বিশ্বকাপ শুরুর মধ্যেই দল সাজানোর কাজে নেমে পড়েছে মোহনবাগান। বসনিয়ার এক ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারকে সই করিয়ে নতুন মরসুমের প্রস্তুতিতে আরও এক ধাপ এগোল সবুজ-মেরুন শিবির।
নতুন মরসুম শুরু হতে এখনও কয়েক মাস বাকি। তবে ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম সফল ও জনপ্রিয় ক্লাব মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট ইতিমধ্যেই দল গোছানোর কাজ শুরু করে দিয়েছে। আইএসএল এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতায় নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার লক্ষ্যে একের পর এক পরিকল্পনা করছে সবুজ-মেরুন শিবির। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এবার বড়সড় পদক্ষেপ নিল তারা। পঞ্জাব এফসি র হয়ে গত মরসুমে নজরকাড়া ফুটবল খেলা বসনিয়ার ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার সামির জেলকোভিচকে দুই বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ করল মোহনবাগান।
বিশ্বকাপের আবহে যখন ফুটবলপ্রেমীদের নজর আন্তর্জাতিক মঞ্চে তখনই ভবিষ্যতের দল গঠনে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব। বসনিয়ার জাতীয় দলের
হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা থাকা সামিরকে দলে নেওয়া হয়েছে মূলত তাঁর বহুমুখী দক্ষতার জন্য। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড এবং সেন্ট্রাল ডিফেন্স দু’টি পজিশনেই সমান দক্ষ এই ফুটবলার মোহনবাগানের স্কোয়াডে নতুন মাত্রা যোগ করবেন বলেই মনে করা হচ্ছে।
আধুনিক ফুটবলে এমন ফুটবলারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি, যিনি একাধিক পজিশনে সমান দক্ষতার সঙ্গে খেলতে পারেন। সামির সেই ধরনেরই একজন ফুটবলার। মূলত সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হলেও প্রয়োজনে স্টপার বা সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারের ভূমিকাতেও অনায়াসে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন তিনি।
মোহনবাগানের কোচিং স্টাফ এবং রিক্রুটমেন্ট টিমের মতে দীর্ঘ মরসুমে চোট আঘাত
সাসপেনশন কিংবা কৌশলগত পরিবর্তনের জন্য এমন ফুটবলারের প্রয়োজন হয় যিনি একাধিক ভূমিকায় নির্ভরযোগ্য পারফরম্যান্স দিতে সক্ষম। সামির সেই চাহিদা পূরণ করতে পারবেন বলেই বিশ্বাস ক্লাব কর্তাদের।
তাঁর উচ্চতা প্রায় ছ’ফুট। ফলে ডিফেন্সে এয়ারিয়াল ডুয়েলে যেমন সুবিধা পাবেন তেমনই সেট পিস পরিস্থিতিতেও আক্রমণভাগে বাড়তি অস্ত্র হয়ে উঠতে পারেন।
গত মরসুমে পঞ্জাব এফসি-র জার্সিতে সামির ছিলেন দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ফুটবলার। মাঝমাঠে তাঁর উপস্থিতি দলকে যেমন রক্ষণাত্মক নিরাপত্তা দিয়েছে তেমনই আক্রমণ গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন তিনি।
সদ্য সমাপ্ত আইএসএল মরসুমে দুটি গোল করেছেন সামির। শুধু তাই নয়, তিনটি গোলের ক্ষেত্রেও সরাসরি অবদান রেখেছেন। একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের জন্য এই পরিসংখ্যান যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য।
মাঝমাঠে বল কেড়ে নেওয়া, প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দেওয়া, দ্রুত বল বিতরণ এবং প্রয়োজনে বক্সে ঢুকে পড়ে গোলের সুযোগ তৈরি করা সব ক্ষেত্রেই নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। ফলে ভারতীয় ফুটবলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাঁর কোনও সমস্যা হবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সামিরের কেরিয়ারের বড় শক্তি তাঁর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা। বসনিয়া প্রিমিয়ার লিগে খেলার পাশাপাশি উজবেকিস্তানের লিগেও নিজের ছাপ রেখেছেন তিনি। যে ক্লাবেই খেলেছেন
সেখানেই নিয়মিত গোল এবং অ্যাসিস্টের মাধ্যমে দলের সাফল্যে অবদান রেখেছেন।
ইউরোপীয় ফুটবলের কঠিন পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই ফুটবলার ট্যাকটিক্যালি যথেষ্ট পরিণত। ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী কখন ডিফেন্সে নামতে হবে এবং কখন আক্রমণে উঠতে হবে, সেই বোধ তাঁকে আরও কার্যকর ফুটবলার করে তুলেছে।
মোহনবাগানের মতো বড় ক্লাবে খেলার ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
মোহনবাগানের বর্তমান দলে ইতিমধ্যেই একাধিক তারকা ফুটবলার রয়েছেন। তবে দীর্ঘ মরসুমে সাফল্য পেতে হলে স্কোয়াডের গভীরতা অত্যন্ত জরুরি। সামিরের আগমন সেই দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি এমন একজন ফুটবলার যিনি ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। প্রতিপক্ষের আক্রমণ
থামানোর পাশাপাশি নিজের দলের আক্রমণও গড়ে তুলতে সক্ষম। ফলে মাঝমাঠে ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বিশেষ করে বড় ম্যাচগুলিতে যেখানে মাঝমাঠের লড়াইই ফল নির্ধারণ করে দেয় সেখানে সামিরের অভিজ্ঞতা এবং শারীরিক সক্ষমতা মোহনবাগানকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বললেই অনেকের মনে শুধুমাত্র রক্ষণাত্মক ভূমিকার কথা আসে। কিন্তু সামিরের ক্ষেত্রে বিষয়টি একেবারেই আলাদা। তিনি প্রয়োজনে আক্রমণে উঠে এসে গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেন।
সেট-পিস পরিস্থিতিতে তাঁর উপস্থিতি প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি হতে পারে। কর্নার বা ফ্রি কিক থেকে হেডের মাধ্যমে গোল করার ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি দূরপাল্লার শট নেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি যথেষ্ট দক্ষ।
ফলে শুধুমাত্র ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে নয় অলরাউন্ড ফুটবলার হিসেবেও তিনি দলের
সম্পদ হয়ে উঠতে পারেন।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর নিজের প্রতিক্রিয়ায় সামির স্পষ্ট জানিয়েছেন যে মোহনবাগানের সমর্থকদের আবেগ ও ভালবাসা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
তিনি বলেছেন, “ভারতে আসার পর থেকেই মোহনবাগানের ধারাবাহিক সাফল্যের কথা শুনেছি। আইএসএলে যুবভারতীতে বিপক্ষ দলের হয়ে খেলতে নেমে সমর্থকদের আবেগ কাছ থেকে দেখেছি। মোহনবাগানের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের জার্সি পরার সুযোগ পাওয়া আমার কাছে গর্বের বিষয়।
এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি কতটা উচ্ছ্বসিত।
সামির স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তিনি শুধুমাত্র অংশগ্রহণ করতে আসেননি। তাঁর লক্ষ্য ট্রফি জয়।
তিনি বলেছেন মোহনবাগান দেশের সেরা ক্লাব। এই দলের ফুটবলারদের সঙ্গে খেলতে পারা আমার কাছে বড় সুযোগ। আমি আরও ভাল খেলব বলে বিশ্বাস করি। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মানসিকতা নিয়েই কলকাতায় আসছি। আইএসএল সহ সব ট্রফি জিততে চাই।
একজন পেশাদার ফুটবলারের কাছে এই ধরনের মানসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা ক্লাবের লক্ষ্য এবং দর্শনের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে মিলে যায়।
গত কয়েক বছরে ভারতীয় ফুটবলে ধারাবাহিক সাফল্য পেয়েছে মোহনবাগান। তবে সাফল্য ধরে রাখা আরও কঠিন কাজ। সেই কারণেই ক্লাব কর্তারা সময় নষ্ট না করে নতুন মরসুমের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন।
সেপ্টেম্বরে নতুন মরসুম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় এখন থেকেই স্কোয়াড শক্তিশালী করার কাজে মন দিয়েছে তারা। সামির জেলকোভিচের মতো অভিজ্ঞ এবং বহুমুখী ফুটবলারের আগমন সেই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শুধু আইএসএল নয়, সুপার কাপ ডুরান্ড কাপ এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতাতেও শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সবুজ-মেরুন শিবির। সেই লক্ষ্য পূরণে সামির বড় ভূমিকা পালন করবেন বলেই আশা সমর্থকদের।
মোহনবাগানের সাম্প্রতিক ট্রান্সফার নীতি দেখলে বোঝা যায় যে ক্লাব শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের কথাও ভাবছে। অভিজ্ঞতা বহুমুখিতা এবং নেতৃত্বের গুণ এই তিন বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েই নতুন ফুটবলার বেছে নেওয়া হচ্ছে।
সামির জেলকোভিচ সেই সমস্ত গুণেরই মিশেল। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, আইএসএলে প্রমাণিত পারফরম্যান্স এবং জয়ের মানসিকতা তাঁকে মোহনবাগানের জন্য আদর্শ সইয়ে পরিণত করেছে।
এখন দেখার বিষয়, সবুজ-মেরুন জার্সিতে মাঠে নেমে তিনি কত দ্রুত নিজের ছাপ রাখতে পারেন। তবে কাগজে-কলমে বিচার করলে বলা যায়, নতুন মরসুম শুরুর আগেই মোহনবাগান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত সই সম্পন্ন করেছে। আর সেই কারণেই সামির জেলকোভিচের আগমন নিয়ে ইতিমধ্যেই উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে সমর্থকদের মধ্যে।
মোহনবাগান গত কয়েক বছরে ভারতীয় ফুটবলে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে মূলত একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল গঠনের মাধ্যমে। শুধু তারকা ফুটবলার নয়, দলের প্রতিটি পজিশনে বিকল্প এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কৌশল বদলানোর মতো খেলোয়াড় রাখার দিকেও গুরুত্ব দিয়েছে ক্লাব। সেই জায়গা থেকেই সামির জেলকোভিচের সই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
আধুনিক ফুটবলে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের ভূমিকা আগের তুলনায় অনেক বেশি। শুধু প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দেওয়াই নয়, আক্রমণ গড়ার প্রথম ধাপও শুরু হয় তাঁদের পা থেকে। মাঝমাঠে বল দখল করে দ্রুত ফরোয়ার্ডদের কাছে পৌঁছে দেওয়া, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রয়োজন হলে রক্ষণভাগকে অতিরিক্ত সুরক্ষা দেওয়া সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার।
সামিরের সবচেয়ে বড় শক্তি হল তাঁর ফুটবল বুদ্ধিমত্তা। মাঠে তিনি খুব কম ভুল করেন এবং ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। মোহনবাগানের মতো দল যারা অধিকাংশ ম্যাচেই বলের দখল ধরে রেখে খেলতে পছন্দ করে তাদের জন্য এমন একজনফুটবলারের গুরুত্ব অনেক বেশি।