গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানকে লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান শুরু করেছে ইজ়রায়েল ও আমেরিকার যৌথ বাহিনী। এই অভিযানের পোশাকি নাম ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের একাধিক শীর্ষ পদাধিকারীকে খতম করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবু প্রবল চাপের মধ্যেও এখনও মাথা নত করেনি ইরান।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানকে লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান শুরু করেছে ইজ়রায়েল ও আমেরিকার যৌথ বাহিনী। এই অভিযানের পোশাকি নাম ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের একাধিক শীর্ষ পদাধিকারীকে খতম করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। আয়াতোল্লা আলি খামেনেই ছাড়াও আইআরজিসির সর্বাধিনায়ক মেজর জেনারেল মহম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ নাসিরজাদেহ এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল সইদ আব্দুর রহিম মুসাভি-সহ বেশ কয়েক জন শীর্ষ আধিকারিকের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
তবে এত বড় ধাক্কার পরেও এখনও মাথা নত করেনি তেহরান। বরং পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করছে ইরান। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর নেপথ্যে রয়েছে ইরানের সামরিক কৌশলের বিশেষ কাঠামো।
Institute for the Study of War-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের যৌথ হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মনোবলে ধাক্কা দেওয়া এবং তাদের সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেই লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি যৌথ বাহিনী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে প্রাক্তন আইআরজিসি কমান্ডার Mohammad Ali Jafari-র কৌশলগত ভাবনার। তাঁর সময়েই ইরানের সামরিক কাঠামোয় এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করা হয়, যেখানে নেতৃত্বের শীর্ষ স্তরে বড় ক্ষতি হলেও যুদ্ধ পরিচালনা থেমে যাবে না। অর্থাৎ, একাধিক স্তরে নেতৃত্ব ও দায়িত্ব বণ্টনের মাধ্যমে সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা সচল রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
এই কৌশলের ফলে শীর্ষ নেতৃত্বে আঘাত এলেও ইরানের বিভিন্ন বাহিনী ও মন্ত্রক পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজেদের কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পরিকল্পনার বাস্তব প্রতিফলনই দেখা যাচ্ছে।
যৌথ হামলায় দমে যাওয়ার বদলে ইরান বরং পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, বাহরিন, কুয়েত এবং ইরাক অঞ্চলে হামলার চেষ্টা চালাচ্ছে ইরানি বাহিনী বলে আন্তর্জাতিক মহলে দাবি উঠেছে।
কিছু দিন আগে ইরানের বিদেশমন্ত্রী Seyed Abbas Araghchi জানিয়েছেন, ইরান কোনও চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাঁর কথায়, ইরানের প্রতিরক্ষা কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে যেকোনও পরিস্থিতিতেই দেশ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।
যৌথ হামলায় দমে যাওয়ার বদলে ইরান বরং পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, বাহরিন, কুয়েত এবং ইরাক অঞ্চলে হামলার চেষ্টা চালাচ্ছে ইরানি বাহিনী বলে আন্তর্জাতিক মহলে দাবি উঠেছে। সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা শুধু দুই বা তিনটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং গোটা পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে অস্থির করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই পাল্টা আক্রমণের কৌশল শুধুমাত্র প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর সামরিক ও কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের প্রতিরক্ষা নীতিতে “বহুমুখী প্রতিরোধ” বা multi-layered deterrence ধারণাকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। এর অর্থ হল, কোনও একটি ফ্রন্টে হামলা হলে অন্য একাধিক ফ্রন্টে চাপ তৈরি করে প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধ করা। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান সেই কৌশলই কার্যকর করছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। কাতারের আল উদেইদ এয়ারবেস, বাহরিনে মার্কিন নৌবাহিনীর ঘাঁটি, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে একাধিক সামরিক স্থাপনা—সব মিলিয়ে গোটা অঞ্চলটিই মার্কিন সামরিক নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে এই ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা করা মানে সরাসরি আমেরিকার সামরিক উপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ করা। ইরান ঠিক সেই পথেই এগোচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের এই কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল “প্রক্সি নেটওয়ার্ক”। পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ইরানের ঘনিষ্ঠ বা সমর্থক মিলিশিয়া গোষ্ঠী রয়েছে, যাদের মাধ্যমে তেহরান অনেক সময় পরোক্ষভাবে সামরিক চাপ তৈরি করতে পারে। ইরাক, সিরিয়া কিংবা লেবাননের মতো জায়গায় এই ধরনের গোষ্ঠীর সক্রিয়তা বহুদিন ধরেই আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই নেটওয়ার্কগুলিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই সংঘাতের পেছনে যে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু বছর ধরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক—এই সব বিষয়কে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে বারবার সংঘাত তৈরি হয়েছে। ইজ়রায়েলের সঙ্গেও ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বৈরিতায় পূর্ণ। ফলে যখন ইজ়রায়েল ও আমেরিকা যৌথভাবে সামরিক অভিযান চালায়, তখন ইরান সেটিকে নিজেদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর কৌশলগত আক্রমণ হিসেবেই দেখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সামরিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল “স্ট্র্যাটেজিক রেজিলিয়েন্স” বা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ ক্ষমতা। অর্থাৎ, কোনও একটি আঘাত বা ক্ষতির ফলে যেন পুরো সামরিক কাঠামো ভেঙে না পড়ে। এই কারণেই ইরান দীর্ঘদিন ধরে তাদের সামরিক নেতৃত্ব, প্রশাসনিক কাঠামো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজিয়েছে যাতে শীর্ষ স্তরে ক্ষতি হলেও নীচের স্তর থেকে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
এই নীতির ফলে ইরান অনেক সময় “ডিসেন্ট্রালাইজড কমান্ড স্ট্রাকচার” বা বিকেন্দ্রীকৃত নেতৃত্ব কাঠামো ব্যবহার করে। এতে বিভিন্ন সামরিক ইউনিট নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে স্বাধীনতা পায়। ফলে কোনও একটি কমান্ড সেন্টার ধ্বংস হলেও সামরিক কার্যক্রম পুরোপুরি থেমে যায় না। সাম্প্রতিক সংঘাতেও সেই কৌশলের প্রভাব দেখা যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
যৌথ হামলার ফলে ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক ও প্রশাসনিক নেতার মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে দাবি করা হয়েছে। সাধারণভাবে এমন পরিস্থিতিতে কোনও দেশের সামরিক মনোবল ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। বরং পাল্টা আক্রমণ এবং কঠোর বক্তব্যের মাধ্যমে তেহরান নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের বিদেশমন্ত্রী Seyed Abbas Araghchi সম্প্রতি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ইরান কোনও ধরনের চাপ বা হুমকির কাছে নতি স্বীকার করবে না। তাঁর কথায়, দেশের সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত তেহরান। তিনি আরও বলেন, ইরানের প্রতিরক্ষা কাঠামো এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যাতে যেকোনও পরিস্থিতিতেই দেশ নিজের সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।
আরাঘচির এই বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক বার্তা নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশেও একটি স্পষ্ট সংকেত। এর মাধ্যমে ইরান বোঝাতে চাইছে যে সামরিক আঘাত বা নেতৃত্বের ক্ষতি তাদের কৌশলগত অবস্থানকে সহজে দুর্বল করতে পারবে না।
তবে এই পরিস্থিতি শুধু ইরান বা আমেরিকার জন্যই নয়, গোটা পশ্চিম এশিয়ার জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। কারণ এই অঞ্চলের বহু দেশই একদিকে মার্কিন সামরিক জোটের অংশ, আবার অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তারা একটি জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান উত্তেজনা যদি আরও বাড়ে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহেও তার প্রভাব পড়তে পারে। পশ্চিম এশিয়া বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী অঞ্চল। এখানকার কোনও বড় সামরিক সংঘাত বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে এবং অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে। অনেক দেশই চাইবে পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত হোক এবং সংঘাত আর না বাড়ুক। কারণ বড় আকারের যুদ্ধ শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক উদ্যোগের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অতীতে বহুবার দেখা গেছে যে উত্তেজনার চূড়ান্ত পর্যায়ের পর বিভিন্ন দেশ আলোচনার টেবিলে ফিরে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংগঠন ও মধ্যস্থতাকারী দেশগুলিও সেই ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে।
তবে আপাতত পরিস্থিতি যে অত্যন্ত সংবেদনশীল, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। একদিকে সামরিক আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ চলছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক বক্তব্য ও কূটনৈতিক বার্তার মাধ্যমে শক্ত অবস্থান জানাচ্ছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহের উপর। যদি সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ে, তাহলে তা একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। আবার কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণেও আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। ইরানের পাল্টা আক্রমণ এবং তাদের দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে সংঘাতের এই অধ্যায় এত সহজে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং আগামী দিনগুলিতে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর রাখছে গোটা বিশ্ব।