Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মেসির বিদায়ী ম্যাচ ঘিরে বিতর্ক! ‘আমাদের কিছুই দেয়নি’, বিস্ফোরক অভিযোগ বেনিন কোচের

মেসির বিদায়ী ম্যাচ ঘিরে বিতর্ক! আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনের বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ তুলে ক্ষোভ উগরে দিলেন বেনিনের কোচ।

মেসির বিদায়ী ম্যাচ ঘিরে তুমুল বিতর্ক! সেলফি-জার্সি কিছুই পাননি বেনিনের ফুটবলাররা, আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ কোচের

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে থাকার কথা ছিল লিওনেল মেসির বিদায়ী ম্যাচ। আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময়ের যাত্রার শেষ অধ্যায় দেখতে বুয়েনস আইরেসের এস্তাদিয়ো মনুমেন্তালে হাজির হয়েছিলেন প্রায় ৮৫ হাজার দর্শক। মাঠে গোল করেছেন মেসি, সতীর্থদের দিয়ে গোল করিয়েছেন, আর শেষ বাঁশি বাজার পর গোটা স্টেডিয়াম ভেসেছে আবেগে। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক বিদায়ের আনন্দের মধ্যেই এবার উঠল গুরুতর অভিযোগ। আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনের ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বেনিনের জাতীয় দলের কোচ গেরনট রোহর।

গত ৬ অক্টোবর ২০২৬, আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে আফ্রিকার দেশ বেনিনকে ৩-০ গোলে হারায় আর্জেন্টিনা। মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় উপলক্ষে ম্যাচটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। কিন্তু ম্যাচ শেষে বেনিনের ফুটবলারদের অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর হয়নি বলে দাবি তাঁদের কোচের। তাঁর অভিযোগ, মেসির সঙ্গে ছবি তোলা কিংবা আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের সঙ্গে জার্সি বিনিময়ের সুযোগটুকুও পাননি তাঁর দলের খেলোয়াড়েরা।

মেসির বিদায়ী ম্যাচে কেন বেনিন?

আর্জেন্টিনার মতো বিশ্বকাপজয়ী দলের বিরুদ্ধে মেসির বিদায়ী ম্যাচে বেনিনকে প্রতিপক্ষ হিসেবে নির্বাচন করা নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের একাংশের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। অনেকেই জানতে চেয়েছিলেন, কেন ইউরোপ কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার কোনও বড় ফুটবলশক্তির পরিবর্তে আফ্রিকার এই দলকে আমন্ত্রণ জানানো হল।

ফুটবলীয় সাফল্য এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতির বিচারে আর্জেন্টিনার তুলনায় বেনিন অনেক পিছিয়ে। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত কোনও দলের বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচ আয়োজন অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। প্রস্তুতি, আন্তর্জাতিক সূচি, প্রতিপক্ষের প্রাপ্যতা এবং আয়োজকদের পরিকল্পনার মতো একাধিক বিষয় এই ধরনের ম্যাচ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।

বেনিনকে বেছে নেওয়ার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত করা ছিল, এমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে প্রতিপক্ষ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সেটিকে পরিকল্পিতভাবে সহজ ম্যাচ আয়োজনের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।

মাঠে মেসির দুরন্ত পারফরম্যান্স

বিদায়ী ম্যাচেও নিজের পরিচিত ফুটবলশৈলীর ঝলক দেখিয়েছেন লিওনেল মেসি। প্রথমার্ধে বেনিনের রক্ষণভাগ আর্জেন্টিনার আক্রমণ সামলে রাখলেও দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র।

৪৮ মিনিটে মেসির কর্নার থেকে গোল করেন নিকোলাস ওতামেন্দি। এরপর ৬১ মিনিটে নিকো পাজের গোলেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। ম্যাচের ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে দলের জয় নিশ্চিত করেন মেসি।

আর্জেন্টিনার জার্সিতে সেটিই ছিল তাঁর ১২৬তম আন্তর্জাতিক গোল। একটি গোল এবং দুটি অ্যাসিস্টের মাধ্যমে নিজের বিদায়ী ম্যাচকে স্মরণীয় করে রাখেন বিশ্বকাপজয়ী মহাতারকা।

তবে মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি বিদায়ের আয়োজনও ছিল নজরকাড়া। বিশাল জার্সি, দর্শকদের সম্মিলিত অভিবাদন, আলো এবং আতশবাজির প্রদর্শনীতে মনুমেন্তাল স্টেডিয়াম হয়ে উঠেছিল আবেগের কেন্দ্রবিন্দু।

বেনিন কোচের বিস্ফোরক অভিযোগ

ম্যাচ শেষ হওয়ার পরই বিতর্কের সূত্রপাত। বেনিনের কোচ গেরনট রোহর ফরাসি রেডিয়ো RMC-র একটি অনুষ্ঠানে জানান, তাঁর দলের ফুটবলাররা মেসির সঙ্গে স্মরণীয় মুহূর্ত কাটানোর প্রত্যাশা করেছিলেন।

কেউ চেয়েছিলেন মেসির সঙ্গে একটি ছবি তুলতে, আবার কেউ চেয়েছিলেন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের সঙ্গে জার্সি বিনিময় করতে। কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে তাঁদের সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ করেন রোহর।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমের কাছে যাওয়া তো দূরের কথা, টানেলেও প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি বেনিনের ফুটবলারদের। কয়েকজন খেলোয়াড় নিজেদের জার্সি নিয়ে অপেক্ষা করেছিলেন। কিন্তু নিরাপত্তারক্ষীদের বাধায় তাঁরা আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের কাছে পৌঁছতে পারেননি।

রোহরের অভিযোগের মূল বিষয় ছিল, এত বড় একটি ঐতিহাসিক ম্যাচে অংশ নিয়েও তাঁর দলের খেলোয়াড়রা প্রত্যাশিত স্মৃতিচিহ্ন সংগ্রহ করতে পারেননি।

একটি সেলফির জন্য অপেক্ষা

লিওনেল মেসি শুধু আর্জেন্টিনার ফুটবলপ্রেমীদের কাছেই নায়ক নন। বিশ্বের অসংখ্য তরুণ ফুটবলারের কাছেও তিনি অনুপ্রেরণা। বেনিনের খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রেও বিষয়টি আলাদা নয়।

বিশ্বকাপজয়ী একজন কিংবদন্তির বিরুদ্ধে মাঠে নামার সুযোগ যে কোনও ফুটবলারের কাছে বিশেষ অভিজ্ঞতা। তার সঙ্গে যদি মেসির বিদায়ী ম্যাচে অংশগ্রহণের সুযোগ মেলে, তবে সেই মুহূর্তের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

বেনিনের ফুটবলাররা তাই ম্যাচ শেষে মেসির সঙ্গে ছবি তুলে কিংবা একটি জার্সি সংগ্রহ করে নিজেদের জীবনের বিশেষ স্মৃতি ধরে রাখতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু তাঁদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে জানিয়েছেন কোচ। রোহরের বক্তব্যে স্পষ্ট, ম্যাচে পরাজয়ের চেয়ে খেলোয়াড়দের অপূর্ণ ইচ্ছাই তাঁকে বেশি হতাশ করেছে।

মেসির জন্য বিশেষ উপহার এনেছিল বেনিন

অভিযোগের পাশাপাশি বেনিনের পক্ষ থেকে ম্যাচের আগে মেসির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ঘটনাও সামনে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেনিনের অধিনায়ক সেসি ডি'আলমেইদা মেসিকে একটি বিশেষ স্মারক উপহার দেন। সেটি ছিল ঐতিহাসিক দাহোমে রাজ্যের নারী যোদ্ধাদের প্রতীকী মূর্তি। সঙ্গে দেওয়া হয় একটি গোলাপ এবং দলের ফুটবলারদের লেখা চিঠি।

উপহারগুলির মাধ্যমে বেনিনের ফুটবলাররা মেসির অসাধারণ ফুটবলজীবনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চেয়েছিলেন।

ম্যাচ শেষে প্রত্যাশিত জার্সি বিনিময় না হলেও রোহর একটি পুরনো মেসির জার্সিতে স্বাক্ষর সংগ্রহের কথা জানিয়েছেন। ২০১৮ সালের সেই জার্সিটি আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনির মাধ্যমে স্বাক্ষর করিয়ে ফেরত পান তিনি বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

news image
আরও খবর

তবে দলের অন্য ফুটবলাররা কোনও জার্সি কিংবা প্রত্যাশিত ছবি পাননি বলেই তাঁর দাবি।

চুক্তি ও আর্থিক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন

বেনিনের ম্যাচে অংশগ্রহণের বিনিময়ে কোনও অর্থ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের ক্ষেত্রে দুই দেশের ফুটবল ফেডারেশনের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক ও প্রশাসনিক সমঝোতা থাকতে পারে। যাতায়াত, থাকা, ম্যাচ আয়োজন এবং অন্যান্য সুবিধার বিষয়ও আলোচনায় আসে।

তবে বেনিনকে কোনও অর্থ দেওয়া হয়নি কিংবা লিখিত চুক্তির নির্দিষ্ট শর্ত ভঙ্গ করা হয়েছে—এমন দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করার মতো যথেষ্ট তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

তাই এই বিতর্কের নিশ্চিত অংশ হল বেনিন কোচের জার্সি বিনিময় ও ছবি তোলার সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ। আর্থিক চুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সামনে না আসা পর্যন্ত নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।

নিরাপত্তার কারণে বাধা, নাকি আয়োজকদের ব্যর্থতা?

মেসির মতো আন্তর্জাতিক মহাতারকার বিদায়ী ম্যাচে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা স্বাভাবিক। বিপুল দর্শক, সাংবাদিক, বিশেষ অতিথি এবং অন্যান্য আয়োজনের কারণে ম্যাচ শেষে ফুটবলারদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করাও প্রয়োজন হতে পারে।

কিন্তু প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে স্বাভাবিক সৌজন্য বিনিময়ের ব্যবস্থা কেন করা গেল না, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

ফুটবলে ম্যাচ শেষে জার্সি বিনিময় দীর্ঘদিনের একটি পরিচিত রীতি। এটি বাধ্যতামূলক না হলেও খেলোয়াড়দের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও সৌহার্দ্যের প্রতীক।

নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু বিধিনিষেধ থাকলেও আয়োজকেরা বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে খেলোয়াড়দের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারতেন কি না, সেই আলোচনা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে এই ঘটনায় মেসি ব্যক্তিগতভাবে কাউকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, এমন কোনও নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মূল অভিযোগটি নিরাপত্তা ও ম্যাচ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে।

বিদায়ের মঞ্চে আবেগপ্রবণ মেসি

বিতর্কের মধ্যেও মেসির বিদায়ী মুহূর্ত ছিল গভীর আবেগে ভরা। জাতীয় দলের জার্সিতে দীর্ঘ পথচলার কথা স্মরণ করে তিনি সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

মেসি জানিয়েছেন, কঠিন সময়েও তিনি কখনও লড়াই থামাননি। আর্জেন্টিনার হয়ে খেলতে এবং দেশের জন্য নিজের সেরাটা দিতে সবসময় চেষ্টা করেছেন।

ফুটবলজীবনের শুরুতে জাতীয় দলের হয়ে প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়া, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় হতাশা এবং সমালোচনার পর শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব—সব মিলিয়ে তাঁর আন্তর্জাতিক কেরিয়ার এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস।

২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয় এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে সেই সংগ্রাম পূর্ণতা পেয়েছিল।

বিদায়ের মুহূর্তে সমর্থকদের ভালোবাসা পেয়ে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি মেসি। পরিবারের সদস্য, সতীর্থ এবং হাজার হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে তাঁর জাতীয় দলের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

জয় ছাপিয়ে কেন আলোচনায় বিতর্ক?

মেসির বিদায়ী ম্যাচে আর্জেন্টিনার ৩-০ ব্যবধানের জয় প্রত্যাশিতভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল একজন কিংবদন্তিকে সম্মান জানানো।

সেই কারণেই বেনিনের ফুটবলারদের অভিজ্ঞতা নিয়ে ওঠা অভিযোগটি আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।

একদিকে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কাছে এটি ছিল উৎসবের রাত। অন্যদিকে বেনিনের খেলোয়াড়দের কাছে মেসির সঙ্গে একটি ছবি কিংবা জার্সি বিনিময়ের সুযোগ না পাওয়ার হতাশা রয়ে গিয়েছে।

কোচ রোহর অবশ্য ম্যাচটির ফুটবলীয় গুরুত্ব অস্বীকার করেননি। তাঁর মতে, এত বড় স্টেডিয়ামে বিশ্বমানের দলের বিরুদ্ধে খেলা তরুণ ফুটবলারদের জন্য মূল্যবান অভিজ্ঞতা।

শেষ পর্যন্ত মেসির বিদায় ফুটবল ইতিহাসের একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়েই থাকবে। কিন্তু সেই আবেগঘন সন্ধ্যার আড়ালে বেনিনের কোচের অভিযোগ মনে করিয়ে দিল, বড় ফুটবল আয়োজনের সাফল্য শুধু মাঠের ফলাফল বা জাঁকজমক দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান এবং সৌজন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এখন দেখার, আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন এই অভিযোগ নিয়ে কোনও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয় কি না। মেসির বিদায়ের আনন্দের মাঝেও বেনিনের ফুটবলারদের অপূর্ণ প্রত্যাশা আন্তর্জাতিক ফুটবল মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে রইল।

Preview image