পটল পছন্দ করেন না? তবুও একবার চেখে দেখুন ঘিয়ের সুবাসে ভরা এই সুস্বাদু মুগ-পটল। মুগ ডালের মাখামাখি স্বাদ আর পটলের দারুণ মেলবন্ধনে তৈরি এই নিরামিষ পদটি ভাতের সঙ্গে জমে যাবে একেবারে! সহজ উপকরণে রান্না করে আপনিও চমকে দিতে পারেন পরিবারের সবাইকে।
নিরামিষের দিনে একই ধরনের ডাল, ভাত কিংবা পনিরের পদ খেতে খেতে অনেকেরই একঘেয়েমি চলে আসে। আবার বাড়ির ছোট থেকে বড়—অনেকেই শাকসব্জি দেখলেই নাক সিঁটকান। বিশেষ করে পটল নাম শুনলেই যাঁরা মুখ ভার করেন, তাঁদের জন্য এই রান্নাটি হতে পারে দারুণ চমক। কারণ সাধারণ পটলের তরকারি নয়, আজ থাকছে এমন এক সুস্বাদু পদ, যেখানে পটলের সঙ্গে মিশেছে ভাজা মুগ ডালের মাখামাখি স্বাদ, টম্যাটোর হালকা টক-মিষ্টি ভাব এবং গরমমশলা ও ঘিয়ের অপূর্ব সুবাস।
নাম তার মুগ-পটল। শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও স্বাদে একেবারেই আলাদা। মুচমুচে করে ভেজে নেওয়া পটল ও আলু যখন মশলা কষানো মুগ ডালের সঙ্গে মিশে যায়, তখন তৈরি হয় অসাধারণ এক নিরামিষ পদ। শেষ ধাপে এক চামচ ঘি ও সামান্য গরমমশলা যোগ করলেই গোটা রান্নাটির স্বাদ এবং গন্ধ যেন কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
এই মুগ-পটল শুধু দুপুরের গরম ভাতের সঙ্গেই ভালো লাগে, তা নয়। গরম রুটি, পরোটা কিংবা লুচির সঙ্গেও পরিবেশন করা যায়। ফলে নিরামিষের দিনে নতুন কোনও পদ কী রান্না করবেন, তা নিয়ে চিন্তা থাকলে এই রেসিপিটি সহজেই তালিকায় রাখতে পারেন।
সবচেয়ে ভালো বিষয় হল, রান্নাটি তৈরি করতে খুব বেশি জটিল কোনও উপকরণ প্রয়োজন নেই। বাড়ির রান্নাঘরে থাকা পরিচিত মশলা, পটল, আলু এবং মুগ ডাল দিয়েই তৈরি হয়ে যাবে এই সুস্বাদু পদ। শুধু রান্নার কয়েকটি ধাপ ঠিকভাবে মেনে চললেই মুগ-পটল হবে ঝরঝরে, সুগন্ধি এবং মাখামাখি।
পটল সাধারণত ভাজা, আলু-পটলের ঝোল, পটল দোলমা কিংবা নানা ধরনের তরকারিতে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু মুগ ডালের সঙ্গে পটলের এই সংমিশ্রণ বাঙালি নিরামিষ রান্নায় বেশ অন্যরকম স্বাদ এনে দেয়।
এই রান্নার মূল আকর্ষণ হল মুগ ডাল। ডালটি সরাসরি রান্নায় না দিয়ে আগে অল্প সময় ভিজিয়ে নিয়ে মশলার সঙ্গে ভালো করে কষিয়ে নিতে হবে। এতে ডালের নিজস্ব গন্ধ বেরিয়ে আসে এবং রান্নায় একটি সুন্দর বাদামি, মাটির মতো সুগন্ধ তৈরি হয়।
অন্য দিকে পটল ও আলু আগে সর্ষের তেলে হালকা বাদামি করে ভেজে নেওয়া হয়। এর ফলে সব্জিগুলি রান্নার সময় সহজে গলে যায় না এবং বাইরের অংশে সুন্দর একটি ভাজা স্বাদ তৈরি হয়। পরে যখন এগুলি মশলা কষানো ডালের সঙ্গে মেশে, তখন প্রতিটি টুকরো মশলার স্বাদ ভালোভাবে শুষে নেয়।
শেষে ঘি দেওয়াটাই এই রান্নার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। গরমমশলার সঙ্গে ঘি মিশে যে সুবাস তৈরি হয়, সেটিই মুগ-পটলকে সাধারণ নিরামিষ তরকারির থেকে আলাদা করে দেয়।
এই রান্নার জন্য খুব বেশি উপকরণের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন হবে—
৫০০ গ্রাম পটল
২টি মাঝারি আকারের আলু
২টি মাঝারি টম্যাটো
আধ কাপ মুগ ডাল
৪ টেবিলচামচ সর্ষের তেল
১টি শুকনোলঙ্কা
২টি তেজপাতা
২টি ছোট এলাচ
এক টুকরো ছোট দারচিনি
আধ টেবিলচামচ গোটা জিরে
দেড় ইঞ্চি গ্রেট করা আদা
আধ টেবিলচামচ হলুদগুঁড়ো
আধ টেবিলচামচ লঙ্কাগুঁড়ো
১ টেবিলচামচ কাশ্মীরি লঙ্কাগুঁড়ো
দেড় টেবিলচামচ জিরেগুঁড়ো
আধ টেবিলচামচ গরমমশলার গুঁড়ো
১ টেবিলচামচ ঘি
দেড় টেবিলচামচ চিনি
স্বাদমতো নুন
প্রয়োজনমতো জল
মশলার পরিমাণ নিজের স্বাদ অনুযায়ী সামান্য কম-বেশি করা যেতে পারে। তবে রান্নার শেষ দিকে ঘি এবং গরমমশলার পরিমাণ খুব বেশি না দেওয়াই ভালো। এতে পটল ও মুগ ডালের নিজস্ব স্বাদ ঢাকা পড়ে যেতে পারে।
প্রথমে পটলগুলি ভালো করে ধুয়ে নিন। পটলের দু’দিকের মাথা সামান্য কেটে খোসা ছাড়িয়ে নিন। চাইলে পুরো খোসা না ছাড়িয়ে হালকা করে চেঁছে নিতে পারেন। এতে রান্নার সময় পটল ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে।
এর পর পটলগুলিকে ডুমো ডুমো করে কেটে নিন। আলুও খোসা ছাড়িয়ে পটলের আকারের কাছাকাছি টুকরো করে কাটুন। সব্জিগুলি কেটে নেওয়ার পর আবার এক বার জল দিয়ে ধুয়ে ভালো করে জল ঝরিয়ে রাখুন।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—পটল ও আলু ভাজার আগে যতটা সম্ভব জল ঝরিয়ে নেওয়া ভালো। সব্জিতে বেশি জল থাকলে গরম তেলে দেওয়ার সময় তেল ছিটকে যেতে পারে। পাশাপাশি সব্জি ভালোভাবে ভাজাও হবে না।
মুগ ডাল কয়েক বার পরিষ্কার জলে ধুয়ে নিন। তার পর প্রায় ১৫ মিনিটের জন্য জলে ভিজিয়ে রাখুন। খুব বেশি সময় ভিজিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই।
এই রান্নায় ডাল একেবারে গলে গিয়ে ডালনার মতো হয়ে যাওয়ার কথা নয়। বরং রান্না শেষে মুগ ডালের দানাগুলি যতটা সম্ভব আলাদা বা গোটা থাকলে পদটির টেক্সচার আরও ভালো হয়।
তাই ডাল সেদ্ধ করার সময় জলের পরিমাণ এবং আঁচের দিকে নজর রাখা জরুরি। রান্নার শেষে ডাল যেন মাখামাখি হয়, কিন্তু একেবারে পেস্টের মতো না হয়ে যায়—এই ভারসাম্যটাই মুগ-পটলের আসল সৌন্দর্য।
এ বার কড়াই বসিয়ে গরম করুন। তাতে ২ টেবিলচামচ সর্ষের তেল দিন। তেল গরম হয়ে গেলে কেটে রাখা আলু ও পটল দিয়ে দিন।
এর সঙ্গে সামান্য নুন এবং দু’চিমটে হলুদগুঁড়ো দিন। মাঝারি আঁচে সব্জিগুলি ভালো করে ভাজতে থাকুন।
পটল ও আলুর বাইরের অংশ যখন হালকা বাদামি হয়ে আসবে এবং আলু কিছুটা সেদ্ধ হয়ে যাবে, তখন বুঝতে হবে ভাজার কাজ প্রায় শেষ। খুব বেশি ভাজার প্রয়োজন নেই, কারণ পরবর্তী ধাপে এগুলি আবার ডালের সঙ্গে রান্না হবে।
ভাজা হয়ে গেলে আলু ও পটল কড়াই থেকে তুলে আলাদা করে রাখুন।
একই কড়াইয়ে এবার বাকি ২ টেবিলচামচ সর্ষের তেল দিন। তেল গরম হলে শুকনোলঙ্কা, তেজপাতা, এলাচ এবং দারচিনি দিয়ে ফোড়ন দিন।
প্রায় কয়েক সেকেন্ড নাড়াচাড়া করার পর গোটা জিরে দিয়ে দিন। জিরে থেকে সুন্দর গন্ধ বেরোতে শুরু করলে পরের ধাপে যেতে হবে।
এ বার গ্রেট করা আদা দিয়ে দিন। আদা কয়েক সেকেন্ড নেড়ে নিয়ে কেটে রাখা টম্যাটো যোগ করুন। এই সময় সামান্য নুন দিলে টম্যাটো দ্রুত নরম হয়ে আসবে।
টম্যাটো নরম হয়ে মশলার সঙ্গে মিশে গেলে একে একে হলুদগুঁড়ো, লঙ্কাগুঁড়ো, কাশ্মীরি লঙ্কাগুঁড়ো এবং জিরেগুঁড়ো দিয়ে দিন।
মশলা দেওয়ার পর আঁচ কমিয়ে ভালোভাবে কষাতে হবে। প্রয়োজনে অল্প জল ছিটিয়ে মশলা কষতে পারেন, যাতে মশলা কড়াইয়ের তলায় লেগে না যায়।
মশলা ভালোভাবে কষানো হয়ে গেলে আগে থেকে ভিজিয়ে রাখা মুগ ডালের জল ঝরিয়ে কড়াইয়ে দিয়ে দিন।
এখন ডালকে মশলার সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে ৪-৫ মিনিট ধীরে ধীরে কষাতে হবে। এই ধাপটি এড়িয়ে গেলে রান্নায় সেই বিশেষ মুগ ডালের সুবাস পাওয়া যাবে না।
ডাল মশলার সঙ্গে কষতে কষতে ধীরে ধীরে সুন্দর গন্ধ বেরোতে শুরু করবে। তখন বুঝবেন ডাল রান্নার পরবর্তী ধাপের জন্য প্রস্তুত।
এর পর পরিমাণমতো গরম জল দিতে হবে। একেবারে বেশি জল দিয়ে দেবেন না। কারণ এই রান্নার ঝোল খুব পাতলা হবে না। মুগ-পটল সবচেয়ে ভালো লাগে যখন ডালটি মাখামাখি অবস্থায় থাকে এবং সব্জির গায়ে মশলা লেগে থাকে।
এ সময় স্বাদমতো নুন এবং চিনি দিয়ে দিন। চিনি এই রান্নায় মিষ্টি করার জন্য নয়; বরং টম্যাটো ও মশলার স্বাদকে ভারসাম্য দিতে ব্যবহার করা হয়েছে।
কড়াই ঢেকে কম আঁচে কয়েক মিনিট রান্না করুন।
ডাল কিছুটা সেদ্ধ হয়ে এলে ঢাকনা খুলে আগে থেকে ভেজে রাখা পটল ও আলু কড়াইয়ে দিয়ে দিন।
সব্জিগুলিকে ডালের সঙ্গে খুব সাবধানে মিশিয়ে নিন। বেশি জোরে নাড়াচাড়া করলে পটল ভেঙে যেতে পারে।
এ সময় খেয়াল রাখবেন ডাল যেন একেবারে গলে না যায়। ডালের দানা এবং পটলের টুকরো দুটোই যেন বোঝা যায়—এই অবস্থাই মুগ-পটলের জন্য আদর্শ।
আবার কড়াই ঢেকে কিছুক্ষণ কম আঁচে রান্না করুন। এতে পটল ও আলুর ভিতর পর্যন্ত মশলার স্বাদ ঢুকে যাবে এবং ডালের সঙ্গে সুন্দরভাবে মিশে যাবে।
সব্জি সেদ্ধ হয়েছে কি না, তা একটি পটল বা আলুর টুকরো চামচ দিয়ে চেপে দেখে বুঝতে পারেন। তবে খুব বেশি নরম করে ফেলবেন না।
রান্নার শেষ ধাপটাই এই পদের সবচেয়ে সুগন্ধি মুহূর্ত।
পটল ও আলু ভালোভাবে সেদ্ধ হয়ে গেলে আধ টেবিলচামচ গরমমশলার গুঁড়ো এবং ১ টেবিলচামচ ঘি দিয়ে দিন।
ঘি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গোটা রান্নায় দারুণ একটি সুবাস ছড়িয়ে পড়বে। হালকা হাতে মিশিয়ে আঁচ বন্ধ করে দিন।
চাইলে কড়াই ঢেকে ২-৩ মিনিট রেখে দিতে পারেন। এতে ঘি ও গরমমশলার গন্ধ রান্নার সঙ্গে আরও ভালোভাবে মিশে যাবে।
এই পদটির সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, এটি একাধিক খাবারের সঙ্গে পরিবেশন করা যায়।
গরম সাদা ভাতের সঙ্গে মুগ-পটলের জুটি একেবারেই অতুলনীয়। ডালের মাখামাখি ঝোল ভাতের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে পটল ও মুগ ডালের স্বাদ আরও ভালোভাবে পাওয়া যায়।
শুধু ভাত নয়, গরম রুটির সঙ্গেও এই পদ দারুণ মানায়। বাড়িতে নিরামিষের দিনে রুটি তৈরি করলে মুগ-পটল দিয়ে সহজেই একটি সম্পূর্ণ খাবার তৈরি করে ফেলতে পারেন।
লুচি বা পরোটার সঙ্গেও এটি পরিবেশন করা যেতে পারে। বিশেষ করে রান্নাটি যদি একটু ঘন করে তৈরি করেন, তা হলে পরোটার সঙ্গে খেতে বেশ ভালো লাগবে।
প্রথমত, পটল ও আলু ভাজার সময় আঁচ খুব বেশি রাখবেন না। মাঝারি আঁচে ধীরে ধীরে ভাজলে সব্জির ভিতরটা সেদ্ধ হবে এবং বাইরের অংশও সুন্দর বাদামি হবে।
দ্বিতীয়ত, মুগ ডাল বেশি সেদ্ধ করবেন না। ডাল একেবারে গলে গেলে রান্নার কাঙ্ক্ষিত টেক্সচার থাকবে না।
তৃতীয়ত, মশলা কষানোর সময় ধৈর্য ধরুন। কাঁচা মশলার গন্ধ চলে গিয়ে তেল ছাড়তে শুরু করলে তবেই ডাল যোগ করুন।
চতুর্থত, ঘি একেবারে শুরুতে না দিয়ে রান্নার শেষে দিন। এতে ঘিয়ের সুগন্ধ অটুট থাকবে এবং রান্নার স্বাদও অনেক বেশি ভালো হবে।
সবশেষে, গরমমশলা খুব বেশি ব্যবহার না করাই ভালো। এই রান্নার আসল আকর্ষণ হল পটল, মুগ ডাল, সর্ষের তেল এবং ঘিয়ের মিলিত স্বাদ।
নিরামিষ রান্না মানেই যে প্রতিদিন একই ধরনের ডাল, তরকারি কিংবা পনিরের পদ খেতে হবে, এমনটা একেবারেই নয়। বাঙালি রান্নাঘরে এমন অসংখ্য পদ রয়েছে, যেগুলি সহজ উপকরণে তৈরি হলেও স্বাদে একেবারে অসাধারণ।
মুগ-পটল তেমনই একটি পদ। এতে যেমন পটল রয়েছে, তেমনই রয়েছে মুগ ডালের পুষ্টিকর গুণ। আলু রান্নায় বাড়তি স্বাদ এবং ঘনত্ব আনে, আর টম্যাটো যোগ করে হালকা টক-মিষ্টি ভারসাম্য।
সর্ষের তেলের ঝাঁঝ, আদার গন্ধ, গোটা মশলার ফোড়ন, কষানো জিরে-লঙ্কার স্বাদ এবং শেষে ঘিয়ের সুবাস—সব মিলিয়ে এই রান্না হয়ে ওঠে একেবারে জমজমাট।
তাই বাড়ির কেউ পটল খেতে না চাইলেও একবার এই পদ্ধতিতে মুগ-পটল রান্না করে দেখতে পারেন। সাধারণ পটলের রান্নার থেকে এর স্বাদ অনেকটাই আলাদা। গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করলে প্লেট থেকে পটলের টুকরোগুলি কখন যে শেষ হয়ে যাবে, তা বোঝাই যাবে না।
তাই নিরামিষের দিনে একঘেয়ে রান্না বাদ দিয়ে আজই বানিয়ে ফেলুন ঘিয়ের সুবাসে ভরা মুগ-পটল। সহজ উপকরণ, পরিচিত মশলা আর সামান্য যত্নেই তৈরি হবে এমন এক সুস্বাদু পদ, যা ভাত কিংবা রুটি—দুইয়ের সঙ্গেই হয়ে উঠতে পারে জমজমাট সঙ্গী।