Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

নিট পরীক্ষা ২১ জুন: প্রশ্ন ফাঁসের জেরে বাতিল হওয়া পরীক্ষা ফের নেবে এনটিএ, ২২ লক্ষ পড়ুয়ার ভাগ্য নির্ধারণ।

প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে দেশজুড়ে বিতর্কের পর অবশেষে ২০২৪ সালের নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিল ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA)। আগামী ২১ জুন এই পরীক্ষা পুনরায় অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়েছে। এর ফলে প্রায় ২২ লক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থীকে আবারও পরীক্ষায় বসতে হচ্ছে। স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবার কড়া নিরাপত্তা ও নতুন নিয়মের অধীনে পরীক্ষা পরিচালিত হবে।

ভূমিকা

ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানে যোগদানের প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট ইউজি নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা টানাপোড়েনের অবসান ঘটল। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে যে বাতিল হওয়া নিট পরীক্ষা আগামী ২১ জুন অনুষ্ঠিত হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং দুর্নীতির অভিযোগে পরীক্ষা বাতিলের এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে সারা দেশের শিক্ষা মহলে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে। ২২ লক্ষেরও বেশি ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ এখন এই পুনরায় পরীক্ষার ওপর নির্ভর করছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও বিতর্ক

এ বছর নিট পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই নানা অসঙ্গতির খবর সামনে আসতে শুরু করে। পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যায় রেকর্ড সংখ্যক পরীক্ষার্থী পূর্ণ নম্বর পেয়েছেন। এর পরেই বিহার ও গুজরাট সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে। পুলিশি তদন্তে জানা যায় যে একটি বড় চক্র এই প্রশ্ন ফাঁসের নেপথ্যে কাজ করেছে এবং মোটা টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন বিক্রি করা হয়েছে। ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকদের বিক্ষোভের মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক এবং এনটিএ পরীক্ষা বাতিলের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।

এনটিএর নতুন ঘোষণা ও প্রস্তুতি

এনটিএ জানিয়েছে যে ২১ জুনের পরীক্ষায় কোনো প্রকার ত্রুটি রাখা হবে না। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক স্তরে নজরদারি চালানো হবে। পরীক্ষার কেন্দ্রগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরীক্ষার্থীদের পরিচয় যাচাই করা হবে। এছাড়া প্রশ্নপত্র বহন এবং বিতরণের ক্ষেত্রেও ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা হচ্ছে। এনটিএ আধিকারিকদের মতে এই নতুন পরীক্ষা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফেরানোই তাদের প্রধান লক্ষ্য।

২২ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর উৎকণ্ঠা ও চ্যালেঞ্জ

একবার পরীক্ষা দেওয়ার পর পুনরায় সেই একই মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাওয়া ছাত্রছাত্রীদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। ২২ লক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থী যারা গত কয়েক বছর ধরে দিনরাত এক করে প্রস্তুতি নিয়েছেন তাদের মধ্যে এখন মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। একদিকে যেমন দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থার কারণে অনেকে খুশি অন্যদিকে আবারও পরীক্ষা দেওয়ার ক্লান্তি ও অনিশ্চয়তা তাদের ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষ করে যারা দূরবর্তী এলাকা থেকে এসে পরীক্ষা দেন তাদের জন্য যাতায়াত এবং থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইনি লড়াই ও সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা

নিট পরীক্ষা নিয়ে জল গড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। একাধিক আবেদন জমা পড়েছিল যেখানে সম্পূর্ণ পরীক্ষা বাতিলের দাবি জানানো হয়। আদালতও পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে যে পরীক্ষার পবিত্রতা নষ্ট হলে কোনোভাবেই তা মেনে নেওয়া হবে না। সিবিআই এই মুহূর্তে পুরো ঘটনার তদন্ত করছে এবং এই তদন্তের অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করেই আগামী দিনের চিকিৎসা শিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।

নিট পরীক্ষা ২০২৪: একটি জাতীয় বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: নিট পরীক্ষার গুরুত্ব ও বর্তমান সংকট

ভারতে চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়াশোনা করা প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর জন্য ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট বা 'নিট' (NEET) হলো একমাত্র প্রবেশদ্বার। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী এই পরীক্ষায় বসেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যাটি ছিল নজিরবিহীন—প্রায় ২৪ লক্ষ। কিন্তু পরীক্ষার পর থেকেই যেভাবে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করেছে, তাতে এই পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা বড়সড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। গত মে মাসে পরীক্ষা হওয়ার পর থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে বিহারের মতো রাজ্যে পুলিশি তদন্তে যখন 'পোড়া প্রশ্নপত্র' উদ্ধার হয়, তখন থেকেই ছাত্রছাত্রীদের মনে ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে।

অসঙ্গতি ও ফলাফল বিতর্ক

জুন মাসের শুরুতে যখন নিট পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়, তখন দেখা যায় ৬৭ জন পরীক্ষার্থী পূর্ণ ৭২০ নম্বর পেয়েছেন। এর আগে কোনোদিন এত বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী নিট পরীক্ষায় পূর্ণ নম্বর পাননি। এমনকি একই পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে একাধিক টপার বের হওয়ার ঘটনাও সন্দেহ বাড়াতে থাকে। এর পাশাপাশি যোগ হয় 'গ্রেস মার্কস' বা অনুগ্রহ নম্বর প্রদানের বিতর্ক। এনটিএ দাবি করেছিল যে সময়ের অপচয় হওয়ার কারণে বেশ কিছু ছাত্রছাত্রীকে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মেধাবী ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় কোনো স্বচ্ছতা ছিল না। এই অসঙ্গতির ফলেই মেধাতালিকায় আকাশছোঁয়া পরিবর্তন আসে, যা লক্ষ লক্ষ সাধারণ পরীক্ষার্থীর ডাক্তারি পড়ার স্বপ্নকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়।

দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলন ও সরকারের ভূমিকা

news image
আরও খবর

দিল্লি থেকে কলকাতা, মুম্বই থেকে পাটনা—দেশের প্রতিটি বড় শহরে নিট দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নামে। সুপ্রিম কোর্টেও এই বিষয়ে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক প্রথমে কোনো বড়সড় দুর্নীতির কথা অস্বীকার করলেও, সিবিআই তদন্তের চাপের মুখে পড়ে তারা স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে কিছু জায়গায় স্থানীয় স্তরে অনিয়ম হয়েছে। এই ব্যাপক জনবিক্ষোভ এবং আইনি লড়াইয়ের পরেই ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA) সিদ্ধান্ত নেয় যে বিতর্কিত পরীক্ষাগুলো বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া হবে। সেই লক্ষ্যেই আগামী ২১ জুন পুনরায় পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে।

এনটিএর নতুন চ্যালেঞ্জ: ২১ জুনের পরীক্ষা

এনটিএর সামনে এখন সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ২১ জুনের পরীক্ষাটি কোনো প্রকার ত্রুটি ছাড়াই সম্পন্ন করা। ২২ লক্ষেরও বেশি ছাত্রছাত্রীর এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করা সহজ কথা নয়। এনটিএ জানিয়েছে যে এবার তারা অনেক বেশি সতর্ক। প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রে ভিডিও নজরদারি, মেটাল ডিটেক্টর এবং বায়োমেট্রিক হাজিরা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এ ছাড়াও পরীক্ষা কেন্দ্রের আশেপাশে ১৪৪ ধারা জারি রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে যাতে কোনো বহিরাগত বা অসাধু চক্র পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না পারে। প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা রক্ষায় এবার ডিজিটাল সিকিউরিটি বক্স ব্যবহারের কথা ভাবা হচ্ছে যা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সময়েই খোলা যাবে।

ছাত্রছাত্রীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও কোচিং সেন্টারের প্রভাব

পুনরায় পরীক্ষায় বসার ঘোষণা অনেক ছাত্রছাত্রীর ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছে। যারা গত দুই-তিন বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে পড়াশোনা করেছেন, তাদের জন্য হঠাৎ করে পুরো সিলেবাস আবার ঝালিয়ে নেওয়া এবং একই মানসিকতায় পরীক্ষায় বসা অত্যন্ত কঠিন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অনিশ্চয়তা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অবসাদ তৈরি করছে। অন্যদিকে, বড় বড় কোচিং সেন্টারগুলো এই সুযোগে পুনরায় ক্র্যাশ কোর্স চালু করে ব্যবসার সুযোগ খুঁজছে বলেও অভিযোগ উঠছে। তবে সাধারণ ঘরের মেধাবী পড়ুয়ারা, যারা কোনো দামি কোচিংয়ে পড়ার সুযোগ পায় না, তাদের জন্য এই পুনরায় পরীক্ষা দেওয়া এক বড় আর্থিক ও মানসিক বোঝা।

তদন্তের গতিপ্রকৃতি: সিবিআই ও পুলিশের অভিযান

সিবিআই এই মুহূর্তে পুরো ঘটনার শেকড় খোঁজার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে কয়েক ডজন মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে যাদের মধ্যে শিক্ষক, মধ্যস্বত্বভোগী এবং সরকারি আধিকারিকও রয়েছেন। জানা গেছে, ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে এবং মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে অতি গোপনে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হয়েছিল। বিহারের 'সুইট হোম' নামক গেস্ট হাউসে যে সব নথি পাওয়া গেছে তা থেকে পরিষ্কার যে এই দুর্নীতির জাল অনেক গভীরে বিস্তৃত। কেন্দ্রীয় সরকার কঠোর শাস্তি হিসেবে দোষীদের ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং বড় অংকের জরিমানার আইন কার্যকর করার কথা ভাবছে।

ভবিষ্যতের শিক্ষা নীতি ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা

নিট কাণ্ড ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার পচনশীল দিকটি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। শুধুমাত্র একটি পরীক্ষা বাতিল করলেই কি সব সমস্যার সমাধান হবে? উত্তরটা সম্ভবত 'না'। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির কাঠামোতে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন। একটি কেন্দ্রীয় সংস্থার ওপর এত বড় পরীক্ষার দায়িত্ব না দিয়ে বিকেন্দ্রীকরণ বা অনলাইন পরীক্ষার দিকে ঝোঁকা উচিত। এছাড়া প্রশ্নপত্র তৈরির প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সুরক্ষিত করা একান্ত প্রয়োজন। শিক্ষাবিদদের মতে, যদি মেধার মূল্যায়ন সঠিকভাবে না হয়, তবে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ বড় সংকটের মুখে পড়বে।

২১ জুনের পরীক্ষার জন্য ছাত্রছাত্রীদের প্রস্তুতি টিপস

এই সংক্ষিপ্ত সময়ে ২২ লক্ষ ছাত্রছাত্রীকে আবার গুছিয়ে নিতে হবে। শিক্ষকদের পরামর্শ হলো, নতুন করে কোনো চ্যাপ্টার শুরু না করে পুরনো নোটসগুলো রিভাইস করা। মক টেস্ট দিয়ে নিজের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো জরুরি। সবথেকে বড় কথা, দুর্নীতির ছায়া যাতে মনে প্রভাব না ফেলে সেদিকে খেয়াল রাখা। এবারের পরীক্ষা অনেক বেশি কড়াকড়ির মধ্যে হবে, তাই ছাত্রছাত্রীদের উচিত হবে নিয়মাবলী ভালো করে পড়ে নেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছানো।

উপসংহার: ন্যায়ের প্রত্যাশা

২১ জুনের পরীক্ষা হবে ২২ লক্ষ স্বপ্নের শেষ রক্ষা করার লড়াই। সারা দেশ তাকিয়ে থাকবে এই পরীক্ষার দিকে। যদি এনটিএ এবারও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে ভারতের ছাত্র সমাজের বিশ্বাস চিরতরে ভেঙে যাবে। তবে আমরা আশা করি, প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ এবং কড়া নজরদারি যোগ্য প্রার্থীদের ন্যায্য বিচার দেবে। দুর্নীতির অন্ধকার কাটিয়ে মেধার জয় হোক—এটাই এখন সারা ভারতের প্রার্থনা।


 


 

Preview image