলকে মনে করিয়ে দেবে—রেকর্ড নয়, শেষ হাসি হাসতে গেলে প্রয়োজন সম্পূর্ণ দলগত পারফরম্যান্স।
নির্ণায়ক তৃতীয় ম্যাচ এখন সিরিজের কেন্দ্রবিন্দু। ভারত যদি ওপেনিংয়ের ধার বজায় রেখে মিডল অর্ডারে স্থিরতা আনতে পারে, তবে তাদের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া চাইবে একই আক্রমণাত্মক মনোভাব ধরে রাখতে।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সৌন্দর্যই হল অনিশ্চয়তা। এক ওভার, এক ক্যাচ, এক পার্টনারশিপ—সবকিছু বদলে দিতে পারে। তাই এখন সব চোখ তৃতীয় ম্যাচে। সিরিজ কার ঝুলিতে যাবে—হরমনপ্রীতের নেতৃত্বে ভারত, না কি অভিজ্ঞতায় ভর করা অস্ট্রেলিয়া?
উত্তর মিলবে মাঠেই।