১৬ বছরের কমবয়সিদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা চললেও বাস্তবে তা কার্যকর করতে পেরেছে একমাত্র অস্ট্রেলিয়া। শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং অনলাইন ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে এই কঠোর পদক্ষেপকে অনেক দেশ উদাহরণ হিসেবে দেখলেও এখনও বেশিরভাগ রাষ্ট্র সিদ্ধান্তের পর্যায়েই আটকে রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ গভীর হচ্ছে। স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে তথ্যপ্রবাহ যেমন সহজ হয়েছে, তেমনই অল্প বয়সে অতিরিক্ত ডিজিটাল আসক্তি, অনুপযুক্ত কনটেন্ট, সাইবার বুলিং, অনলাইন প্রতারণা এবং ডিপফেকের মতো ভয়ঙ্কর প্রযুক্তিগত অপব্যবহার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ১৬ বছরের কমবয়সিদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটতে শুরু করেছে একাধিক দেশ।
এই বিষয়ে বাস্তবে সবচেয়ে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। সেদেশে আইন করে ১৬ বছরের কমবয়সিদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে কার্যত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, যদি কোনও সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থা এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নাবালকদের কাছে অবাধে পৌঁছে যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির উপর সর্বোচ্চ ৩ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত জরিমানা আরোপের বিধানও রাখা হয়েছে। এই আইন কার্যকর হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের সঠিক পথ কোনটি।
ভারতেও এবার সেই পথেই হাঁটার ইঙ্গিত মিলছে। কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক ইতিমধ্যেই ১৬ বছরের কমবয়সিদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনার বিষয়টি নিয়ে নোট প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছে। সূত্রের খবর, বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থা ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয়েছে। কোন কোন প্ল্যাটফর্মে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে, কোথায় বয়সভিত্তিক লগইন ব্যবস্থা চালু করা হবে এবং কোথায় অভিভাবকীয় নজরদারি বাধ্যতামূলক করা হবে—এই সব বিষয়েই একাধিক স্তরে কথা চলছে।
মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেন। তিনি জানান, বয়সভিত্তিক কনটেন্ট আলাদা করা, শিশু ও কিশোরদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করা এবং ডিপফেকের মতো প্রযুক্তিগত অপব্যবহার কীভাবে রোখা যায়—তা নিয়ে একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থা ও ওটিটি কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা চলছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে মূলত দুটি বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—প্রথমত, ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং দ্বিতীয়ত, বয়সভিত্তিক ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ বাস্তবে কতটা কার্যকর করা সম্ভব।
এই আলোচনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ‘ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন আইন’-এ সংশোধন এনে আরও কড়া বিধিনিয়ম যোগ করার চেষ্টা শুরু করেছে কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক। নাবালকদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, ডিজিটাল পরিচয় যাচাই এবং অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই সংশোধনের মূল লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলিও অবশ্য পিছিয়ে নেই। ফ্রান্স ইতিমধ্যেই ১৬ বছরের কমবয়সিদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সম্মতি বাধ্যতামূলক করেছে। সেখানে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খোলার সময় অভিভাবকদের অনুমোদনের নথি আপলোড করতে হয়। যদিও ফরাসি প্রশাসনের একাংশ মনে করছে, এই ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর নয়, কারণ অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মের অপব্যবহার হচ্ছে।
অন্যদিকে চীন চালু করেছে ‘মাইনর মোড’ বা মাইনর কোড ব্যবস্থা। নাবালকরা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করলে নির্দিষ্ট সময় পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাপ বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে কনটেন্টের ধরনও সীমিত করে দেওয়া হয়। এই ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিগত দিক থেকে তুলনামূলকভাবে কার্যকর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, স্পেন—প্রায় সব উন্নত দেশেই টিনএজারদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খসড়া আইন, গাইডলাইন বা নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। তবে বাস্তবে কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে পেরেছে একমাত্র অস্ট্রেলিয়াই।
ভারতের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। কয়েকটি রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের কাছে আবেদন জানিয়েছে যে, আংশিক নিয়ন্ত্রণ নয়—১৬ বছরের কমবয়সিদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক। তাদের যুক্তি, অভিভাবকদের অনুমতির মতো ব্যবস্থাগুলি বাস্তবে যথেষ্ট নয় এবং সেগুলির অপব্যবহার সহজেই সম্ভব।
এই তালিকায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে গোয়া। গোয়া সরকার নিজেদের রাজ্যে সোশ্যাল মিডিয়া সংক্রান্ত বিধিনিষেধকে সাইবার অপরাধের আওতায় আনার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ, নাবালকদের জন্য নিষিদ্ধ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে উৎসাহ দিলে বা সুযোগ করে দিলে তা আইনত অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
কেন্দ্রের অন্দরমহলে আলোচনা অনুযায়ী, ভারত সরকার কিছু কিছু সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে সরাসরি নিষেধাজ্ঞার পক্ষপাতী। বিশেষ করে যেসব প্ল্যাটফর্মে কিশোরদের মধ্যে আসক্তি, মানসিক চাপ বা অনুপযুক্ত কনটেন্টের ঝুঁকি বেশি—সেগুলিকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার কথা ভাবা হচ্ছে। একই সঙ্গে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলিকেও বয়সভিত্তিক কনটেন্ট বাছাই এবং আলাদা লগইন ব্যবস্থার বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
শুধু অ্যাকাউন্ট ব্যবহারে নয়, অ্যাপ ডাউনলোডের ক্ষেত্রেও ১৬ বছরের কমবয়সিদের জন্য বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপ করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। ভবিষ্যতে স্মার্টফোনে কোনও সোশ্যাল মিডিয়া বা ওটিটি অ্যাপ ইনস্টল করতে গেলে বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারত সরকার এখন আর শুধু সতর্কবার্তায় সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না। অস্ট্রেলিয়ার মডেলকে সামনে রেখে ধাপে ধাপে কঠোর ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের পথে এগোনোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে। যদিও এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, প্রযুক্তিগত ও আইনি চ্যালেঞ্জ কতটা মোকাবিলা করা যাবে—সেদিকেই এখন নজর বিশেষজ্ঞ মহলের।
শুধু অ্যাকাউন্ট ব্যবহারে নয়, অ্যাপ ডাউনলোডের ক্ষেত্রেও ১৬ বছরের কমবয়সিদের জন্য বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপ করার প্রস্তাব নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা ভারতীয় ডিজিটাল নীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এতদিন পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ বলতে মূলত ব্যবহারকারীদের সতর্ক করা, অভিভাবকদের নজরদারির কথা বলা বা স্বেচ্ছামূলক গাইডলাইন জারির মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন সরকার সরাসরি প্রযুক্তিগত স্তরে হস্তক্ষেপ করার কথা ভাবছে, যেখানে অ্যাপ ইনস্টল করার আগেই বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক হতে পারে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে স্মার্টফোনে কোনও সোশ্যাল মিডিয়া বা ওটিটি অ্যাপ ডাউনলোড করতে গেলেই ব্যবহারকারীর বয়স সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হবে এবং যদি বয়স ১৬ বছরের কম হয়, তাহলে সেই অ্যাপ ইনস্টল করার সুযোগই দেওয়া হবে না।
এই প্রস্তাব কার্যকর হলে অ্যাপ স্টোর, অপারেটিং সিস্টেম নির্মাতা এবং সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থাগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ, শুধুমাত্র আইন করে নির্দেশ দিলেই এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তার জন্য প্রয়োজন হবে শক্তিশালী প্রযুক্তিগত কাঠামো, নির্ভরযোগ্য বয়স যাচাই পদ্ধতি এবং ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার নিশ্চয়তা। বয়স যাচাইয়ের নামে যাতে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ না করা হয়, সেই দিকটিও সরকারকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারত সরকার এখন আর শুধু সতর্কবার্তায় সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না। শিশু ও কিশোরদের ডিজিটাল নিরাপত্তাকে সামনে রেখে আরও বাস্তবমুখী এবং কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দিকেই ঝুঁকছে কেন্দ্র। এই প্রসঙ্গে অনেকেই উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন অস্ট্রেলিয়া-র কথা। সেদেশে কেবল নীতিগত ঘোষণা নয়, বাস্তবে আইন কার্যকর করে দেখানো হয়েছে এবং প্রয়োজনে বড় অঙ্কের জরিমানার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ভারতও সেই মডেলকে সামনে রেখে ধাপে ধাপে ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের পথে এগোতে চাইছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এই উদ্যোগের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। প্রথমত, ভারতের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে বয়স যাচাই কতটা নির্ভুলভাবে করা যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা থাকবেই—বিশেষ করে টিনএজারদের মধ্যে। তৃতীয়ত, আইনি দিক থেকেও এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। ব্যক্তিস্বাধীনতা, তথ্যের অধিকার এবং ডিজিটাল অ্যাক্সেস—এই বিষয়গুলির সঙ্গে শিশু সুরক্ষার ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বিশেষজ্ঞ মহলের একাংশ মনে করছে, সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানোও সমান জরুরি। শুধুমাত্র অ্যাপ বন্ধ করে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বরং শিশু, অভিভাবক এবং শিক্ষকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। অন্যদিকে, আর একাংশের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বিকল্প নেই, কারণ সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাব ক্রমেই ভয়াবহ আকার নিচ্ছে।
এখন সব নজর এই দিকেই—কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক ঠিক কী ধরনের আইন ও প্রযুক্তিগত কাঠামো নিয়ে আসে এবং তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়। অস্ট্রেলিয়ার মডেল অনুসরণ করে ভারত যদি সত্যিই কঠোর ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ চালু করে, তাহলে তা শুধু দেশের মধ্যেই নয়, বিশ্বজুড়েই একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।