বিধানসভায় রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা, চিকিৎসা পরিকাঠামো ও সাধারণ মানুষের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন ভাঙড়ের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী।
রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা পরিকাঠামো এবং চিকিৎসা পেতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে যে সমস্ত সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, সেই বিষয়গুলি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় তুলে ধরলেন ভাঙড়ের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি রাজ্যের হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর প্রাপ্যতা, রোগীদের পরিষেবা এবং প্রত্যন্ত এলাকার স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনেন।
স্বাস্থ্য পরিষেবা যেকোনো জনকল্যাণমূলক সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। শহর থেকে গ্রাম, ধনী থেকে দরিদ্র—সমাজের প্রত্যেক মানুষের জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে বহু মানুষ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গিয়ে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন। কোথাও পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই, কোথাও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি অচল, কোথাও শয্যার অভাব, আবার কোনো কোনো এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও সেখানে নিয়মিত চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়া যায় না। এই বাস্তব সমস্যাগুলির দিকেই বিধানসভায় সরকারের নজর আকর্ষণ করেন নওশাদ সিদ্দিকী।
স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়ন শুধু নতুন হাসপাতাল নির্মাণ অথবা নতুন প্রকল্প ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, ওষুধ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে কি না—এসব বিষয় সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
রাজ্যের বহু সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উপর প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ নির্ভর করেন। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থা সবচেয়ে বড় ভরসা। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ বহন করা অনেক পরিবারের পক্ষেই সম্ভব হয় না। ফলে সরকারি হাসপাতালে পরিষেবার কোনো ঘাটতি থাকলে তার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের উপর।
বিধানসভায় স্বাস্থ্য দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করার মাধ্যমে নওশাদ সিদ্দিকী মূলত সেই সমস্ত মানুষের সমস্যাকে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যাঁরা প্রতিদিন চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরে বেড়ান অথবা পর্যাপ্ত পরিষেবা না পেয়ে সমস্যায় পড়েন।
রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের ভবন, রোগীদের বসার জায়গা, শৌচাগার, পানীয় জল, পরিচ্ছন্নতা, বিদ্যুৎ এবং জরুরি পরিষেবার পরিকাঠামো নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ সামনে আসে। একটি হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবা ভালো হওয়ার পাশাপাশি তার সামগ্রিক পরিবেশও রোগীবান্ধব হওয়া প্রয়োজন।
অনেক হাসপাতালে রোগীর চাপ অনুযায়ী পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই শয্যায় একাধিক রোগীকে রাখার অভিযোগও উঠে আসে। আবার জরুরি বিভাগে রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে পরিস্থিতি সামাল দিতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে শুধু ভবন নির্মাণ করলেই হবে না। সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, অপারেশন থিয়েটার, অক্সিজেন সরবরাহ, আইসিইউ, সিসিইউ, ডায়ালিসিস ইউনিট, ব্লাড ব্যাঙ্ক, অ্যাম্বুল্যান্স এবং রোগ নির্ণয়ের আধুনিক ব্যবস্থা কার্যকর রাখতে হবে। যন্ত্রপাতি কিনে হাসপাতালে রেখে দেওয়া হলেও সেগুলি পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত কর্মী না থাকলে রোগীরা তার সুবিধা পান না।
এই কারণে প্রতিটি হাসপাতালের পরিকাঠামো, কর্মীসংখ্যা এবং চিকিৎসা পরিষেবার বাস্তব অবস্থা নিয়মিত পর্যালোচনা করার দাবি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রামীণ এবং প্রত্যন্ত এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে চিকিৎসকের ঘাটতি দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। অনেক সময় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক পাওয়া যায় না। সাধারণ চিকিৎসক থাকলেও স্ত্রীরোগ, শিশুরোগ, অস্থি, চক্ষু, হৃদরোগ অথবা শল্যচিকিৎসার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না।
এর ফলে জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষকে জেলা হাসপাতাল অথবা কলকাতার বড় হাসপাতালে যেতে হয়। দূরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী রোগীদের জন্য এই যাত্রা অত্যন্ত কষ্টকর এবং ব্যয়বহুল। গুরুতর অবস্থায় রোগীকে দ্রুত বড় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় প্রয়োজনীয় অ্যাম্বুল্যান্স বা রেফারেল পরিষেবা না পাওয়া গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
চিকিৎসক নিয়োগের পাশাপাশি তাঁদের গ্রামীণ এলাকায় কাজ করার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। নিরাপদ আবাসন, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম, সহায়ক কর্মী এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা না থাকলে অনেক চিকিৎসক প্রত্যন্ত এলাকায় দীর্ঘদিন কাজ করতে আগ্রহী হন না। স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্থায়ী উন্নতির জন্য এই সমস্যাগুলির সমাধান প্রয়োজন।
সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা সচল রাখার ক্ষেত্রে নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্ট, স্বাস্থ্য সহায়ক, সাফাইকর্মী এবং অন্যান্য কর্মীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বহু হাসপাতালে রোগীর তুলনায় স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা কম থাকায় তাঁদের উপর অতিরিক্ত কাজের চাপ পড়ে।
একজন নার্সকে যদি একসঙ্গে অত্যধিক সংখ্যক রোগীর দায়িত্ব সামলাতে হয়, তাহলে প্রত্যেক রোগীকে প্রয়োজনীয় সময় ও যত্ন দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে ল্যাব টেকনিশিয়ান বা রেডিওলজি কর্মীর ঘাটতি থাকলে পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে দেরি হয়। চিকিৎসক দ্রুত পরীক্ষা করানোর নির্দেশ দিলেও প্রয়োজনীয় কর্মী না থাকায় রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা শুরু হতে সময় লেগে যায়।
স্বাস্থ্যকর্মীদের শূন্যপদ পূরণ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং উপযুক্ত কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা স্বাস্থ্য পরিষেবা উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ।
সরকারি হাসপাতালে আউটডোর টিকিট সংগ্রহ থেকে শুরু করে চিকিৎসক দেখানো, পরীক্ষা করানো এবং ওষুধ নেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে রোগীদের অনেক সময় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। প্রবীণ নাগরিক, গর্ভবতী মহিলা, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য এই অপেক্ষা বিশেষভাবে কষ্টকর।
ডিজিটাল টোকেন ব্যবস্থা, অনলাইন রেজিস্ট্রেশন এবং নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক চিকিৎসক দেখানোর ব্যবস্থা চালু করা হলেও সব জায়গায় তা সমানভাবে কার্যকর নয়। অনেক মানুষ এখনও অনলাইন পরিষেবা ব্যবহারে অভ্যস্ত নন। ফলে ডিজিটাল ব্যবস্থার পাশাপাশি অফলাইন সহায়তা কেন্দ্রও থাকা দরকার।
হাসপাতালে রোগীর চাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রাথমিক এবং ব্লক স্তরের স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই যদি সাধারণ রোগের যথাযথ চিকিৎসা, পরীক্ষা এবং ওষুধ পাওয়া যায়, তাহলে জেলা ও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপর চাপ অনেকটাই কমবে।
সরকারি হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া হয়। কিন্তু রোগীদের একটি অংশের অভিযোগ, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সব ধরনের প্রয়োজনীয় ওষুধ সবসময় হাসপাতালের কাউন্টার থেকে পাওয়া যায় না। ফলে তাঁদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হয়।
গরিব পরিবারের কাছে নিয়মিত ওষুধ কেনার খরচ একটি বড় বোঝা। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, হাঁপানি, কিডনি বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত ওষুধ প্রয়োজন। হাসপাতাল থেকে ওষুধ না পেলে অনেক রোগী আর্থিক সমস্যার কারণে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিতে পারেন, যা তাঁদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ওষুধের মজুত, সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থা ডিজিটালভাবে পর্যবেক্ষণ করা হলে কোন হাসপাতালে কোন ওষুধের ঘাটতি রয়েছে তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। প্রতিটি হাসপাতালে প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত ওষুধ মজুত রাখা এবং ওষুধের মেয়াদ নিয়মিত পরীক্ষা করাও জরুরি।
সরকারি হাসপাতালে রক্ত পরীক্ষা, এক্স-রে, আল্ট্রাসোনোগ্রাফি, সিটি স্ক্যান, এমআরআই এবং অন্যান্য রোগ নির্ণয়মূলক পরীক্ষার জন্য রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়—এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করানোর তারিখ অনেক পরে দেওয়া হয়।
জটিল রোগ দ্রুত শনাক্ত করতে সময়মতো পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি। পরীক্ষা করতে দেরি হলে রোগের প্রকৃতি বুঝতে এবং সঠিক চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হয়। বিশেষ করে ক্যানসার, হৃদরোগ, কিডনি রোগ অথবা মস্তিষ্কের সমস্যার ক্ষেত্রে দেরি বিপজ্জনক হতে পারে।
সরকারি হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি বসানোর পাশাপাশি সেগুলি নিয়মিত সচল রাখা দরকার। যন্ত্র নষ্ট হয়ে গেলে দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা এবং বিকল্প কেন্দ্রে রোগীকে পাঠানোর কার্যকর প্রক্রিয়া থাকা উচিত।
গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র অথবা ছোট হাসপাতাল থেকে রোগীদের বড় হাসপাতালে রেফার করা হয়। কিন্তু অনেক সময় রোগীর পরিবারকে পরিষ্কারভাবে জানানো হয় না কেন তাঁকে রেফার করা হচ্ছে, কোন হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে এবং সেখানে প্রয়োজনীয় শয্যা বা চিকিৎসা পাওয়া যাবে কি না।
রেফারেল ব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করা প্রয়োজন। কোনো রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠানোর আগে সেখানে শয্যা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা গেলে রোগীর হয়রানি কমবে।