Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুফল পাচ্ছে শিল্পমহল: জিতিন প্রসাদ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দেশীয় শিল্প ও উদ্যোগের প্রসারে নতুন সুযোগ তৈরি করবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (Free Trade Agreement বা FTA) দেশের শিল্প ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন কেন্দ্রীয় বাণিজ্য, শিল্প, ইলেকট্রনিক্স ও তথ্য-প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জিতিন প্রসাদ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একাধিক দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সমঝোতার ফলে ভারতীয় সংস্থাগুলি আন্তর্জাতিক বাজারে আরও সহজে প্রবেশের সুযোগ পাবে। বিশেষ করে দেশের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প বা MSME ক্ষেত্র এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলে ব্যবসার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।

মঙ্গলবার কলকাতা চেম্বার অব কমার্স এবং ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্স (ICC)-এর আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে দেশের শিল্প ও রপ্তানি সম্ভাবনা নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই মন্তব্য করেন জিতিন প্রসাদ। অনুষ্ঠানে তিনি ভারতের সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অবস্থান এবং দেশীয় শিল্পকে বিশ্ববাজারের সঙ্গে আরও বেশি করে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

জিতিন প্রসাদের বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ভারতের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পাদিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। তাঁর দাবি, ওমান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের পাশাপাশি ইউরোপীয় দেশগুলির সঙ্গে ভারতের যে বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, তার ফলে উন্নত বিশ্বের ৬৫ থেকে ৭৫ শতাংশ বাজারে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের প্রবেশাধিকার তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, এই ধরনের বাজারে প্রবেশের সুযোগ ভারতীয় শিল্প সংস্থাগুলির জন্য একটি বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মূল উদ্দেশ্যগুলির মধ্যে অন্যতম হল অংশীদার দেশগুলির মধ্যে পণ্য ও পরিষেবার বাণিজ্যকে আরও সহজ করা। শুল্ক ও অন্যান্য বাণিজ্যিক বাধা কমলে সংশ্লিষ্ট দেশের ব্যবসায়ীরা বৃহত্তর বাজারে নিজেদের পণ্য নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান। ভারতের ক্ষেত্রেও এই ধরনের চুক্তি দেশীয় উৎপাদক, রপ্তানিকারক এবং ব্যবসায়িক সংস্থাগুলিকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার সুযোগ দিতে পারে—এমনই বক্তব্য উঠে এসেছে মন্ত্রীর কথায়।

বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে MSME বা ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পক্ষেত্রকে। ভারতের অর্থনীতিতে এই ক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জিতিন প্রসাদ মনে করেন, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক বাজারের সুযোগকে MSME সংস্থাগুলি কাজে লাগাতে পারে। তাঁর বক্তব্য, সঠিকভাবে এই সুযোগ ব্যবহার করা গেলে ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলিও দ্রুত নিজেদের ব্যবসা সম্প্রসারণের পথে এগোতে পারবে।

রপ্তানি বাড়ানোর ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক সহায়তার প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী। তাঁর দাবি, রপ্তানি সংক্রান্ত সহায়তা পেতে ব্যবসায়ীদের আগের মতো প্রশাসনের দরজায় দরজায় ঘুরতে হবে না। দেশের প্রতিটি জেলাতেই রপ্তানি সহায়তা কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে এবং সেখানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সহায়তার জন্য একজন করে অফিসার নিযুক্ত রয়েছেন বলে তিনি জানান।

এই ব্যবস্থার লক্ষ্য হিসেবে স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসায়িক সংস্থাগুলিকে রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। বিশেষ করে যে সমস্ত ছোট ও মাঝারি সংস্থা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে চায়, তাদের জন্য স্থানীয় স্তরে রপ্তানি সংক্রান্ত সহায়তার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ব্যবসায়ীদের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং রপ্তানির সুযোগ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করাই এই ধরনের ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য বলে বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

অনুষ্ঠানে ভারতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন জিতিন প্রসাদ। তিনি জানান, ২৭টি দেশ ভারতকে তাদের ব্যবসার অংশীদার করেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের সঙ্গে অন্যান্য দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গত কয়েক বছরে নতুন মাত্রা পেয়েছে। একসময় উন্নত দেশগুলির কাছে ভারত মূলত একটি বড় ভোক্তা বাজার হিসেবে বিবেচিত হতো বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ভারতের বিপুল জনসংখ্যা এবং ক্রমবর্ধমান ভোক্তা বাজার দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। জিতিন প্রসাদ বলেন, দেশের দেড়শো কোটি মানুষের কাছে পণ্য বিক্রি করাই একসময় বহু উন্নত দেশের ব্যবসায়িক আগ্রহের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল। তবে তাঁর বক্তব্যে বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের প্রত্যাশার পরিবর্তনের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে।

news image
আরও খবর

মন্ত্রী বলেন, ভারতের গ্রামাঞ্চলেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে ভালো মানের পণ্য কেনার বিষয়ে সচেতনতা ও আগ্রহ বেড়েছে। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ পণ্যের বাজার আরও সম্প্রসারিত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। অর্থাৎ ভারতের বাজার এখন শুধু জনসংখ্যার দিক থেকে বড় নয়, পণ্যের চাহিদা ও ভোক্তাদের প্রত্যাশার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—এমন একটি চিত্র তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।

তবে ভারতকে শুধুমাত্র একটি বড় বাজার হিসেবে দেখার ধারণার পরিবর্তন চায় কেন্দ্র—এমন কথাও স্পষ্টভাবে বলেন জিতিন প্রসাদ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অন্যান্য দেশ শুধু ভারতে নিজেদের পণ্য বিক্রি করবে, এমন সম্পর্কের পরিবর্তে ভারত চায় অংশীদার দেশগুলি এদেশের সঙ্গে একযোগে শিল্প গড়ে তুলুক। অর্থাৎ ভারতের লক্ষ্য শুধু আমদানি বা বিদেশি পণ্যের জন্য বাজার তৈরি করা নয়; বরং যৌথভাবে উৎপাদন, শিল্প স্থাপন এবং ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করা।

এই বক্তব্যের মধ্যে ভারতের শিল্পনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। বিদেশি সংস্থার জন্য ভারতের বিশাল বাজার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই ভারতীয় শিল্পের জন্য বিদেশি বাজারে প্রবেশের সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সেই পারস্পরিক বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে।

দেশীয় শিল্পের জন্য এর সম্ভাব্য সুবিধার মধ্যে অন্যতম হল আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধি। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সমঝোতা থাকলে ভারতীয় সংস্থাগুলি সেই বাজারগুলিতে নিজেদের পণ্য নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা পেতে পারে। বিশেষ করে যে শিল্পগুলি রপ্তানিমুখী ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চাইছে, তাদের কাছে বাণিজ্য চুক্তিগুলি নতুন বাজারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পাশাপাশি পণ্যের মান, উৎপাদন ক্ষমতা, মূল্য প্রতিযোগিতা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের মতো বিষয়গুলিও ব্যবসায়ীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাজারের সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই সুযোগকে বাস্তব ব্যবসায়িক সাফল্যে পরিণত করতে শিল্প সংস্থাগুলির প্রস্তুতি ও সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

এই জায়গাতেই MSME ক্ষেত্রের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। দেশের বহু ক্ষুদ্র ও মাঝারি সংস্থা স্থানীয় বাজারে ব্যবসা করলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে সীমিত হতে পারে। রপ্তানি সহায়তা কেন্দ্রের মতো প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ এই সংস্থাগুলিকে ভবিষ্যতে রপ্তানিমুখী হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে।

জিতিন প্রসাদের বক্তব্যে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—ভারতের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সম্পর্ককে শুধুমাত্র পণ্য কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিল্প সহযোগিতার দিকে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান। যৌথভাবে শিল্প গড়ে তোলা, উৎপাদন ক্ষেত্রে সহযোগিতা এবং পারস্পরিক ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ভারত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে চায়—এমন বার্তাই তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে।

কলকাতায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, রপ্তানি এবং দেশীয় শিল্পের আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তাতে ভারতের ব্যবসায়িক পরিবেশে বৈশ্বিক বাজারের গুরুত্ব আরও একবার সামনে এসেছে। একদিকে যেমন বিদেশি বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে দেশীয় বাজারে বিদেশি সংস্থার উপস্থিতির পাশাপাশি যৌথ শিল্প উদ্যোগকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, জিতিন প্রসাদের বক্তব্যের মূল বার্তা হল—ভারতের সাম্প্রতিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিগুলিকে শুধু কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক সমঝোতা হিসেবে না দেখে দেশীয় শিল্প, MSME এবং রপ্তানিকারকদের জন্য বাস্তব ব্যবসায়িক সুযোগে পরিণত করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ, রপ্তানি সহায়তা এবং বিদেশি সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে শিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে ভারতীয় ব্যবসাগুলির জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এই সুযোগ কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যাবে, তা নির্ভর করবে শিল্প সংস্থাগুলির প্রস্তুতি, পণ্যের মান, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার উপর।

Preview image